পঞ্চমীর শতকবিতায় দুর্জয়ভাবনা | চতুর্থ পর্ব | বই আলোচনা | মিহিন্দা

 

দুর্জয় খান 



পর্বঃ ৪





বিশ্লেষণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যদি আপনি মহামানবদের জীবনপাঠ পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা পাঠ করেন তবে দেখবেন সেইসব মহামানবদের উদারতা, মননশীল চেতনা, শ্রুতিমধুর বাণী, গতিশীল কার্যক্ষমতা, সুদৃঢ় আত্মবল ও মনোবল, জাগরণী শব্দের ব্রহ্মাস্ত্র ও সৎ আদর্শ পরিলক্ষিত হবে। বোধ ও দর্শনের সামগ্রিক শিক্ষা নিয়ে মনের বন্ধনকে উর্ধ্বে রেখে অনুভব আর উপলব্ধি দিয়ে হাজারো মনোজগতের উন্নতি সাধিত করে থাকে। যার ফলে মানুষের ভেতর আত্মপ্রতিচ্ছবি ফুটে উঠে, পৃথিবীর আমূল পরিবর্তন এনে থাকে। বস্তুজগত তথা বিশ্বপ্রকৃতির স্বরূপ দর্শন কেবল কল্পনারঞ্জিত না হয়ে বিশেষ অবস্থায় জীবপ্রকৃতির আয়ুকলায় বিদ্যুতের গতিতে আঁচড় কেটে থাকে। কিন্তু জীবনোৎকন্ঠা, এই একটিমাত্র শব্দ মানুষের চিন্তা -চেতনা, অনুসন্ধানের দৃষ্টিভঙ্গি, বিরতিহীন নৈতিক আদর্শের বলয়ে বেড়ে ওঠতে গিয়ে জীবনকে লঘু করে দেয়। জীবনে অজস্র বাঁকের সৃষ্টি হতেই থাকে, মানবজীবনের এই অদ্ভুদ লীলায় স্বয়ং স্রষ্টার যে হাত থাকে তা মানুষ কল্পনাও করেন না। অলৌকিক পরিবর্তনের কথা যদি বলেন তবে এক্ষেত্রে একটি কথা প্রযোজ্য যে, বাস্তবিক অর্থে অলৌকিক দ্বারা পরিবর্তন হয় ঠিকই কিন্তু এর স্থায়িত্ব বেশি দিনের হয় না। এজন্যই মানুষকে স্বয়ং সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রসৃত ব্যাধির মোকাবেলা করতে হয়। ঈশ্বর তাই আমাদের শিখিয়েছেন যুগে যুগে মহামানবের প্রেরণ করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে যদি আমরা তাকিয়ে দেখি তবে বুঝতে পারবো যে বর্তমান রাজনৈতিক চলমান অবস্থায় ঈশ্বর কতকগুলো মহামানব প্রেরণ করেছেন। সেইসব মহামানব যুগে যুগে এসে তাঁদের চিন্তা চেতনা ও সৎ উদ্দেশ্যর মাধ্যমে গোটা ইতিহাসকে পরিমার্জিত করে গেছেন।
আমি মানবজীবনের উৎকন্ঠার কথা বললাম তা সাধারণ মানুষ থেকে অসাধারণ মানুষগুলো এর বলয়ে আত্মিক শিল্পজাতের পরিচিন্তন বিষয়গুলো অতি সততার সাথে জনসম্মুখে স্পষ্ট করেছেন। যেমন কবি জীবনানন্দের কথায় বলি,  অতি সাধারণ থেকে মানুষের আত্মাকে সমৃদ্ধ করেছেন, জ্ঞান ও অনুভূতির ভান্ডারে যোগ করেছেন প্রকৃত মানবতাবাদ। অপরদিকে কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথা বলি, যিনিও সাধারণ থেকে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে গেছেন। তাঁদের জীবনপাঠ অবলোকন করলে দেখা যায় জীবনোৎকন্ঠা কখনোই তাঁদের পিছু ছাড়েনি। সেখান থেকেই জন্ম দিয়েছেন আধুনিক রাষ্ট্র তথা নতুন প্রজন্মের সুখ ও সমৃদ্ধি। 
পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে, সকল নিয়ম-কানুন বাঁধন-শৃঙ্খল মানা নিষেধের বিরুদ্ধে, ঠিক এমনই মতবাদের উপর ভিত্তি করে আন্দোলন শুরু হয়েছিলো ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। সেই সময়ের ভয়বহতা কতটা ভীতির সঞ্চার করেছিলো সকলের মনে তা কেবল বর্তমান প্রজন্ম কল্পনাই করতে পারে। অগণিত চিৎকার, পথরুদ্ধ ও বাকরুদ্ধ সময়, ঘরে বাইরে মৃত্যুর ভয়াবহতা আমাদের মানবজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিলো। মেধাসম্পন্ন ও মানুষের জাগ্রত বিবেক তথা বুদ্ধিজীবীদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিলো।

" শব্দটা সামনে আসে পেছনে যায়ডানে আসে বামে যায়ঘুরপাক খেতে থাকে সমস্ত জায়গায়করিডোর, দরজা, জানলা,দেয়াল, পর্দা,আলমারি,বাসনকোসন।থরথর কাঁপছে গ্রিলবেরিয়ে যাওয়ার পথ কোথায়পথরুদ্ধ; বাকরুদ্ধ! "

এমনই ভয়াবহতার আভাস দিয়েছেন কবি শুক্লা পঞ্চমী তার কবিতা ' ৩২ থেকে বাংলাদেশ -২" তে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সেই ভয়াল রাত্রের কথা যদি স্মরণ করি তবে এখনো গা শিউরে ওঠে। বাঙালি নির্মমভাবে হত্যার নির্দেশ দিয়ে কুখ্যাত ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগ করার পর সেই রাতে চলে নির্মম হত্যাযজ্ঞ। ৩২ থেকে বাংলাদেশ " এই বাক্যটির যদি ইতিহাস পর্যালোচনা করি তবে এর করুণ পরিণতি চোখের সামনে ভেসে উঠে। যে নাড়ী থেকে একটি স্বাধীন  রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে সেখানেই বুলেটফুল ঢেলে রক্তাক্ত করা হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যথার্থ বলেছিলেন,
' যাঁর মনের মধ্যে আছে সাম্প্রদায়িকতা, সে বন্য পশুর সমতুল্য "
বন্য পশুর আচরণ হয় রক্ত খেকো। বন্ধুরূপী পিশাচগুলো গভীর অন্ধকারে যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলো তা ২৫ শে মার্চের কালরাতকেও হার মানায়। কবি শুক্লা পঞ্চমীর অনুধাবন যথার্থই যে,

" ঘুমন্ত রাত জেগে জেগে পাহারা দেয় অন্ধকারদুঃস্বপ্নের তীক্ষ্ণ শলাকা যেনো বিঁধছে তাদের গা'য়৩২ নম্বর রোড পিচঢালা পথনিদারুণ অস্থিরতায় তোলপাড় হচ্ছে সব"...

এখানে ভয়াবহতার যে অপূর্ব নান্দনিক নির্দশন তিনি তুলে ধরেছেন তা বাস্তবিক অর্থে সত্য।  পাখির মতো মরে যাওয়া মানুষের রক্তের কি পরিণাম হলো ১৫ ই আগষ্টের রাতে! এখানে কবির জীবনোৎকন্ঠায় প্রমাণ করে।
জ্যাকব এ. রিস যথার্থ বলেছেন যে,
"সংগ্রামী জীবন দীর্ঘ এবং আনন্দপুর্ন জীবন প্রায়শই ক্ষণিকের হয়''
এই চেতনাকে ধারণ করে বঙ্গবন্ধু সরল শব্দে তুফান এনেছিলেন। একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি রাষ্ট্রগঠন ও বাঙালির অধিকার আদায়ের দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি। যাঁর তর্জনীর ইশারায় শত্রুদের হৃদয় কম্পিত হতো। যাঁর কথার বজ্রে কোটি কোটি বাঙালি বুক পেতে দিতো বিনা দ্বিধায়। একটি কথা না বললেই নয় যে, সুভাসচন্দ্র বসু ও বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতায় মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য ছিলো। নেতাজি বলতেন, " আমাকে রক্ত দাও আমি তোমাদের স্বাধীনতা এনে দেবো " অপরদিকে বঙ্গবন্ধু বলতেন, '' রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো, এ দেশের মানুষকে মুক্ত ছাড়বো ইনশাআল্লাহ "। অর্থাৎ মানবতাবাদ ও স্বাধীনতাকামী মনোভাব উভয়ই বিদ্যমান ছিলো তাঁর মস্তিষ্কজুড়ে। " ৩২ থেকে যখন একটি রাষ্ট্রের জন্ম হলো, মুক্তি এলো সাতকোটি বাঙালির,তখনও রক্ত শুকায়নি, তার পবিত্র রক্তে পুনরায় স্নান করলো সদ্য জন্ম হওয়া দেশ " বাংলাদেশ "। এই শোক কোটি হৃদয়ে যে চিৎকার করেছিলো তার কোনো শব্দ ছিলো না। কেবল গভীর নিনাদে গোঙানোর আওয়াজ ছিলো। ওই সময় থেকে অবিশ্বাস, সংশয়, বিদ্বেষ, হতাশা, অনুভূতির জীবন্মৃত অবস্থা ভীষণরকম ঘিরে ধরে মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়।
কবি শুক্লা পঞ্চমী সেখান থেকেই বলেছেন,

'' এক চিলতে করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শুনতে পায়বিভক্ত জাতির চিৎকার"
পুনরায় পরাধীন হলো না তো বাঙালি!  এমন সংশয় নিয়ে এখনো বাংলাদেশ, জীবন,  কবি ও কবিতা এগিয়ে চলছে আগামীর পথ ধরে! ৩২ থেকে বাংলাদেশ পেয়েও তাঁর মৃত্যু আমাদের জীবন্মৃত করে দিয়েছে। এ দায় কার! কি দক্ষিণা পেলেন জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান!

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন