যৌনতার মাঝে অবস্থান করে যৌনতাকে অস্বীকার করবেন তাতো হয়না : মলয় দত্ত | মিহিন্দা



[মলয় দত্ত। কবি, গদ্যকার, ফিল্মমেকার। প্রকাশিত কবিতার বই সংখ্যা দুই। প্রথম কবিতার বই- মায়ের হাঁসগুলিরে জংলা খালে দেবতার মতন লাগে(২০১৭)। সর্বশেষ কবিতার বই - দ্যা  অ্যাপেল ভেণ্ডর এন্ড মাই জুলিয়েটস (২০১৯)। এ সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে  মলয় দত্তের যাপিত জীবন, সাহিত্যসহ নানা বিষয়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন - রাফাতুল আরাফাত।]  


মিহিন্দা : ভাই কেমন আছেন?

মলয় দত্ত :আমি কখনোই ভালো থাকিনা।


মিহিন্দা : আপনার শৈশব সম্পর্কে জানতে চাই। আপনার শৈশব কীভাবে কেটেছে?

মলয় দত্ত : আমার জীবনের প্রথম ৯ বছর গ্রামে। বাগেরহাটের মোড়েলঞ্জ থানার বৌলপুর গ্রাম। ক্লাস থ্রি অব্দি গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে পড়েছি। এরপর ক্লাস ফোরে জিলা স্কুলে ভর্তি হই, তখন আমরা পুরো পরিবার পিরোজপুর শহরে শিফট হয়ে যাই৷ আমার বন্ধু বান্ধব পরিচিত জন সব পিরোজপুরেই, গ্রামে একদম হাতেগোনা দু একজন ছিলো৷ এখন গ্রামে গেলে কেউ ঠিকমতো চিনতেও পারেনা, বাবার নাম জিজ্ঞেস করে। শৈশব কিভাবে কেটেছে, এর উত্তর স্মৃতির উপর নির্ভর করে দিতে হচ্ছে, যদিও আমি খুব সাম্প্রতিক আর আগের অনেক জরুরী ঘটনাও ইদানীং ভুলে যাচ্ছি, তবু শৈশব আমার, আমি স্কুলে যাচ্ছি, ফিরে আসছি, একাদের এক বাড়ি, চারদিকে জঙ্গল, অল্প কজন মানুষ আমরা বাড়িতে, কারেন্ট ছিলোনা এলাকায় তখনো , সন্ধ্যা হলেই হারিকেনের আলোয় পড়তে বসছি, আর খুব গরম লাগলেই উঠানে পাটি পেতে শুয়ে থাকা বড়মার পাশে শুয়ে পরছি, বড়মা আমার গুনগুন করে গান গাইছে আর বৃষ্টির দিন এলে বাবু কলারভেলা বানিয়ে দিচ্ছে বা হাটুসমান কাদাভেঙে বাজারে উঠে হাত পা ধুয়ে স্কুলে ঢুকে যাচ্ছি, টিনের চালা দিয়ে বৃষ্টির ফোটা আমাদের গায়ে লাগছে বড় ম্যাডাম স্কুল ছুটি দিয়ে দিচ্ছে অথচ সবাই বারান্দায় দাড়িয়ে আর তবুও আমার ছাতি সবার মতই বারবার হারিয়ে যাচ্ছে বাড়ি ফিরে দেখছি ব্যাটারি ভাড়া করে এনে টিভি চালানো হয়েছে এন্টেনা ঘুরিয়ে ঠিক করতে করতে জসিম শাবানা আলমগীরের জীবন অনেকদুর এগিয়ে চলে যাচ্ছে আমাদের সামনের বারান্দা ভর্তি মানুষ এত এত আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকছে সেই আগ্রহ ভেঙে বড়'দি আমাকে ডাক দেয় চল তেতুল বাগানের দিকে, আমরা তেতুল বাগানের দিকে এগিয়ে যাই, আমরা কাঠের পিস্তল বানাই, আমরা সুপারির খোল দিয়ে নৌকা বানিয়ে টানতে থাকি আর বালতি হাতে পুকুরের চারপাশে ঘুরি বাবা জাল মেরে মাছ ধরে আমাদের পড়াতে আসে মনি পিসি আমাদের ঠাকুরদা গল্প বলে রামায়ন মহাভারত ঠাকুরমা ঝুলি আমরা ভেঙে চুরে আমি হয়ে যাই, দিদির সাথে সুপারির বনে হাটতে হাটতে গুইসাপ দেখে ভয়ে দিদির জামা টেনে ধরি দিদি বলে ও আমাদের সাথে পারবেনা, আমি টের পাই, ফাইনাল পরীক্ষার পর'ই মামাবাড়ি, ফাইনাল পরীক্ষার পর'ই মা আর আমাকে বাসে তুলে দিয়ে আসবে বাবা, জানলার ধারে বসে আমরা যাবো ফিরে আসবো আর একদিন আমরা সব সব আগ্রহ কেটে অনেক অনেক কথা একদিন চাইলেও মনে করতে পারবোনা জেনে শহরের দিকে যাই, বলেশ্বর নদী পার হয়ে শহরে পা রেখে বলি, নতুন স্কুল নতুন বাসা নতুন সব মানুষ আর অগাধ বিস্ময় জিলা স্কুল, এখানে গ্রামের মত টিনের চালা দেয়া স্কুল না, বৃষ্টি নামলে আমরা ভিজে যাইনা, আমরা এখানে প্রতিযোগিতায় থাকি কিভাবে অন্যের থেকে পরীক্ষায় বেশী ভালো করা যায় বা আমরা এর থেকে বেশী উপভোগ করি শহরের যেখানে বাসা নিলাম আমরা সেই বাসার গলিতেই ক্রিকেট খেলতে, লিখন মৃদুল ওদের সাথে নিয়ে টিফিনের পরে স্কুল পালাতে আর রোজ সকালে জাতীয় সংগীত শুরু হলে ক্লাসরুমে লুকিয়ে থাকতে...

আমি মনে হয় নিজেকে একা করে রাখতেও আনন্দ পাই, বা আমি একদম'ই একা নই, এইযে সবাই আছে, কেবল নিজের সাথের দুরত্ব মেটাতে পারছিনা আমি। 


মিহিন্দা : আপনার লেখালেখির হাতেখড়ি কীভাবে?

মলয় দত্ত : এই প্রশ্নের উত্তরে যেইটা দেখা যায় অনেকেরই উত্তর এক থাকে স্কুল কলেজে ম্যাগাজিনে বা খুব ছোট বয়স থেকেই। আমার সেরকম কিছু নাই। আমার লেখার সংখ্যা কম, লেখা আর বাড়ুক সেই ইচ্ছাও কম, তেমনি লিখতেছি এতদিন সেই দিনের সংখ্যাও কম৷ আমি ২০১৬ সালের শেষের দিকে প্রথম লিখি, এইটা আমার কাছে নাজিল হয়নাই, আমি নিজে নিজেই মনে করছি, প্লান করছি লিখবো, ব্যাপারটা এরকম, আমি তখন গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরে থাকি, বি আর টি সিতে সকাল সন্ধ্যা ডিউটি থাকে, ইন্টার্নী চলছে৷ আমি রাজেন্দ্রপুরে যে এলাকায় থাকতাম তার চারদিকে শালবন আর লালমাটির ঘর, এলাকায় একটা মাত্র বিল্ডিং, সবাই নাম বললেই চেনে, ৫ তালায় যাবো এরকম বললেই রিকশালারা নিয়া যায়৷ আমি সেই বিল্ডিং এর ৪ তালায় থাকি, রুমের সাথে একটা বারান্দা, কিছুদিন আগেই খুলনা শহর ছেড়ে এসেছি, মন খারাপ, আর রাজেন্দ্রপুরের চারদিকে শালবন অন্ধকার রাত শালবনে ঝুম বৃষ্টি এমন পরিবেশে আমি মনে করলাম লিখবো, আমি ঠিক যেটুকু বলতে চাই সেটুকু লিখবো। এই গাজীপুরে থাকা অবস্থাতেই আমার সাথে সোয়েব মাহমুদের পরিচয়। তখন আমি ঢাকার কিছুই চিনিনা। গাজীপুর দিয়া কিভাবে ঢাকা আসবো কোথায় আসবো বলে দিলেন সোয়েব ভাই, আমি কথামত মহাখালী বাসস্টাণ্ড এসে দাড়ালাম, সেদিন শুক্রবার ছিলো, সোয়েব ভাই ঘন্টা দুয়েক দেরী করে এলো, এই মানুষটার সাথে পরিচয়ের পরে বোধহয় আমি টের পেয়েছি লেখার সিরিয়াসনেস, আর " মলয় আপনি লেখেন, এত জানা বোঝার দরকার নাই কেবল লিখতে থাকেন" এই কথাটা এখন অনেকে বললেও সর্বপ্রথম সোয়েব ভাই'ই আমাকে বলেছিলো, আমাকে বিশ্বাস করাতে পেরেছিলো।


মিহিন্দা : আপনার লেখায় একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা বারবার এসেছে। একাকিত্বগুলো কি শৈশব থেকেই বয়ে বেড়াচ্ছেন?

মলয় দত্ত : আমি মনে হয় নিজেকে একা করে রাখতেও আনন্দ পাই, বা আমি একদম'ই একা নই, এইযে সবাই আছে, কেবল নিজের সাথের দুরত্ব মেটাতে পারছিনা আমি। আমার জীবন অন্তত সেরকমই কেননা ব‍্যক্তি মানুষ ভাবলে আমি অসহায় একা নিঃসঙ্গ নিজের মনের অবচেতন ভীতি ও দুর্বলতাকে উৎসে পৌঁছে ধাপে ধাপে ভেঙে ফ‍্যালাটাই আজ একমাত্র ঘটনা । আমার জীবন অন্তত সেরকমই আমার জীবন আবার অরুপের কথার কাছে বসে থাকে, আর বলতে থাকে তার ভাষাতেই কারন আমি কোনো একটা নির্দিষ্ট বিন্দু নই । টেরিফিকালি জীবিত আমি । আঘাত আমাকে সমাদর করে । ঘৃনা আমাকে ভালোবাসে । মিলর্ড আমি একা নই আমি একা হতে পারি না । আমিই সেই হতভাগা যে ঈশ্বর দর্শন করেছে । আমিই সেই দুর্বল যে প্রতি মুহূর্তে অলীক শক্তির উৎসাদন দেখতে পায়। আর যে বিরাট ধবংসস্তুপের মাঝে আমি দাড়িয়ে আছি তাকে আমি সন্দেহ করি।


মিহিন্দা : ২০১৭ তে আপনার প্রথম বই মায়ের হাঁসগুলিরে জংলা খালে দেবতার মতন লাগে। ২০১৯ সালে দ্বিতীয় বই দ্যা অ্যাপেল ভেণ্ডর এন্ড মাই জুলিয়েটস। ২০১৯ সালের বইমেলায় সুইসাইড সানগ্লাস আসার কথা ছিলো..

মলয় দত্ত : আসার কথা ছিলো, কাভার আপলোড ও করছিলাম ফেসবুকে, একদম শেষমুহুর্তে আসেনাই, ওইসময়ে আমার অতিরিক্ত ঘুমের ট্যাবলেট খাওয়ার অভ্যাস ছিলো, নেশার পর্যায় একদম । এই অবস্থায় আমার সাথে প্রকাশনীর সম্পর্ক ভালো ছিলোনা তাই শেষ মুহুর্তে বইটা আর হয়নি, তবে এইবার মেলায় ও অনেকে এসে ঐ বইটা খুজছে, মানে প্রকাশিত বই দুইটার ব্যাপারে না জানলেও অপ্রকাশিত এই বইটা এত আলোচনায় ছিলো ২০১৮-১৯ সময়টাতে যে অনেকেই এখনো জানেইনা যে এইটা আসেনাই, তারা ভাবে আসছে।


মিহিন্দা : সুইসাইড সানগ্লাস বইটা আপনি তনয়কে উৎসর্গ করেছেন। উৎসর্গ পত্রে জীবনকে স্পষ্ট করে দেখার স্পর্ধার কথা বলেছেন। তনয় এই পান্ডুলিপিটার কথা জানে? তার সাথে কখনো আপনার জীবনবোধ নিয়ে কথা হয়?

মলয় দত্ত : না, তনয় আমার ছোটভাই, যেহেতু আমি বাড়িতে থাকিনা, অনেক অনেকদিন পর বাড়ি যাই, ফোন কখনোই একে অপরকে দেইনা, বাড়ি গেলেও সামনা সামনি কথা হয়না বললেই চলে, কেমন আছো ভালো আছো টাইপ আলাপ, আর আমাদের দুজনের দুনিয়া সম্পুর্ন আলাদা, সে শহরের রাজনীতি নিয়া থাকে, আর আমি নিজের ভেতরের রাজনীতি নিয়া থাকি৷ তনয় কখনোই বই পড়েনা, আমার প্রথম বইটাও পড়েনাই, দ্বিতীয় বইটা তো বাড়িতেই নেই৷ পাঠাইনি। আর সুইসাইড সানগ্লাস তো এখনো ছাপা হয়নি, কাছের দু একজন বাদে কেউই জানেনা এটা তনয়কে উৎসর্গ করা, হয়তো ছাপা হবার দীর্ঘ দীর্ঘ দিন পরেও জানবেনা, যেমন আমার দ্বিতীয় বইটা আমার মা'কে উৎসর্গ করা অথচ আজকে ১ বছর পরেও মা জানেনা তাকে আমার একটা বই উৎসর্গ করা আছে।


মিহিন্দা : সুইসাইড সানগ্লাসের শুরুতে মলয় কথা'য় আপনি সুপারি গাছের মাঝে মাঝে আনারস চারার কথা বলেছেন। এই বর্ণনাটা কি পিরোজপুরের?

মলয় দত্ত : না, এটা আমার গ্রামের কথা৷ বৌলপুর এর। পিরোজপুর এ আমার জীবন ছিলো শহুরে জীবন একদম, এখানে এরকম বাগান নেই, বন জংগল নেই৷ আমরা মাসে এক আধবার বাড়ি যেতাম, পিরোজপুর থেকে বৌলপুর ৩০-৪০ মিনিটের পথ। বাবার স্কুল ছিলো ওইদিকেই, তার সাথে সাইকেলে আমি বাড়ি যেতাম বা মা ও যেতো, আর এসব বর্ননা আমাদের বাড়ির'ই।


মিহিন্দা : " আমি এখন আফিম ফুলের ভাষায় কথা বলি.." আফিম ফুল এ পাণ্ডুলিপিতে বেশ অনেকবার এসেছে।
আফিমের ক্ষেত্রে ফুল যখন পরিপক্ব হয় তখন ব্লেড দিয়ে ফলে গায়ে গভীর করে আঁচড় দেওয়া হয়। ফলে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা পর এর ফুল থেকে কষ বের হয় এবং চাষীরা তা সংগ্রহ করে এটাই হলো আফিমের কাঁচামাল। এগুলো ভেবেই কি আফিম ফুল ব্যবহার করেছেন?

মলয় দত্ত : কয়েকবার এসেছে, বেশ অনেকবার মনে হয় না, লেখাটা অনেক আগের, প্রায় দু বছর৷ আমি মনে করতে পারছিনা ঠিক কি ভেবে লিখেছিলাম, তবে এখন ভাবলে হয়তো নতুন কিছু একটা পাওয়া যাবে!


মিহিন্দা : " তমালিকা দেবনাথের চোখের ভেতর আমার প্রাইমারি ইশকুল। একটা গাধার উপর চেপে আমি রোজ ইশকুলে যাই। গাধাটার ডাকনাম রাজু।" রাজু কি আপনার বাল্যবন্ধু?

মলয় দত্ত : রাজু নামে আমার কোনো বন্ধু নেই৷ তমালিকা দেবনাথ নামে আছে।


মিহিন্দা : " বোনের মৃত্যু সে তো এক তানজীম তাবিয়া.." এই লাইনটা ব্যখ্যা করুন।

মলয় দত্ত : তানজীম তাবিয়া একজনের নাম, সে খুবই কঠিন প্রকৃতির মেয়ে, রুক্ষ স্বভাবের, তার চোখেমুখে দয়ামায়া নেই, কথাতেও না। আমি এমন কাউকে কল্পনা করি, যে তার সব রুক্ষতা নিয়ে, বোনের মৃত্যুদিনের সমান কঠোরতা নিয়ে দাড়িয়ে আছে৷
আর আপনি যদি নামের অর্থে যান তাইলে তানজীম তাবিয়া মানে অনুগত বিন্যাস৷


কবিতা লেখার প্রথমদিকে যে ঝামেলা বা কথাকথির মধ্যে পরছিলাম সেইটা হইলো এসব আবার কেমন কবিতা, ছন্দ নাই টন্দ নাই, এইগুলা ভোগাস, তো এইসব নিয়া খুব ডিপ্রেসড, বারবার সোয়েব ভাইকে কল করি, উনি ধমকায়, আফজাল ভাইর কাছে যাই, উনি বুঝায় এইগুলা ইস্যু না।


মিহিন্দা : সুইসাইড সানগ্লাস পাণ্ডুলিপির শেষ কবিতায় লিখেছেন, " ট্রান্সলেশনের সাথে সূচনা ও ভূমিকা দুইজন মেয়ের যৌনজীবন ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। " একটু ব্যাখ্যা করুন।

মলয় দত্ত : এইটাতো আপনি একরকম ভাবে ভাবতে পারেন, আরেকজনে আরেকরকম ভাবে ভাবতে পারে, আর লেখাটা মনে হয় এমন ছিলো যে মাছের পেটের মধ্যে বিমান দিয়ে যদি প্রিপজশিনের ক্লাস বুঝানো হয় তাহলে সুচনা আর ভুমিকা যেইটা ছিলো কোনো রচনার ফার্স্ট স্টেপ তাদের সাথেও অনুবাদের সম্পর্ক আছে, এইটা লেখাটায় যে স্যারের কথা বলা আছে তার উপর একপ্রকার বিরক্তি প্রকাশ বা তারে বড়সড় তাচ্ছিল্য করা!


মিহিন্দা : এ পাণ্ডুলিপির শুরুর দিকে প্রচুর তৎসম শব্দের ব্যবহার হয়েছে। সামনের দিকে যেতে যেতে ইংরেজি শব্দ ঢুকতে শুরু করলো। সময় খেয়াল করলে দেখা যাবে কবিতাগুলো কাছাকাছি সময়ে লেখা। এর মধ্যে কী এমন পরিবর্তন এলো?

মলয় দত্ত : ইংরেজী শব্দ নিয়া মঈন ভাইর থেকে আগে আপত্তি শুনেছি, তৎসমের টা শুনিনাই মানে শুনিনাই বলতে ব্যবহার যে আসলেই প্রচুর এইটা শুনিনাই। এখন এটা নিয়া ভাবা যাবে, এরপর নাহয় বলতে পারবো আসলেই কি চেঞ্জ হইছিলো বা কিছু!


মিহিন্দা : আপনার দ্বিতীয় বই দ্যা অ্যাপেল ভেণ্ডর এন্ড মাই জুলিয়েটস । এই বইটাকে গল্প,কবিতা, নাকি মুক্তগদ্য না ভেবে আপনি মলয় দত্তের বই ভাবতে বলেছেন..

মলয় দত্ত : কবিতা লেখার প্রথমদিকে যে ঝামেলা বা কথাকথির মধ্যে পরছিলাম সেইটা হইলো এসব আবার কেমন কবিতা, ছন্দ নাই টন্দ নাই, এইগুলা ভোগাস, তো এইসব নিয়া খুব ডিপ্রেসড, বারবার সোয়েব ভাইকে কল করি, উনি ধমকায়, আফজাল ভাইর কাছে যাই, উনি বুঝায় এইগুলা ইস্যু না। কিন্তু ছন্দ নিয়া কথাবার্তাতো কোনোকালেই কমেনা, গদ্যরীতির লেখক'দের একটা চাপ দিতেই থাকে এসব কথাবার্তার মালিকেরা। কেউ আবার বলে না লিখো না লিখলা অন্তত জেনে রাখলা, তখন আমার পড়াশোনা নাই, চাকরি নাই, সারাদিন বাড়িতে বসা, ভাবলাম পড়া যাক, বইপত্র যোগার করে পড়তে বসলাম আর টের পেলাম এসব আমার কাজ না, আমার দ্বারা কবিতার এইসব রীতিনিতি মেনে লেখা সম্ভব না, হতে পারে এইটা আমার মুর্খতা, দুর্বলতা বা যেকোনো কিছুই কিন্তু আমি যেটুকু বলতে চাই সেটুকু এসব নীয়মনীতির মধ্যে দিয়ে বলতেও পারবোনা আর বলতে মানে লিখতে পারলেও সেটা হবে ভেবেচিন্তে লেখা কোন লাইনের পরে কোনটা দিলে মিলবে এরকম একটা ব্যাপার, তো এমনিতে আমার মত লেখার সময় যে ফ্লুয়েন্ট ভাবটা থাকে সেইটা তখন থাকবেনা নিজে পড়তে গেলেও প্রানহীন লাগে যেন অন্য মানুষের কথা, তাই আমি এসব নিয়ে বছর খানিক অনেক কথাকথির মধ্যে থেকে বের হয়ে এলাম আর কবিতার এইসব লোক যারা কেবল ফতোয়াই দেয় ওর কবিতা নাকচ ওরটা কিছু হয়নাই ওর তো অমুক রীতিতে ভুল সেইসব ওস্তাদ'দের কথাবার্তার থেকে দুরে সরে এসে বললাম, এটা কবিতা না, মুক্তগদ্য ও না, গল্প ও না, এটা কিছুইনা, আমার অল্প কিছু বলার ছিলো আমি বলেছি মাত্র যা আপনাদের সকল নিয়ম আর ফতোয়ার উর্ধে৷


মিহিন্দা : দ্যা অ্যাপেল ভেণ্ডর এন্ড মাই জুলিয়েটস বইতে প্রথাগত সূচীপত্রও রাখেন নি..

মলয় দত্ত : হ্যাঁ রাখিনাই, সুইসাইড সানগ্লাসের পাণ্ডুলিপি তো পড়েছেন দেখবেন সেখানেও নেই, নার্সিসিস্ট ডার্লিং এ নেও নেই। আমার প্রতিটি লেখার তো নাম ও নাই, বা আমি দিতে পছন্দ করিনা আর সুচিপত্রে তো কোন লেখাটা কত নাম্বার পেজে সেইটা খোজা যায়, আর আমার বইয়ের সুচিপত্রটা পড়লেও বইয়ের ৫০-৫৫ টা যে লেখা আছে সেগুলো আসলেই কে কোথায় আছে আপনি জানতে পারবেন, খেয়াল করেন, প্রতিটা বইয়ের একটা ম্যাজিক মনে হয় এখানেই।


মিহিন্দা : এই বইটাতে একজন আপেল বিক্রেতার সাথে নিবিড় বোঝাপড়ায় লিপ্ত হয়েছেন আপনি। এই আপেল বিক্রেতা আসলে কে? ভেতরের মলয় দত্ত? সময়? নাকি ঈশ্বর?

মলয় দত্ত : কখনো সময় কখনো মলয় দত্ত৷


মিহিন্দা : এ বইয়ে উপমা হিসেবে ব্যক্তিকে ব্যবহার করেছেন..

মলয় দত্ত : ব্যবহার করার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক আলোচনা করলো বললো যে এসব পড়ে নাকি বলে দেওয়া যায় আমি প্রচুর ইংরেজী কবিতা পড়ি, এরকম উপমা সেখানেই চলে। আমি আসলে লেখার সময়ে যেকোনো কিছুকে এই ধরেন একটু আগে বললেন বোনের মৃত্যুকে তানজীম তাবিয়া বললাম তো এরকম যেকোনো অবস্থা সৌন্দর্য ঘটনা দুঃখ আনন্দ উৎসাহ উচ্ছাস কে মানুষ দিয়ে প্রকাশ করেছি, যেমন বোনের মৃত্যু কে তানজীম তাবিয়ার কঠোরতা দিয়ে বলেছি, আবার রোজকার দুঃখ কে ফার‍যানার মতন বলে দুঃখ বুঝিয়েছি ।


মিহিন্দা : " পালিয়ে যাবার রঙ মাছরাঙা সাপ।" ( দ্যা অ্যাপেল ভেণ্ডর এন্ড মাই জুলিয়েটস বইয়ের ১নং কবিতার লাইন) এই লাইনের ব্যখ্যা কী?

মলয় দত্ত : এটা আমার পালিয়ে যাবার রঙ৷ গ্রামে এই সাপ'টা প্রচুর দেখা যায়, এই সাপটার রঙ দেখলেই আনন্দ লাগতো ঠিক যেমন আনন্দ লাগে পালিয়ে যাচ্ছি ভাবলেই...


মিহিন্দা : মৃত্যু ঠিক কতটুকু যৌন আর মারিয়া রঙ পালকের মতন আরমানী সেসব নিয়ে অনেকগুলো আসিফা তর্ক হয়ে যাবে আজ - যেকোন মুল্যেই। "(২নং কবিতা) মৃত্যুর সাথে যৌনতার সম্পর্ক কী?

মলয় দত্ত : যেহেতু অরুপ বলেছে কবিতা বিয়ন্ড কবিতা ; কবিতা আন্ডার কন্সট্রাকশন কবিতা ; শব্দের শর্করা ও সেলুলোজ ; কবিতা প্রোটিন ক্রিটিক ; কবিতা ইট মিনস আনটাচেলেবল ফ্রাগমেন্ট ; রসের বহুস্তরিক আগা ও রুট চাগার দেওয়া ; দার্শনিকের দিনলিপি ; জ‍্যামিতির সহজ রোদ ও ভাষা ; যৌন অবসেশনের ফোঁড় ; বস্তুত দ‍্যুতিসভ‍্যতার উরুর অভিসার ; লজিকের মদ ; র‍্যাঁবো ও মালার্মে পাশাপাশি পড়া, সেতু ও পরাপারের স্বতন্ত্র বাসনায় ; নীতি জ্ঞনের অতীত ;সেহেতু আমরা বা আমি বলতেই পারি যৌনতার সাথে কেবল মৃত্যু কেনো প্রতিটি নিশ্বাসের সম্পর্ক, আর এই সম্পর্ক স্মৃতি আর বিস্মৃতির মহাসংঘাত।


মিহিন্দা : " আপেলওয়ালা তুমিই বলো মৃত্যুর চেয়ে রোমান্টিক প্রেমের গান কি ছিলো কখনো?" (৮ নং কবিতা) মৃত্যুকে রোমান্টিক প্রেমের গানের সাথে তুলনা করছেন?

মলয় দত্ত : আসলেই কি আছে?


মিহিন্দা : এ বইয়ের লেখাগুলোর স্থান, সময় লক্ষ্য করলে দেখা যাবে শুরুর লেখাগুলো ভ্রমণরত অবস্থায় লেখা। জীবনের প্রতি ক্লান্তি চলে এসেছিলো? পালিয়ে দূরে কোথাও চলে যাবার ইচ্ছে হয়েছিলো সে সময়টাতে?

মলয় দত্ত : ঢাকা থেকে বাড়ি যাচ্ছিলাম। প্রথমদিকের কিছু লেখা বাসে বসে লেখা। আমি আগেও বলেছি আমার উপর লেখা নাজিল হয়না, আমি যে ভাষায় লেখি সে ভাষায় আমি অনর্গল কথাও বলতে পারি, আর আমি খুব প্লান করে চাইলেই লিখতে পারি, লেখাগুলা সেরকম আমার মনে হয়েছে একটা চরিত্র আপেলওয়ালা আর আমি আর অজস্র বান্ধবী, আমি এদের নিয়ে লিখবো, লিখেছি৷ তবে লেখাগুলো টানা মনে হলেও পুরো বইটা'তে অনেক কাটাছেড়া করা হয়েছে। অনেক লেখা বাদ দিয়ে অনেক লেখা নতুন যোগ করে তৈরী করা হয়েছে৷ আর হ্যাঁ, জীবন এর ক্লান্তি তো আছেই, মারাত্মক রকম ক্লান্তি!


মিহিন্দা : এই বইয়ের প্রায় সবগুলো কবিতাই কাছাকাছি সময়ে লেখা। কিন্তু ভাবনার উঠা-নামা অনেক বেশি। যাপিত জীবন বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলো ওই সময়টাতে?

মলয় দত্ত : আমি সবসময় বড় পরিবর্তনের মধ্যে থাকি, ভাবনার ওঠা নামা অনেক বেশী, একদিন আড্ডায় সজীব মেহেদী, সাঈদ শ ও এই বিষয়ে কথা বলতেছিলো, ব্যপারটা সত্যি হতে পারে এটা একটা অভিযোগ ও, কিন্তু আমার মনে হয় না এরকম, আমার মনে হয় প্রথম লাইনের সাথে দ্বিতীয় লাইনের ভাবনার যে জাম্প, এইটা লং জাম্প হলেও রিলেট করা যাবেনা এরকম না, আর আমাদের লেখা মনে হয় গল্প উপন্যাসের থেকে অতিরিক্ত মনোযোগ দাবী করে।


মিহিন্দা : এই বইয়ের শেষ কবিতা, " এখন শান্ত সব, আপেলওয়ালা ঘুমিয়েছে। " এই পাণ্ডুলিপি শেষ করে আত্মহত্যার কথা ভাবছিলেন? বা কখনো ভেবেছেন আত্মহত্যার কথা?

মলয় দত্ত : আমি সবসময়'ই ভাবি। যেদিন দেখলাম মলয়রায়চৌধুরীর এক আত্নীয় চিরকুটে " আনন্দধারা বহিছে ভুবনে " লিখে ছাদ থেকে লাফ দিলেন এমন ঘটনা উনি শেয়ার করলেন সেইদিন থেকে আমি আনন্দধারা বহিছে ভুবনে গানটা বান্ধবী'দের শিখতে বলেছি।


মিহিন্দা : এই বইটাতে অনেকগুলো নারী চরিত্র ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এসেছে। বহুগামিতাকে কীভাবে দেখেন?

মলয় দত্ত : আমার বরাবর'ই মনে হয় মানুষ প্রাকৃতিকভাবেই বহুগামী, কেবল আমি আপনি বললেই দোষ, যেখানে এর চেয়ে সরল সহজ প্রস্তাব হবার কথা না, সেখানে বহুগামীতা নিয়া কথা বলার সুযোগ ও নাই এইখানে বা এটা এমন এক টপিক্স যা নিয়ে আমি পাকা পাকা যুক্তি দিলেও অনন্তকাল ধরে বিতর্ক চলতে থাকবে কেননা যৌন জীবনে একগামী থাকার ব্যাপারটা অধিকাংশের মধ্যেই নাই, আর যাদের মাঝেই নাই তারাই অনন্তকাল ধরে এই বিতর্ক বাচিয়ে রেখেছে আর আমার ধারনা কেবল শারীরিক চাহিদার কারনে যে যৌনতা যা ঘনিষ্ঠতাবিহীন আর যে যৌনতা সংস্কৃতির আদলে যা কিঞ্চিত বা অনেকটা মানসিক ও, এই দুই রকম রিলেশনকেই এরা অস্বীকার করে বসে আছে, থাক এর বেশী বলে আক্রমনের স্বীকার হতে চাইনা। তবে টপিক্স টা নিয়ে অনেক কথা বলা যায় , সামনা সামনি আশা করি অনেক আলাপ হবে এটা নিয়ে৷


মিহিন্দা : আপনি প্রচুর ব্যান্ড সংগীত শুনেন? কবিতায় বেশ কয়েকবার ব্যান্ড সংগীতের কথা এসেছে। সংগীতকে অনেকে কবিতার কাছাকাছি শাখা মনে করেন৷ আপনি কীভাবে দেখেন?

মলয় দত্ত : আমি প্রচুর ব্যাণ্ড সংগীত শুনিনা। আমি কোনো প্রকার গান'ই প্রচুর শুনিনা। সংগীত'কে আমি কবিতার কাছাকাছি শাখা নয় সংগীত'কেও আমার কবিতার'ই আরেক রুপ মনে হয়।


মিহিন্দা : ফেসবুকে একবার লিখেছিলেন, চন্দ্রবিন্দুর সবচেয়ে কম বিক্রিত বই দ্যা অ্যাপেল ভেণ্ডর এন্ড মাই জুলিয়েটস। বই বিক্রি নিয়ে আক্ষেপ হয় কখনো?

মলয় দত্ত : প্রথম বইটা ২০১৭ সালে যখন আসে তখন ধারনা ছিলো এরকম যে একটা কবিতার বই আসবে ভালো হোলে সবাই কিনবে এরকম, কিন্তু ২০১৭ সালে বইটা আসার পর আমি দেখলাম এসব আজগুবি চিন্তা, বই পত্র সব নামে বিক্রি হয়, নতুন লেখকদের অধিকাংশেরই যেহেতু নাম ধাম নাই তাদের বই কেউ কেনেওনা, যে ৫০-১০০ কপি বিক্রি হয় দেখা যায় স্কুল কলেজ বা ফেসবুকের অন্তরঙ্গ বন্ধ বান্ধবী এসে নিয়ে যায়, এরা কিন্তু সবাই আসলে পাঠক না, অনেকে চক্ষুলজ্জায় ও কেনে যে বন্ধুর বই আসলো না কেনলে কিরকম দেখায় এইসব কারনে। এইরকম, আরো অনেক ভয়ংকর ঘটনার সাথে পরিচিত হই আমি, যে বাইরে থেকে যেরকম দেখা যায় বই, বই ছাপা হওয়া, বিক্রি হওয়া, ভিতর থেকে ব্যাপার গুলা আসলে সেরকম না। তো ২০১৭ তে এই আক্ষেপ টা ছিলো, ওটা আমার প্রথম বইমেলায় আসা, সকাল থেকে জায়েদ ভাই আর আমি রাস্তায় রাস্তায় হাটতাম দুপুর এর পরপরি বই মেলায় ঢুকে যেতাম, আর রাতে দুজনে বাংলামটরের বাসায় কখনো সোয়েব ভাইর বাসায় মোহাম্মদপুরে ফেরার সময়ে হিসাব করতাম কার কত কপি বই বিক্রি গেলো, বই বিক্রি দিয়া তো আর সাহিত্যের কিছু যায় আসেনা, কিন্তু আমাদের আনন্দ হইতো বই বিক্রি হইছে এরকম শুনলে, কিন্তু বছরখানিকের মধ্যে এসব ধ্যান ধারনা ভেঙেচুরে যেতে থাকে আর যায় ও, আমরা বুঝতে পারি, আমাদের বই কখনোই বিক্রি হবেনা, আর এটা একদম ই আক্ষেপের বিষয় আর নেই৷ এটাই স্বাভাবিক। আপনি খুব রঙ চঙ মাখা ইউটিউবার বা ডিশ ব্যাবসায়ী বা অন্য যে কারো সাধারন মোটিভেশনাল বা এনিথিং ভোগাস টাইপের বই ও প্রচুর বিক্রি হবে দেখবেন হতাশ লাগবে এই ভেবে যে এগুলা কেন, মানে পাঠক কেনো একটা দেশের ইয়াং জেনারেশন কেনো এসবের প্রতি এত আকৃষ্ট! একটা খারাপ লাগা থাকে কিন্তু এইটা আসলে যার যার ব্যক্তিগত রুচি, হতে পারে পুরা দেশের রুচিই মোটিভেশনাল বা বিজ্ঞাপনভিত্তিক সাহিত্যের দিকে আবার আপনি হয়তো বলবেন তার আগে আমিই বলি এইযে যেসব বই কে সরাসরি খোচা দিয়ে আমি কথা বললাম সেসব বই'কে আমি অস্বীকার করি কারন বইয়ের যে স্বতন্ত্রতা লেখকের নিজস্ব আঙ্গিক ঐকান্তিক প্রচেষ্টা থাকা দরকার বা ধরেন সাব্জেক্টওয়াইজ গবেষনা টা দরকার সেইসব আমি পাইনাই এইসকল বইয়ে এটা আমার ক্ষমতার অভাব তবুও এটাও এক ক্ষমতা আমরা বুঝে গেছিলাম বা আমি ও আমরা সেসব বলতে পারিনাই পারবোওনা যেহেতু সেহেতু আর আক্ষেপের অবকাশ নেই। আর হ্যাঁ চন্দ্রবিন্দু নিয়া যেটা লিখছিলাম সেইটা খুব সম্ভবত সত্যিই, আমি ধারনা করছিলাম ওইরকম ই যে তারা এত এত বই ছাপাইছে আমার বইটাই সবথেকে কম বিক্রি হইছে বইলাই আমার ধারনা কারন আমি ফেসবুকে থাকিনা মুখরোচক কিছু বলতে পারিনা বরং গালাগালি করে ফেলি আমি প্রতিদিন মেলায় যেতে রাজি নই আর আমাকে চন্দ্রবিন্দুর মঈন ভাই ফাহাদ ভাই অনলাইনে এক্টিভ থাকতেও বলার পরেও তা পারিনি বা একান্ত নিজের লোকদের ও কখনো ভুলেও বলিনা যে আমার একটা বই এসেছে মেলায় এবার আর প্রথম বইটা ২০১৭ তে ছাপা হবার পর এই বইটা আসে ২০১৯ এ, এই দুই বছরে আমি এটা বুঝেছিলাম যে ফেসবুকে হাজার বার বলে আর বন্ধু বান্ধব দিয়া এডিশনের ৫০০ কপি শেষ করাইয়াই আমি কেউ একজন হতে পারবোনা, বারবার ফেসবুক পোস্ট এই সেই আমি আছি মেলায় আপনারা আসুন বইট অমুক স্টলে এইগুলা বারবার আমি বলতে পারবোনা, মানে পারবোনা তো এইসব জাগা দিয়া আমার আগ্রহ কম থাকায় বইটা খুব স্বাভাবিক ভাবেই কম প্রচার হইছে আর যেহেতু আপনারা বলেন প্রচারেই প্রসার সেহেতু আমার বইটার থেকে কোন বই বাংলা সাহিত্যে'ই মেবি কম বিক্রি হয়নাই।



আর আমার প্রথম বইটা সোয়েব ভাই ছাড়া হইতোইনা। আর বই এর ও আগের ব্যাপার লেখকের কনফিডেন্স গ্রো করার যে স্টেজ টা সেই স্টেজে আমার সোয়েব মাহমুদ ছাড়া ছিলোটা কে! 

মিহিন্দা :  আপনি নিভৃত জীবন-যাপন করেন। ফেসবুকেও ইদানীং সক্রিয় নন। বন্ধু বান্ধব এড়িয়ে চলেন। বই মেলায় যান না..

মলয় দত্ত : আমার বন্ধু বান্ধব নেই বললেই চলে, বন্ধু শব্দটার এত ভার যা আমি নিজেও বহন করতে পারিনাই, অন্য কেউ এই শব্দ বহন করবে এরকম কাউকে আমার জীবনে আমি দেখিনাই, আর নিজে একজন ভালো বন্ধু না হয়ে উঠতে পারলে বন্ধু আশা করাটাও বোকামি, আর ফেসবুক আমার ভালোলাগেনা, এত এত মানুষ টাইমলাইন বোঝাই নানান রকম ইস্যু এত আনন্দ এত দুঃখ মানুষের পিছনে মানুষ সামনে মানুষ এসব আমাকে আক্রান্ত করে, অসুস্থ হয়ে যাই, তাই এসবের থেকে দুরে থাকি, সোজা কথায় মানুষ থেকে দুরে থাকি, ফেসবুকে অনেক মানুষ। আর বইমেলা হচ্ছে, হবে, আমি এখানে নিয়মিত যাবার মত আগ্রহ পাইনা, জোর করে প্রতিমেলায় দুই একদিন যা যাওয়া হয় তা আমার অনিচ্ছায় আমার ভালোলাগেনা, কেন লাগেনা এটার বিশ্লেষনে গেলে সম্ভাব্য অনেক কারন দাড় করানো যাবে, কিন্তু এত ভীড় এত মানুষ এত লেখক এত অটোগ্রাফ এত সেল্ফি এত বড় বড় বানীর মাঝে যেতে চাইনা , যারা একে প্রানের বইমেলা বা সারাদিন এবং প্রতিদিন মেলায় থেকে সেল্ফি তুলে আড্ডা দিয়ে আনন্দ পায় পাক তা নিয়ে আমার আপত্তি নেই কিন্তু আমি আনন্দ পাইনা, আমাকে টানেনা, এখন আমি দু কলম লিখি বলেই আমাকে যে এসব নিয়মিত মেলায় যাওয়া সেল্ফি ফুডকোর্টে ভীড় স্টলের সামনে দাড়িয়ে থাকা পাঠক বা পরিচিত কাউকে দেখেই ডাক দেয়া বা তরুন ঔপন্যাসিক হলেতো কথাই নাই মেলায় যেখানে দেখা হবে জিজ্ঞেস করবে বই কয় কপি বিক্রি হইলো  বা খেয়াল করবেন একজন আমার বয়সী লেখক বইমেলার মাসে ২৮ দিনে ১০০ এর বেশীবার পোস্ট দেবে যে আমি স্টলে আছি বলে আর ২০০ ছবি থাকবে অটোগ্রাফের এইসব ব্যাপারে আমি আনন্দ পাইনা, অন্যরা পেতে পারে তারা যায় মেলায় বা মেলার আগে পরেও নানান আড্ডায়, আমার প্রান টানেনা আমি রোমাঞ্চিত হইনা উত্তেজিত হইনা আবার এভাবেও ভাবতে পারেন আমার বইপত্র বিক্রি হয়না, ১০০ বা ২০০ ছবি আপলোডের আমার দ্বারা সম্ভব না, আমি লিখে লিখে এরকম করতে চাইনা কিন্তু আমি নিজেকে গুরুত্বপুর্ন মনে করি, আমি লিখি এক চাপ, দায়বোধ থেকে আপেল ভেণ্ডরের শুরুতে সে সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছি সুতরাং যে দায় থেকে আমি লিখি সেই দায়ের মধ্যে এমন কিছু নাই যে যাও নিয়মিত প্রচুর ভীড়ে আর এমন ও নাই যে থাকো এরকম একা, এটা স্রেফ আমি আনন্দ পাইনা, আমার কাছে আহামরি কিছু নয় আশা করি অন্যায় করলাম না আমি এ কথা বলে,   বরং আমি চুপচাপ বইমেলা বা যেকোনো ভীড় থেকে বেরিয়ে যেতে চাই আর সত্যিই বইমেলা আসলেই মানুষের যে প্রানের আনন্দ দেখা যায় শোনা যায় আমি আসলে সেরকম আনন্দই অনুভব করিনা বরং শাহবাগে দাড়িয়ে মাঝে সাঝে কাউকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, কিসের এত আনন্দ বা যখন বলা হয় তোমার বই আসছে মলয় তুমি মেলায় না গেলে বই চলবে কেমনে মানে ব্যাপার টা এরকম যে লেখক থাকলে বই দুই কপি বেশি যাবে বা ছবি অটোগ্রাফের জন্য ও, আমি এমন অনেক ঘটনা জানি, স্টল থেকে বইটা নিয়ে ছবি তুলে বইটা আবার রেখে দিয়ে ছবিটা লেখক কে পাঠানো হয় যে বইটা নিলাম বা লেখক স্টলে না থাকায় পাঠক এসে ফিরে যায় কারন অটোগ্রাফ ফটোগ্রাফের অভাবে, আমি আসলে এখনো বুঝে উঠতে পারিনি লেখাগুলোর থেকে এসব কবে দামী হয়ে উঠলো বা প্রকাশকের কথামত লেখক'কে কেনো স্টলেই থাকতে হবে আর লেখক না থাকলেই সেটা তার ইগো! বুঝে উঠতে হয়তো আমি চাইনা, আমাদের আছেই সামান্যমাত্র অহংকার...আর এইযে এত এত ভীড় এত মানুষ এত ক্লিক এত এত কিছু আমি টের পাই, সত্যি টের পাই এসব ভেঙেচুরে আমি লেখালেখির নির্জন এক দুনিয়ায় ঢুকে পরেছি, দু বছর আগেও পাঠক পাঠক বন্ধু বন্ধু বান্ধবী বান্ধবী বলে আক্ষেপ করলেও আজ আর আমার পাঠক নিয়েও মাথা ব্যথা নেই, পকেটে কিছু খুচরো টাকা থাকে সবসময়, রোজ সকালে ১০ টাকা ভাড়া বাচাতে মগবাজার দিয়ে ২-৩ কিলোমিটার হেটে
ধানমণ্ডি যাই, ফিরে আসি, বই পড়ি , সিনেমা দেখি  বিকেলে চায়ের দোকানে বসে থাকি, সিগারেট খাই, নুরিন চা আনে, আরিফ তামাক নিয়ে আসলে দুজনে বানিয়ে খেয়ে টানটান শুয়ে থাকি আর রাতে বাজার করে যখন ফিরতে পথে ভাবি বাসায় গিয়ে মাংস রান্না করবো জেমস স্টুয়ার্টের সিনেমা দেখতে দেখতে ভাত খাবো বিশ্বাস করুন এই জীবনের কাছে এই শান্তির কাছে পাঠক, অজস্রভীড়, বইমেলা সবকিছু ফিকে হয়ে আসে, আমি খোদার দিকে তাকিয়ে বলি লোন শোধ হয়না...


মিহিন্দা :  আপনি একটা সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, চিৎকার করে পড়তে চাইলে কবি সোয়েব মাহমুদকে পড়েন।  মায়ের হাঁসগুলিরে জংলা খালে দেবতার মতন লাগে বইটাও কবি সোয়েব মাহমুদকে উৎসর্গ করেছেন। কবি সোয়েব মাহমুদ আপনাকে নিয়ে কবিতাও লিখেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকে মলয় দত্তকে নিয়ে সোয়েব মাহমুদের কিছু স্টেটমেন্ট বিভ্রান্তিকর ছিলো। এ বিষয়ে কিছু বলবেন?

মলয় দত্ত : কোন সাক্ষাৎকারে বলছিলাম মনে নাই, আগেই বলেছি আমি সব ভুলে যাচ্ছি ইদানীং তবে এরকম কথা আমি সামনা সামনি অজস্র বার অজস্রলোককে বলেছি। আর আমার প্রথম বইটা সোয়েব ভাই ছাড়া হইতোইনা। আর বই এর ও আগের ব্যাপার লেখকের কনফিডেন্স গ্রো করার যে স্টেজ টা সেই স্টেজে আমার সোয়েব মাহমুদ ছাড়া ছিলোটা কে! উনিতো বড় ভাই, বন্ধু, দুভাবেই আমার সাথে মিশতেন, আমার মনে আছে, প্রথম দেখা আমাদের, আমার মনে আছে শেষ দেখা আমাদের। আর উনি যখন প্রথম জানতে পারে বইটা ওনাকে উৎসর্গ করতেছি, মেলার তখন ১২-১৩ তারিখ, ২০১৭ সালের কথা, সোয়েব ভাই আমি  আর সত্যজিত বিশ্বাস রানা (রম্যলেখক) তিনজনে বইমেলার গেটের কাছে দাড়ানো উনি বললেন মলয় আমাকে বই উৎসর্গ করবেন না, এইসব পাল্টান, আমি বললাম পাল্টাবোনা ভাই। এরপর জানা গেলো বইটা আসতে আরো দেরী হবে। আমি তখন পিরোজপুর চলে আসি। বই আসলে আসমা অধরা আপু ফোন করে, আমি তার এক দুইদিন বাদে ঢাকা যাই, গাবতলী বাস থেকে নেমে শ্যামলী যাই,জায়েদ ভাই আমার জন্য দাড়িয়ে ছিলো, আমরা দাড়িয়ে থাকলাম সোয়েব ভাই এলো, ওনার হাতে আমার বইটা! একদম প্রথম কপিই উনিই নিয়ে রেখেছিলেন। আর ২০১৭ সালের মেলার পর আমি পিরোজপুর চলে আসি, বরিশাল থাকি, চট্টগ্রাম যাই, কলকাতা যাই, এইসময়টাতে ফেসবুকে নানান ইস্যু নিয়া আমার উপর সোয়েব ভাই মনক্ষুন্ন হয়, কিন্তু এরপর ও আমাদের অজস্রবার দেখা হয়েছে, ফেসবুকের সোয়েব ভাই আর বাস্তবের সোয়েব ভাই কে আমি চিনি, আমি শুনেছি আমার নামে অনেক কথা, সোয়েব ভাই জানে মলয় অনেক কিছু বলেছেন, মনে হয় অনেক বড় একটা টপিক্স ২০১৭-১৮ সালের মলয় সোয়েবের মনমালিন্য, নানান দিকে নানান কথা, অনেকেত এরম বলতে লাগল, মলয়ের বাবা সোয়েবের সাথে গ্যাঞ্জাম, বাপ পোলার গ্যাঞ্জাম এসব। আর এসব হয়তো এখনো অনেকে বলে, অনেক গল্প কিন্তু সেই যে প্রথম দেখার সোয়েব ভাই, সেই যে সোয়েব ভাই বইমেলার পুরো সময়টাতে আমাদের কে ওনার দায়িত্বে রেখেছেন, নিজে ফ্লোরে ঘুমিয়ে আমাদের বিছানা ছেড়ে দিয়েছেন, সেই সোয়েব ভাইর সাথে আমার অন্তত আমি বিশ্বাস করি সেই আগের সম্পর্ক'ই আছে কেননা এত এত এত কথার পরেও বইমেলা ২০২০ এ আমাকে সোয়েব ভাই দেখা হোলেই বলল, মলয় আপনি কেবল লিখতে জন্মাইছেন। আমি সত্যিই খুব ভেঙেচুরে পরি ভিতরে ভিতরে কিন্তু যখন একজন সোয়েব মাহমুদ আমাকে এইকথা বলে আমি এই কথার যোগ্য না হলেও নিজেকে এরকম ভাবতে ভালোলাগে আর আমাদের মাঝে অনেক মনোমালিন্য সব ভুলে গিয়ে মনে পরে সোয়েব মাহমুদ হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলছেন তাকে ঘিরে আমরা কজন, আমরা কথা বলার সময় ই পাচ্ছিনা, আর বাসায় ফেরার পথে সোয়েব মাহমুদ আমাকে শংকর এ রিকশা থামিয়ে নামিয়ে দেবার সময় বলছে, আপনি লিখতে থাকেন মলয়। তবে আমরা সারাজীবন'ই অনেক দরকারী কথাই সময়মত বলে উঠতে পারিনা, হয়তো একটা ফোনকলের দরকার ছিলো, আমার বা সোয়েব ভাইর, হয়তো আমাদের একদিন দেখা করে সামনা সামনি বসে একে অপরের উপর যার যত রাগ  আছে সব টানা বলে ফেলা দরকার ছিলো, সমাধানের উদ্দ্যেশ্যে নয়, কেবল বলে ফেলাটাই দরকার ছিলো, উদ্দেশ্যহীন।


মিহিন্দা :  আপনি একবার বলেছিলেন, আপনি সারাক্ষণ ডিপ্রেশনের মধ্যে বসবাস করেন..

মলয় দত্ত : হ্যাঁ সে এখনো থাকি। সারা দুনিয়ার যত দুঃসংবাদ আছে সব আমি এড়িয়ে যেতে চাই, মুর্খের মত থাকতে চাই, আক্রান্ত হতে চাইনা, সংবাদ পত্র পড়িনা, তাও আমি আক্রান্ত, ডিপ্রেসড সবসময় এবং সবসময় মনে হতে থাকা কেবল কেবলই ধ্বংস হয়ে যাওয়া ; যেতে থাকা ; অনন্ত ফ‍্যাসিস্ট পৃথিবীর গভীরে ঢুকে ও সবকিছু অস্বীকার করে স্মরণাতীতের উৎসাদন....



মিহিন্দা : কখনো ইচ্ছে হয় জীবনানন্দ দাশের তো পাণ্ডুলিপির পর পাণ্ডুলিপি ট্রাঙ্কে তালাবদ্ধ করে রাখতে? বা পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলতে?

মলয় দত্ত : না আমি ওনার মত এত লিখতে পারিনা পান্ডুলিপির পর পাণ্ডুলিপি আমার নেই, হয়তো সুইসাইড সানগ্লাস'ই সর্বশেষ কবিতার বই হবে। এই ২-৩ টা বই, এই লেখাগুলো, এটুকুই অনেক। তাই লুকিয়ে রাখার কিছু নেই তবে আমি জমিয়ে রাখি দেখা গেলো আজকের লেখাটা দু বছর বাদেও এডিটের সুযোগ থাকে, ছাপাইলে আর থাকেনা। এই ব্যাপার টায় অনেকে দ্বিমত পোষন করবে কিন্তু আমি লেখি কারন এইখানে আমিই সব আমি সব সৃষ্টি করতে পারি মারতে পারি ভাঙতে পারি তাই এখানে নিয়মটাও আমার, কিন্তু আমি পুড়িয়ে ফেলতে চাইনা, লুকোতে চাইনা, নিজের কাছে ধারেই জমিয়ে রাখি কিছুদিন, কথার সাথে আরো কথা বলার জন্য।


 মিহিন্দা :  আপনার অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি মাই নার্সিসিস্ট ডার্লিং এর প্রসঙ্গে আসি। এ পাণ্ডুলিপিতে পরবাস্তববাদ, সুফিবাদ, আধুনিকতাবাদ, উত্তর আধুনিকতাবাদ সবগুলো বিষয় এসেছে। তবে কোনটা স্পষ্ট হয়নি। পড়তে গিয়ে এমন মনে হয়েছে। কীভাবে ব্যখ্যা করবেন?

মলয় দত্ত : আমার সাবকনসাস মাইন্ড উদ্ভট সব কল্পনা সাজিয়ে অদ্ভুত মেটাফোর দিয়ে লেখা তৈরী করছে এইটা কিন্তু আমার সব লেখারই কমন গুন, এইটা দোষ না গুন সেইদিকে না গিয়েই, তো মানে দাড়ালো আমি এমন এক জগতের কথা বলি বা বলতেছি বা বলেছি যার চাক্ষুস অস্তিত্ব নাই। সেই দিক থেকে আমার সবসময় মনে হয় পরাবাস্তবাদ আমার লেখায় আছে, মানে আমি যখন খেয়াল করি নিজের লেখার দিকে মনে হয় নিয়ম ও যুক্তিতর্কের বাইরে গিয়ে অবচেতন মন'কে রুপায়িত করতে পেরেছি আর দৃশ্য থেকে অন্যদৃশ্যে যাবার যে জাম্পটা আমার জন্য কঠিন নয় কিন্তু আপনি আগে একদিন বলেছিলেন অনেকেই এখন এটা এড়িয়ে যাচ্ছে এমন কিছু একটা কিন্তু আমার মনে হচ্ছে দৃশ্য থেকে দৃশ্যের জাম্প এমন হচ্ছে একদৃশ্য থেকে দ্রুত আরেক দৃশ্যে যেতে গিয়ে যে পরিমান ভাবনার আন্দোলন হচ্ছে এইরকম আন্দোলনের সাথে পাঠকেরা এখনো কমফোর্টবেল না।


মিহিন্দা : একটা পর্যায়ে মনে হয়েছে, সবকিছু ছাপিয়ে যৌনতাই বোধহয় এই পাণ্ডুলিপিতে প্রমিনেন্ট হয়ে উঠেছে..

মলয় দত্ত : তাতো সত্যিই, মলয় দত্ত সেক্স বাদে কিছু লিখতে পারেনা এ কথা তো শোনা যায়, বলে সবাই, বা স্তন যোনি ছাড়া দেখি কিছুই নাই কবিতায় বা জোর করে স্তন যোনি টেনে আনলেই কবিতা হয়না এসব আমি শুনি। সবসময় সবাই বলে। কিন্তু আমার লেখা এমনই, আমি এমনটাই লিখি, আমি এমন জীবনবোধ থেকেই লিখি, আমার লেখা এতটুকুই যেখানে যৌনতাই সব ছাপিয়ে জেঠে উঠবে বা ওঠে বা দেখেন এইযে নর নারী এদের মাঝে কিন্তু পরস্পর ব্যাকুলতাই শেষমেষ সত্যি, হ্যাঁ যৌন শীর্ষসুখ লাভ সময়ের ব্যাপার কিন্তু  আমাদের ক্ষুধা বলেন, পিপাসা বলেন সবকিছুই সেক্সুয়াল এখন কথা হচ্ছে আপনি এখন যৌনতাকে কিভাবে দ্যাখেন বিশাল এক শ্রেনী'তো একে কেবল দু পা ফাঁক করে শুয়ে থাকা মহিলার মাঝে পুরুষের উত্থিত লিঙ্গ প্রবেশ'ই বোঝে কিন্তু এর বাইরে, অনেক বাইরের কিছুও কি নেই আমার লেখায়? কেননা যৌনতা এমন একটা ব্যাপার যেটা বিছানা নিয়েই কেবল চিন্তা নয়, এটা আমাকে আপনাকে অস্তিত্বের গভীরে প্রেরন করে শরীরের প্রতিটা তন্তু এরমধ্যে দিয়ে স্পন্দিত হয় শুরু থেকে শেষ আর শেষের পরে দীর্ঘসময়ের পথে আমাদের রোমাঞ্চিত করে যায় তো এই আমি অন্তত যৌনতার বাইরে গিয়ে কিছু বলতে পারিনা এইটা সীমাবদ্ধতা না আবার যার ভাবার সে ভাবতেও পারে, এভাবে ভেবে আমাকে স্রেফ ট্যাগ লাগিয়ে দেয়া হচ্ছে অবশ্য তাতে আমার আপত্তি নাই অস্বস্তি নাই আর যেখানে আমি অজস্রবার বলেছি আমাদের বিশ্বাসের ক্ষমতা আমাদের এক্সপ্রেরিয়েন্স থেকে আসতেছে, বাতাসে তোমার গন্ধ পাওয়া তো যৌনতা বা মোমেন্ট বাই মোমেন্ট এইযে ভাবনাচিন্তাহীন ফিগার ভেবে চলেছি আমার তো একেও যৌনতা মনে হয় আর যৌনতার মাঝে অবস্থান করে যৌনতাকে অস্বীকার করবেন তাতো হয়না বা আমার হয়না, পারিনা।


এখন কথা হচ্ছে আপনি এখন যৌনতাকে কিভাবে দ্যাখেন বিশাল এক শ্রেনী'তো একে কেবল দু পা ফাঁক করে শুয়ে থাকা মহিলার মাঝে পুরুষের উত্থিত লিঙ্গ প্রবেশ'ই বোঝে কিন্তু এর বাইরে, অনেক বাইরের কিছুও কি নেই আমার লেখায়? 


মিহিন্দা :  আপনি লিখেছেন, " মোহনার জরায়ু পূজা করে ও স্পর্শ করে.."  জরায়ু তো বাইরে থেকে স্পর্শ করা যাবে না। বাইরে থেকে যোনি স্পর্শ করা যাবে৷ যোনি না লেখে এখানে জরায়ু লিখলেন কেনো? এর পরেই আরেক জায়গায় লিখেছেন যোনি স্পর্শ করে..

মলয় দত্ত : হায় হায় মৃত শব্দের তিমির থেকে জ‍্যান্ত শব্দের অবসাদে ধরাশায়ী হবার অবস্থা এখন, ইচ্ছে হচ্ছে জরায়ু যেখানে এসে
যোনিতে উন্মুক্ত হয় সেখানে আবার পুজায় বসে যাই...আর সবাই যেভাবে মন হৃদয় ছুয়ে দেখে সেভাবে ছুয়ে দেখি যে বাপু কোথায় কিভাবে ছুয়ে দেখো...আর আমি সেই থেকে শিখে নেই খুলে দেখি ফাণ্ডাস কর্পাস সারভিক্স অরফিস!


মিহিন্দা :  " হৃদপিণ্ডটা বন্ধক রাখা আছে বেশ্যার রজঃস্রাবের কাছে.." কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

মলয় দত্ত : আপনি এই দৃশ্যটা কল্পনা করুন। আর মনে করুন আসলেই ব্যাখ্যার দরকার পরছেনা।


মিহিন্দা :  "ঈশ্বরের বিশ্বাসী পত্রবাহক নেচে যাচ্ছে মানুষের মতন, কখনো দেবতার মতো, কখনোবা ঈশ্বরের মতন.."  ইংরেজিতে দেবতা এবং ঈশ্বরের মধ্যে সাধারণত পার্থক্য করা হয় না। দুইটারই ইংরেজি God। আপনি এখানে দেবতা এবং ঈশ্বরের পার্থক্য করলেন..

মলয় দত্ত : ইংরেজীতে করেনাই পার্থ্যক্য, কিন্তু আমি যেই পরিবেশে বড় হইছি, ছোটবেলায় যেসব দেখছি বা জানতে চাইয়া জানছি সেসব বড় হইয়া ভুল জেনেও আর অস্বীকার করতে পারার মত হইলেও করিনাই, যেমন ধরেন দেখতাম লক্ষ্মী পুজা হইতেছে বাড়ি, স্বরস্বতী পুজা, কার্তিক পুজা, এরম আরো অনেক পুজা দেখেছি, তো যখন জানলাম এরা কেউ ভগবান না এরা হইলো দেবতা এরকম ত্রেত্রিশ কোটি দেবতা আরো আছে, কিন্তু ভগবান একজন আলাদা। এইটা তখনথেকে আমার মাথায় গেথে যাওয়া, যে দেবতারা হইলো কম পাওয়ারফুল আর ঈশ্বর বা ভগবান হইলো সবথেকে পাওয়ারফুল, এইটাই ছিলো ওইসময়ে দেবতা আর ঈশ্বরের মধ্যে আমার জানা পার্থক্য, কিন্তু ঈশ্বর দেবতা এইসব বিষয়ে আমার জানাশোনা যখন পাল্টেযেতে থাকে তখন ও ছোটকালের এই ব্যাপারগুলা মাথায় থেকে গেছে, যে কারনে
দেবতা আর ঈশ্বর তাই আমার কাছে আলাদা আলাদা ভাবেই লেখাতে আসছে।


মিহিন্দা : "কেবল রুহুর ভেতরে যেভাবে শুয়ে থাকে ভুলভ্রান্তি.." ধর্মীয় ভাবে রুহু মানে আত্মা বুঝানো হয়না। রুহু হলো যা থেকে সমগ্র কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে। রুহুকে ধরা হয় সকল পাপ ও ভুলভ্রান্তির উর্ধ্বে..

মলয় দত্ত : আমি যতদুর জানতাম রুহু আর আত্মা একই জিনিস, আবার অনেকে বলে আলাদা জিনিস এইটা নিয়ে একটা বিতর্ক চালু আছে আর শিশু যখন মায়ের গর্ভে থাকে তখন তার মাঝে রুহু আসে, অই স্টেজ টাকে রুহানি জগত বলা হয়। তো আপনি যখন নিশ্চিত একপ্রকার সেহেতু আমার এখানে ব্যখ্যা  একপ্রকার নিস্প্রোয়জন।


মিহিন্দা :  আপনার প্রথম বইয়ের পর দ্বিতীয় বইয়ে এসে বলার ধরন, চিন্তা অনেক জায়গাতেই বড়সড় পরিবর্তন এসেছে..

মলয় দত্ত : এইটা শান্তির ব্যাপার আমার জন্য। অধিকাংশ নতুন লেখকদের প্রথম কবিতার বইটা দেখবেন খুব বেশি প্রভাবিত থাকে, বর্তমানে রুদ্র, সুনীল, নির্মলেন্দু গুন, মহাদেব সাহা, এই কজনের প্রভাব থাকে সবচেয়ে বেশী। অধিকাংশের'ই। তো আমার বইটাও ব্যতিক্রম না, আমার নিজেরই মনে হইছে এই বইয়ের কবিতা গুলো অনেক বেশি প্রভাবিত। তো এইটা কিন্তু খারাপ না, আমরা সমাজে থাকি সমাজের নানান উপাদান দিয়া প্রভাবিত হইয়াই আমাদের জীবন ঠিক তেমন কবিতা লিখতে আসলে আপনি দেশী বিদেশি নানান লেখকের কবিতার সাথে স্বভাবতই পরিচত হবেন এবং আরো স্বভাবিক ভাবেই প্রভাবিত হইয়া যাবেন এখন আমার দায়িত্ব ছিলো এই প্রভাব টা এড়ানো, আর এই দায়টা দ্বিতীয় বইতে এসে দাড়ায় বেশী কারন প্রথম বইয়ের পরে দ্বিতীয় বই আডাই বছর পরে এই সময়টাতেই আমাকে নিজের ভাষা মানে বলার ধরনা আবিস্কার করতে হইতো বা হইছে, প্রভাবিত হওয়াটা যেমন স্বাভাবিক সেইখান থেকে বের হয়ে এসে নিজের কাব্যভাষা আলাদা বলার ধরন আবিস্কার করাটাও তো জরুরী, বই বিক্রি একদম কম হইলেও আমার মনে হয় আমি সাকসেস প্রথম বইর পরে দ্বিতীয় বইতে বিশাল একটা ভাষার জাম্প আছে, যেইটা আমাকে আনন্দ দেয়।


মিহিন্দা :  আধুনিকতাবাদ ও উত্তরাধুনিকতাবাদকে কীভাবে দেখেন?

মলয় দত্ত : এ নিয়া তো তর্ক বিতর্ক লেগেই আছে, আমি এইসব বিষয় প্রথমত যেমন বুঝতাম না আর বোঝার আগ্রহ যখন আসলো বুঝতে গিয়ে আমি ক্লান্ত অনুভব করি, এত এত কথা অবশ্যই জানা দরকার অনেকের, কিন্তু সবার এসবে দরকার নাই। আমি জানি উত্তর আধুনিকতাবাদ নামে কিছু একটা আছে, আধুনিকতা বাদ নামে কিছু একটা আছে ওই অব্দিই, জানা দরকার এ ব্যাপারে এই আগ্রহ একসময় ছিলো বা আশেপাশে যখন দেখতাম সবাই এইসব ব্যাপারে যেকোনো আলোচনায় ঝড় তুলে দিচ্ছে নিজের উত্তর আধুনিক বিষয়ক মতবাদ নিয়ে তখন আমি আমার ক্লান্তি টের পাই, এইসব তত্ত্বের উপরে বিশাল বিশাল লেখা শেষ করে বুঝতে পারার আগ্রহ না থাকার অক্ষমতা টের পাই, আর দেখি আমার একান্ত দুই একজন যারা আমাকে বলে, এই লেখাটা ভালো হইলোনা, এইটা এইখানে বেশি লাগতেছে, সেইসব একান্ত কয়েকজন মানুষ আমাকে বলে, মডার্নিজম বলতেছে ক্লাসের কথা আর মলয় তুমি করতেছো নৈরাজ্য, ঐপাশে যখন চলে যুক্তির শাসন তুমি কবিতার নামে  দৃশ্যের পর দৃশ্য সাজাইয়া বানাইতেছো নীরবতা, মীমাংসার বদলে অমীমাংসাতেই যেনো খুশী তোমার লেখাপত্র, বা কোনো এক সিজ্রোফেনিয়ার রুগী তুমি। তখন কেউ কেউ বা কোনো একজন একান্ত মানুষ বলে,এইগুলা দেখি উত্তর আধুনিকের লক্ষন, আমি তারে উত্তরে বলি, আসলেই তারা ঠিক বলে উত্তর আধুনিকের নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নাই, ফর্ম নাই, আমি যে উত্তরআধুনিক তা আমি নিজেও জানিনা, আমি জানতে পারি আমি বুদ্ধিবৃত্তিক মতাদর্শের ভিতরে কেনো বাইরেও যেতে পারি আমি আর সম্ভাবনা স্বীকার করতে যেমন পারি তেমন পারি অস্বীকার করতে সেটা উত্তর আধুনিকবাদ বা অন্য যেকোনো দার্শনিক আন্দোলনের ধারে কাছের নাও হইতে পারে।


মিহিন্দা :  কবিতার সাধারণ টাইপোগ্রাফি ফর্ম এর বাইরে কবিতাকে কীভাবে দেখেন? এই ধরুন দৃশ্য কাব্য - ভিস্যুয়াল পোয়েট্রি..

মলয় দত্ত : মানে শ্রব্যকাব্য'র জাগায় শ্রব্যকাব্য আবার দৃশ্যকাব্যের জায়গায় দৃশ্যকাব্য, দুইটাতো দুইরকম, কবিতার সাধারন ফর্মের বাইরে গিয়ে দেখবো কেনো, এটাতো কবিতার মধ্যেই দুইটা ভাগ। 


মিহিন্দা : আপনার কবিতায় পার্ভাটনেস নানা ভাবে আসে। এগুলো নিয়ে অশ্লীলতার অভিযোগ আছে৷ কবিতা কি অশ্লীল হয়? বা শ্লীল অশ্লীল এই ডিক্লারেশনটা কারা করবে?

মলয় দত্ত : আমি একটা উত্তর দেবো আরেকজনে আরেকটা দেবো মানে কে ঠিক করবে কোনটা ঠিক কোনটা বেঠিক, মানে শিল্প ব্যাপারটাই এরকম, ধরেন রুম ইন রোম সিনেমার কথা বলি, এই সিনেমাটা দেখে আমি বিষণ্ণ হয়ে ছিলাম সারাদিন, মারাত্মক মন খারাপ, অথচ একই সিনেমা আমার এক ক্লাসমেট দেখে মাস্টারবেট করলো কারন রুম ইন রোম সিনেমাটা জুড়ে মেয়ে দুজন সম্পুর্ন উলঙ্গ অবস্থাতেই নিজেদের মধ্যে কথপোকথন করে। আবার এক বন্ধু এই সিন আছে দেখে সিনেমাটা দেখবে না বলেই সিদ্ধান্ত নিলো। কারন এটা অশ্লীল। এখন এই সিনেমাটা খুব ভালো এই রায় দেবার আমি কে, আর সিনেমাটা খুব অশ্লীল এই কথা বলার ই বা বন্ধুটা কে, আবার যে বন্ধু মাস্টারবেট করলো সেই বা কে এই সিনেমাকে পর্নোগ্রাফি বলার?
ব্যাপারটা এমনই, শিল্পে এসব থাকবেই, কারন আমাদের জীবনেই এসব আছে৷ আমরা আছিই যৌনতার মাঝে, আছিই উত্তাপের মাঝে নষ্ট রাজনীতির মাঝে নষ্ট পরিবেশের মাঝে, এখন সেই খানে চোদা শব্দ টা লিখলে বা শুয়োরেরবাচ্চা বলে গালি দিলেই সেইটা অশ্লীল হইয়া যাবে বা অই শব্দটা স্কিপ করলেই শীল্ল হইয়া যাবে এই কনসেপ্ট  আসলে আমি বিশ্বাস করিনা, আর ডিক্লারেশন দেবার কেউ নাই একদম কেউ নাই, যা মনে চায় লেখা হবে, অনেকের শীল্ল মনে হবে অশ্লীল্ল হবে মনে আবার অনেকের কিন্তু লেখক তো জানে সে এইটা কি লিখছে!
আর আমার কবিতার অভিযোগ যখন এরকম আসে আমি এইটাকে আনন্দের সাথে নেই ভালোই লাগে যখন দেখি সবাই খুব ভদ্র সভ্য আর আমার নামেই অশ্লীল্লতার অভিযোগ আসতেছে তার মানে এই লাইনে আমিই একা, এত অশ্লীল্ল আর কেউ লেখনা!  এটা দারুন সংবাদ তো।


মিহিন্দা : আপনার কবিতায় নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রবণতা লক্ষণীয়। এটা কি আত্মঘাতী ক্লান্তি? 

মলয় দত্ত : এটা ক্লান্তি না, এটা স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে তৈরী হওয়া একটা ডিফারেন্স  এর লাইন, যে গদ্য এবং কবিতা দু জাগাতেই অভিজ্ঞতার আঘাতে আর পারিপার্শ্বিক ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় আমি ক্লান্ত নই, কমার্সিয়াল সাম্রাজ্যের ওস্তাদ'দের চিন্তার বাইরে গিয়ে চিন্তা করছি, প্রতিনিয়ত বাস্তবতার কাঠগড়ায় দাড়িয়ে থেকে প্রতিদিন মৃত্যুর অপেক্ষা করছি সেখানে লেখার সময় ও নিজেকে কাঠগড়ায় দাড় করানোই যে স্বাভাবিক সেটাই লেখাগুলো বলছে, আর তারো অধিক বার বলছি পৃথিবীকে দেবার মত মেসেজ আমার নাই, যেভাবে অরুপ বলে নিজের মনের অবচেতন ভীতি ও দুর্বলতাকে উৎসে পৌঁছে ধাপে ধাপে ভেঙে ফ‍্যালাটাই আজ একমাত্র ঘটনা । আমার জীবন অন্তত সেরকমই ।


মিহিন্দা :  বিভিন্ন সময় এই আলোচনাগুলো এসেছে। বিভিন্ন সাহিত্য আলোচকগণ করেছেন। একজন লেখককে আশাবাদী হতে হবে। আপনার লেখায় হতাশা,বিষন্নতা, রাগ, অভিমানের প্রভাব প্রকট। এটাকে কি আপনি আপনার সীমাবদ্ধতা বলবেন?


মলয় দত্ত : আমি আশাবাদী নই, আশাবাদী হতে হবে একজন লেখক'কে এই কথায় ও মত নেই,আমি যেকোনো রকম হতে পারি, আমার লেখা আশার বদলে হতাশা থেকে আনন্দের বদলে দুঃখ থেকে আরো ভয়ানক রুপে জন্ম নিতে পারে, এটা সম্ভাবনার কথা, যেহেতু আমি আশার কথা আনন্দের কথা জানিনা, আর আশা আনন্দ উচ্ছাসের সাথে আমার জীবনের বিশাল দুরত্ব সেহেতু আমি জানিনা আসলেই আশাবাদী লেখাগুলো কিরকম ভাবে রচিত কিন্তু এই অভিযোগ যখন শুনি মলয় তোমার সবগুলো লেখা একই বিষয় নিয়ে হয়ে যাচ্ছে, এক যৌনতা, এক অভাব, এক হতাশা, এক রাগের কথাই বারবার বলছো, আমি তখন চুপ করে নিজের সাথে কথা বলি, এই অভিযোগ অবশ্যই অস্বীকার করি , কেননা কেবল যৌনতা'কে উপজীব্য করে বা কেবল হতাশাকে উপজীব্য করে আমার কোনো লেখাই রচিত হয়নি বরং লেখালেখির শুরুতে যেমন কেউ কিছু বললে নিতেই পারতাম না, সমালোচনায় ভেঙে যেতাম তুচ্ছ লাগতো নিজেকে এখন এসব অভিযোগ অস্বীকার করি সাথে সাথে ভাবি যে যাই বলুক যতই বিরোধিতা করে নাকচ করুক আমার ঘরানার লেখা আমি জানি আমার লেখা এলিট ক্লাসের ড্রয়িংরুম ছেড়ে শোপিসের মত সাজানো আয়োজন ছেড়ে মধ্যবিত্তের নিম্নবৃত্তের রান্নাঘরে ঢুকে গেছে, মশলার কৌটার উপর প্রজাপ্রতি হয়ে বসে আছে, ভাষা নিজেই সত্য হয়ে উঠছে, আমার ভাষা অন্তর্ঘাতী এবং পাঠকের মাঝে ঢুকে পড়ার ক্ষমতা রাখে, আমি সত্যের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারিনা, তবুও অনেকরকম লেখা যখন একজন লেখক কেনো লিখছেনা ভ্যারিয়েশন কেনো নেই বিন্দুমাত্রও এই অভিযোগ নানান দিক দিয়ে আসতে থাকে আমার ভাস্কর চক্রবর্তীর ডায়েরীর কথা মনে আসে, মনে আসে " যারা আমার থেকে অনেকরকম লেখা চায় তারা মুদি দোকানে যায়না কেনো "  আর সীমাবদ্ধতা! 
না একদমই সীমাবদ্ধতা বলবোনা৷ কারন আমি জীবনযাপন'ই করি এরকম এক দেশে, এক সমাজে, এক পরিবারে, যেখানে আমার ব্যক্তিগত জীবন সামাজিক জীবন মারাত্মক বিপর্যস্ত, কখনো দারুন উশৃঙখল , আমি আক্রান্ত যেমন আক্রমনকারীও, আমি অভাবে শেষ, আমার আশেপাশে সবাই একা হয়ে যাচ্ছে, হতাশার কথাও অনেকে আর বলতেও পারছেনা, রাগ দেখাতে পারছেনা, প্রতিবাদ বোধহয় ভুলেই গেছে, অভিমানের পরে জমা হচ্ছে অভিমান আমি নিয়মিত দেখছি এসব, আমার জীবনটাই উঠে এসেছে এই অভাব অভিমান প্রচণ্ড রাগ থেকে আমি কিভাবে এসবের বাইরে কিছু লিখবো, যে জীবন দেখিনি জানিনা সেসব জীবনের হয়ে লিখলে হয়তো এসব থাকতোনা, বরং এটাই ভালো আমার জীবন এরকম আমি লেখিও এরকম, আর যদি আমার প্রথম বইয়ের পর থেকে এখন অব্দি খেয়াল করেন দেখবেন আমার লেখা অন্য লেখা থেকে আলাদা করা যায় একটা ধারা আসলেই তৈরী হয়েছে যে মলয়ের লেখা এরকম, চেনা যায়, আমি মনে করি একজন লেখকের এটা দরকার আর আমি একজন লেখক হিসেবে আমার জীবনবোধের নিবিড়তার উপর একান্তভাবেই নির্ভরশীল। 


মিহিন্দা : পাঠকের সাথে কমিউনিকেশন এর ক্ষেত্রে মলয় দত্ত অনেক এগিয়ে। পাঠক মলয় দত্তের সাথে কথোপকথন করতে পারে মলয় দত্তকে পড়ার সময়। আপনার কী ভাবনা,এগুলো স্বতঃস্ফূর্ত? নাকি সাধনা?


মলয় দত্ত : স্বতঃস্ফুর্ত বললে মিথ্যা বলা হবে যেহেতু আমি বর্ন ট্যালেন্ট না, আমি বলবো ৩-৪ বছরের লম্বা জার্নির মাধ্যমে আজকের স্বতঃস্ফুর্তভাব এসেছে, এইযে এখন কমিউনিকেশন করা যাচ্ছে এইটা নিতান্তই দুএকজন জানাচ্ছে এই কমিউনিকেশন পাওয়ার কিন্তু সব লেখার থাকেনা, হুট করে একদম প্রথমে তো খুব কম ই থাকে, যেমন আমার প্রথম দিকের কিছু লেখায় এই পাওয়ার নাই বলেই আমি মনে করি, তো এই ক্ষমতা অর্জনের যে জার্নি সেইটাতো সাধনা'ই, তাই আজকে আমার লেখার যে টোন সেটা অবশ্যই স্বতঃস্ফুর্ত, এই টোনে আমি এখন টানা কথা বলেও যেতে পারি, সাধনা দ্বারা নির্মিত আমার স্বতঃস্ফুর্তার পিলার। 


মিহিন্দা : সাহিত্যের সমালোচনা সাহিত্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ শাখা। কিন্তু এখন এটা প্রায় বিলুপ্ত। এখন সাহিত্য আলোচনা আছে,তবু সেখানে তোষামোদ ছাড়া আর কিছুই নেই। এটা কি বাংলা সাহিত্যের জন্যে অশনিসংকেত?

মলয় দত্ত : "এখন এটা প্রায় বিলুপ্ত " এই লাইনটা আপত্তি করা যায় কি যায়না তাই নিয়া ভাবলাম, আসলে আপনি এখনকার অবস্থাই দেখতেছেন তাই মনে হচ্ছে এখন বিলুপ্ত আবার ২০ বছর ৫০ বছর আগে দেখলেও বলতেন বিলুপ্ত প্রায়। সমালোচনা হচ্ছে, হইছে, কিন্তু খুবই ক্ষীনধারায়। আপনি কিন্তু পত্র পত্রিকা খুললেই আলোচনা সমালোচনা দেখতে পারবেন কিন্তু ভালোমত খেয়াল করলে দেখবেন অধিকাংশ সমালোচনাই একনয় নিন্দায় তাচ্ছিল্যে ভরপুর মানে একপ্রকার নাকচ কইরা দেবার চেষ্টা বা নাকচ করে দেওয়াই আর কিছু সমালোচনা প্রশংসায় বোঝাই, ফুলের মালা আর ফুলের মালা, সোজাসুজি পা চাটা, এগুলি একদম ধরে কয়ে টাকা দিয়া লেখানো আলোচনার মত। শুধুমাত্র গীবত নিন্দা বা শুধুমাত্র ভুরি ভুরি প্রশংসাই কিন্তু সমালোচনার চরিত্র না,  কিন্তু এই দুইরকমের বাইরেও কিছু সমালোচনা হচ্ছে আবার সেই কিছু সমালোচনা এমন জাগায় হচ্ছে এমন পত্রিকায় হচ্ছে যেই পত্রিকাগুলো মিডিয়াগুলো নামিদামী পত্রিকা মিডিয়ার চাপে আমাদের সামনে আসতেছেনা, অনেক খুজলে বা কখনো বাই চান্স আমাদের সামনে আসতেছে, আর এই সামনে না আসার কারনে বা ভালো আলোচনারে পঙ্গু বা চরিত্রহীন বানানোর পিছনে পত্রিকার সম্পাদকেরাও অনেকেই দায়ী যেমন ধরেন আমি নিজে কিছু আলোচনা লিখেছিলাম তরুন কবিদের কবিতা নিয়ে, এর আগে একজন কবির উপরে প্রকাশিত বিশেষ সংখ্যায়, তো পত্রিকা ছাপা হবার পর পত্রিকা হাতে নিয়া দেখলাম আমার আলোচনা হতে অনেক লাইন মাঝখান দিয়া দিয়া কেটেকুটে সম্পাদক মনের মত বা যতটুকু বললে আতে ঘা না লাগে সেইটুকু রেখেছে, লেখাটাকে এককথায় যাকে বলে চুদে দেওয়া, সেটা সে করেছে, আবার অনেক পত্রিকায় কিন্তু যেমন ধরেন ফাল্গুনী রায়'কে নিয়া আমার দীর্ঘ আলোচনা আছে সেখানে কিন্তু অনেকরকম কথাই আছে সেখানে কিন্তু হাত দেয়নাই সম্পাদক তো আমার কথা হচ্ছে একজন সম্পাদক কিভাবে একজন লেখকের লেখার মাঝে হাত দিয়া কেটেকুটে নিজের মনমত লেখাদাড়া করায় তাহলে তো সে নিজে লিখলেই পারতো আর সে যেহেতু আমাকে উক্ত তরুন কবি বা বিশেষ কবি সম্পর্কে লেখার মত যোগ্যতা আছে বলেই আমার থেকে লেখা চেয়েছিলো, যদি যোগ্যই ভাবে আমাকে আমি যা বলবো তাতো তার ছাপাতে হবে না না ছাপালে মানে পত্রিকার স্বার্থের সাথে না গেলে লেখাটা পুরাপুরি নাকচ করে দিতে হবে, কিন্তু মাঝখানে কেটেকুটে দিবার অধিকার কোথায় পায় জানিনা এটা যে কেবল আমার সাথে তা কিন্তু নয় আমরা যারা গদ্যের লেখক যারা কথা বলতে চাই আলাপে আগ্রহী লেখা পত্র নিয়ে তাদের অনেকেই আর সমালোচনায় আগ্রহী না এ কারনে, বা লিখবেনা বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এটাও কিন্তু সমালোচনা কমার একটা কারন মানে এইযে সম্পাদকের দুষ্টু আচরন, দ্বিতীয়ত আমাদের মধ্যে আলসেমি আছে, অনেক ভালো লেখা আমাদের সামনে আসে, আমরা পড়ি আবার পড়া যাচ্ছেনা এতটাই বাজে এরকম লেখাও কিন্তু আপনি আমি দেখতেছি কিন্তু আমরা কজন কথা বলি এই নিয়ে বলুন, আমরা ভাবি ধুরহ বলে কি হবে, বা অনেক অনেক ভালো লেখা, লেখক দেখেও ভবিষ্যৎ দুএকজন কে নিয়ে কথা বলি, আর এরপরে সমালোচনার স্পেস নাই এটা একটা ব্যাপার, আপনি যদি সমালোচনার সব চরিত্র ঠিক রেখে লেখাটা লেখেন মানে সত্যকথাই বলেন দেখবেন যাকে নিয়ে লিখেছেন অধিকাংশ সময় সেই লেখক আপনার শত্রু হয়ে যাবে মানে যদি সত্যিই দু এক লাইন ও তার বিরুদ্ধে যায় আর অনেকে আবার ভুয়সী বেহুদা প্রশংসা করে লেখকের বন্ধুত্ব ও অর্জন করে, এইসব কারনে চরিত্রহীন সমালোচনা অনেক হচ্ছে কিন্তু সার্থক সমালোচনা না, এইজন্যই আপনার মনে হচ্ছে বিলুপ্ত আর যেহেতু এখন লেখামাত্রই সেটা ফেসবুকে দেয়া যাচ্ছে বা ছবি তুলে পত্রিকা থেকে দেয়া যাচ্ছে ট্যাগ দিয়া তাই সাথে সাথে লেখকের একটা রিএকশান পাওয়া যাচ্ছে, ভালো বা মন্দ। এই রিএকশান টাকে ব্যবহার করে সমালোচনার পথ আরো সুন্দর হইতে পারতো কিন্তু আফসোস আমাদের এখানে অধিকাংশ সময়ই সে আলোচনা হয়ে উঠেছে অনর্থক কথার ঝুড়ি। আর সবশেষে সমালোচনা'কে সাহিত্যের যে স্থানটা দেওয়া দরকার ছিলো সেইটা দেয়নাই বা দেওয়া হয়নাই, মানে কবি, ঔপন্যাসিক, এদের যে একটা জায়গা পাঠক দেয়, সমালোচকরা ওই স্পেসটা না পাইয়াও অনেকেই আগ্রহহীন। তবে এইযে বিলুপ্ত বললেন, এইটা বিলুপ্ত হবেনা, এভাবেই চলবে খুব আস্তে, খুবই ক্ষীনধারায়, ১০০ টার মধ্যে ৫-৬ টা হবে সার্থক সমালোচনা। 


মিহিন্দা : আপনি বই আলোচনা-সমালোচনা নিয়ে  পত্রিকা “পোস্টমর্টেম” এর সহ-সম্পাদক ছিলেন। একটা সংখ্যার পর পত্রিকাটা থেমে গেলো কেনো?

মলয় দত্ত : ২০১৮ সালের ঈদের সময় ভিন্নচোখের অফিসে যাবার পথে আমি বাতিঘর থেকে একটা বই সমালোচনার পত্রিকা কিনে নিয়ে যাই। নিয়া ভিন্নচোখের অফিসে বসে পড়তে থাকি, আফজাল ভাইকে দেখাই পত্রিকাটা, সে দেখে, কিছু সময় পরে বলে এরকম একটা কাজ আমাদের এখানে করা দরকার, কারন প্রতিবছর প্রচুর বই হচ্ছে, পুশ সেলের ভীড়ে কতিপয় বেস্ট সেলার বই এর নাম আমরা জানতে পারতেছি কিন্তু অনেক ভালো ভিন্ন রকম বই আমাদের নজর এড়াইয়া যাচ্ছে যেগুলা আলোচনার দাবী রাখে। তো এরপর আমরা এরপর কেবলমাত্র বই সমালোচনা নিয়াই একটা পত্রিকা করার চিন্তা করি। আফজাল ভাই তখন বলে আমি যেহেতু ভিন্নচোখের নিয়মিত কাজগুলা নিয়েই ব্যস্ত থাকবো তুমি এইদিকটা দেখবা। এরপরে জায়েদ ভাই আমি আর আফজাল ভাই পত্রিকার নাম ঠিক করি, আর এরপরের পত্রিকার যাবতীয় সব কাজ করতে গিয়া টের পাই আসলেই একটা পত্রিকা করার চিন্তা থেকে একদম প্রিন্ট হয়ে হাতে আসা অব্দি কত দিক যে চিন্তা করা লাগে আর কত কাজ, তো এইসময় আফজাল ভাই'ই সব ডিরেকশন দেয় তাই আমি সম্পাদক থাকতে চাইনাই, কারন আমার তখনো অনেক শেখা বাকি। এইগুলা ছিলো শুরুর কথা। এরপর প্রায় ৬ মাস কাজ করার পরে প্রথম সংখ্যাটা আসে। আমাদের প্লান ছিলো ৩ মাস পর পর করবো, আর বই সমালোচনার পাশাপাশি আমি যেইটা এড করি সেইটা হলো এখানে লেখালেখির দুনিয়ায় জড়ির প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ দুজন ব্যাক্তির সাক্ষাৎকার থাকবে প্রতি সংখ্যায়, কিছু বইয়ের পরিচিত থাকবে, আপনি খেয়াল করলে দেখতে পাবেন ভিন্নচোখের প্রতিটা কাজের মতই এই কাজটাও কত আলাদা যেহেতু তখন বাজারে বই সমালোচনার পত্রিকা একপ্রকার ছিলোইনা, সেইসময় এই কাজটা শুরু করে কন্টিনিউ করাটাই ব্যাপার ছিলো, কিন্তু প্রথম সংখ্যার পরে আমরা আর্থিক দিকটা দিয়া পিছিয়ে যাই কারন বাস্তব সত্যি হলো এইযে এই পত্রিকা বলেন সেইটা তো মিনিমাম বিক্রি হওয়া লাগবে নাইলে তো আমাদের মিনিমাম টাকাও রিটার্ন আসবেনা তার উপর বিজ্ঞাপন ও আমরা তেমন পাইনি, প্রথম সংখ্যাটার কন্টেন্ট খেয়াল করলে দেখবেন ২০১৮-১৯ সময়ের সেরা কিছু বই নিয়ে আমরা কাজ করেছিলাম, কিন্তু আজকে ৩ বছর পরেও প্রথম সংখ্যার অর্ধেক কপি এখনো আমাদের অফিসে পরে আছে তো এইসব নানাবিধ কারনে আমরা মাসখানিক চুপ ছিলাম, আমি ব্যক্তিগত ভাবে হতবাক ও ছিলাম কারন এমন আলাদা একটা কাজ বাতিঘর, বইমেলা, পাঠক সমাবেশ কোথাও থেকেও ১০ কপিও ঠিকমত সেল হয়নাই, শুনতে খারাপ লাগছে কিন্তু এটাই সত্যিই, আমি এইটা নিয়া আফজাল ভাইর কাছে হতাশা প্রকাশ করি, আফজাল ভাই আমাকে বললো তুমি টাকা পয়সা নিয়া ভাইবোনা লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাস আজীবন ই এরকম, আর টাকা নিয়া ভাবলে ভালো কাজ জীবনেও করতে পারবানা, কাছের আরো দুএকজন আমাকে বুঝালো আর এরপর প্রথম সংখ্যায় যারা আমাদের সাথে কাজ করেছে তারা অনেকেই প্রফেশনাল লাইফে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার আমি আর আফজাল ভাই দুজনে মিলে একা হয়ে থাকি আর ওইসময় প্রায় ৪-৫ মাস ভিন্নচোখে আমার যাতায়ত ছিলোনা যোগাযোগ অফ ছিলো, এরপরে যখন ফিরি আমরা দ্বিতীয় সংখ্যার কাজ শুরু করি, এবং বই আলোচনা, বিজ্ঞাপন, সাক্ষাৎকার সব রেডি করি। কিন্তু এরপরে ভিন্নচোখের আরেকটা বড় প্রজেক্ট " বিশ্ববাংলা কবিতা সংখ্যা " যেটা দুই বাংলা ১০০ কবিদের প্রত্যেকের ১ ফর্মা কবিতা নিয়ে প্রায় ২০০০ পেজের এক মহা আয়োজন, সেই কাজের দিকে আমি আর আফজাল ভাই দুজনেই ব্যাস্ত হয়ে যাই, কিন্তু তার ও পাশাপাশি " পোস্টমর্টেমের " জন্য কাজ চলছিলো, আমাদের প্লান ছিলো দুটো সংখ্যাই ফেব্রুয়ারি'তে একবারে আনা, যেহেতু দীর্ঘ একটা গ্যাপ গেছে আমরা ভেবেছিলাম বইমেলাটাই ভালো সময় আবার নতুন করে শুরু করার, আর কন্টিনিউ করার, কিন্তু যেহেতু অনেক বড় পরিসরের কাজ যেটা সংখ্যাটা দুটো আসলেই আপনারা দেখতে পাবেন যে কেন এত এত সময় ভিন্নচোখের কাজ আপনাদের সামনে এলোনা, সেটা দেখলেই বুঝবেন কেন এতটা সময় দাবী করেছে কাজ দুটো। আর ফেব্রুয়ারীর পরে করোনার কারনে আজকে অব্দি পৃথিবীর সব থেমে আছে, দুটো সংখ্যার জন্য'ই আমাদের সব কাজ গুছানো, প্রেসে যাবার জন্য প্রস্তুত, আশা করি সবকিছু ঠিক হবার মাসখানিকের মধ্যেই পোস্টমর্টেমের নতুন সংখ্যা আসবে এবং ধারাবাহিক ভাবেই আসবে। 


মিহিন্দা :  বাংলা সাহিত্যে হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকে কীভাবে দেখেন?

মলয় দত্ত : এইটা একটা কমন প্রশ্ন সবাই করে যেকোনো আড্ডায়, আমি নিজেও যখন আনোয়ারা হকের সাক্ষাৎকার নিলাম ওনারেও জিগাইছিলাম কারন উনি বয়স্ক মানুষ অইসময়টা ওনারা দেখছে, আন্দোলন টা যেহেতু বছর পঞ্চাশ আগের তো ওই ইমপ্যাক্ট তাৎক্ষনিক এপারের সাহিত্যে কি ছিলো বা বছর দশেক বিশেক ত্রিশেক পরে কি ছিলো  তা তারাই ভালো জানে বা বলতে পারবে, কিন্তু আজকে আমরা যেইখানে দাড়ানো মানে এইযে আমি বলতেছি যা ইচ্ছা তাই লিখবো, কোনো শীল্ল অশীল্ল নাই এই সাহসটুক এর পিছনে হইলেও কিন্তু হাংরি জেনারেশনের অবদান আছে আবার এইযে এই সাহসটুকু হাংরি আন্দোলন কেবল এই সাহসটুকুই না, আরো অনেক বড় কিছু।


মিহিন্দা :  আপনার কী মনে হয়, হাংরি জেনারেশন যে কবিতার কথা বলতে চেয়েছিলো, তা এতোগুলো দশক পেরিয়ে দ্বিতীয় দশকে চর্চা হচ্ছে?
 
মলয় দত্ত : না আমার বরং উল্টো মনে হয়, তারা যে কবিতার কথা বলতে চেয়েছিলো সেসব কবিতার চর্চা ৮০-৯০ দশকের অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশের সময়কালেই বেশি হয়েছে এখন হাতে গোনা ১০-১৫ ও জন বোধহয় নেই এরকম কবিতার চর্চা করে আর বিশাল একটা অংশ কিছুকাল পরে এই আন্দোলন সম্পর্কে গভীর ভাবে ভাবতে বা হৃদয়ে ধারন ও করতে চাইবেনা, পারবেনা।


মিহিন্দা : আপনি কি এটা বিশ্বাস করেন, একজন কবি নিজেই একটা আন্দোলন?

মলয় দত্ত : একজন কবি নিজেই একটা আন্দোলন তবে সেটা দার্শনিক আন্দোলন।


মিহিন্দা : ভাই, কবিতা ও রাজনীতিকে কীভাবে দেখেন? একজন কবির রাজনৈতিক সচেতনতা কতটুকু জরুরি? 

মলয় দত্ত : দেখেন ভাই কবিতার সংজ্ঞা আমি দিতে পারবোনা বা আপনে মনে হয় সংজ্ঞা চান ও নাই। তবে কবিতাকে আমি মানুষ আর তার কাজ কারবারের কাইন্ড অফ অনুকরন মনে করি, এরিস্টটল ও একই কথা বইলা গেছে। আর আমার কবিতা প্রতিফলিত জীবনদর্শনের, সমকালীম নানান সমস্যা না ধরেন একটা ঘাস একটা সবুজ মাঠ বা আমি সারাজীবনে একবার'ই নাসরিন সুলতানাকে দেখেছি এই আমার কবিতা এসব যে কেবল ব্যক্তিজীবনের গর্ত দিয়া উঠে আসছে তা কিন্তু না এইসব একপ্রকার আন্তর্জাতিক ঘটনা ও, এইযে আমার কবিতায় এত অভাব এত হতাশা এইটা কিন্তু একটা আর্থসামাজিক অবস্থায় ও নির্দেশ করে বা আমি কবিতাকে দেখি ক্রমশ বোধের খোলাপথ বিভিন্ন যৌন্ন উত্তেজক ভ্রমনের মধ্যে ব্যপক কর্মযজ্ঞ ঘটাচ্ছে বা এসব কিছুইনা আমি একা, আমি একা এটাই চিৎকার করে বলেছি বা কবিতা আমার কাছে এমন যেন আমি মাত্র দু বছর বয়স জীবনের প্রতিটি সুচারু পর্দা সরিয়ে সরিয়ে প্রকৃতির অনুসরন অথবা দারুন অভিমানে প্রকৃতির অমান্যকরন আর হাংরিদের মত দেখি বা বুঝি অমানুষ হলেও মানুষ " মানুষ" থেকে যায়..সামনে বিশাল প্রকৃতি...

আর রাজনীতি, কবিতায় অনেক রাজনীতি আছে। দেশে আছে। পরিবারে আছে। ফ্রেন্ড সার্কেলের মধ্যে আছে৷ এইগুলা বা ওরম আরো যা যা আছে সব ই কিন্তু ইন্সটিটিউট, আর এতে রাজনীতি থাকবেই, তো দেশের রাজনীতির দিক দিয়ে আমি আসলে বোকা মানে আমি বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস পড়েছি শেখ মুজিব জিয়াউর রহমান এরশাদ সবাইকেই পড়েছি, খালেদার শাসনামল দেখেছি, হাসিনার শাসন দেখছি, মায়ের মুখে যুদ্ধের গল্প শুনেছি কিভাবে ওনার লুকিয়ে ইন্ডিয়া গিয়া রিফিউজি ক্যাম্পে ছিলো, তো এত পড়া শোনা দেখার পর ও ভাই আমি আসলেই বুঝে উঠতে পারিনা এদেশের  রাজনীতির মতদার্শটা আসলে কি, আর কি বলতে চায়, ইভেন এই ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতির ইতিহাস ও বর্তমান পড়ে শুনে আম বিরক্ত আমার স্রেফ ভাল্লাগেনা। একজন তরুন এরকম রাজনীতির বিষয়ের উপর উদাসীন হওয়া একদম ই অনুচিত কিন্তু আমি এই অনুচিতের দলেই। আর যে সেক্টর গুলা বন্ধু পরিবার এসব জাগায় ও রাজনীতি আছে, আমি আসলে পরিবারের বাইরে থাকি একা থাকি বন্ধু নেই এবং অবশ্যই যোগাযোগহীন থাকি তাই যেহেতু আমি একা মানুষ কোনো ইন্সটিটিউট এর মধ্যে নাই সেহেতু আমি রাজনীতিতে নেই আর কবিতার রাজনীতিতে আপনি না থাকলেও থাকবেন এটা ভয়ানক, বলবে অমুকে অমুক গ্রুপের, অই গ্রুপ আবার আরেক গ্রুপ কে দেখতে পারবেনা, তাদের ভালো বই হলেও কেনবেনা আড্ডায় এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের গীবত কিভাবে কার লেখা আটকানো যায় মানে সোজা কথায় ছ্যাচড়ামি কিন্তু রাজনীতি আর কি, একপ্রকার শুন্য প্রতিযোগিতা, আপনাকে কেউ না কেউ যেহেতু সবাই ই এই রাজনীতির ই অংশ তাই কেউ না কেউ ট্যাগ লাগাইয়াই দেবে যে অমুকে অমুক গ্রুপের, ওর লেখা আমাগো পত্রিকায় ছাপাবোনা, ওর বই আমরা কেনবোনা যতই ভালো লেখা হোক ওর নামে এ কথা বইলা বেড়াবো ভালো কাজ এর কথা বলবই না, এরকম টেন্ডেন্সী নিয়া চলে এরা। এইসব আর কি ভাই, আদতে আমি এইসব থেকে অনেক দুরে থাকি, আগে তো কবিতার এই কাদাকাদা ছোড়ছুড়ি রাজনীতি পত্রিকা আর বিভিন্ন আড্ডায় হোতো আর এখন হয় ফেসবুকের পোস্টে কমেন্টে আর আপনি ভালো করেই জানেন আড্ডা আর ফেসবুকে এসবে আমাকে পাওয়াই যায়না আমি এসবের বাইরে থাকার ট্রাই করি, এক প্রকার রাজনীতির বাইরে থাকারই ট্রাই করি তবুও একদম নিরপেক্ষ মানুষ হয়না 
আর আমিও তো মানুষ ভাই.।।



মিহিন্দা : কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধার্ঘ্যে সৌরীন ভট্টাচার্য (‘এক চুলে মাত’, ১৩-২) লিখেছেন, ‘কবিতার রাজনীতি আর কবির রাজনীতি গুলিয়ে ফেলার দরকার নেই। যদিও তা আমরা হামেশা গুলিয়ে ফেলি।’ আপনার কী মনে হয়? 

মলয় দত্ত : কবিতার রাজনীতি আর কবির রাজনীতি দুইটাই অহেতুক একটা টপিক্স ভাই, এইসব নিয়া চিন্তা ভাবনার দরকার আছে বইলাই মনে করিনা, তবে এই দুইটা যে দুইরকম আলাদা বিষয় তাতো ঠিক ই আছে আর গুলায়েও ফেলে অনেকে, কারন পড়াশোনা কম। এই জেনারেশনের পড়ার অভ্যাস কমের কারনে আরো কত কি যে গুলায়ে ফেলবো তার হিসাব ও আশা করি গুলিয়ে যাবে। 



কবিতায় তত্ত্বকে অস্বীকার করতে গিয়ে মানে অস্বীকার করেছে অনেকেই, এইটা আমার কাছে ভুল মনে হয়, তত্ত্বকে অস্বীকার করার দরকার আছে বইলাই মনে করিনা, আর তত্ত্বকে অস্বীকার কইরাই যে কবিতায় খুব একটা ফিলোসফি আনা যাবে তাও না।


 মিহিন্দা : আপনার রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কে জানতে চাই। আপনার কবিতায় শিল্প এবং রাজনীতি কীভাবে এসেছে?

মলয় দত্ত : আমি একনায়কতন্ত্র পছন্দ করি। এইটা কি আমার মতাদর্শ হইতে পারে? তাইলে এইটাই আমার মতাদার্শ। বুঝতেই পারতেছেন বিস্তারিত বলতে চাইতেছিনা। 

আমার কবিতায় রাজনীতির প্রয়োগ একভাবেই আসছে যেভাবে আসলে রাজনীতি আসে "দলীয় বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যস্থ ক্ষমতার সম্পর্কের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্পর্কিত কর্মকাণ্ডের সমষ্টি " এইভাবেই। মানে যেটা রাজনীতির সংজ্ঞা আর কি
 আর দেশ পরিবার বা সব রকমের প্রতিষ্ঠানের মানে যেসবের সদস্য আমি সেসবের কেউই আমার উপর ন্যায় বিচার করেনি তাই আমার শিল্প এবং রাজনীতি, কবিতায় রাজনীতি সব এসেছে অভাব থেকে চরম অভাব থেকে। আমি আগেও বলেছি আমার শিল্প রাজনীতি চরম অভাব অন্যায় থেকে আসা, আমি এমনভাবে আজ নির্যাতিত যেন পিতামাতা বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধু নেই আমার, বা যে আসে সে এসে শুনায় শুনুন কেবল মরে যাওয়ার পক্ষেই সব চমৎকার আমি বলি ভাগ হারামজাদী আমার একাকীত্ব ধু ধু করে চৌরাস্তায় জ্বলে ওঠে..খিদে পায়, কবিতা পায়, রাজনীতি ফুটে ওঠে...কবিতা আসে..



মিহিন্দা : কবিতায় তত্ত্ব ও দর্শনকে কীভাবে দেখেন? 

মলয় দত্ত : আত্মকেন্দ্রিকতার কারণে ক্রমাগত আমরা শুধু ইতিহাসই নয়, পরমজ্ঞান সাধনতত্ত্ব এগুলো যে কত জরুরী তা যেন আমাদের আজকের লেখকেরা জানেইনা বা জানতেও চায়না আগ্রহ ই নেই, তারা বছর বছর বই করায় ব্যস্ত আর লোকের ইনবক্সে বই এর রকমারি লিংক পাঠাতে ব্যস্ত অথচ আমাদের নৃতাত্ত্বিক পটভূমি ও দার্শনিক ভাব সম্পদ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছি আমরা এই বদ অভ্যাসে। তত্ত্ব অবশ্যই জরুরী আর তাকে কবিতায় গুরুত্বসহকারেই দেখি। 


আর দর্শনে আমি প্রচল কোনো মতের পথে নেই৷ আমার নিজের একটা সৃষ্ট দর্শন আছে তবে তা পাঠকেরে জোর করে গেলানোর প্রচেষ্টা নেই তবে খেয়াল করবেন মলয় দত্তের কবিতার ফিলোসফি নিয়া প্রকাশ্যেই দ্বন্দ আছে। 
 আগের কবিরা প্রচল কাব্যধারার পরিবর্তনের তাগিদ অনুভব করেছিলেন ফলে তাদের কবিতায় শ্রমজীবী ও জনতাভিত্তিক সমাজচেতনার উন্মেষ দেখা যায়।  দেখবেন আমার কবিতায় ও কাব্যধারার পরিবর্তনের তাগিদ যে অনুভব আর অনুভব করার পরের লেখার রিএকশন টা আছে, আমি একটা সম্পুর্ন নতুন ভাষায় লিখছি, এটা একটা দুর্ঘটনার ঝাপ বলতে পারেন কারন আমি চেঞ্জ না করে ফেইলর ও হতে পারি ভ্যান ঘগের মত লিখে জানাবো হয়তো "ইটস ফেইলর এগেইন ব্রাদার "। তবুও তদন্ত করা সমীক্ষা করা কমিশন বসিয়ে মাথায় এই হোলো আমার দর্শন আর অসীম নিষ্ঠানুগত্যে মৃতদের পাহারাদারের ভাষায় লিখে যেতে থাকা। 


মিহিন্দা : কবিতায় তত্ত্বকে অস্বীকার করতে গিয়ে অনেকে কি দর্শনকেই অস্বীকার করে ফেলছেন?


মলয় দত্ত : কবিতায় তত্ত্বকে অস্বীকার করতে গিয়ে মানে অস্বীকার করেছে অনেকেই, এইটা আমার কাছে ভুল মনে হয়, তত্ত্বকে অস্বীকার করার দরকার আছে বইলাই মনে করিনা, আর তত্ত্বকে অস্বীকার কইরাই যে কবিতায় খুব একটা ফিলোসফি আনা যাবে তাও না। বরং এই দুইটার মিশ্রন সহ কবিতাও কিন্তু আছে, সুন্দর আর সুখপাঠ্য সেসব কবিতা..তো আমার মনে হয় তত্ত্বকে অস্বীকার করাও যেমন ভুল, তেমনি এই ভুলের চাপেই কারন একটা ভুল লেখার ফ্লো'কে এমন দিকে টেনে নেয় যে দর্শন ও কিনা এড়াইয়া যায়, যদিও কবিতা মানেই খুব দর্শন ফলালাম বা জ্ঞান জাহির করলাম এরম কিন্তু না। তো এইসব এক ভুলের চাপে অনেকেই দর্শনকে অস্বীকার করে ফেলেছে, যদিও এই অস্বীকার ও ক্ষতিকর না.বিস্তারিত আলাপের দাবী রাখে।

মিহিন্দা : ধন্যবাদ ভাই।
মলয় দত্ত : আপনাকেও ধন্যবাদ। 

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন