রোমেল রহমান এর মহামারী দিনের প্যারাবল | মিহিন্দা




জেলরাষ্ট্র


এক দল হাতি জেল গেটে এসে হইচই শুরু করে দেয়, কারারক্ষীরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়! জেলার বেরিয়ে এসে হতভম্ব হয়ে যায়। জেলার আতঙ্কে তোতলাতে তোতলাতে জিজ্ঞেস করে, কি বিষয়? হাতিদের লিডার তার অতিকায় শরীর নিয়ে এগিয়ে এসে বলে, আমাদের জেলখানায় ঢুকায় দেন! জেলার বলে, কেন? কোন দুঃখে? হাতিদের লিডার বলে, ফেইসবুকে রাষ্ট্রযন্ত্রের চালকদের ব্যর্থতা নিয়ে সত্য কথা লিখছি! তাদের তীব্র নিন্দামন্দ করছি! আমার সঙ্গীরা সেই পোস্ট শেয়ার করছে, লাইক দিছে, কমেন্টে গালাগালি দিয়া মতামতের স্বাধীনতা প্রকাশ করছে! রাষ্ট্র তো আবার এইসব পছন্দ করে না, সত্যের ব্যাপারে তার ভয়ানক আতঙ্ক! কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের নামে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হবে! তাই ভাবলাম, থানা পুলিশ গুম নাগুম পলাপুলি বাদ দিয়া একবারে জেলখানায় হাজির হই! জেলার কিছুক্ষণ হা করে থেকে বলে, বুঝলাম না! লিডার হাতি বলে, বোঝার কাম নাই! আমাদের ঢুকায় দেন জেলখানায় তাইলেই বুঝবেন! ভিত্রে থাকা আই সি টি আইনে মামলা খাওয়া ডজন ডজন ভাইবেরাদারের সাথে যখন গালগল্প করবো তখন বুঝবেন কাহিনী কি! জেলারের মাথা খুলে যায়! সে বলে, আচ্ছা এক কাজ করেন, এট্টু ঘুইরা আসেন, মানে মামলা খায়া আসেন! তার মধ্যে আমরা জেলখানার গেইট ভাইঙ্গা বড় করি! এই ফুটা সাইজের গেইট দিয়া তো আপ্নেগোরে সান্দানো যাবে না ভাইজান! হাতিদের দলের এক যুবক হাতি বলে ওঠে, এহ্‌ ইয়ার্কি? কলাকৌশল? এইখান থিকা আমরা এক কদম নড়বো না! এইখান থিকা সরলেই কালা বাহিনী আইসা তুইলা নিয়ে অন্য কোথাও গুইজা থুইয়া বলবে, আছে কিন্তু নাই... তয় টের পাওয়া যায়...কিন্তু হারায় গেছে! সব হাতি হো হো করে হেসে ওঠে! অসহায় জেলার বলে, দেখেন আমরা হুকুমের গোলাম! কাগজ না আসলে কেম্নে ঢুকতে দেই? তখন দুই তরুণ হাতি লিডার হাতির কানে পরামর্শ দেয়! ফলে তারা দল বেঁধে জেলখানার দেয়াল মাথা দিয়ে ঠেলতে থাকে! জেলার চিৎকার দিয়ে বলে, আরে আরে করেন কি? ব্রিটিশ আমলের দেয়াল বেশি ঠেলাঠেলি করলে কাইত হয়্যা যাবে! লিডার হাতি খেঁকিয়ে বলে ওঠে, দেয়াল ভাংতেই তো আসছি গাড়ল, বুঝো না? জেলার বলে, আমার চাকরি চলে যাবে ভাই! লিডার হাতি বলে, যাবে না! ঠিক তখন হুরমুর করে দেয়ালের একটা অংশ ভেঙে পড়ে! লিডার হাতি হুকুম দেয় , তোরা আগায় যা, ভিত্রের সব দেয়ালের জয়েন্ট খুইলা ফেল! জেলার কাঁদতে কাঁদতে বলে, এইটা কি করলেন? হাতিদের লিডার বলে ওঠে, কি আবার করলাম, ভিতর বাহির এক কইরা দিলাম! আলাদা জেলখানার দরকার কি, পুরা দেশটাই তো আইজ জেলখানা!

০৭ মে ২০২০


_____________

আমরা আসলে এরকম(ই) চেয়েছিলাম


খাবার যোগাড় করা যখন একটা প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো, আর ক্ষুধা নামক দৈত্যকে লাগাম দেয়া যাচ্ছিলো না; তখন শহরের গরিব মানুষদের কাছে একটা স্বস্তির খবর এলো, শোনা গেলো গুড় পুকুর নামে যেই পুকুরটা আছে শহরের ঐ মাথায় সেই পুকুরের জল খেলে নাকি খিদে থাকছে না! সমস্ত দিনরাত মানুষ মুখ লাগিয়ে শুয়ে বসে ঐ পুকুরের জল খাচ্ছে! কেউ কেউ ঝাঁপিয়ে পড়ছে! ঝাঁপিয়ে পড়লে সব থেকে বেশি শান্তি, জীবন নিয়ে কোন দুশ্চিন্তা থাকে না! আর ডুবে যেতে পারলে সকল অশান্তির সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করা যায়! ফলে শহরের সব গরিবেরা হাঁটা শুরু করে গুড় পুকুরের দিকে! জ্যৈষ্ঠের রোদের মধ্যে পিচ পোড়া রাস্তায় তারা হেঁটে এগোতে থাকে গুড় পুকুরের দিকে! কোলে হ্যামাট্যামা নিয়ে ট্যাঁ ট্যাঁ করতে করতে তারা এগোয়, বুড়ো বাপ মাকে কাঁখে করে কিংবা ঝোলায় নিয়ে এগোয় সন্তানেরা! সমস্ত গরিবেরা গুড় পুকুরের রাস্তা নেয়! ফলে বড় লোকেরা হা হয়ে দেখে ঝুলন্ত বারান্দায় দাঁড়িয়ে অথবা নিউজ চ্যানেলে, গরিব শূন্য হতে চলেছে শহর! ফলে বাসাবাড়িতে কাজের লোকেরা আসে না, কারখানা গুলোতে পাওনার দাবিতে মিল গেটে ইনসাফ প্রার্থীদের শ্লোগান শোনা যায় না, রাস্তায় অভাবী রিকশাওয়ালা দেখা যায় না কিংবা চা সিগারেটের দোকানদারেরাও রওনা হয় নিশ্চিত ক্ষুধা মুক্তির ঐ পুকুরের দিকে! জীবন তাদেরকে ক্ষুধা নামক দৈত্যের বাহক ছাড়া অন্য কিছু হতে দেয় নি! এবার সেই দৈত্যের হাত থেকে অন্তত বিনাশ্রমে পাকাপাকি মুক্তি পাওয়া যাবে! কেনোনা যারাই গিয়েছে তারা আর ফেরেনি গুড় পুকুর থেকে, সেই অমৃত তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে, মুক্ত করে দিয়েছে ক্ষুধা থেকে!

তারপর গরিব মানুষেরা যখন গুড় পুকুরে পৌঁছালো তারা দেখল, তুমুল ভিড় চারদিকে! যেন শহর ভেঙে পড়েছে এখানে! শোনা গেলো আশপাশের শহর থেকেও লোকেরা আসছে ক্ষুধা মেটাতে! তবে এখন আর কেউ মুখ লাগিয়ে আয়েশ করে খাচ্ছে না! সবাই নেমে যাচ্ছে! হেঁটে হেঁটে পিলপিল করে নিজেদের পরিবার নিয়ে গুড় পুকুরের রসে তারা নেমে যাচ্ছে ক্ষুধা মুক্তির আনন্দে! গুড় পুকুর তার অপার পেটে টেনে নিচ্ছে এই সব ক্ষুধার্ত মানুষের দঙ্গল!

তারপর সন্ধ্যেবেলায় দেখা গেলো শহরের সব গরিব ক্ষুধার্ত মানুষেরা একজনও নেই! তার সবাই গুড় পুকুর জলে নিজেদের ক্ষুধা মুক্তির সনদ পেতে ডুবে গেছে! পুলিশ জানালো, কোথাও কোন লাশ পাওয়া যায় নি! এই শহরে এখন কোন গরির ক্ষুধার্ত শ্রমজীবী বা নিম্ন আয়ের মানুষ নেই! শহরটা এখন শুধু মাত্র ধনীদের! ফলে ব্যবসায়ীরা মহা বিপদে পরে গেলো কেননা কারখানা গুলো এখন চালাবে কারা? রাস্তার ঝাড়ুদার থেকে শুরু করে চা দোকানী, রিকশাওয়ালা, থালাবাসন ধোয়ার লোক কেউ নেই কোথাও! পরদিন প্রত্যেক কারখানায় কিংবা বাসা বাড়ি থেকে নোটিশ ঝুলিয়ে দেয়া হল, ‘ সকলকে তাদের পাওনা সম্পূর্ণরূপে পরিশোধ করা হবে। মহামারীর দিন গুলোতে ত্রাণ সহায়তা দেয়া হবে। সকলে কাজে ফিরুন। ’ এই জাতীয় নোটিশ টেলিভিশন রেডিও বা অন্যান্য প্রচার মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হল! কিন্তু কোথাও কাউকে ফিরে আসতে দেখা গেলো না গুড় পুকুরের নিশ্চিন্ত অতল থেকে! ফলে বড়লোকেরা জোটবদ্ধ হয়ে চিন্তা করতে লাগলো সবাই মিলে আস্ত গুড় পুকুরটাই যদি কিনে নেয়া যায়, তবে ওর ভেতর থেকে শ্রমিকদের টেনে টেনে বের করে আনা যাবে!

১৫ মে ২০২০


____________

উটপাখি


উটপাখির খামার থেকে একটা উটপাখি বেরিয়ে পড়েছে শহরের রাস্তায়, এই খবর রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম থেকে জানতে পারে আমাদের শহরের লোকেরা! ফলে শহরবাসীদের মধ্যে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো উটপাখিটা দেখবার চুল্কানি ক্রমাগত অনুভূত হয়! বাধ্যগত গৃহবাস কানুনজনিত কারণে তাদের কৌতূহল কিংবা অন্তরের উস্কানি আরও তীব্রতর হতে থাকে! ফলে কেউ কেউ রাতের অন্ধকারে পুলিশের নজর এড়িয়ে অলিগলিতে নেমে মনে মনে অপেক্ষা করে অতিকায় সেই পাখি দর্শনের! কিন্তু ব্যর্থ হয়ে তাদেরকে বউ বাচ্চা স্বামীর ঘ্যানর ঘ্যানরের কাছে ফিরে যেতে হয়! ফলে নৈরাশ্য ভেজা মন গুগোলে উটপাখি সার্চ দেয় এবং উটপাখির আকার আয়তন কিংবা ডিম পাড়ার মৌসুম অথবা খাদ্য কিংবা জীবন যাপনের কায়দাকানুন বিষয়ে জ্ঞান নিতে থাকে! ফলে ফাজিলদের মনে একটাই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা হয়ে টলতে থাকে যে, এত্তো বড় ডিম কেম্নে পাখির পোঙ্গা দিয়া বাইর হয়? অথবা যারা একটু বেশিই বিখাউজ তারা ভাবে, রিমান্ডে কি উটপাখির ডিম প্রয়োগ করা সম্ভব? ফলে প্রশ্ন আসে রাজবন্দি বা দ্রোহীদের পায়ুপথ কতোটা প্রশস্ত হয় বা হতে সক্ষম? কিন্তু এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান সকলে আমল করে উটপাখি বিষয়ে এই যে, মরুঝড়ের সময় উটপাখি বালিতে মুখ গুঁজে আত্মরক্ষা করে! ফলে একটু বেশিই বিখাউজদের মনে প্রশ্ন আসে যে, ঝড়ের সময় বালিতে উটপাখি মাথা গুঁইজা থোয়ায় না হয় মাথা রক্ষা পাইল মানলাম কিন্তু পোঙ্গার কি দশা হয়? সকলে সিদ্ধান্তে আসে যে, আসলে মাথাটাই আসল! কেননা সকল বজ্জাতির রানাবান্না ওইখানে হয়! দুঃসময়ে পাছার কাপড় খুইলা গেলে মানুষের যেমন খুব একটা আসে যায় না, তেমন ঝড়ে উটপাখির পশ্চাতের পালক উড়ে গেলে ক্ষতি হয় না; কেননা, পাছা থাকলে লোম গজায়! এইসব চিন্তাকে একটু বেশি আগায় নিতে সকলে ইউটিউবের দ্বারস্থ হয় এবং সেখানে তারা উটপাখির মাথা গুঁজে দেয়ার ভিডিও দেখে আমোদে খলবল করে! ফলে গৃহবন্দী সবাই ঘরের মধ্যে আমল করতে থাকে উটপাখির মতন লম্বা লম্বা পা ফেলে কুঁজো হয়ে হাটার! কিন্তু জন্মসূত্রে উটপাখির মতল লম্বা ন্যালব্যালে গলা বা লাউয়ের ডগার মতন শূন্যে দুলতে সক্ষম লম্বা গলা না পাওয়ায় সকলে সামান্য হতাশ হয়, তবে তারা কুঁজো হয়ে উটপাখি উটপাখি খেলার চর্চা জারি রাখে এবং তারা কিছুদিনের মধ্যে ফেইসবুক লাইভে এসে উটপাখি খেলা দেখায়! কেউ কেউ স্বপরিবারে বা স্বগোত্রে লাইভে এসে দেখায় কেম্নে তারা উটপাখি জীবনযাপন করে ‘হ্যাপি’ আছে! ফলে মহামারী নামক একটা অপপ্রচারমূলক শব্দের সঙ্গে অর্থনীতি, খাদ্যাভাব, মৃত্যুসংখ্যা কিংবা পূঁজি নামক গ্রন্থের দুরভিসন্ধিজনিত ফলাফল হিসেবে কিছু অপপ্রচার দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে! তবে অক্লান্ত উটপাখি জীবন চর্চার আঘাতে আড়ালে পরে যায় বিভ্রান্ত বা অপপ্রচারকারীরা!

কিন্তু দুঃখের বিষয় ঘটে খামার থেকে বেরিয়ে শহরের রাস্তায় নেমে হারিয়ে যাওয়া উটপাখিটাকে কেউ আর খুঁজতে চায় না কেননা সবাই ততদিনে আয়ত্ত করে ফেলে উটপাখির জীবনযাপন কৌশল, শুধুমাত্র বালির অভাবে তারা মুখ গোঁজে সামনের জনের পশ্চাতে! ফলে প্রশ্ন হয় যে, সবার সামনে যে থাকে সে মুখ গোঁজে কার নিতম্বে? ফাজিলেরা উত্তর দেয়, সবার সামনে যিনি থাকেন তিনি আসলে একটা আস্ত নিতম্ব, কিংবা তার মাথাটা নিতম্ব এবং নিতম্বটাও নিতম্ব; অথবা সবার সামনে যিনি থাকেন তিনি মুখ গোঁজেন সবার পিছনে যিনি তার নিতম্বে!

ফলে যারা একটু বেশিই বিখাউজ তারা বলে, খামার থিকা হারায় যাওয়া পাখিটা কি উটপাখি আছিল নাকি ইমু পাখি? আমগোর শহরে তো উটপাখির খামার নাই, তাইলে সবাই এদ্দিন লাফায় উঠলো ক্যা? বজ্জাৎ একজন বলে ওঠে, উটপাখি ফেসবুকে সান্দায় গেছে, এহন আসেন গুগোলে ইমুপাখি খুঁজি!

১০ মে ২০২০

_______________

একজন ষাঁড়ের শেষকৃত্য


মহান ষাঁড়ের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সমস্ত গ্রামটা তুলকালাম হয়ে উঠলো! যথারীতি পক্ষ হবার কথা ছিল দুটো! কিন্তু এই মহান ষাঁড়ের বেলায় পক্ষ হল আড়াইটা! আড়াই নম্বর পক্ষটা পুলিশ! তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখল কিংবা তামাশা দেখা ছাড়া উপায় ছিল না! কেননা হানাহানিতে নেমে আসা দুই পক্ষের লোকের সংখ্যার সামনে পুলিশ এবং তাদের কার্তুজের সংখ্যা সিকি পরিমাণ! জমায়েতের মূলপক্ষ দুই ভাগ হয়ে ছিল যথারীতি দুটো বিখ্যাত ধর্মীয় লোগোর আবডালে! এক পক্ষ বলল, এই মহান ষাঁড় আমাদের ধর্মের! তাকে আমরা শেষ বিদায় জানাবো আমাদের আচার অনুযায়ী! অন্যপক্ষ বলল, মোটেই না উনি, মানে মহান ষাঁড় জন্মেছিলেন আমাদের সম্প্রদায়ের শান্তিবাহন হয়ে! ফলে একদল মুচি এসে কিছুক্ষণ পুরো ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলো এবং বুঝে ফেলল, এখানে চামড়ার দামের চেয়ে মূল্যবান অনুভূতি সরব, ফলে তারা সটকে পড়লো! জুবুথুবু পুলিশেরা শুধু ওয়াকিটকিতে কেন্দ্রে খবর জানাতে লাগলো যে, উদ্ভুত পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে ধাবমান, এহেন হালত নিয়ন্ত্রণে আরও ফৌজ পাঠান অন্যথায় আমাদের সরিয়ে নিয়ে বাঁচান!

দুই পক্ষ মাইকে চিৎকার দিয়ে বলতে লাগলো এই ষাঁড়ের মহাত্ম! কেউ কেউ তার শৈশবের স্মৃতি খুলে বসলো, কিভাবে সে ষাঁড়কে খাবার দিয়েছিলো কিংবা কেউ কেউ বলল, মানত করে ষাঁড়কে ঘাস খাওয়ানোর পর তার মানত পূর্ণ হবার আধিলৌকিক কাহিনী! কিন্তু সব থেকে ভালো ব্যাপার ছিল, এইসব বাকোয়াজি, চিৎকার কেউই মনোযোগ দিয়ে শুনছিল না! মাঝখানে মাঠের মধ্যে ষাঁড়টা পরে থাকলো আর আকাশে কয়েকটা শকুন ড্রোনের মতো ঘোরাঘুরি করে টের পেয়ে গেলো মানুষই একে ছিঁড়ে খাচ্ছে! কিন্তু লগডাউন ভেঙে জামায়েত হওয়া এইসব মানুষদের আবেগকে ছুঁড়ে ফেলতে না পেরে স্থানীয় নেতারা এসে বলল, আপনারা যা-ই করেন্না কেন মুখে মাস্ক এবং হাতে গ্লোভস্‌ পিন্দে করবেন! তারপর তারাও এই গ্রামের কল্যাণে এই ষাঁড়ের অবদান এবং যারতার ক্ষেতের বেড়া ভেঙে ঢুকে পরার যে অবাধ পাসপোর্ট ভিসা এই ষাঁড়ের ছিল সেই মহাত্ম বর্ণনা করে ক্ষান্ত হলেন! সাংবাদিকেরা ছিল সবচে ব্যস্ত! তারা চারদিকে এতো নিউজের ভিড়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলতে লাগলো এবং তারা জানলো যে, করোনা ভাইরাস থেকে গ্রামকে বাঁচানোর জন্য ষাঁড় কমিটি থেকে ষাঁড়ের গলায় মন্ত্রপড়া ঘণ্টা বেঁধে দেয়া হয়েছিল সপ্তাখানেক আগে! ফলে সারা গ্রাম ষাঁড়টা ঘুরে বেড়াতো আর তার ঘণ্টার শব্দে করোনা ভাইরাস ঘাঁটি গাড়তে পারতো না গ্রামের কোথাও! কিন্তু দুপুরের দিকে যখন সূর্য তার তাপ দিয়ে সবাইকে কাহিল করে ফেলতে শুরু করলো তখন ভিড়ের মধ্যে একজন মাথা ঘুরে পরে যাবার কিছুক্ষণের মধ্যে শোনা গেলো প্রতিপক্ষ নাকি বান নিক্ষেপ করে লোকটাকে ফেলে দিয়েছে এমন গুঞ্জন এবং তার জ্ঞান না ফেরায় মুহূর্তের মধ্যে হাঙ্গামা লেগে গেলো! ফলে সঙ্গে বয়ে আনা দাউ সড়কি বল্লম কিংবা তীর জাতীয় দেশীয় অস্ত্রের এস্তেমাল শুরু হল আর সাংবাদিকেরা পুলিশের কাছে এসে বলল, এখন কি হবে? পুলিশ বলল, ইয়া নফ্‌সি ইয়া নফ্‌সি করেন আর ছবি তুলেন! কিছুই করার নাই! 

সন্ধ্যায় রক্তারক্তি শেষ হলে হাঁসপাতালের বারান্দা ভরে উঠলো রক্তাক্ত ষাঁড়প্রেমী যোদ্ধাদের ভিড়ে! তাদেরকে দেখতে এলো জাতীয় ষাঁড় কমিটির নেতারা এবং তারা দুইপক্ষেকে আশ্বাস দিয়ে গেলো উচ্চতর তদন্ত হবে এই ঘটনার! কিন্তু ষাঁড়টার কোন ব্যবস্থা হল না, মুচিদের দলটা আবার এসে একটা বাগানের আড়ালে দাঁড়িয়ে বুঝতে চেষ্টা করলো সমাজ সেবার দায়িত্বটা তারা তুলে নেবে নাকি কর্পোরেশন? সাংবাদিকেরা সারা দেশে এই সংবাদের ডজন ডজন ফটেজ ছড়িয়ে দিলো! সেইসব ফুটেজে দেখা যায় উল্লাসিত তরুণেরা হল্লা করে জানাচ্ছে, খুনোখুনির সময় সকলেই তারা মুখে মাস্ক এবং হাতে গ্লোভস্‌ পরে মারামারি করেছে যাতে করোনা ভাইরাসের সংক্রমন না ঘটে! ফলে আসামি হিসেবে একদল মুখোশধারী মানুষের নামে মামলা দায়ের করা হল এবং গ্রামটার নাম হল, ষাঁড়গ্রাম!

১৯ এপ্রিল ২০২০


_____________

এখানে গাধার প্রবেশ নিষেধ


সংবাদ মাধ্যমে জানানো হচ্ছিল, দেশে কোন ক্ষুধার্ত মানুষ নেই! কোথাও কেউ না খেয়ে নেই! কর্মহীন আছে যারা তাদের জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে! হৃদয়বান রাজনীতিবিদেরা প্রত্যেকে তাদের এলাকায় গিয়ে নিজ হাতে খাবার বিলি করে ক্ষুধা দূর করছেন! ফলে আসল চিত্র দেখবার জন্য রাস্তায় নেমে দেখা যায় নিরন্ন মানুষের দীর্ঘ লাইন ত্রাণের জন্য সমস্ত শহরে। তেমন একটা লম্বা লাইনের মাঝখানে দাঁড়ানো একটা হাড়জিরজিরে গাধা! তবে ক্ষুধার্ত মানুষের গাধা নিয়ে কোন চাপ নেই! তারা গাধাটাকে একজন অভুক্ত মানুষের সমতুল্য মনে করে ক্লান্ত দাঁড়িয়ে থাকলো চুপচাপ! নেতা পৌঁছালে ত্রাণ দেবার ছবি তোলা হবে তারপর ত্রাণ দেয়া শুরু হবে! বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে প্রত্যেকের ফিঙ্গার প্রিন্ট নেয়া হবে যাতে কেউ দুইবার বা আগামীকাল আবার নিতে না পারে! কিন্তু নেতা পৌঁছাতে পৌঁছাতে কয়েকজন ক্ষুধার্ত মাথা ঘুরে পড়ে গেলো আর বাকিরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল তাদের নিয়তি! 

একসময় নেতা এলেন এবং হাসি হাসি মুখে ক্ষুধার্ত মানুষদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ শুরু করলেন! একসময় গাধার ডাক এলো! ত্রাণ নিতে একজন গাধা আসায় নেতা এবং তার ঘনিষ্ঠ সুশীল বুদ্ধিজীবীরা কয়েক সেকেন্ড বিব্রত হয়ে থাকলো! স্থানীয় পাতি নেতা ফিসফিস স্বরে বলল, লিডার দিয়ে দেন! এরা খুব বিপদে আছে! অভাবের তাড়নায় গাধাওয়ালারা তাদের গাধা গুলোকে ছেড়ে দিচ্ছে মাবুদের নামে, কেনোনা নিজেরাই খেতে পাচ্ছে না ঠিকঠাক তার উপ্রে কাজ নেই, গাধা পুষবে কি করে! নেতার পদলেহি এক শিক্ষক বলে উঠলো, তা বলে মানুষের লাইনে গাধা? পাতি নেতার বুদ্ধিজীবী এলার্জি থাকায় সে চোখমুখ কুঁচকে বলে উঠলো, স্যার আপ্নেরা তো আম গাছের ডালে বইসা আম খান তাই জমিনের খবর টের পান্না! শহরে গাধার সংখ্যা মানুষের সংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ! এতো সংখ্যক গাধার জন্য হয় আলাদা গাধাত্রাণ কার্যক্রম শুরু করতে হবে নৈলে একই লাইনে গাধা এবং মানুষ চালিয়ে যেতে হবে! নেতা বিড়বিড় করে বলে উঠলো, কি আশ্চর্য তারমানে শহরের দুইভাগ মানুষ এক ভাগ গাধার উপর নির্ভরশীল? পাতি নেতা বলল, স্যার সময় নষ্ট করে লাভ নেই! লাইন অনেক লম্বা! ফলে নেতা হাসি হাসি মুখে গাধাকে একটা ত্রাণের ব্যাগ দিলো এবং একজন ফটো সাংবাদিক বলে উঠলো, নেতা আরেকটু সময় ধরে থাকুন ছবিটা তুলে নিই! নেতা বলে উঠলো, না না গাধাকে ত্রাণ দেবার ছবি তোলা ঠিক হবে না! ফটো সাংবাদিক বলে উঠলো, নেতা এই ছবি নিশ্চিত ভাইরাল হবে কেনোনা আপনি হবেন দেশের প্রথম নেতা যিনি মানুষের পাশাপাশি গাধাকেও ত্রাণ দিয়ে বাঁচাচ্ছেন! এই বাক্যটা নেতার ভাল্লাগলো! ফলে নেতা হাসি হাসি মুখে ছবি তুলে ফেললো! কিন্তু সমস্যা বাঁধল গাধার ফিঙ্গার প্রিন্ট নিতে গিয়ে! গাধার তো আঙুল নেই! কিন্তু গাধা গোঁ ধরে বসলো তার ফিঙ্গার প্রিন্ট নিতেই হবে, সে নিয়ম ভাংতে রাজি নয়! ফলে আয়োজকদের সবার মাথায় বাজ পড়লো এবং একদল বিরক্তি নিয়ে বলল, তুমি মিয়া ত্রাণ পাইছ এহন বিদায় হও, এতো ত্যানা প্যাঁচাও ক্যা? গাধা বলে ওঠে, কাহিনীতে ত্যানা আছে বইলাই প্যাঁচাই! একজন বুদ্ধি দেয় কালো রঙ দিয়ে গাধার শরীরে একটা লম্বা দাগ এঁকে দেয়া যেতে পারে যেহেতু ফিঙ্গার প্রিন্ট নেয়া সম্ভব হচ্ছে না! আবার যখন সে ত্রাণ নিতে আসবে তখন আবার আরেকটা দাগ দেয়া হবে! গাধা চেঁচিয়ে বলে ওঠে, এভাবে দাগ দিতে দিতে আমাকে কি শেষমেশ জেব্রা বানিয়ে ফেলবে? গাধা হিসেবে কি সমাজে আমার কোন মূল্য নেই? উপস্থিত ক্ষুধার্ত মানুষদের ভেতর থেকে একটা গুঞ্জন শোনা গেলো, কথাডা কিন্তু মিথ্যা না, গাধাটা গাধা বইলা কি মানুষ না?

এই সমস্যা ঘটতে লাগলো শহরে সব ত্রাণের লাইনে! এবং দিনদিন গাধার সংখ্যা বাড়তে লাগলো! আর ঠিক এর মধ্যে একরাতে একটা ক্যু ঘটে গেলো দেশে! কিন্তু অভাব গেলো না! ত্রাণের দীর্ঘ লাইন যথারীতি দেখা গেলো! ক্ষুধার্তের লাইনে দাঁড়ানো রাজনৈতিক নেতারা! ঘরে কারো চাল নেই, বিক্রি করার মতন আসবাব নেই, কাজ নেই কারোর! ফলে ভরসা ত্রাণের চালডাল! ত্রাণ দিচ্ছিল গাধারা! তবে গাধারা গোছানো এবং সুশৃঙ্খল! গান গায় আর ত্রাণ দেয়! এবং কিছুটা রুচিশীল হওয়ায় গাধারা ত্রাণের লম্বা লাইনের পাশে একটা সাইনবোর্ডে লিখে দিলো, এখানে মানুষ এবং বুদ্ধিজীবীর প্রবেশ নিষেধ!

১৩ মে ২০২০


________________

গোরেস্তানে পঙ্খিরাজ


গোরেস্তানে মধ্যরাত্রে পঙ্খিরাজ টানা গাড়ি নামে! গাড়ি ভরা লাশ! গোরেস্তানের নীরবতায় ঝিঁঝিঁর ঝিমঝিম টানা সুরের মধ্যে ঝুমঝুমি বাজিয়ে পঙ্খিরাজ গাড়িটা নাজেল হয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসে আর  ঘোড়ার ক্ষুরের ক্লান্ত শব্দ চারদিকের মৌনতার মধ্যে রহস্যে ঢেলে দেয়! গোরখোদক দুজনের নাম চান মিয়া আর তারা মিয়া! তারা দুইজন যমজ ভাই! লোকে বলে, মুর্দা দাফন করতে করতে এরা হাফ মুর্দা হয়ে গেছে! চান মিয়া পান খায় আর তারা মিয়া গুল নেয়! দাঁত দেখে আলাদা করা যায় তাদের! কথাবার্তা বলে খুব কম! ফাজিল ছেলেপেলেরা বলে, এরা হইলো কবরের ফেরেশতা মুনকার-নকির! এইসব বেদাতি কথাবার্তা থাক, মূল গল্পে আসা যাক! চান মিয়া তারা মিয়া গত দুই যুগ মুর্দাফরাসের কাজ করতে করতে দাড়িতে পাক ধরিয়ে ফেলার পর একসময় দুনিয়ায় মহামারী লাগে! একদিন রাত্রে পঙ্খিরাজ গাড়ি ভর্তি লাশ আসে দাফনের জন্য! সঙ্গে কেউ নেই! দুজন পুলিশ আর ঘোড়ার সহিস! চান মিয়া তারা মিয়া এতো লাশ দেখে বলে, এক্সিডেন্টের লাশ? পুলিশ বলে, অতো জানার কাজ কি? এখন থেকে রোজ লাশ আসবে, দাফন দিবা! যদি ১৪টা দাফন দেও, খাতায় লিখবা ৪ টা! ২৯ টা হইলে ৯ টা, ৬০ টা হইলে ৬ টা! তারা মিয়া বলে, এইটা কেমন কারবার? পুলিশ বলে, এইটা ছোট সংখ্যা বড় সংখ্যা খেলা, তোমরা বুঝবা না; তোমাদের কাজ কোদাল চালানো আর কবর দেয়া! এহন লাশ গুলান রে কবর দেও! সেদিন সারারাত কেটে যায় তাদের দুজনের লাশগুলো কবর দিতে! ভোরবেলায় পুলিশ যাবার আগে বলে যায়, বাসায় গিয়া ঘুমাও! কেউ বেশি কিছু জিগাইলে বলবা, থানায় খোঁজ নিতে! 

এর সপ্তাহখানেকের মধ্যে একটা ব্যারাছ্যাড়া লাগে সমস্ত রাজ্যে! গোরেস্তানে দাফনের হিড়িক বেফাঁস হয়ে যায়! ফলে সেদিন রাত্রে যখন পঙ্খিরাজ ভর্তি লাশ আসে! লাশ দাফনের আগে পুলিশ সুঁই সুতো আর শানানো ছুরি দিয়ে বলে, লাশ গুলার মুখ সেলাই কইরা দেও আর চোখ তুইলা আমাদের বস্তায় দেও! চান মিয়া ক্ষেপে গিয়ে বলে ওঠে, এইসব কি বলেন আবোলতাবোল? পুলিশ বলে, আমি বলি না তয় আমার বলতে হয়! তারা মিয়া বলে, মুর্দার সাথে এইসব করতে আমরা রাজি না! পুলিশ বলে, তোমরা করবা না তোমাদের বাপে করবে! চান মিয়া  বলে, এইসব কেন করতে  হবে? পুলিশ বলে, লাশ গুলান যাতে দাফনের পর ফেরেশতাকে সত্য কথা গুলো বলতে না পারে তাই জবান সেলাই করে দেয়া হবে! আর চোখ তুলে নেয়া হবে যাতে চোখ সাক্ষী দিতে না পারে সে কি কি দেখেছিলো জিন্দা অবস্থায়!

ফলে এক ভয়ঙ্কর দিন নাজেল হয় চান মিয়া আর তারা  মিয়ার জীবনে! তাদেরকে আর বাসায় যেতে দেয়া হয় না! গোরেস্তানের অফিসেই তারা থাকে আর তাদেরকে খানাদানা দেয়া হয়! কিন্তু দুই ভাইয়ের চোখের ঘুম উড়ে যায় আর ক্রমে তাদেরকে দেখলে মনে হয় লোকদুটো জ্যান্ত আছে তবে বহুদিন আগের মরা! কিন্তু মুর্দার ঠোঁট সেলাই করতে করতে আর চোখ তুলতে তুলতে তারা মিয়া উন্মাদ হয়ে যায়! একদিন সে গোরেস্তানের এক দাঁড়কাককে বলে ফেলে এই কুৎসিত সত্য! দাঁড়কাক শুনেই আঁতকে ওঠে! ফলে পরের দিন থেকে আর তারা মিয়াকে দেখা যায় না! আগের রাত্রে তারা মিয়াকে একটা অতিরিক্ত কবর খুঁড়তে হয় এবং চান মিয়াকে দাফনের কাজটা করতে হয় একা একা! ফলে পরের দিন সকালে দেখা যায়, চান মিয়া নিজের হাতে সুঁই সুতো দিয়ে তার ঠোঁট সেলাই করতে থাকে এবং কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালে বসে থাকা দাঁড়কাকটা আতঙ্ক নিয়ে কাঁপতে থাকে এই জন্য যে, ঠোঁট সেলাই শেষ হলে চান মিয়া কি তার চোখদুটো নিজ হাতে উপড়ে ফেলবে সমস্ত সাক্ষী মুছে ফেলতে?

১১ মে ২০২০

____________________


চালবৃষ্টি


ঝুম বৃষ্টি শুরু হয় সন্ধ্যামালতী ফুল যখন ফোটে তার পরপর! মানুষেরা হতভম্ব হয়ে পরে কেননা এই বৃষ্টিতে জল পড়ে না একফোঁটাও! সবাই নেমে গিয়ে দেখে বৃষ্টি ধারার মতো আকাশ থেকে অবিরাম চাল পড়ছে! ক্ষুধার্ত মানুষেরা বিশ্বাস করতে পারে না এটা কি ঘটতে যাচ্ছে তাদের সঙ্গে, ফলে তারা জড় হয়ে দেখতে থাকে! এবং ক্রমশ রাস্তা ঘাট নর্দমা পুকুর উঠোন মাঠ চালে ভরে ওঠে! কিন্তু কেউ সাহস করে নামে না চাল কুড়াতে! কেননা পুলিশি রাষ্ট্রের কড়া নিয়ন্ত্রণবাদ তাদের মজ্জার মধ্যে দ্বিধা এবং ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে! তারা অপেক্ষা করে ব্যাপারটা বোঝার জন্য! এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা দেখতে পায়, চার হাতপায়ে হেঁটে আসছে দলে দলে সরকারী দলের চেয়ারম্যান মেম্বার নেতা ডিলারেরা! তারা তাদের হিংস্র চোয়াল বের করে ঘষ্‌ ঘষ্‌ স্বরে হুঙ্কার দিয়ে বলে, কোন খানকির পুত একদানা চাউল ধরবার না! এগুলা আমাগোর বাপের সম্পত্তি! আমরা এগুলান গুছায়া গোডাউনে গুইজা থুবো, গর্ত খুইড়া পুইতা থুবো! ক্ষুধার্ত মানুষরা তাকিয়ে তাকিয়ে শোণে! তারপর চতুষ্পদগুলো বলে, কেউ এক পা নড়লে খবর আছে! স্যাটেলাইট দিয়া দেখতেছি আমরা সব! কেউ যদি একদানা চাইল চুরি করছ তাইলে ফালাফালা কইরা ফেলা হবে তারে! আমরা এহন বস্তা আনতে যাইতেছি! ফলে তারা চাল লুটে নেবার জন্য বস্তা আনতে বেরিয়ে যায়! এবং যখন তারা ফিরে আসে তখন দেখা যায় এই চতুষ্পদেরা একজন অন্যজনের সঙ্গে কামড়াকামড়ি করছে! কে কতো বেশি চাল নিতে পারে সেই প্রতিযোগিতায়! ক্ষুধার্ত মানুষ গুলোর চোখে ঘুম এসে যায়, চালধোয়া আকাশে চাঁদ ওঠে! সেই আলোর মধ্যে এইসব নিরন্ন মানুষ গুলোর কারো কারো মনে হয়, কতো আর ক্ষুধা সহ্য করবে, তারচেয়ে এই জানোয়ার গুলোকে খুন করে ফেলা উত্তম! কারো কারো মনে হয়, এইসব দেখার চেয়ে আত্মহত্যা উত্তম! আবার কারো কারো মনে হয়, একজন মানুষের কতোটুকু চাল প্রয়োজন এক জীবনে?

২১ এপ্রিল ২০২০


________________

টোপ



রাত আটটার দিকে সিরাজুদ্দিন গলির মোড়ে গিয়ে হাঁটাহাঁটি, মোড়ামুড়ি, লুঙ্গি ঝারাঝারি করতে থাকে! মুখে একটা মাস্ক পরা! সমস্ত রাস্তা শুনশান! লগডাউনের ছায়া সমস্ত শহরে! কিছু চ্যাংড়া ছেলে বউ আর খাটাশ কিসিমের বুড়ো ছাড়া অন্য কেউ নেই! কুকুরগুলো ড্রেনে মাথা নামিয়ে জমিনে পশ্চাৎ উঁচিয়ে খাবার খুঁজছে! অভাব ছড়িয়ে গেছে চারদিকে! ঘরে ঘরে চাল বাড়ন্ত! হাত ফাঁকা! কোথাও কোন কাজ নেই! বেশ্যাপাড়াতেও ভিড় নেই! ভাসমান মেয়ে গুলো খিদের যন্ত্রণায় রাজি হয়ে যাচ্ছে অল্প টাকাতেই! সিরাজুদ্দিন সেই ফিকিরেই  আছে! আজ তার মনের মধ্যে আমোদ! একটা বড় দান মেরে দিয়েছে! সরকারের দেয়া গরিবের সস্তা চালের এক ট্রাক চাল তার দোকানে পানির দরে বেঁচে দিয়ে গেছে এক ডিলার! সে শুধু বস্তা গুলো পাল্টে নিয়েছে! আকালের দিনে কিছু কামিয়ে নিতে না পারলে গ্রামে দোতলার কাজটা এবার শেষ করা যাবে না! বড় ছেলেটা স্কুল ছাড়িয়েছে, ছোট ছেলেটাকে মাদ্রাসায় দিয়েছে! এরমধ্যে খবর এসেছে গতমাস বউ আবার পোয়াতি! সিরাজুদ্দিনের অবশ্য ভালো লাগে বউ পোয়াতি শুনে! তার খোয়াব এবার একটা মেয়ে হোক! মেয়ের জন্য মনে মনে নাম সে খোঁজাখুঁজি করছে! গ্রামের মাদ্রাসার বিল্ডিঙয়ের কাজ শুরু হয়েছে! সেখানে দাতাদের একজন সিরাজুদ্দিন! গ্রামে এইটুকু না করলে ইজ্জৎ থাকবে না! লগডাউনের এই সময়ে ভালো ব্যবসা করা যাবে সেটা টের পেয়ে গেছে সিরাজুদ্দিন! 

অনেকক্ষণ হাঁটাহাঁটির পর সিরাজুদ্দিন দেখে যাত্রী ছাউনির অন্ধকারে একটা মেয়ে ঘুরঘুর করছে! বোরকা পরা! সিরাজুদ্দিনের বুঝতে দেরি হয়ে না! সে দ্রুত ওদিকে এগিয়ে গিয়ে ইশারা দেয়! পুলিশ এসে গেলে ঝামেলা আছে! মেয়েটা সিরাজুদ্দিনকে পেয়ে যেন সমুদ্রে একটা আস্ত গাছের টুকরো খুঁজে পাওয়ার মতো স্বস্তি পায়! মেয়েটা জানে এই বুড়ো হাবড়া গুলোর লালচ সবচে বেশি! এদের চোখ শরীর লাগলেই ঝরতে শুরু করে! খেলার মাঠে গিয়ে সামান্য লোফালুফি করে হুমড়ি খেয়ে  পড়ে! 

বড় বাজারের পাশের এই পাড়ায় বাজারের লোকেরা ভাড়া থাকে বেশি! রাতবিরাতে মেয়েছেলের কণ্ঠ শোনা গেলে কেউ কিছু মনে করে না! কখনো কখনো কিশোরদের গোঙানিও শোনা যায়! মেয়েটাকে যখন ঘরে নিয়েসলো সিরাজুদ্দিন মেয়েটার চেহারা দেখে তার শরীরের মধ্যে ঝিমঝিম লাগে! মেয়েটার সাথে সিরাজুদ্দিনের কথাবার্তা শুরু হয়...

- নাম কি?
- বিউটি!
- আগে দেখি নাই এই মোড়ে! কোন দিকের তুই?
- তা দিয়া কাম কি! চোদার কাম চুইদা পয়সা দিয়া দেন!

এই বাক্য শুনে সিরাজুদ্দিন আমোদ পায়! মেয়েদের মুখে অশ্লীল কথাবার্তা শুনতে তার ভালো লাগে! অথচ তার বউটা একটা ভ্যান্দা! তার সামনে মুখ খারাপ করলে উল্টা আল্লা খোদার নাম নিয়ে নিজের দুইগালে হাত ছুয়িয়ে তওবা পড়ে! সিররাজুদ্দিন বলে...

- চোদনের টাইম হইলে খাবি! আগে দুইটা কথা কই!
- কথা বলবার টাইম নাই! আপনের একারে বাটলে আমার পেট বাঁচবো না! আরও কাস্টমার  লাগবো! আকালের দিনে সব মোল্লা হইসে! কাছে গেলে কয় ভাইরাস! দুইদিন আগেও যে ঠাপায় গেলি তহন ভাইরাস লাগে নাই?
- তোরে পছন্দ হইসে! তুই রাজি থাকলে একটা কাজ দিতে পারি! আমার রান্ধার কাজ! রোজ রাইতে আইসা রাইন্ধা দিয়া যাইতে পারবি? টেকা পাবি!
- শুধু রান্ধা নাকি কামও করবেন?
- ঐ হইলো আর কি!
- বুঝছি! রান্ধার কাম আমি করি না!  রান্তে গেলে সবাই ঠাইসা ধরে! তার থিকা এইটাই ভালো!
- দুই কাজের জন্য দুইরকম টেকা পাবি! রাজি?
- বাংলায় কন রোজ লাগবো আপনের আমারে।  কামের বেটি অফ তাই তো?
- হ!
- বুঝছি! পরে ভাইবা বলি! এহন কি করবেন করেন।  বাইরে পুলিশ! আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারবো না! আর রাখতে হইলে পুরা রাইতের টেকা দিয়া রাখতে হবো!
- ভ্যাজরভ্যাজর কম কর মাগী! টেকা পয়সা কোন বিষয় না! আড়ৎদার আমি! কারে কেম্নে কিনতে হয় জানি! এইদিক আয় তোর বাস্না নিই!

মেয়েটাকে সিরাজুদ্দিনের ভীষণ ভালো লেগেছে! এইরকম দুঃসময়ে এমন একজন সঙ্গী পাওয়া আমোদের ব্যাপার!  মেয়েটা টাকা নিয়ে যখন বেরিয়ে যাবে তখন সিরাজুদ্দিন বলে, দাড়া এক মিনিট! ভেতর ঘরে বাজারের দোকান মালিক সমিতির উদ্যোগে দরিদ্র কুলিদের দেয়া ত্রাণের থেকে কয়েকটা ছোট বস্তা সে রেখে দিয়েছিলো তার নিজের লোকদের জন্য! সেখান থেকে একটা বস্তা এনে দেয় মেয়েটার হাতে! সিরাজুদ্দিন বলে, না খায়া থাকলে আসিস আবার, এখন এইটা নিয়া যা!  ক্ষুধার্ত মেয়েটা এবার কিছুটা টসে যায়! সিরাজুদ্দিন টের পায় চাল খেয়েছে কবুতর!

১৬ এপ্রিল ২০২০


________________


দুঃস্বপ্ন



বস্তিতে এক ট্রাক ত্রাণের চাল হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে! ক্ষুধার্ত বস্তিবাসী ক্ষেপে গিয়ে ঘিরে ধরে ট্রাকটা, আরেকটু হলেই তাদের ঘরের বেড়া ভেঙে চাপা দিতো! ড্রাইভারকে বস্তিবাসীরা জিজ্ঞাস করে...

- আচোদা লোক নাকি? আরেকটু হইলে তো গেছিলাম আমরা!
- মরেন তো নাই! আমি সামছু ড্রাইভার! হেল্পারেরা কয় কোপা সামছু ওস্তাদ! আমি ট্রাক চালাই না উড়াই!
- রাখেন মিয়া! সামছু চোদার টাইম নাই! পেটে খিদা!
- এই তো লাইনে আইছেন! নেন! বস্তা গুলান নামায় নেন! 
- বস্তায় কি?
- খুইলা দেহেন!
- নাহ! বস্তা খুলবো আর চোর বইলা ফাঁসায় দিবেন! এইগুলান নির্ঘাত চুরির চাইল, আমাগোর কান্ধে সাঁটায় দিতে আনছেন!
- নারে ভাই! খুইলাই দেখেন ভিত্রে মানুষ আছে! চাইল নাই!
- মানুষ দিয়া করবো কি আমরা? মানুষ কি খাওয়া যায়?
- হে হে! দামি কথা! কিন্তু না খুললে তো বুঝবেন না! দেখেন না কি মাল নিয়াসছি! পাইলে খুশি হবেন! আমি আপ্নাগোরই লোক!

বস্তিবাসীরা দ্বিধায় পরে যায়! তাদের মধ্যে একজন অতি সাহসী ট্রাকে উঠে যায়! একটা বস্তার সেলাই করা মুখ খুলেই চিৎকার দিয়ে বস্তাটা নিচে ফেলে দেয়! বস্তায় বন্দি একজন চাল চোর! সবাই দেখে হাতপা গুড়ো করে থ্যাঁতলানো একজন চাল চোর কাৎরাচ্ছে! ড্রাইভার সামছু তার পান খাওয়া লাল মুখ খুলে বলে...

- নেন বস্তা গুলান নামায় নেন! সব গুলাতে চাইল চোর আছে! রান্না কইরা খায়া ফেলান!

বস্তিবাসী খিঁচ মেরে যায়! তারা ভাবে ড্রাইভার লোকটা রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতিয়ার এবং এটা নির্ঘাত কোন খেলা! তারা জলদি দুঃস্বপ্ন ভেঙে জেগে ওঠে এবং টের পায় ঘরে চাল নেই, কোথাও কোন চালচোর ভর্তি ট্রাক আসে নাই! 

১২ এপ্রিল ২০২০

____________________


মহল্লার কোয়ারেন্টাইন


মহল্লার লোকেরা ঘরবন্দি থাকবার ফরমান মানে না, ফলে তারা গলিতে ঘুল্লি খেয়ে আড্ডা মারে; ফলে একদিন পুলিশ সাদা পোশাকে বাইক নিয়ে এসে মোটা বেত দিয়ে পিটিয়ে সবার পাছা কালো করে দিয়ে যায়...ফলে পোলাপাইনেরা পাছা ডলতে ডলতে ঘোঁট পাকায়া এবং কয়...

- প্যান্ট খোল দেহি! 
- ইহ্‌! প্যান্ট খুলবো ক্যা?
- দেখবো কেমন কালা হইসে!
- নিজেরটা দেহেন!
- দেখছি! তোরটা দেহি!
- আমি হাতদিয়া দেখছি ফুইলা উঠছে!
- আহা! দেহি না!
- নাহ! বাড়ি গিয়া আয়নায় নিজেরটা দেইখেন!
- বাড়ি যাওয়া লাগবে না, কায়দা কইরা দেখছি! 
- কেম্নে ভাই?
- চিপায় গিয়া মোবাইলে ফ্লাস মাইরা ছবি তুইলা দেখছি!
- মেসেঞ্জারে পাঠান দিহি দেহি কেমুন কালা হইসে!
- চুপ হারামি!
- হে হে! তয় আপনে প্যান্ট খুইলা আমারে দেহাইলে আমিও দেখাইতে রাজি!
- ইচ্ছা করতেছিল পুলিশ গুলানরে ইট দিয়া ভোঁতা কইরা দি!
- হ দেখছি! পুলিশের সামনে তো মিউমিউ করলেন!
- চুপ!
- খালি পারেন আমাগোর লগে!
- চুপ হারামি!
- আপনের আব্বারে তো পুলিশ গাইল দিসে! হ্যায় নাকি পুলিশরে কইসে দেইখা নিবো!
- ঠিকই কইসে!
- কেম্নে দেখবেন ওস্তাদ! দোষ তো আমাগোর!
- তুই চুপ যা হোলপাকা! 
- চলেন ভাই মোড়ের দিক যাই!
- ক্যান?
- আর্মি আসছে নিকি! সবাইরে ঘরে যাইতে মাইকিং করতেছে!
- অ!
- চলেন যাই!
- ক্যান?
- আর্মি দেইখা আসি! কি মেশিন কান্ধে কইরা আনছে সেইগুলান দেইখা আসি!
- নাহ!
- ক্যান ভয় খাইছেন? 
- লাত্থি খাবি হারামি!
- হি হি!
- রিলিফের চাইল ডাইল আসলে তোর গুষ্টির নাম কাইটা দিবো আব্বারে বইলা! আমার সাথে গোস্তাখি?
- সরি ভাই! মাফ কইরা দেন! ইয়ার্কিতে বুঝতে পারি নাই!
- ইয়ার্কি কার সাথে করস? ফকিন্নির বাচ্চা!
- বেশি বইলেন না, আল্লা খোদার নাম নেন! পুলিশের ঐ লাঠিতে করোনা ভাইরাস থাকলে ফকিন্নির পুত আর বড়লোকের পুত দুইজনেই শ্যাস! 
- কি কস?
- হ ভাই! কিন্তু একটা জিনিস জানা দরকার করোনা ভাইরাস পাছা দিয়া প্রবেশ করতে পারে কিন!
- তুই কি ইয়ার্কি মারতাছস নাকি সিরিয়াস?
- সিরিয়াস!
- তাইলে খোঁজ নেই ফোন দিয়া?
- নাহ থাক! সন্ধ্যায় নিয়েন!
- হু! বিড়ি ধরা! চল যাই মোড়ে আর্মি দেইখা আসি!

তারা দুইজন বিড়ি ভাগ করে খেতে খেতে মোড়ে গিয়ে আর্মির হাতে ধরা খায়, আর্মি তাদেরকে মুর্গি বানায়ে রাখে, ফলে মুর্গি অবস্থায় তাদের আলাপ...

- ভাই কেমুন লাগতেছে?
- চুপ হারামি! তোর জন্য ঘের খাইলাম!
- হি হি! আমার কিন্তু ভালোই লাগতেছে!
- চুপ!
- স্কুলের জীবনের কথা মনে হইতছে! স্যারেরা এমুন শাস্তি দিতো!
- তরে কপালে বাটা আছে, মহল্লায় ফিরা নিই!
- আমারে বাটলে কিন্তু সবাইরে বইলা দিবো আপনারে আর্মি মুর্গি বানায় রাখছিল!
- আচ্ছা বাটা বাদ! তয় কথা কিন্তু সত্যি, আমারও স্কুল জীবনের কথা ইয়াদ আসতেছে! লাইন দিয়া মুর্গি বানায় থুইত স্যারেরা! আর জাউরা গুলান চান্স পাইলে হোলে খোঁচা দিতো! আহারে কি সুন্দর দিন ছিল!!! 

০৭ এপ্রিল ২০২০

______________________


ফাঁদ


একটা মরা কুকুরকে কয়েকটা কাক ছিঁড়ে খাচ্ছে, ফলে একটু দূরে বসে থাকা একজন ক্ষুধার্ত মানুষ চিন্তা করতে লাগলো, কাক গুলোকে ধরার জন্য সে কুকুরটার মতো মরে পড়ে থাকবে!

১৪ এপ্রিল ২০২০


______________


বাঘে পাওয়া



শোনা যায় সুন্দরবন থেকে একটা মানুষ খেকো বাঘ লোকালয়ে এসেছে গত দুদিন আগে! খাদ্যাভাবের এই দিনগুলোতে মানুষ যখন ত্রাণ যোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে তখন বাঘ লোকালয়ে নেমে আসাটা কিসের ইঙ্গিত? বাঘের খাবারও লুট করে নিচ্ছে চোর মজুদদারেরা? সাধারণ লোকেরা এসব নিয়ে চিন্তিত হয় না কেননা তারা বাঘের চেয়ে বেশি চিন্তিত থাকে মহামারীর মধ্যে খাবার চাল যোগাড় করতে! কিন্তু একে একে খবর আসতে থাকে চারদিকের গ্রাম এবং শহরে বাঘের হানায় বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী, নেতা, চালের ডিলার, মজুদদার মারা পড়েছে! কোথাও কোথাও শিকার হওয়া তাদের লাশের ছিটেফোঁটা খুঁজে পাওয়া যায় নি! ফলে জীবিতরা আতঙ্কে দিন কাটাতে থাকে! তারা লগডাউনের মধ্যে নিরাপত্তা চায় সরকারের কাছে! কিন্তু হত্যা ঠেকানো যায় না! বাঘ তো মানুষ না যে রাষ্ট্রের কানুন মানবে! ফলে, যখন তখন বাঘ যেখানে সেখানে হুঙ্কার দিয়ে ওঠে! এরকম চলতে থাকে বেশ কিছুদিন।  ফলে, ঐ অঞ্চলে বাঘের হাতে মারা পড়ে গোটা তিরিশেক এবং বাঘের বদৌলতে আচানক চালের সুষম বিক্রিবণ্টন হয়! কিন্তু বাঘটাকে খুঁজে পাওয়া যায় না!

মহামারী শেষ হলে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করা হয়! যার ফলাফল হিসেবে অনেকদিন পর জানা যায়, মহামারীর ঐ সময়ে ঐ এলাকার সবার মোবাইলের রিংটোন ‘বাঘের হুঙ্কার’ ছিল, এবং ঐ সময়ে ঐ অঞ্চলের লোকদের বাঘে পায়!

২২ এপ্রিল ২০২০


_______________________


বাঙ্গিকৃষি


দিলু একজন বাঙ্গি চাষি! সফল বাঙ্গি  চাষি হিসেবে মেডেল পাওয়ায় গতবছর তার ক্ষেত এবং তাকে সরকারী টেলিভিশনের কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠানে দেখানো হয়েছিল! তারপর থেকে এলাকায় তার নামডাক বদলে গেলো! স্টার চাষা হয়ে উঠলো সে, কেনোনা টেলিভিশনের সেই অনুষ্ঠানে জানানো হয়েছিল, দেশের আশু বাঙ্গি বিপ্লবের প্রধান সৈনিক দুলু! বিদেশি এক এঞ্জিও এসেছিল এদেশের জনপ্রিয় সব ফলের উপর একটা ডকুমেন্টারি বানাতে, যেখানে দিলুর সুযোগ হল বাঙ্গি বিষয়ক কথা বলার।  ফলে গ্রামের টকিজ দেখা দুষ্ট ছেলেপেলেরা দিলুর নাম দিয়ে ফেললো, বাঙ্গিম্যান! দিলু অবশ্য এইসব নিয়ে ভাবনা থাকে না, সে স্বপ্ন দেখে জীবনটা বাঙ্গিময়, দুনিয়াটা বাঙ্গির ক্ষেত! আর তার ক্ষেতের বাঙ্গি দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে! সমগ্র দুনিয়ার প্রধান ফলের নাম হয়ে উঠবে একদিন বাঙ্গি! কিংবা তার গ্রাম বা দেশের নাম হবে বাঙ্গিস্তান! স্বপ্নের তো মা বাপ নেই তাই এইসব ভাবনা বউয়ের সঙ্গে আলাপ করতেও খারাপ লাগে না যদি গেন্দুলির মতন বউ পাওয়া যায়! কেননা এইসব বিশ্বাস আর স্বপ্নের পর তার বউ গেন্দুলি বলে, লোকটা একটু আউলা হলি কি হবে দাদা মানুষটা একেবারে বাঙ্গির মতন খাঁটি! গেন্দুলি বাঙ্গির তরকারী রান্নাবান্নার বিভিন্ন কলাকৌশল আয়ত্ব করে রেখেছে! যেহেতু শহর থেকে সাহেবরা আসে বাঙ্গি  চাষবাস বিষয়ে নাড়াচাড়া করতে, তখন চান্স পেলেই গেন্দুলি জানিয়ে দেয় বাঙ্গি শুধু ফল হিসেবে নয় সব্জি হিসেবেও খাওয়া যায়! গেলো বছর দিলু যখন বিখ্যাত হয়ে উঠলো, তখন ডিসি সাহেবকে একদিন বাঙ্গির কয়েকটা পদ রান্না করে খাওয়ানর সৌভাগ্য হয়েছিল গেন্দুলির! সেই ছবি এখনো তাদের ঘরে বাঁধানো! এবার দ্বিগুণ চমক দিতে দিলু টাকা লোণ নিয়েছিলো এবং নিজের ক্ষেতের পাশের কয়েকটা ক্ষেত লিজ নিয়েছিলো নিজে হাতে বাঙ্গি ফলাবে বলে! কৃষি অধিদফতর থেকে কর্মকর্তারা এসে কয়েকদফা খোঁজ নিয়ে গেছে! এবারও তার ক্ষেতকে মডেল হিসেবে তারা চিহ্নিত করেছে, একটা সাইনবোর্ড পুতে গেছে! কিন্তু আচমকা মহামারী এসে পড়ায় সবকিছু উলটপালট হয়ে গেছে আচমকা! দিলু টের পেয়ে গেলো ফলন ভালো হলেও বাজার পাওয়া যাবে না! মানুষ ভাত খেতে পাচ্ছে না যেখানে সেখানে বাঙ্গি খাবে কোন দুঃখে? তার মধ্যে একদিনি গেন্দুলি জানালো, গত বছরের সাফল্যের উত্তেজনায় সেও ফলবতী! দিলু হিসেব কষে দেখল, সিজন শেষে বাঙ্গি বিক্রির পর হাতে নগদ টাকা থাকতো আর সেই গরম হাতের মধ্যে বাচ্চাটা জন্মাত! কিন্তু এখন কি হবে তার? আকালের মধ্যে বাচ্চাটা ট্যাঁ ট্যাঁ করবে?

ক্ষেতের যত্ন নেয়া ছেড়ে দিলো দিলু! টাকার অভাবে ক্ষেতের যত্ন নিতে পারছে না এই বলে যদি কিছু টাকা পয়সা পাওয়া যায় কৃষি অধিদপ্তর থেকে কিংবা কোন সাহায্য সংস্থা থেকে! কিন্তু কেউ এগিয়ে এলো না! কারোর দেখাই পাওয়া যাচ্ছিলো না! ফোন দিলে সবাই বিরক্তি নিয়ে জানাত, তুমি কি নির্বোধ এই অভাবের দিনে বাঙ্গি চাষ নিয়ে আছো? সে যদি বলতো, স্যার আমি মেডেল পাওয়া চাষি! এবার ফসল নষ্ট হয়ে গেলি মাঠে মারা যাবো! তখন ফোনের ওপাশ থেকে শোনা যেত, মেডেল ধুয়ে পানি খাও! ফলে দিলুর বুঝতে দেরি হয় না বাজার ব্যবস্থা একজন কৃষককে কেন মেডেল দেয় এবং কেন তার মৃত্যুতে ‘আহারে’ বলে উঠে একমিনিট নীরবতা যাপন করে! 

গেন্দুলির পেট ফুলে উঠতে থাকে যতো দিলুর মানুষিক চাপ বাড়তে থাকে ততো! লিজ নেয়া ক্ষেত গুলোয় যত্ন নেয়া ছেড়ে দিলেও ভালো ফলন হয়! দিলুন মনে সামান্য আলোর ইশারা জাগে! হয়তো অর্ধেক দাম পাওয়া যাবে! কিন্তু ফড়িয়ারেরা যখন আসে বাঙ্গি কিনতে, মহামারীর ওজুহাতে একেবারে নামমাত্র মূল্য দিতে চায় বাঙ্গির! দিলু টের পায়, এই টাকায় বাঙ্গি বিক্রি করে দেয়া আর মাঠ পরিষ্কার করা এক কথা! তারচেয়ে মাঠের ফসল মাঠে পচুক! লোকে বলে, তুই বাঙ্গি বেচতিছিস না ক্যান দিলু? দিলু বলে, দাদনের টাকা তো শোধ দিতি পারবো নানে! তারচাইয়ে বাঙ্গি গুলো পইচে সার হোক, কাজে দেবেনে আগামী বচ্ছর!

একদিন বিকেলে গেন্দুলির চেঁচামেচিতে আশপাশের লোকেরা তাদের বাড়িতে এসে দেখে, দিলুর মুখ দিয়ে গেজলা বেরোচ্ছে! এই দৃশ্য তাদের চেনা! দিলু কীটনাশক খেয়েছে! মৃত্যুকে কণ্ঠনালী দিয়ে পাচার করে দিয়েছে সে মহামারী কিংবা ঋণের টাকা অথবা প্রতিভার মিথ্যা মূল্যায়নে মেডেল নামক ভুজুংভাজুং হজম করতে না পেরে! কিন্তু কেউ তাকে হাসপাতেলে নিতে এগিয়ে আসে না! সবাই বলে, হাঁসপাতাল যাবে কিডা? ভাইরাসে গিজগিজ করতিছে হাঁসপাতাল! একজন কেউ বলে, দিলু কাকা কি এন্ডিন খাইচে নাকি করোনা ভাইরাস? ফলে সাবাই দ্রুত সটকে পরে ভাইরাসে কথা শুনে! সেদিন সন্ধ্যায় গেন্দুলি যখন ঠোঁটে জল দিচ্ছিল হরিনাম ডাকতে ডাকতে! তখন একবার শুধু দিলু বলে ওঠে, আমি মরলি চিতে দিস নে, মাটিও না; ক্ষেতে দিস, পইচে সার হবো!

ফলে, 
গেন্দুলির মতন বউ যার থাকে, তার আত্মহত্যা করেও শান্তি হয়! কেননা পরদিন দেখা যায় দিলুর বাঙ্গি ক্ষেতের ঠিক মাঝখানে একদল শকুন এসে ভিড় করে! লকডাউনের এই সময়ে শকুনেরা নির্ভয়ে খেতে থাকে একজন মেডেল পাওয়া বাঙ্গি চাষির শরীর! তারপর থেকে শোনা যাবে বাঙ্গি ক্ষেতে কাকতাড়ুয়া দেয়া লাগে না কেনোনা, বাঙ্গি ক্ষেতে দিলুর ভূত পাহারা দেয়! আর গেন্দুলি মনে মনে ঠিক করে ফেলে তার ছেলে সন্তান হলে নাম রাখবে, বাঙ্গি আর মেয়ে হলে নাম রাখবে, ফুটি! পরের বছর ঐ এলাকায় বাঙ্গির ফলন তুমুল হয়! সবাই বলে, দিলু যে সার দিয়ে গেছিলো এইটে তার কেরামতি! কিন্তু দিলুর মৃত্যু রহস্যের কোন কিনারা হয় না! মহামারীতে নিরন্নতার অভিশাপে সে মারা গেলো, ঋণ শোধের আতঙ্কে নাকি পুরোটাই রাষ্ট্রির ব্যবস্থার ব্যর্থতায়? এর উত্তর খোঁজার উপায় থাকে না, কেননা, গেন্দুলিকে কৃষি অধিদপ্তর সোনার মেডেল দেয় শ্রেষ্ঠ বাঙ্গিচাষি হিসেবে! গেন্দুলি ভেবে পায় না মেডেল তাকে কেন দেয়া হল? সে বাঙ্গি বা ফুটি নামের সন্তান প্রসব করেছে বলে? তাহলে কি আগামী বছর সেও মেডেল পাওয়ার অভিশাপে আত্মহত্যা করবে তার স্বামীর মতন?

১৩ মে ২০২০


_______________________


মাইক


জনগণ যেহেতু সকল ক্ষমতার উৎস সেহেতু তথ্য জানা জনগণের অধিকার! এই বাক্যটা রাষ্ট্র বিশ্বাস করে বলেই জনগণের কাছে কোন তথ্য গোপন করে না! ভেতর এবং বাইরের সব কিছু সে জানিয়ে দিতে পছন্দ করে! কেননা সততাই একমাত্র শক্তি যা সরকারকে সুস্থ রাখে! ফলে মহামারী নিয়ে যখন প্রচার মাধ্যম গুলোতে সাংঘর্ষিক তথ্য প্রচার হতে লাগলো! আর জনমনে বিভ্রান্তি জন্মাতে শুরু হল তখন সরকার সকল অপপ্রচার নিরাময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করলো! সত্য এবং সঠিক তথ্য প্রচারের জন্য সরকার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে প্রত্যেক শহরে, গ্রামের সাতটা যায়গার একটা করে বেদি নির্মাণ করলো! বেদিটাকে একচালা টন শেড দিয়ে আচ্ছাদিত করলো, চারদিকে ফাঁকা! টিনের চালের উপর সরকারের লোগোবাহী একটা সাইনবোর্ড যেখানে লেখা, ‘সরকারী মাইক’ ।  বেদিতে একটা শক্ত খুটো পুতে রাখা! জনগণ অপেক্ষায় থাকলো ব্যাপারটা কি? মাইক লাগাতে শেড দেয়ার কাজ কি? যেহেতু সরকার কোন বিভ্রান্তি পছন্দ করে না সেহেতু সে এই ভ্রান্তিও দূর করে দিলো! দুদিন পর দেখা গেলো, টিন শেডের নিচে খুঁটোয় বাঁধা একটা করে গাধা! শহরে এবং গ্রামের সাতটা পয়েন্টে একটা করে গাধা বেধে দিলো সরকার! তিনবেলা কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা এসে খাবার দিয়ে যেতে লাগলো! একদিন বেশ হইচই করে ব্যান্ডপার্টি এনে বাজনা বাজিয়ে লাঠি ঘুরিয়ে উদ্বোধন করা হল ‘ সরকারী মাইক’! 

এরপর থেকে দরিদ্র, উন্নত দরিদ্র বা অনুন্নত দরিদ্র কিংবা নিকৃষ্ট দরিদ্র মানুষেরা প্রত্যেক দিন বেদির চারপাশে এসে বসে থাকতো খবর শুনতে! গাধা কখনো কখনো কাঁদত, কখনো কখনো হাসত, কখনো কখনো বিড়বিড় করতো, কখনো কখনো হেঁচকি তুলত! কিন্তু জনগণ এইসবের কিছুই বুঝতে পারতো না! কেননা গাধার ভাষা মানুষ তখনো শেখে নি! কিন্তু মানুষ যে অসীম প্রতিভা নিয়ে জন্মেছে তার প্রমাণ কিছুদিনের মধ্যে টের পাওয়া গেলো! গাধার হাসি, কান্না হেঁচকি কিংবা বিচিত্র মুখভঙ্গিমা থেকে শারীরিক বিচিত্র মুদ্রার লক্ষণ অনুবাদ করে একটা ভাষা আবিষ্কার করে ফেললো এইসব মানুষেরা! গাধা যদি হাসত তাহলে জনগণ বলতো, আইজকা পরিস্থিতি ভালো! মউতের সংখ্যা কম! গাধা যদি কাঁদত জনগণ, বিড়বিড় করে বলতো আহারে অবস্থা ভয়ঙ্কর, মউতের সংখ্যার বেশি! গাধা যদি হেঁচকি তুলত তাহলে জনগণ বলতো, পরিস্থিতি মোটামুটি, তয় ভালোর দিকেই মনে হয়! তবে মানুষেরা সন্তুষ্ট হতে শুরু করলো কেনোনা বেসরকারি সংবাদ মাধ্যম গুলোর কণ্ঠনালী চেপে ধরা হয়েছিল, আর গাধা গুলোর ছিল হেঁচকি তোলা রোগ! ফলে সবাই হেঁচকি খেতে লাগলো, ‘ পরিস্থিতি মোটামুটি, তয় ভালোর দিকেই মনে হয়!’

কিন্তু কিছুদিন পর ভিড় কমে আসতে শুরু করলো! মৃত্যুর সংখ্যা নজরে পড়তে লাগলো! জনগণ সংবাদের জন্য গাধার কাছে যাওয়া কমিয়ে দিলো! কেননা অভাব তুমুল বেড়ে গিয়েছিলো, সকলেই থাকতো চাল যোগাড়ের ফিকিরে! তবে সদয় সরকারের সংবাদ পৌঁছে যেত তখন দুয়ারে দুয়ারে, কেনোনা জনগণের মধ্যেই গাধা জন্ম নিচ্ছিল! সরকারের কট্টর সমর্থক যারা ছিল তারা প্রত্যেকে গাধামাইক হয়ে উঠতে লাগলো! তারা বলতো, পরিস্থিতি মোটামুটি, তয় ভালোর দিকেই! 

১৪ মে ২০২০


_______________________


মহিষ


গ্রামে অতিকায় এক মহিষ হাজির হল, বিরাট বাঁকানো শিঙ তার! কোত্থেকে মহিষটা এলো তা জানা নেই! লোকেরা ভাবল, মহিষটা আশীর্বাদ! মহামারী ভাইরাসের নিদান হিসেবে সে এসেছে! লোকেরা বলতে লাগলো মহিষটাকে ছুঁতে পারলে তাকে আর স্পর্শ করবে না মহামারীর ভাইরাস! ফলে নিরীহ মহিষটা বিপাকে পড়ে গেলো সবাই দৌড়ে এসে তার স্পর্শ করতে লাগলো! খাবার দিতে লাগলো যাতে মহিষটা থিতু হয় এবং বাড়ি শুদ্ধ লোকেরা তাকে ছুঁতে পারে! গভীর রাতে এক ভাইরাস আক্রন্ত রোগী মহিষটাকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো যেন তার অসুখটা সে নিয়ে নেয়! ফলে কিছুদিনের মধ্যে গ্রামের সবাই ঐ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মরতে শুরু করলো! 

মহিষটা হাঁটতে হাঁটতে পাশের গ্রামে ঢুকল যেদিন সেদিন ঐ গ্রামের সবাই গ্রাম ছেড়ে পালাল! তারা বলাবলি করলো, মহিষের রূপ ধরে ভাইরাস এসেছে কিংবা যমদূত মহিষে চড়ে এসেছে সবাইকে তুলে নিতে! মহিষটা জনহীন গ্রাম ছেড়ে হাঁটতে হাঁটতে তার পাশের গ্রামের দিকে গেলো!

১৬ মে ২০২০


_____________________


হাঁসগুলো হাওয়া হয়ে গেলো


শেয়ালবন নাম কিন্তু বন ভর্তি ছিল হাঁস! হাঁস মানেই প্যাঁকপ্যাঁকানি! হাঁস মানেই ইলিংবিলিং! চমৎকার একটা ম্যাড়ম্যাড়ে নদী, লম্বা দুটো বিল জঙ্গলের একদিকে! মানুষ্যবিহীন এক হাঁস দুনিয়া! হাঁসেরা খেয়ে দেয়ে নেচে গেয়ে, তুমুল প্যাঁকপ্যাঁক করে, গণ্ডায় গণ্ডায় ডিম পেড়ে, বাচ্চা ফুটিয়ে আমোদে জঙ্গল ভরিয়ে ফেলতো! থৈ থৈ উৎসব ছিল জীবনে, যখন তখন প্যাঁকপ্যাঁক করে ওঠা যেত; হোক সে আনন্দে কিংবা দুঃখে অথবা তুলকালাম বিষাদে! এক মহান সঙ্গীতজ্ঞ হাঁস এমন এক উদ্ভট সুরেরা আবিষ্কার করেছিলো যেই সুরে হাঁসেরা যখন প্যাঁকপ্যাঁকি গান গাইত তখন বোঝার উপায় থাকতো না গাতক হাঁসটার অন্তরে ব্যথা নাকি আনন্দ নাকি হিজিবিজি! এই সুরটার নাম হাঁসেরা দিয়েছিলো, বেহুদা সুর! এই সুরের গান গুলোকে বলা হতো, বেহুদা সঙ্গীত! জন্ম যৌবন মৃত্যুর সিঁড়ির মধ্যে তবু গান ছিল তাদের! অন্তত কারণে অকারণে বেহুদা সঙ্গীত গেয়ে ওঠা যেত! এই বেহুদা সঙ্গীতে জীবন তবু কেটে যাচ্ছিলো ছিমছাম আর উপচে পড়ছিল হাঁসেদের সংখ্যার! 

ওদিকে 
জঙ্গলের বাঘগুলো বুড়ো হয়ে যাওয়ায় শেয়ালেরা ক্ষমতা নিয়ে নিলো! বুড়ো বাঘগুলোকে শেয়ালেরা বলল, শিকার করতে তো এখন আর পারেন না, দাঁত নখ টালমাটাল, আমাদের ক্ষমতা দ্যান; আমরা শিকার করে খাবার এনে দেবো! বুড়ো বাঘেরা রাজি হয়ে গেলো, যেহেতু ভালো দাঁতের ডাক্তার ছিল না জঙ্গলে তাই তাদের দাঁত বাঁধানোর সুযোগও ছিল না! শেয়ালেরা ক্ষমতায় আসার পর তারা দলবেঁধে হামলে পড়লো হাঁসেদের অঞ্চলে! রোজ ডজন ডজন হাঁস মেরে খেতে লাগলো আর বাঘেদের হাঁস খেতে দিলো! বাঘেরা বিরক্ত হয়ে বলল, হাঁস খেয়ে আরাম পাই না, হরিণ টরিন আনো! শেয়ালদের প্রধান বলল, যা দিচ্ছি তাই খান; শেয়াল রাজ্যে বুড়ো বাঘেদের গর্জন চলে না! ফলে বুড়ো বাঘ গুলো বুঝে ফেললো সাড়ে সর্বনাশ ঘটে গেছে! 

এদিকে 
হাঁসেদের জীবনের আনন্দ বেদনা কিংবা দুঃখ উড়ে গিয়ে ভয় নেমে এলো হুড়মুড় করে! খুন হয়ে যাবার ভয়! খাবার হয়ে যাবার ভয়! ফলে হাঁসেদের জীবন থেকে বেহুদা সঙ্গীত উবে গেলো! যেখানেই গান হয়, হাঁসেদের মুক্ত প্যাঁকপ্যাঁকানি শোনা যায় সেখানেই হামলে পড়ে শেয়ালের চোয়াল! শেয়াল গুলো খেতে খেতে হায়েনা হয়ে উঠতে লাগলো দিনে দিনে আর তারা স্বপ্ন দেখতে লাগলো একদিন তারা বাঘ হয়ে উঠবে! 

ওদিকে 
হাঁসেরা সিদ্ধান্ত নিলো আপাতত তারা আর ডাকবে না, গান গাইবে না, বোবা হয়ে থাকবে! ডাকলেই শেয়ালেরা টের পেয়ে যায় তাদের অবস্থান, ফলে সহজেই ধরে ফেলে! কিন্তু একদল হাঁস বলল, ডাকাডাকি, প্যাঁকপ্যাঁকানি আমাদের অধিকার; আমাদের জমিনে আমরা প্যাঁকপ্যাঁক করবোই! কিন্তু ভীতু অন্যসব হাঁসেরা তাদের ছেড়ে চলে গেলো! এদিকে প্যাঁকপ্যাঁক করা হাঁসেদের সংখ্যা দিনে দিনে কমে আসতে লাগলো! কথা বলা, গান গাওয়া হাঁসেরা আর্জি জানালো বোবা হয়ে থাকা হাঁসেদের কাছে যেন তারা সবাই প্যাঁকপ্যাঁক করে! নৈলে একদিন সবাই চিরতরে বোবা হাঁস হয়ে যাবে! কিন্তু কোন হাঁস সাড়া দিলো না তাদের কথায়।  ফলে শেয়ালেরা আমোদের সঙ্গে খেয়ে যেতে লাগলো প্যাঁকপ্যাঁক করা বেহুদা সঙ্গীত গেয়ে ওঠা হাঁসেদের! ঠিক এই সময়ে হাঁসেরা সবাই নতুন সিদ্ধান্ত নিলো তারা এই জঙ্গল ছেড়ে অন্য কোথাও পালিয়ে চলে যাবে! তারা নদী দিয়ে সাঁতরে যাবে যাতে শেয়াল তাদেরকে ধরতে না পারে! ফলে এক পূর্ণিমার রাতে হাজার হাজার হাঁস ম্যাড়ম্যাড়ে নদীর জল বেয়ে জঙ্গল ছেড়ে চলে গেলো তাদের কণ্ঠ বাঁচাতে! আর থেকে যাওয়া সর্বশেষ সবাক হাঁস গুলোকে সাবাড় করে চললো শেয়ালেরা! ফলে দিনে দিনে জঙ্গল হয়ে উঠলো শুনশান! কোথাও কেউ কথা বলছে না, গান গাইছে না! যেন বোবা গাছের এক দুনিয়া! একদিন শেষ সবাক হাঁসটাকে খেয়ে ফেলার পর ক্ষুধার্ত শেয়ালেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো হাঁস যেহেতু নেই তাহলে এবার বুড়ো বাঘ গুলোকে খেয়ে ফেলা যাক! ক্ষুধাও মিটবে আবার গর্ব করে বলা যাবে, বাঘ খাওয়া শেয়াল! 

ফলে,
পালিয়ে যাওয়া হাঁসেরা পালাতে পালাতে ভুলে গেলো বেহুদা সঙ্গীত! দূর কোন দ্বীপে গিয়ে তারা শুধু বেঁচেই থাকলো, কেননা পালাবার সময় তারা সবাই বুকে করে নিয়ে গিয়েছিলো ভয়! 

০৯ মে ২০২০

_______________________


ভুঁইচাপা


সারারাত তুলকালাম ঝড় শেষ হবার পর, ভোরে যখন ফিচফিচে বৃষ্টি হয় আব্দুল জলিল তখন ছাতা নিয়ে বের হয় জঙ্গলের গাছগুলো দেখতে! বের হতেই উঠোনে আব্দুল জলিল দেখে একটা আস্ত মানুষের মাথা পড়ে আছে! যেন ধড় থেকে মাথাটা ছিঁড়ে কেউ ফেলে রেখে গেছে, এখনো রক্ত স্পষ্ট! মাথাটার চোখ পিটপিট করছে! তার মানে মাথায় প্রাণ আছে! আব্দুল জলিল এগিয়ে যায়, মাথাটার কাছাকাছি যেতেই মাথাটা বলে ওঠে, ভালো আছেন জ্ঞানী মানুষ? একটু পানি দেয়া যায়? পিপাসা লাগছে খুব! মাথাটার মাথা ভর্তি দীঘল চুল! আব্দুল জলিল মাথাটার চুল ধরে ঘরে নিয়াসে! কয়েক বছর আগে তার এক বন্ধু এখানে জীবন যাপনের জন্য এসেছিল একটা একুরিয়াম সঙ্গে নিয়ে! মাছ শূন্য সেই চারকোনা একুরিয়ামের কাঁচের মধ্যে মাথাটাকে ফেলে দিয়ে আব্দুল জলিল কয়েক মগ জল ঢেলে বেরিয়ে যায় গাছ গুলো দেখতে!

আব্দুল জলিল তার বাড়ির চারদিকে ছড়ানো জমিতে বিচিত্র গাছ লাগিয়ে জঙ্গল সাজিয়েছে, গ্রামের লোকেরা এখন ডাকে জঙ্গল বাড়ি! আব্দুল জলিল এই বিরাট জায়েদাদ নিয়ে থাকেন।  এবং আছেন এক তরুণী, গ্রামের দুষ্ট লোকে বলে এই মেয়ের সঙ্গে আব্দুল জলিলের ফষ্টিনষ্টি!

আব্দুল জলিল তার ‘নবরাষ্ট্র কাঠামো’ প্রকল্প ভাবনার জন্য এইখানে তার জ্যান্ত মাজার স্থাপন করেছিলেন!  আব্দুল জলিল ঝিম মেরে থাকতে পছন্দ করেন বলে হয়তো গাছপালা নিয়ে থাকেন, তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন  নবরাষ্ট্র কাঠামো ভাবনার বিবিধ দিক দর্শন, আলাপ বিলাপ বৃক্ষদের সাথে! সম্ভবত বৃক্ষদের জবান গণমাধ্যম শুনতে পায় না এটা তার জন্য আপাত সুখকর! তার একরোখা জীবনের মধ্যে আচমকা একটা মাথা উড়ে এসে পড়ায় নতুন তরঙ্গ হবার কথা! কিন্তু আব্দুল জলিল নিরাসক্ত ভাবে মাথাটাকে ঘরে তুলে নেয়! 
আব্দুল জলিল বিদেশ থেকে আচমকা দেশে ফিরে আসেন নাড়ীর টানে কিংবা গণহিতসাধনের বাসনা নিয়ে, কেনোনা তিনি একরাতে খোয়াবে দেখেন, কার্ল মার্কসের ছবিতে একটা ছোরা বসানো আর ঠিক তার পাশের ফ্রেমে তার একটা বিরাট ছবি! ফলে দেশে ফিরে তিনি এই বিরাট ভূমি ক্রয় করেন! রাজধানীতে তিনি জানান দিয়ে আসেন তার দেশে থাকা কালীন পুরানা অনুসারীগণের মধ্যে যে, এই রাষ্ট্র কাঠামো ভুয়া! চাই একটা নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থা! তরুণেরা চিরকাল আগুন ভালোবাসে বলেই সময় লাগে না আব্দুল জলিলের ইশারায় লাফিয়ে উঠতে অগ্নি শিখাদের! ‘রাজধানী ছাড়’ নামে আহ্বান তরুণ চিন্তকদের জলে ঢিল ছুঁড়ে তরঙ্গ তোলে! ফলে তারা দলে দলে নেমে আসতে থাকে আব্দুল জলিলের এই গ্রামে! আব্দুল জলিল তার অতি মেধাবী তরুণ বন্ধুদের জন্য এই বাড়ির ভেতরে সারি সারি কুঠুরি বানিয়ে দেন! সেইসব ঘরে ঘরে আব্দুল জলিলের যুবক যুবতী বন্ধুরা স্বসঙ্গি বসবাস এবং তত্ত্ব চর্চা শুরু করে! সন্ধ্যায় বসে, ‘ভাবনা আলাপ’ নামে আসর যেখানে প্রত্যেকে নির্ধারিত বিষয়ে তাদের ভাবনা উপস্থাপন করেন! এই অংশে সবাই মৌন হয়ে একে একে সকল আলাপির আলাপ শোনেন! এর দ্বিতীয় অংশের নাম ‘ তর্ক বাসর’ এই অংশটা ছিল দুর্দান্ত! এখানে সবাই একে অপরকে ছিঁড়ে ফেলে নির্দয় তর্ক দিয়ে! এর থেকে নির্যাস নিয়ে আব্দুল জলিল তার ভাবনাকে যোগ বিয়োগ দিতেন! এবং ফলাফল গুলো নবরাষ্ট্র কাঠামোর মুখপাত্র ‘নবচিন্তায়’ মুদ্রিত হয়ে সমগ্র দেশের তরুণ বুদ্ধিকারদের মধ্যে একটা হুল্লোড় তুলত! গ্রামের লোকেরা যদিও আব্দুল জলিলের এই কীর্তি নিতে নারায হয়ে ওঠে! কেননা তারা আব্দুল জলিলের এই বিদ্রোহের সূতিকাগারকে বলে, বেলেল্লাখানা! আব্দুল জলিলের কিছুই ছিঁড়তে গ্রামের লোকেরা পারে না কেননা তিনি বিদেশ থেকে যেই সুতা বেয়ে এসেছেন এখানে সেই সুতার মাঞ্জায় যথেষ্ট ধার! ফলে আব্দুল জলিল আরেক কাণ্ড ঘটান এবার! তিনি তার শিষ্যদের অনুরাগি শিষ্যদেরকে আনতে শুরু করেন এবং তাদেরকে এই বাড়িতে ঠাঁই না দিয়ে ছড়িয়ে দেন গ্রামে! গ্রামের মধ্যে তারা থাকতে শুরু করে এবং সন্ধ্যায় আব্দুল জলিলের বাসায় আয়োজিত চিন্তা ভাবনার মজমায় জমায়েত হয়ে শূন্য ভান্ড পূর্ণ করে নিয়ে জীবন যাপন করতে থাকে গ্রামে! ফলে তাদের জীবন যাপনে নব চিন্তার ছিটেফোঁটা থাকায় সেইগুল চুয়িয়ে চুয়িয়ে পড়তে থাকে গ্রামের মাটিতে এবং গ্রামের লোকদের সাথে তাদের বিবাদ লাগতে শুরু হয়! ব্যাপারটা আব্দুল জলিলকে আনন্দ দেয় কেননা, তিনি টের পান যে তার বাহিনীর কাজ জমিনে ছড়াতে শুরু করেছে! ‘বিবাদ থেকেই আবাদ!’ এই ফর্মুলা দিয়েছিলো তার এক শিষ্য! এই ছেলের নাম বিহঙ্গ! এটা তার ছদ্দ নাম! মূল নামের বিলুপ্তি ঘটিয়ে সে এই নাম নিয়েছে! সঙ্গে আছে তার বান্ধবী পাতা! এই মেয়ে এক বিদুষী! এরা দুজনে এখানে এসে জানিয়ে দিয়েছে তারা এসেছে মূলত ব্যাপারস্যাপার দেখতে! তারা কেউ আব্দুল জলিলের শিষ্য নয়! এই শেষের বাক্য শুনে আব্দুল জলিলে আগ্রহ জন্মেছে এদের উপর! তারপর তিনি একটি কুঠুরি খুলে দিয়েছেন এই যুগলকে যেন এরা আনন্দে থাকতে পারে এখানে এবং চিন্তায় শরিক হতে পারে! প্রথমদিনের তর্কে এরা সবাইকে ধাক্কা দিয়ে ছিটকে ফেলে দেয় এবং জানিয়ে দেয়, ‘...আপনাদের এই মিউমিউ কারবারে কিচ্ছু হবে না! রাষ্ট্র কিছু ক্লাউন পোষে, বা পুষতে হয় চিন্তার দুনিয়া স্বাভাবিক আছে এটা বিশ্ববাসীকে দেখাতে, সেই প্রকল্পের মধ্যে আপনারা তেল হিসেবে কাজ করছেন! গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র স্বৈরতন্ত্রের কাসুন্দিতে কয়েক ফোটা বাউল ফকিরি ভাবের যেই লেবেল জুড়ে নতুন রাষ্ট্র কাঠামোর হুজুক তোলা হচ্ছে তার পাত্রে একটা বড় ফুটো হচ্ছে আপনারা সবাই ভেবেই যাচ্ছেন জনগণকে ভাউরা ভেবে! মানে আপনারা নিজেরা আমোদে খাচ্ছেন দাচ্ছেন, যে জীবনের কথা বলছেন সেই জীবন নিজেরা যাপন না করেই! এবং আপনারা  সেটা আপনাদের সমান স্তরের সাথে আলাপ করে যাচ্ছেন জনগণকে বাইরে রেখে! জনগণ কি আপনার সমান মেধাবী নাকি আপনি তাদের থেকে নিম্ন মানের?’ এইসব বাক্যের পর আব্দুল জলিল সহ সকল তরুণ বুদ্ধিজীবীরা বিব্রত কিংবা ধাক্কা খায়! ফলে তরুণদের একটা দল বিহঙ্গ এবং পাতার ভক্ত হয়ে  ওঠে! তারা ওস্তাদ বলে ডাকতে থাকে! পাতা আব্দুল জলিলকে বলে, ‘...আপ্নে আপনার তথাকথিত শিষ্যদের শিষ্য যারা আছেন তাদেরকে ডাকেন এইখানে এবং গ্রামে ছাড়ায় দেন! তারা হাঙ্গামা লাগাক!’ এই ফর্মুলার নিরিখে আব্দুল জলিল ডাকে সবাইকে! বিহঙ্গ বলে, ‘...এই ছেলে মেয়ে গুলো গ্রামে যেইসব সমস্যা বা সঙ্ঘাতে জড়াবে তার থেকে আমরা সমাধান বের করে আনবো! প্রতিটা বিষয়কে দেখতে হবে আক্রমণকারীর আক্রমণ করার কারণ কি এবং কেন সে আক্রমণ করে এই হিসেবে! এবং কিভাবে আমাদের কাজটা করলে সে আক্রমণ করতো না সেই রাস্তার সন্ধান আমাদের করতে হবে!’ ফলে আব্দুল জলিল টের পায় এদের রাস্তায় আগালে তার নাম ছারাবে! কাজ আগাবে! এদের ব্যক্তিগত চাওয়াপাওয়া তেমন কিছু নাই! এই আন্দোলনের সকল ফলাফলই তার নামে প্রচারিত হবে ফলে ভয়ের কিছু নেই!  আব্দুল জলিল তার প্রকল্প ভেঙে দিলেন একদিন সান্ধ্য আড্ডায়! তিনি জানালেন আমাদের আপাতত কাজ হয়ে গেছে এখন আপনারা ছড়িয়ে পড়েন দেশের নিজ নিজ প্রান্তে! আবার যখন দ্বিতীয় ফিকিরের কাজ শুরু হবে তখন সবাই আসবেন, জমায়েত হবে! উপস্থিত তরুণ বুদ্ধিকারীদের মধ্যে আচমকা হিজিবিজি লেগে যায়! তারা চিৎকার চ্যাঁচামেচি করে অনাস্থা জানায় আব্দুল জলিলের উপর! কিন্তু তার ভূমিতে বসে তার বিরোধিতা টেকে না! ফলে এই তরুণদের ঝাঁক ফিরে যায় হতাশা নিয়ে! এবং তারা বেশিরভাগই ফেরে রাজধানীতে! সেখানে তারা প্রথমত আব্দুল জলিলের গুষ্টি উদ্ধার করতে থাকে এবং সে যে একজন এজেন্ট এই জাতীয় প্রচারণা জারি রাখে যা আব্দুল জলিলকে আরও বিখ্যাত করে তোলে এবং রাষ্ট্র চিন্তিত হয়ে ওঠে একটা নতুন বিশৃঙ্খলার আশংকায়! 

আব্দুল জলিল বিহঙ্গ এবং পাতাকে রেখে দেয় তার বাড়িতে! তারা তিনজন চিন্তার বিকাশ ঘটাতে শুরু করে! যদিও আব্দুল জলিলের সঙ্গে বিহঙ্গের বিরোধ ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে কেনোনা আব্দুল জলিলের নিয়ত পরিষ্কার লাগে না বিহঙ্গের কাছে! ফলে একদিন এমন ঝড়ের রাতে আব্দুল জলিল বিহঙ্গকে পুতে ফেলে বাগানের গভীর মাটিতে! পাতা এর কিছুই টের পায় না কেনোনা তাকে তার প্রিয় মাদকে ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল সেই রাত্রে! ফলে পরদিন থেকে পাতাকে  আটকে রাখা হয়! এবং দীর্ঘ বন্দিত্বের একটা স্তরে পাতা আব্দুল জলিলের আনুগত্য মেনে নেয় কিংবা সে এখনো অভিনয় করে যাচ্ছে আনুগত্যের, মূলত সে খুঁজে যাচ্ছে বিহঙ্গকে!

বহু বছর পর গত পরশু বিহঙ্গের মাথা ভুঁইচাপা থেকে মাটি ফুঁড়ে জেগে ওঠে বনের গভীরে যেখানে তাকে পুঁতে রাখা হয়েছিল! কিন্তু আচমকা গতরাতের উন্মাদ ঝড় এসে যা রাষ্ট্রের মতো নির্দয়! সেই ঝড়ের ঝাঁপটা তাকে গোঁড়া থেকে ছিঁড়ে বাগানের মধ্যে থেকে আব্দুল জলিলের উঠোনে এনে ফেলে! 

আব্দুল জলিল যখন বাগানের গাছপালা দেখে ঘরে ফিরতে উঠোনের কাছাকাছি এসে পৌঁছায় তখন সে দেখে, পাতা একটা ছোট্ট গর্ত খুঁড়ে সেখানে বিহঙ্গের গলটা বসিয়ে মাটি দিয়ে গেঁথে দিচ্ছে! মাথাটা জেগে আছে! ভেজা চুল গুলো শেকড়ের মতো মাটি স্পর্শ করে আছে! আব্দুল জলিল চুপচাপ এসে দাঁড়ায়! পাতা বলে, রাষ্ট্র আসলে আপনার মতো একটা চরিত্র! তবে আমি বিহঙ্গবৃক্ষ রোপণ করে দিলাম, এবার পাতা গজাবে! আমার  অপেক্ষা শেষ ঘৃণিত প্রাজ্ঞ! 

২২ মে ২০২০


romelabc@gmail.com

1 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন