পঞ্চমীর শতকবিতায় দুর্জয়ভাবনা | পর্ব ৭ | বই আলোচনা | মিহিন্দা

দুর্জয় খান


পর্বঃ ৭



এই মহাকালের স্বরূপ দর্শন সৃষ্টির সমস্তকিছু, সময় হলেই টের পেয়ে যায়। মানবতাবাদী চেতনা, মানুষ ও মৈত্রীর মেলবন্ধন সৃষ্টির শুরু থেকেই এক বৃহৎ ইতিহাসজুড়ে লেপ্টে লেগে আছে। আদিযুগ থেকে মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগে পূর্ণ গরিমায় সমাজশাস্ত্র তথা মানুষের মগজে মগজে প্রবাহমান। এই সিদ্ধ ইতিহাসের ধারকবাহকগণ যুগে যুগে এসে ইতিহাস তথা সমাজ ব্যবস্থা পাল্টে দিয়ে গেছেন। তাঁদের অবদান কিংবা কার্যকলাপ লক্ষ্য করলে দেখা যায় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় স্পষ্ট যে, 

" আসিছে সেদিন আসিছে সেদিন
চারি মহাদেশে মিলিয়ে যাবে, 
যেইদিন মহা-মানব- ধর্মে 
মনুর ধর্ম বিলীন হবে।"

সবরকমের ভেদাভেদ, বাধাবন্ধন ভেদ করে কেবল একটি ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা হলো মানবধর্ম। মধ্যযুগে সাম্যবাদী চেতনার যে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিলো তা আধুনিক যুগে এসে তার ফল ভোগ করছে গোটা মানুষজাতি। মানবধর্মের ফাঁক ফকড়ে যদিও কিছু অধর্ম কিছু মানুষের শিরায় শিরায় প্রবাহমান তবুও মানবতাবাদী দর্শনের স্রোতধারায় পরিশুদ্ধ প্রবাহমান। নদীতে ময়লা পড়বেই আর নদী তা পরিশুদ্ধ করবে এটাই প্রকৃতির নিয়ম। এসব বিষয়ভাবনা,জীবনার্থ ও পরমার্থের প্রতিধ্বনি এবং পরিমার্জিত শব্দ ব্যবহারে " বঙ্গবন্ধু অযুত প্রাণের নাম " কাব্যগ্রন্থে কবি শুক্লা পঞ্চমী প্রাতিস্বিকতার পরিচয় তুলে ধরেছেন।  হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালিকে নিয়ে লেখা শামসুর রহমান, কবি নির্মলেন্দু গুণের পর একমাত্র কবি শুক্লা পঞ্চমী বঙ্গবন্ধুর স্বতন্ত্র মনোভাবকে স্পষ্ট তুলে ধরেছেন পাঠকের সামনে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন পরিশুদ্ধ বাঙালি চেতনার মহানায়ক। তাঁর ঐতিহ্যবোধ ছিলো জীবনসম্পৃক্ত। ঔপনিবেশিক শাসনের ভয়াবহ স্রোত থেকে ছিনিয়ে এনেছেন বাঙালির অধিকার। নতুনভাবে জন্ম দিয়েছেন জীবনভাবনার একটি সুরক্ষিত রাষ্ট্র। যে সাবলীল ভাষা ও কার্যকলাপে তিনি বাঙালি চেতনাকে ধারণ করে বাঙালিমানসে মুক্তির ফসল রোপণ করেছেন তা মহাত্মা গান্ধীসহ বিশ্বনেতাদের কাতারে নিজের নামটি স্বরূপে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। বাঙালির প্রয়োজনে, বাস্তব কন্ঠে উচ্চারণ করেছেন অগণিত মুক্তির শব্দ যা একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ গঠনে প্রথম পদক্ষেপ ফেলেছিলো বাংলার মাটিতে,যেমনঃ

ভাইয়েরা আমার। দেশবাসী।জেলজুলুম।মজলুম।গণমানুষ।শাসনভার।হুঁশিয়ার। শাসনতন্ত্র। গরীবের। অধিকার। ন্যায়সঙ্গত। জয়বাংলা।

এরকম হাজারো শব্দ শুনলেই বঙ্গবন্ধুকে নত মস্তকে স্মরণ করতে হয়। বিশ্বের এমন কোনো নেতা নেই যে এইরকম শব্দে জোয়ার এনেছিলেন। যাঁর স্পষ্ট স্বাক্ষর রেখেছেন কবি শুক্লা পঞ্চমী তাঁর কবিতা " এক ধ্রুব কণায়" 

" স্বপ্নদ্রষ্টা এক কাব্যরূপকার
উৎকন্ঠিত সমুদ্রের মহাপ্রলয়ধ্বনি।"

যেখানে একজন মানুষ সহজ করে চলমান ভাষায় বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে সাধারণ মানুষ বলে থাকে ঠিক তেমনি করে কবি শুক্লা পঞ্চমী বলেছেন কবিতায়। এখানেই তো কবির প্রকৃত সার্থকতা যে পাঠক হৃদয়ের ও ইতিহাসখ্যাত বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সুদৃঢ় উচ্চারণ করা। যাতে একজন সাধারণ থেকে সাধারণ পাঠকের হৃদয়েও বঙ্গবন্ধুপ্রেম অকপটে জন্ম নেয়। 

কখনো হাতাশা,কখনো আক্ষেপ আর কখনো দীপ্তোজ্জ্বল নক্ষত্রটিকে নিয়ে আনন্দে ভেসেছেন কবিতায় কবিতায়।  এমন শব্দ ও ভাবনার প্রয়োগ করেছেন যেখানে কেবল স্বতন্ত্ররূপে বঙ্গবন্ধু প্রকাশ পেয়েছেন। আধুনিক দিক থেকে বিচার করলে বঙ্গবন্ধুদর্শন ও তাঁর আদর্শবাদ পরিপূর্ণ ভাষায় লিখিত বাক্যের সাথে এক সত্য অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন কবি শুক্লা পঞ্চমী। হাজারো বাঙালির হৃদয় থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রতি প্রেমময় শব্দ কুড়িয়ে একটা একটা করে বুনে রচনা করেছেন " বঙ্গবন্ধু অযুত প্রাণের নাম"।  বঙ্গবন্ধুর মনস্তত্ত্বকে ধারণ করে যেমন আজকের বাংলাদেশ গড়ে উঠছে ঠিক তেমনি বঙ্গবন্ধুর মনস্তত্ত্বকে জেনে লিখেছেন, " The roar of an cataclysmic restless Ocean. "। 

বঙ্গবন্ধু যেমন ছিলেন বিনয়ী তাঁর তেমন ছিলো নতুন সৃষ্টির প্রয়াস। ১৯৭০ সালের ৬ জুন যেদিন বঙ্গবন্ধু " জয় বাংলা " স্লোগানের জন্ম দিলেন সেদিনই স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, বাঙালির অধিকার আদায়ে বাঙালি আর পিছু হটবে না। বলা ভালো যে, " জয় বাংলা " কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি একটি ব্রহ্মাস্ত্রও বটে। বঙ্কিমচন্দ্রের যেমন " বন্দে মাতরম" দাদাভাই নওরোজির যেমন " স্বরাজ" মহাত্মা গান্ধীর যেমন " কুইট ইন্ডিয়া " নেতাজি সুভাষ চন্দ্রের যেমন " জয় হিন্দ" ঠিক তেমনি বঙ্গবন্ধুর " জয় বাংলা"।  এই ব্রহ্মাস্ত্র বাঙালির পূর্ণ অধিকার আদায়ে মাঠ-ঘাট,বন্দর শহর লোকালয় সব জায়গায় ছেয়ে গেছিলো। যার বিস্ফোরণে শত্রুদের হৃদয় গলিত হতো। সেই চেতনাকে ধারণ করে কবি শুক্লা পঞ্চমী যথার্থ লিখেছেন, 

" কি বাণী ছিলো তাঁর কন্ঠে? 
ফুলকির মতো ছড়িয়ে গেলো আপামর জনতার অন্তরে!"

বাস্তবিক অর্থে বঙ্গবন্ধুর প্রতি,বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি গভীর টান না থাকলে বঙ্গবন্ধুর এমন উচ্চারিত শব্দগুলো বুকে ধারণ করা যায় না, লেখা যায় না একশোটি কবিতা। 
বঙ্গবন্ধুর প্রতি কেবল ভালোবাসা নয়। যদি সমর্পণ না থাকে সেখানে ভাবনা কিংবা লেখা অনর্থক পর্যবসিত হয়। বাঙালির প্রতি সমর্পিত ছিলেন বলে বঙ্গবন্ধু এক মহাবার্তার ঘোষণা দিতে পেরেছিলেন ১৯৭১ সালের ৭ ই মার্চ। যার উপর নির্ভর করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলো লাখো বাঙালি। সেই সমর্পণের সুবাদে তিনি পেয়েছিলেন " বঙ্গবন্ধু " উপাধি যা বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসেও পাবেন না। সেই সারসত্যকে ধারণ করে কবি শুক্লা পঞ্চমী রচনা করলেন " বঙ্গবন্ধু অযুত প্রাণের নাম"।  এখানে সমর্পণের যে সত্য ধারা বইছে তা অস্বীকার করার অবকাশ নেই আমাদের মাঝে।
Show quoted text

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন