পঞ্চমীর শতকবিতায় দুর্জয়ভাবনা | পঞ্চম পর্ব | বই আলোচনা | মিহিন্দা


দুর্জয় খান



পর্বঃ ৫

ক) সমর্পণের এক মহানায়কঃ



মানবধর্ম তথা মানবতার প্রকৃত পূজারীর নাম বঙ্গবন্ধু। বিশুদ্ধ বিবেকের জ্বলন্ত নক্ষত্র। বঙ্গবন্ধুর হৃদয়, মন,ভাবনাজগত তথা সমগ্র অস্তিত্ব " মানবতা" নামক বিশুদ্ধ শব্দের উপর দণ্ডায়মান মূর্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন, একমাত্র মানবতাবাদী চেতনা একটি রাষ্ট্র তথা একটি জাতিগোষ্ঠীর সমৃদ্ধ এনে দিতে পারে। এই ভিত্তি গড়ে উঠার পিছনে তাঁর পূর্বপুরুষদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা দারুণভাবে প্রভাব ফেলেছিলো তাঁর সমগ্র জীবনজুড়ে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, অষ্টাদশ শতাব্দীতে এবং তারও পূর্বে অনেক ধর্মপ্রচারক সুদূর আরব থেকে আমাদের বাংলাদেশে আসেন মহান ইসলাম ধর্মের বাণী নিয়ে।  সেই সুবাদে ইতিহাস বিবেচনা করলে দেখা যায় বঙ্গবন্ধুর পূর্বপুরুষগণ কেউ ছিলেন সুফি সাধক,মানবতাবাদী চেতনার বিকশিত প্রাণপুরুষ। তাঁর পূর্বপুরুষদের প্রত্যেকে নিজ নিজ কর্মগুণে খ্যাত হয়েছিলেন। সেই প্রভাব বঙ্গবন্ধুর আদব-কায়দায়,ভাষায় ও ভাবনাজগতে দারুণ প্রভাব বিস্তার করেছিলো। আবার অনেকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থেকে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, জেল-যুলুম ভোগ করেছেন। অর্থাৎ মানবতাবাদী চেতনার আধ্যাত্মিক শক্তি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ অবস্থান তাঁর ধমনিতে প্রবাহিত ছিলো। সেখান থেকেই তাঁর মেধা ও মননে " সমর্পণের" অমৃত বীজ ফুটে উঠেছিলো। ধর্মীয় রীতিনীতি উর্ধ্বে রেখে মানবতাবাদকে আপন মস্তিষ্কে জায়গা দিয়ে স্রষ্ঠা ও মানুষের প্রতি সমর্পণের অঙ্কুশ টেনেছিলেন। কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন যথার্থই বলেছেন, " বঙ্গবন্ধু কখনও ক্ষমতা বা দম্ভের জায়গা থেকে রাজনীতি করেননি। তার রাজনীতির পুরোটাই মানবকল্যাণে নিবেদিত"। অর্থাৎ, বিশ্বমানবতার প্রতি এ এক উৎকৃষ্ট সমর্পণের উদাহরণ। বঙ্গবন্ধুর তার অসাম্প্রদায়িক ভাবনা, মানবতা, দৃঢ় নেতৃত্ব, দেশপ্রেম, মাতৃভাষাপ্রীতি, মূল্যবোধের জায়গাগুলো সমর্পণের নন্দিত এক ইতিহাস।১৯৬৬ সালে ৬ দফা দাবী যা ১৯৬৭ সালে বাংলার প্রতিটি মানব হৃদয়ে সমর্পণের রেখা টেনেছিলো। বাংলা ভাষার প্রতি সমর্পণের কথা বললে দেখা যায়, তিনি যেখানেই যেতেন সেখানে মিটিং শুরু করার আগেই বলতেন " আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি"।  ১৯৫৭ সালে তিনি চিনে গিয়েও বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন। মা,মাটি ও ভাষার প্রতি সবসময় বিশুদ্ধ সমর্পণ রেখে কথা বলেছেন। ১৯৫৫ সালে ৬ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদে বলেন, " জনগণের খাদ্য,বস্ত্র,বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা পাওয়া উচিত এবং তাদের কর্মসংস্থান করা দরকার"। মানুষের কেবল অধিকারের কথাই এখানে বললে ভুল হবে, বরং তিনি এখানে দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমের প্রতি সমর্পণের নন্দিত পরিচয় বহন করেন। সেই সমর্পণকে স্মরণ করে কবি শুক্লা পঞ্চমী তাঁর রচিত ১০০ কবিতা বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ লিখেছেন, 

'' তুমি, মিশে থাকা মাটির মায়ায় সবুজ ঘাসের নামতুমি উড়ে চলা পাখির ডানায় বাংলার শিরোনাম"।


খ) দীপ্ত উচ্চারণে ন্যায়ের মূর্তিঃ




ছোটবেলা থেকেই " জয় " শব্দের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ছিলো বিশেষ টান। দশ- এগারো বছর থেকেই তিনি জীবনে অন্যায়ের কাছে পরাজিত হওয়ার আগেই " জয় " তথা সত্যের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। স্পষ্টভাষী হওয়ার কারণে সকলে তাঁর প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন থাকতো। পরাজিত হয়ে নয়, জয়ের বরমাল্য নিয়ে সবসময় সমুদ্রের তরঙ্গের মতো নিরন্তর ছুটে ছিলেন সবার আগে। " শীর্ষে আরোহণ" শব্দটিকে বুকে বেঁধে অনুজ ও অগ্রজদের কাছে ছিলেন একজন প্রিয়পাত্র। স্কুলে ছাত্রাবস্থায় সেই সময়কার বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের সামনে নায্য অধিকার আদায় করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর এতোটুকু বুক কাঁপেনি। বঙ্গবন্ধুর সৎসাহস দেখে বলেছিলেন, ' এই ছেলে একদিন বড়ো কিছু হবে" হ্যাঁ সেই সূত্র ধরে অদম্য প্রাণশক্তির দীপ্ত উচ্চারণে ভরপুর জনতার সামনে বলেছিলেন,  ' বাংলার মানুষ অধিকার চায়, " আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, আমি চাই বাংলার মানুষের অধিকার", " তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো,তোমাদের কেউ কিচ্ছু বলবে না" শেষমেশ দীপ্ত উচ্চারণে ঘোষণা দিলেন,  " এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম"। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুর সেই দীপ্ত উচ্চারণের অনুভূতি আপন হৃদয়ে ধারণ করে কবি শুক্লা পঞ্চমী তাঁর শতকবিতায় লিখেছেন, 
" তুমি ষড়ঋতু ফাগুনের লাল গ্রীষ্মের খরতাপ"
বলিষ্ঠভাবে সত্য উপস্থাপন করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু সহ্য করেছেন নির্যাতন আর অপমান। বঙ্গবন্ধুর মন এবং দীপ্ত উচ্চারণ কোনো কল্পকথার কাহিনি নয়, পরিপূর্ণ মানবতাবোধ থেকে প্রতিটি কথা উচ্চারণ করেছেন বিশ্বাস আর জয় শব্দের টানে। কখনো এতোটাই হতাশ আর পীড়া ভোগ করেছেন সত্যকে বাঁচাতে গিয়ে যা ৭ মার্চের ভাষণের শুরুতেই বলেছেন,  " আজ দুঃখভরাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি"।  এই বাক্য অনুধাবন করলে বোঝা যায়, তিনি সত্যের জন্য কতটা অপমান আর মানুষের অধিকার আদায় করতে গিয়ে বারবার বিচ্যুত হয়েছেন। তবুও তিনি দমে যান নি। দমানোর প্রয়াসকে তিনি সরাসরি বলে দিয়েছেন, " আর দাবায়ে রাখতে পারবা না"। এখান থেকেই বিদ্রোহী আত্মা পুনরায় জীবন পায়। তাঁর সরল শব্দে, দীপ্ত উচ্চারণে বাঙালি নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিলো। ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঔপনিবেশিক শাসনের পতন ঘটিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ছিনিয়ে এনেছিলো বাংলার স্বাধীনতা।  বঙ্গবন্ধুর দীপ্ত উচ্চারণকে কাব্যিক ভঙ্গিমায়, নন্দিত উপমায় যেটাকে আমি বলে থাকি আত্মিক শিল্পজাত, সেই অনুধাবনেই লিখেছেন,

" তুমি স্বপ্নে বিভোর রূপকথার গল্পরাক্ষসের কম্পিত প্রাণ"


গ) বঙ্গবন্ধু; বিশ্বজয়ী এক নামঃ





নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে কিভাবে নিজেকে তৈরি করতে হয় তা বঙ্গবন্ধুর বয়ান তথা ' অসমাপ্ত আত্মজীবনী 'তে স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। বাঙালির অধিকার ও বাংলার স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বঙ্গবন্ধুর লড়াইয়ের খবর খবর জানতে জানতে সেখানেই পেয়ে যায় তাঁর চিন্তা চেতনা, দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি, সততা ও প্রকৃত মানবতাবাদী চেতনা। একথা অস্বীকার করার নয় যে, " অসমাপ্ত আত্মজীবনী " কোনো রাজনীতিকের স্মৃতিকথা নয়, বরং এটা ইতিহাসের উজ্জ্বল উপকরণ। তাঁর বয়ান ও লেখা সম্বলিত গ্রন্থটি পাঠ করলে নির্দ্বিধায় বলা যায়, বিশ্বনেতাদের চেয়ে তিনি কোনো অংশে কম ছিলেন না। আমি মনে করি উনিশ শতকের যেকজন বলিষ্ঠ ও সৎ আদর্শের বলয়ে গড়ে উঠা নেতা ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বঙ্গবন্ধু। মহাত্মা গান্ধীর সাথে নির্দ্বিধায় তাঁর সমীকরণ টানা যায়। আর বাঙালিদের মধ্যে একমাত্র তিনিই বাঙালিত্বের সীমা ছাড়িয়ে ইতিহাসের পাতায় মহৎ এবং বৃহৎ হয়ে উঠেছেন। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে দেখা যায় কবি শুক্লা পঞ্চমী তাঁর প্রত্যেকে কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গেছেন এক উচ্চ মর্যাদায়। ভাব,কল্পনা,শব্দের সাবলীলতায় বঙ্গবন্ধুর অকৃত্রিম চেতনার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন পাঠক সমাজকে। " তুমি সেই ইতিহাস বিশ্বজয়ী অক্ষয় অমর নাম" এই বাক্য উচ্চারণ করে কবি শুক্লা পঞ্চমী বঙ্গবন্ধু বিশ্বনেতৃত্বের মধ্য অন্যতম ব্যক্তিত্ব তাই প্রকাশ করেছেন। স্রষ্ঠা যেমন এক থেকে বহু হবো বলে এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন ঠিক তেমন বঙ্গবন্ধু সেই দর্শন থেকে নিজেকে আবিস্কার করে বাঙালির কাছে হয়ে উঠেছিলেন সার্বজনীন এক নাম। কবি শুক্লা পঞ্চমী বঙ্গবন্ধুর সেই চেতনাকে অবনত মস্তকে স্বীকার করে বলেও দিয়েছেন যে, " আমি জানি তুমি বঙ্গবন্ধু, বাংলার শিরোনাম"।  অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর বহু হবার বাসনা থেকে, বাঙালির আত্মমর্যাদার মূর্তি স্বরূপ দেখে কবি শুক্লা পঞ্চমী যথার্থ ভাবনা থেকে কল্পনা অথচ বাস্তব চেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে হৃদয় থেকে জন্ম দিয়েছেন সাবলীল এই বাক্যগুলো যা বঙ্গবন্ধুর সাথে স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্পিত তিনাঞ্জলি।
আজকের এই পর্বে কবি শুক্লা পঞ্চমীর ভাবনায় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তাঁর ভাবনার এক অমৃত বিষয়গুলো স্পষ্ট প্রতিয়মান হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে বাংলার শিরোনাম আখ্যা দিয়ে কবি শুক্লা পঞ্চমী বঙ্গবন্ধুর অবদানকে বাস্তবিক চেতনা কিংবা পবিত্র চেতনার পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন যা আগামী প্রজন্ম তথা গোটা পাঠক সমাজ বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধার জায়গাটাকে আরো বিস্তার করতে এক অনন্য ভূমিকা পালন করবে। প্রাঞ্জল শব্দের প্রয়োগ ও কবি অশোক কর আর কবি কৌশিক ব্যানার্জী সেইসব ভাষাকে দেশ বিদেশে পাঠকের কাছে উপযোগী করে তুলতে ইংরেজিতে অনুবাদ করে বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ধারার জন্ম দিয়েছেন।
আজ ১৬ ই ডিসেম্বর। " অসমাপ্ত আত্মজীবনী " কিংবা ' বঙ্গবন্ধু অযুত প্রাণের নাম " মহান বিজয় দিবসকে পরিশুদ্ধ চেতনায় উপলব্ধি করতে শেখায় এই বর্তমান প্রজন্মকে। গদ্য আর কবিতার সম্বয়ে দুটি গ্রন্থ বিচার করলে দেখা যায় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুকে দুইভাবে বাঙালি উপলব্ধি করার মতো দুটি গ্রন্থ পেয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি গোটা বাংলার ইতিহাসকে স্মরণ করা হয়েছে " বঙ্গবন্ধু অযুত প্রাণের নাম " কাব্যগ্রন্থে। যেখানে কবি অশোক কর ও কবি কৌশিক ব্যানার্জীর ইংরেজি অনুবাদগুলো পাঠকপ্রিয়তা বাড়াতে এক অনন্য ভূমিকা পালন করবে। 

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন