মাহমুদ সানা এর ছোটগল্প | মিহিন্দা

বশির মিয়ার ভাঙচুর






বশির মিয়ার ঘর থেকে ভাঙাচোরার শব্দ পাওয়া যায়। পাশের ঘরে ভাবীদের তখন মনোযোগ রান্নায়। তবুও বশির মিয়ার ভাঙাচোরার শব্দ মনোযোগ ফিরিয়ে নেয় ভাবীদের। ভাবীরা বশির মিয়ার দরজায় এসে দাড়ায়। সাহস করে কেউ ঘরের ভিতরে যায়না। কারন অনেক বছর যাবত তারা বশির মিয়ার সাথে একই বাড়ীতে ভাড়া থাকে। বশির মিয়া এই ঘর গুলোর দেখা শোনা করে। আর ভাবিরা জানে যে বশির মিয়া নিজেই বেরিয়ে আসবে। আর ঐ লোকটার মাথার তার সামান্য কাটা। বরং ঘরের ভিতরে গেলেই বিপদ। তাই ভাবীরা অপেক্ষা করে বশির মিয়ার বেরিয়ে আসার। বশির মিয়ার ভাংচুর শেষে রক্ত বর্ন চোখে দরজা খুলে বের হয়। প্যাচপেচে ঘামের শরীরে বানু ভাবী বলে, ভাই ঘটনা কি? বশির মিয়ার রক্ত বর্ন চোখের দৃষ্টি বানু ভাবির দিকে গিয়ে আটকায়। তখন আসন্ন আর এক বিপদের সম্ভাবনা। তাই নিয়ন্ত্রণের জন্য জরি ভাবী তার টানা চোখ দূষণ মুক্ত হাসি দিয়ে এক গ্লাস পানি এগিয়ে মাথায় আর চোখে মুখে ছিটায় ফর্সা হাত বুলিয়ে। জরি ভাবি কোমল কন্ঠে বলে, ইস্ ভাই গরমে ঘাইমাতো অবস্থা বেহাল! বইসা পড়েন। বশির মিয়ার গোপন দূর্বলতা এই খানে। ফলে বশির মিয়া শান্ত হয় এবং তার আজকের ভাঙচুর বিষয়ে বলতে শুরু করে। তাই প্রতিবারের মতো ভাবীরা আগ্রহ নিয়ে শোনে। বশির মিয়া বলে, আরে ঘুম ভাইঙ্গা বালিশের কোনা হাতায়া দেহি সিগারেট নাই। রবিউলের মা ভাবী তার শুকনো মুখে বলে, রোজার দিনে… বশির মিয়া বলে, হ! রমজান মাসে দ্যাশে ঐ একটা জিনিস আছে যেইডার দাম বাড়েনা। যাক হেডা গেলো! কিন্তু এই যে লকডাউন চলতাছে। বাইরে যাইতে পারবানা ঘরে থাকো। খানকির বাচ্চারা এই গুলো না কইলেও পারে। ওগোর অহন কোন কাম নাই তাই ঘরে বইসা খায় আর এই সব বইলা সময় কাডায়। টিভিতে কয় ফেসবুকে কয় কওনের যতো যায়গা পায় কয়। মানলাম ঔ হাউয়া। কিন্তু আমারে বুঝাও রবিউলের মা ভাবি এই যে, তোমাগো ভাতাররা কাম করতাছে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে বেতন পাইছে! পায়নায়। অহন টিভিতে আইসা মন্ত্রী মিনিস্টারে কয়! আমাগো সরকার গরীব শ্রমিক মেহনতি মানুষের। আমাগো সরকার প্রণোদনা দিছে। আর ফ্যাশ ফ্যাশ গলায় এক ন্যাতা মালিকগো কয়, শ্রমিক ছাটাই হবেনা বেতন দিবা পুরা মাসের। গেছে কাইল থেইকা আমার দোকানের পাশের ফ্যাক্টরি বন্ধ আর একটায় শ্রমিক ছাটাই। মাথা কি হুদাই গরম হয়! আমার দোকানের বাকি ট্যাকা ওরা দিবো ক্যামনে! এদিকে ভাবী দিন ঘুরতে না ঘুরতেই মন্ত্রী-মিনিস্টারগো যাত্রার ডায়লগ পালটাইয়া গ্যাছে ৬০ পার্সেন্ট বেতন দিবো আর বাড়ীর মালিকেরে অনুরোধ করে ট্যাকা কম নিতে! হাসি পায়না কও ভাবি! আবালেও বুঝে কটিট্যাকার কারবারিরে বাচাইয়া গরীবের পোঙ্গা… থাক কমুনা রোজার দিন। তয় ভাবী কও মাইনষেগো ত্রান দিতাছে! তোমার আমার ঘরে আইছে! আসে নায়। আরে তোমাগো কথা বাদ আমার ঘরে তো বালও আসে নায়। দোকানডা মাস ভারাইছে বন্ধ। তাইলে বুঝি কেমনে মিনিস্টারগো ত্রান সবার কাছে গ্যাছে! সব ভোকাস বুঝলা ভাবী। তাই মাথা-মুথা গরম হইয়া গ্যাছে ভাইঙ্গা ফালাইছি টিভি আর মুখ দেখা আয়না।


ফ্যাক্টরি থেইকা ঘরে প্রবেশ করে সব ভাইরা। ভাবীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে যেহেতু রান্না ফালাইয়া গল্পে মশগুল। তাই ভাবীরা তড়িঘড়ি রান্না ঘরের দিকে যায় এবং রান্নার দেরির কারন হিসাবে বশির মিয়ার ভাংচুর বিষয় জাহির করে। এরমধ্যে বশির মিয়া এলে বানু ভাবীর স্বামী বলে, বশির ভাই গরীবের মাথা গরম কইরা লাভ কি? বশির মিয়ার মাথার তার যায়গা চুত্যি হয়ে যায়। আর বলে, লাভ খুজতাছো তুমি কি বিজনেস ম্যাগনেট? সবাই পাবে পুরা মাসের বেতন। তুমি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির শ্রমিক ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা! পাবা ৬০ পার্সেন্ট। পাইছো? পাওনাই! রাস্তায় নামবা তাইলে যদি পাও। জরি ভাবীর স্বামী বলে বশির ভাই আমরা ভিতরে ভিতরে আলোচনা করছি কাইল নামতে পারি আন্দোলনে। বশির মিয়া বলে, করবা কি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে যহন কাম করো আন্দোলন না কইরা করবা কি! চালায়ে যাও…


মহামারি করোনার কালে মানুষের সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিপরিতে আন্দোলন হয় পোশাক কারখানায় বেতনের দাবিতে। জরি ভাবীর স্বামী রোজ হুমকির মুখে পড়েও পেছায় না। সক্রিয় আন্দোলন চালায়। ভাবিরা এখনও রান্না ঘরে বসে। সুধু কয়েকজন সাদা, কালো পোশাকে এসে বশির মিয়াকে একদিন ঢেকে নিয়ে যায়। তারপর থেকে বশির মিয়াকে এখনও পাওয়া যায়নি।


Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন