পঞ্চমীর শতকবিতায় দুর্জয়ভাবনা | পর্ব ৬ | বই আলোচনা | মিহিন্দা

দুর্জয় খান


বুনতে বুনতে বাংলাদেশ

পর্বঃ ৬


এ কথা সত্য যে,  হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রপথিক, বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আপামর জনগণ বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে বাংলার স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলেন। তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ বাংলাদেশ। শূন্য থেকে শুরু করতে হবে সবকিছু। অনুন্নত থেকে উন্নতির পথে ধাবিত হতে হবে। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে একটি দরখাস্ত দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই অনুন্নত দেশকে স্বল্পোন্নত দেশে পরিণত করতে প্রথম পদক্ষেপ ফেলেছিলেন। নিঃশেষিত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বের সকল দেশে ভিখারির মতো ছুটে বেরিয়েছেন। একাত্তরের পর অল্পশিক্ষিত জাতিকে এগিয়ে নিতে শিক্ষিত লোকের বড্ড অভাব ছিলো। এমন প্রতিকূল অবস্থায় একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কার্যকরী বেশ কিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়ে উন্নতির পথে প্রথম পদচিহ্ন ফেলেছিলেন তা আমরা কোনোমতেই অস্বীকার করতে পারিনা। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিতে তখন বঙ্গবন্ধু ও তাঁর রাজনৈতিক সতীর্থরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু অগাধ বিশ্বাস নিয়ে সেই সময় বলেছিলেন, '' আমার উর্বর জমি আছে, আমার পরিশ্রমী মানুষ আছে,তারাই আমার সম্পদ"।  ৩২ থেকে বাংলাদেশ " কবি শুক্লা পঞ্চমী সেটাই বারবার তাঁর কবিতায় তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ, রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিলো বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক মুক্তি প্রদান করা। কর্মহীনতা, দুর্নীতি, আয়-সম্পদ-সুযোগ বৈষম্য, চোরাকারবারি, দারিদ্র্য দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয় সেটিই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করেছিলেন। এমন দূরাবস্থা থেকে একটি ছেঁড়া স্বপ্ন জোড়া দিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবনের দীর্ঘ বছর তথা যৌবনকাল এই বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে ব্যয় করেছেন। বাংলার মানুষের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ভিত্তি ছিলো সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধ। সেই বোধকে বাস্তবে পরিণত করতে মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের অনুধাবন করাতে কবি শুক্লা পঞ্চমী যথার্থই লিখেছেন,

একটা ছেঁড়া স্বপ্ন, জোড়া দিতে দিতে '৫২ থেকে ' ৭১একটা লক্ষ্য, বুনতে বুনতে ৩২ থেকে বাংলাদেশএক মহাজাতকের জয়গানশতাব্দীর শ্যাওলা মুছে চকচক ফুটে উঠেছিলো শুভ্র জ্যোৎস্নায়জানি, জানা সেই নাম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।"

অর্থাৎ অতি সাবলীল রচনায় একাগ্রচিত্তে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কবি শুক্লা পঞ্চমী তাঁর '' বঙ্গবন্ধু অযুত প্রাণের নাম" বইতে সুন্দর নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করেছেন।  যেখানে গদ্য আকারে হাজার হাজার আর্টিকেল বের হয় সেখানে কবি শুক্লা পঞ্চমী আত্মিক শিল্পজাতের অনুকরণে স্বাধীনতা ও বাংলার ইতিহাসকে কাব্যিক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন। বাংলা সাহিত্যে এই কাব্যিক অনুভূতির ধারা নতুন সংযোজন করেছে জাতির পিতার উদ্দেশ্য। 
বস্তুত, ১৯৭১ সালের ৭ ই মার্চ বাঙালির মুক্তির বার্তা বহন করে বঙ্গবন্ধু ইতিহাসে প্রথম স্বাধীনতার পয়গাম এনেছিলেন তা বাঙালি জাতির কাছে অস্বীকার করার নেই। সেই ভাষণ ছিলো মহাকাব্যিক ভাষণ। একটি আদর্শ রাষ্ট্রের রূপরেখা ও লক্ষ্য কি হতে পারে, বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু তা উপলব্ধি করেছিলেন সম্যকভাবে। বঙ্গবন্ধুর সেই উচ্চ ও সৎ দৃষ্টিভঙ্গিকে অনুধাবন করে শুক্লা পঞ্চমী পুনরায় লিখেছেন,

" হ্যাঁ বলেছিলেন পিতাছেঁড়া স্বপ্নগুলো কোমর বেঁধে দাঁড়াবেবেদনার ফাটলগুলো মাটি ভরাট হবেতালে তালে টোকা দিবে রঙিন দিন"।

বলতে হয় তাঁর এ এক যথার্থ অনুধাবন। আজ বাংলাদেশ চরম ক্ষুদাকে জয় করেছে। দারিদ্র্যকে জয় করেছে। বাংলাদেশে আজ ২১ শতাংশ লোক এখন দারিদ্র্য সীমার নিচে যা ৩ দশক আগে ছিলো ৪৭ শতাংশ। প্রাথমিক -মাধ্যমিক শিক্ষা, নারীশিক্ষা, নারীজাগরণে আজ বাংলাদেশ অর্জন করেছে বিস্ময়কর সুনাম। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে উঠছে দ্রুত গতিতে। শিক্ষাখাত,অর্থনৈতিকখাতসহ দেশের সকল খাতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে আজ তাই প্রমাণ করে। ১৯৭১ পরবর্তী সময় আর আজকের সময় আকাশ-পাতাল সম্পর্ক যা আমাদের অকপটে স্বীকার করতে হয়। পদ্মা সেতু ছাড়াও অনেক বৃহৎ প্রকল্প রাষ্ট্র নিজ হাতে গ্রহণ করেছে, যেমন, এলএনজি টার্মিনাল, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রাবন্দর, চট্টগ্রাম -কক্সবাজার-টেকনাফ রেললাইন, ঢাকা মেট্রোরেল,কর্ণফুলি টানেল এরকম হাজারো পরিকল্পনাসহ দেশের ১০০ টি অঞ্চলকে অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে যা সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে অসামান্য ভূমিকা পালন করবে।  ভূতপূর্বের বাংলাদেশ সম্পর্কে জ্ঞাত করে প্রখ্যাত কবি নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন,

" এরকম বাংলাদেশ কখনো দেখোনি তুমি।মুহূর্তে সবুজ ঘাস পুড়ে যায়ত্রাসের আগুণ লেগে লাল হয়ে জ্বলে উঠে চাঁদ।নরম নদীর চর হা-করা কবর হয়েগ্রাস করে পরম শত্রুকে;মিত্রকে জয়ের চিহ্ন ; পদতলে প্রেম,ললাটে ধুলোর টিপ এঁকে দেয় মায়ের মতোনএরকম বাংলাদেশ কখনো দেখোনি তুমি"

অর্থাৎ কবি শুক্লা পঞ্চমী ও প্রখ্যাত কবি নির্মলেন্দু গুণের ভাবনায় তেমন কোনো পার্থক্য নেই। বঙ্গবন্ধু -বাংলাদেশ নিয়ে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ও আত্মোপলব্ধি নদীর মোহনার মতো এক জায়গায় এসে মিলিত হয়ে গেছে।
বিজয়ের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় এই স্বাধীন ভূমি কলঙ্কিত হয় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পবিত্র রক্তে। যে সামরিকখাতকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বপ্রথম কুমিল্লা সেনানিবাসে পরিপূর্ণ এক জাতির কান্ডারি হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সেই সামরিক বাহিনীর কিছু নেমকহারামের দল রচনা করে ইতিহাসের কালো অধ্যায়,১৫ ই আগষ্ট।  স্বাধীন হয়েও যেনো পরাধীনতার স্বাদ পাই বাংলার মানুষ। বঙ্গবন্ধু যখন কোনো সভায় বের হতেন তখন তাঁকে দেখার জন্য উদোম গায়ে হাজারো মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতেন।  তা,দেখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলতেন, " তোমরা আমাকে এতো ভালোবাসো কেন! " সেই বঙ্গবন্ধুকে আজ দেখার জন্য কেউ দাঁড়িয়ে থাকে না। কেউ তাঁকে একটিবার দেখার জন্য রাস্তায় দৌড়ে এসে ভিড় জমায় না। নরপিশাচগুলো ১৫ ই আগষ্টের রাতে শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেনি, হত্যা করেছে হাজারো সাধারণ মানুষের মুখের হাসি, হত্যা করেছে আপামর জনতার ভালোবাসা,  স্বাধীন বাংলার অবিস্মরণীয় নাম, বাঙালি জাতির বিবেক কে হত্যা করেছে। এই শোক নয় এ যেনো ব্যথা! তাইতো কবি শুক্লা পঞ্চমী লিখেছেন,

" সবাই বলে শোক, শোক, শোক
আমি বলি ব্যথা, অনেক ব্যথা!

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন