শিকদার ওয়ালিউজ্জামান এর কবিতা নিয়ে সারোক শিকদার এর আলোচনা | মিহিন্দা

ব্যর্থতার রাজহাঁস থেমে গেলে শুরু হয় যে সাঁতার




শিকদার ওয়ালিউজ্জামানকে শুন্যের ক্রুশে বিদ্ধ করলে কতটা প্রতিনিধিত্বশীল যীশু আবিষ্কার করা যাবে সে দুর্গম পথে না হেটে লেখাটিকে আমার একপাক্ষিক ভাবনা বলাটাকেই নিরাপদ বোধ করছি।গদ্যছন্দের ৬৪ টি কবিতা নিয়ে গ্রন্থিত "ব্যর্থতার রাজহাঁস এবার থামো" বইটিকে কাব্যগ্রন্থ না বলে কাব্য সঙ্কলনই বলা ভালো। কিন্তু বিতর্কের পাশ কেটে আলোচনার স্বার্থে গ্রন্থটিকে কাব্যগ্রন্থ বলায় যুক্তিযুক্ত। "ব্যর্থতার রাজহাঁস এবার থামো" বইয়ের নামটি ২৮ নম্বর কবিতারই শিরোনাম। যদিও শেক্সপিয়ারের মতে what's in a name? That which we call a rose, by any other name would smell as sweet. ( Romeo and Juliet) আবার জার্মান লেখক আর্থার শোপেনহাওয়ার লিখেছেন " গ্রন্থের নামকরণের বিশেষ সাবধান হওয়া কর্তব্য; কারণ, চিঠির ঠিকানার মতই ঐ নামের দ্বারা তাকে পাঠকবর্গের নিকট পৌঁছে দেওয়া হয়।" দ্বিতীয় মতানুযায়ী বইয়ের নামকরণের ক্ষেত্রে শিকদার ওয়ালিউজ্জামানের নামকরণকে সার্থকই বলতে হয়। ব্যর্থতার গণ্ডি ভেঙ্গে ফেলে নতুনের সৃষ্টির প্রচেষ্টাই যেন এই কাব্যগ্রন্থের উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছে। যদিও নামের ক্ষেত্রে কয়েক জায়গায় অসম্মতির দৃষ্টিও বিদ্ধ করা যায়। যেমন কবিতার নাম " বাবুই" লিখে লেখক বিষয়বস্তুতে সাদা বকের কথাই লিখে গেছেন।
"মুহূর্তটুকু স্মৃতি হয়ে থাক, দীর্ঘশ্বাসগুলো মিলিয়ে যাক হাওয়ায়"- এরকম আশাজাগানিয়া শব্দ ও পংক্তির শান্তি সৌমের প্রগার ব্যাঞ্জন সিদ্ধ কবিতার বই " ব্যর্থতার রাজহাঁস এবার থামো"। সবকিছুর শেষে তিনি আশায় বুক বেঁধে এগিয়ে চলা মানুষের দলে। "দীপাবলি রাত" শিরনামের একটি কবিতাতে তিনি লিখছেন-
এক ভোর ভরসা নিয়ে আমিও বসে
দীপাবলি রাতে...

কিন্তু "ব্যর্থতার রাজহাঁস এবার থামো" কাব্যগ্রন্থে আমরা বাউলভাবের উপর সুফিইজমের একটি ছায়া আবিষ্কার করি।

প্রথম দৃষ্টিপাতেই যে বিষয়টি প্রত্যক্ষ হয়, শিকদার ওয়ালিউজ্জামানের কবিতায় বাংলার বাউল ভাব ও তার প্রভাবের দারুণ প্রতিফলন। যদিও বাউল প্রভাবিত বাংলা সাহিত্যের লেখকের সংখ্যা রোমান্টিসিজম পরবর্তী যুগে কম নয়। বরং স্বভাবজাতভাবে বাঙালি লেখক মন এই দর্শন লালন করেন। সেটা অবচেতন বা চেতন যে অংশ থেকেই নিয়ন্ত্রিত হোক না কেন। দম সাধনা বা বায়ু সাধনাই বাউল তত্ত্বের মূল এবং অন্তরাত্মা বা মনের মানুষের খোঁজই তার সাধনার পরম্পরা। বাউল তত্ত্বকে বাঙালির আধ্যাত্মিক গতিও বলা যায়। এবং বৃহৎ অর্থে যেহেতু আমরা অখণ্ড ভারতবর্ষের ভাবধারাগত তাই লেখায় আধ্যাত্মিকতার অনুপ্রবেশ আমাদেরকে বিস্মিত করেনা। শ্রী অরবিন্দ ভারতীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে বলেছেন- A spiritual aspiration was the governing force of this culture. কিন্তু "ব্যর্থতার রাজহাঁস এবার থামো" কাব্যগ্রন্থে আমরা বাউলভাবের উপর সুফিইজমের একটি ছায়া আবিষ্কার করি। ফলে আমরা নিশ্চিত করে বাউল প্রভাবের কথা যেমন বলতে পারিনা তেমনি বলতে পারিনা সুফি প্রভাবের কথা। তবে এই দুইয়ের মিশ্রনে একটি ভাবাবেগ লক্ষ করি। এবং এও লক্ষ করি যে এই ভাবাবেগ প্রকাশে লেখকের সাধনার চাইতে আবেগের বহিঃপ্রকাশই বেশী গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি লিখছেন-

নামবে প্রেম আমাদের মরমি সুরে
" নবগঙ্গার পদাবলী- নয়"

আবার লিখছেন-
এই তো ভোর, সুর দিয়ে স্বপ্ন জাগাও
আর ভাসিয়ে দাও সময়ের নাও এ ঘর, ও ঘর
যেটুকু সময়, সে তোমারই বারমাস।
কি তবে আমার, যদি নষ্ট করো তোমার বায়ু বাস?
( অদৃশ্য জল ও ফোয়ারা )

এই দর্শনের বিষয় ও তার প্রকাশ নতুন দার্শনিক কোন অভিজ্ঞানের অনুরণন সৃষ্টি না করলেও লেখকের আদর্শিক অবস্থান প্রকাশ করে এবং উদ্দেশ্য এইমতে থাকলে তা সার্থকই বলা যেতে পারে।
যে প্রার্থনালয়ে কোনো জানালা নেই" কবিতার একটি আত্মস্বীকারোক্তি-
আমার ঘরে আমি গির্জা আমিই মন্দির

এমন ভাবে এক সমর্পিত সত্তার সাথে কবির মান অভিমান, চাওয়া পাওয়ার কথা নানান ভাবে আমরা বিভিন্ন কবিতায় দেখি। কয়েকটি কবিতাংশ উদ্ধৃত করা গেল-

অক্ষরে লেখা নাম মুছে ফেলবে নিমেষেই
যদি জানতাম
নিজেই হাঁটতাম অজানা রশি বেয়ে
চিনে নিতাম নির্মম হাওয়া পাখি
"হাওয়া পাখি"

তোমার তো অনেক আকাশ, শুন্যতার রাশিফল
দিয়েছ যে কিঞ্চিত, তাই দিয়ে আমার সরোবর।
"অদৃশ্য জল ও তার ফোয়ারা"

যদি সড়কের বাতি নিভেই যাবে
পথিক হারাবে পথ
অচেনা ঝড় এলোমেলো করে দেবে পরিপাটি চুল,
মলিনতায় ছেয়ে যাবে মৌমাছিদের ঘর
তবে কেন শিখিয়েছিলে পায়ে হাঁটা আলপথ?
"হাওয়ার পাখি"


বাংলা কবিতার পৃথিবীতে জীবনানন্দের চেয়ে নিঃসঙ্গতার চর্চা আর কেউ নিশ্চয় বেশী করেননি। ফলে নিঃসঙ্গতার কথা বলতে গেলে জীবনানন্দের একটা ফাঁদ পার হয়ে আসতে হয়।

শিকদার ওয়ালিউজ্জামানের এই আধ্যাত্মিকতার প্রতি যে টান সেটিকে আত্মজ্ঞান না বলে বরং আত্মজিজ্ঞাসা বলাই শ্রেয়।কোথাও কোথাও অদৃশ্য বস্তু সম্পর্কে তার যে আবেগ তা রিয়েলিস্টিক নয়, যৌক্তিকতাবর্জিত। তিনি শরণার্থী চোখে কবিতায় লিখছেন -
ভাবি, কেন বাউলা মন ছেড়ে পাখিরা ঘরে ফিরে আসে!

এই প্রশ্নিক চরিত্রকে বিশ্লেষণ করলে এই চরিত্রের পাশে দেখা মেলে কবির ধ্যানস্থ চরিত্র। যেখানে খুবই স্থিরতা এবং একাগ্রতার সাথে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন তার লক্ষের দিকে। স্থিরতার কথা বলতে গিয়ে "সম্পূর্ণ" কবিতায় কবি স্বীকার করছেন-

অনতিদূরেই পৌঁছতে চাই
গন্তব্যের দিকে , এগোতে চাই মন্থর।

"জলের আরাধনা" কবিতায় বলছেন-

প্রত্যাখ্যানে আমার ভয় নেই
দূরের পাখি, বসে থাকি একাকীত্বে।
কোন তাড়া নেই ঘরে ফেরার।

"জলের আরাধনা" শিরনামের এই কবিতায় কবি কি তার নিঃসঙ্গতার কথা জানাচ্ছেন! আসলে এই নিঃসঙ্গতা সব লেখকের ভেতরই সুপ্ত থাকে। প্রায় সব লেখকই এই নিঃসঙ্গতাকে নিঃসঙ্গভাবে আগলে রাখেন, যত্ন নেন। রিলকেও লিখেছিলেন- works of art of an it infinite loneliness. বাংলা কবিতার পৃথিবীতে জীবনানন্দের চেয়ে নিঃসঙ্গতার চর্চা আর কেউ নিশ্চয় বেশী করেননি। ফলে নিঃসঙ্গতার কথা বলতে গেলে জীবনানন্দের একটা ফাঁদ পার হয়ে আসতে হয়। কেননা প্রকাশের ক্ষেত্রে জীবনানন্দ তার সময়ে যে দুরূহ পথ আবিষ্কার করেছিলেন সেই পথে আজ পরিভ্রমন করা অপেক্ষাকৃত সহজ। "ব্যর্থতার রাজহাঁস এবার থামো" কাব্যগ্রন্থে কবি খুব সাবধানতার সাথে সে ফাঁদ এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেও কোথাও কোথাও ব্যর্থ হয়েছেন। কিছু শব্দ এতটাই জীবনানন্দ প্রভাবিত যে সচেতন কবি মাত্রই সেগুলো অনেকদিন থেকেই এড়িয়ে যান। নক্ষত্রের রাত, হেমন্তের মাঠ, " নক্ষত্ররা আসে আর চারিদিকে ছুড়ে দেয়- রাত্রির জাল" এরকম শব্দ এবং লাইনের বহুল ব্যবহার যখন পরিলক্ষিত হয় তখন সচেতন পাঠক মনে প্রথমতই জীবনানন্দ দাশ একটা উঁকি মারেন। "রাতের খসড়া- তিন" কবিতায় যখন কবি বলেন "আমি শুধু একা নই, অন্ধকারের হাত ধরে আছি" তখন আড়াল থেকে কেউ যেন বলে "থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন"। কিংবা হৃদয়ের বান্ধবী, মিথ্যের বোনের মত শব্দ জীবনানন্দ দাশের হৃদয়ের বোন কিংবা কিটসের soul sister এর কথা মনে করিয়ে দেয়।
"পরিত্যাক্ত সময়ের কাছে" কবিতাটির উৎসমুখে এসে দাঁড়িয়ে থাকেন সুধীন্দ্রনাথ দত্তের "দুঃসময়" কবিতাটি।

আধার ঘনায় চোখে, তুমি ছাড়া কেউ নেই পাশে
                              "দুঃসময়"
বয়সি পৃথিবীর ভাঁজ দেখ
তুমি আর আমি কত অসহায়! 
             "পরিত্যাক্ত সময়ের কাছে"

শিকদার ওয়ালিউজ্জামান এই কাব্যগ্রন্থে সামাজিক বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত হতে পারেননি। যুগ সচেতনতার মধ্যে তার নিঃসঙ্গ মনোবৃত্তি প্রবলভাবে উঁকি দেয়। নিঃসঙ্গতা একাকীত্বের সাথেও তার ভালবাসার নিবিড় বন্ধন। নিঃসঙ্গতার সহচর্যে যেন তিনি সস্থির সন্ধানও পেয়েছেন। 

সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তার "জাতিস্মর" কবিতায় লিখেছেন-
মার্জিতরুচি জনপদে, বহুদূরে,
ভিড়ে মিশে আমি ভেসে যাব একা একা 

"ব্যর্থতার রাজহাঁস এবার থামো" কাব্যগ্রন্থে আমরা পড়ি-
আমি এখন তীর্থে যাবো
আমাকে থাকতে দাও হিমের নির্ভরতায়
ও পথে নবগঙ্গার কোন ঘাঁটে বসবো একা। 
                    "নবগঙ্গার পদাবলী- আট"

নিঃসঙ্গতার এই ভাবের প্রবাহ যেন যুগ যুগ পরেও একই সুরে ভিন্ন বাশরিয়ার বাঁশিতে বাজে। নিঃসঙ্গতা নিয়ে নীৎসে বলেছেন- I need solitude, with is to say, recovery, return to myself, the breath of free, light, playful air.  কিন্তু কবির সকল একাকীত্বকেই কি নিঃসঙ্গতা বলা যাবে কিনা সেটাও পাঠক মনে প্রশ্ন থাকতে পারে। যেমন "পাশাপাশি বসে থাকাও এক ধরনের নিঃসঙ্গতা" কবি অপু মেহেদীর "ঘুমের প্রেসক্রিপশন" কাব্যগ্রন্থের কবিতাংশ আমাদেরকে নিঃসঙ্গতার একটি ধারণা দেয় তেমনি ব্যর্থতার রাজহাঁস এবার থামো কাব্যগ্রন্থে কবি লিখছেন- প্রতিটি নীরবতায় এক একটি সরবতার নাম ( রাতের খসড়া)। বুদ্ধদেব বসু অবশ্য নিঃসঙ্গতার ব্যাখ্যা দিয়েছেন আরেকটু পরিণতভাবে- সঙ্গহীনতাকেই নিঃসঙ্গতা বলেনা, মনকে নিবিষ্ট করার উপায়ের অভাবকেই বলে নিঃসঙ্গতা।
হয়তো তাই নিঃসঙ্গতাকে অস্ত্র করে শিকদার ওয়ালিউজ্জামান "পুনর্জন্ম" কবিতায় লিখেছেন-

তোমার ব্রহ্মাস্ত্র নিরবতা,
অস্তিত্ব, কপালের অন্ধকার ভাঁজে
দুঠোঁটের ভীরু কম্পনে, একাকীত্বে, নিঃসঙ্গতায়।        

নিঃসঙ্গতার সাথে মৃত্যুচিন্তা সমন্তরালভাবেই চলে আসে। 
"মরণ রে, তুঁহুঁ মম শ্যামসমান।
মেঘবরণ তুঝ, মেঘজটাজূট,
রক্ত কমলকর, রক্ত অধরপুট
 তাপবিমোচন করুণ কোর তব
মৃত্যু অমৃত করে দান’,
 
"ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী"তে মরণ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনের প্রথম প্রভাতে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে অমৃতের স্বরূপ বলেই আহ্বান করেছিলেন। 
শিকদার ওয়ালিউজ্জামান "সমর্পণ" কবিতায় লিখছেন- বেড়ে ওঠা ঘাসের শিরায় লাশের ফিসফাস। 
এই চিন্তার কাব্যিকতা আমাদেরকে আলোড়িত করে, উপমার আড়ালে আমাদেরকে শোনায় ঘাসের গল্পে মানুষের কণ্ঠস্বর।
 
"কাক সংবাদ নাকি শোকের কোরাস" কবিতায় লিখছেন-
প্রতিদিন পাতার গানে মৃত্যু বাজে ক্ষুধার ঝড়ে-
অথবা বৃষ্টি আয়ু কবিতায়
অথচ প্রতিটি ঝমঝমানো কবিতা আমার আরাধনা
ঠিক মৃত্যুর মত... 
                               ২

জীবনকে আটকে রাখা যায় না, এই পরম সত্যকে বার বার উপলব্ধিতে এনেই শিকদার ওয়ালিউজ্জামান তার রচনায় যে মৃত্যুদর্শন এঁকেছেন, তা কবিতার ভাষায় হয়ে উঠেছে নান্দনিক এক জীবনদর্শন।

আবার পুঁজিবাদের করাল গ্রাসে আত্মসংস্কৃতি ভেঙ্গে যাবার দৃশ্যও কবির চোখ এড়ায়নি। কবি সচেতন দৃষ্টিতে গভীর পর্যবেক্ষণ করেছেন এই পরিবর্তনের।

পুঁজিবাদী এই বিশ্বের আর্ত চিৎকার কবিকে স্পর্শ করেছে খুব সুক্ষ কিন্তু গভীর ভাবে। তবে মনে হয়েছে পুঁজিবাদের এই বিরোধীমনোভবই প্রকারন্তরে সমাজতন্ত্রের প্রতি সমর্থক হয়ে গেছে, যেখানে সমাজতন্ত্র একটি প্রবাহমান ঝোঁকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, পাঠককে উজ্জীবিত করার সঞ্জীবনীর মত। "শ্রমিকের গান" কবিতায় -
মরিচ ভাতে সুবাস ঢালে
রোদ্দুর হাঁটে পায়ে পায়ে
কাস্তের দাঁতে।
 
এই লেখার পরে দিনেশ দাসের " কাস্তে" কবিতার কয়েকটি লাইন পড়া যেতে পারে-
বেয়নেট হ'ক যত ধারালো
কাস্তেটা ধার দিও বন্ধু!
শেল আর বোম হ'ক ভারালো
কাস্তেটা শান দিও বন্ধু।  

এই রকম অনুভূতি ব্যাক্ত করার পরও আমরা ব্যর্থ হই কবির রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ আবিষ্কারে। যদিও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ জানা কবিতার জন্য অতিআবশ্যক নয় কিন্তু টাল-মাতাল রাজনৈতিক অবস্থানও কাম্য নয়। সমাজতান্ত্রিকতার গতানুগতিক ভাষায় একটা ট্রেনডের মত করেই, কবি প্রচলিত আবেগের ভাষা ব্যাবহারের মাধ্যমে শোষিতের মুক্তির কথা বলে গেছেন। এরকম ভাষা সুভাষ মুখোপাধ্যায় আগেই পাঠকের স্বাদজ্ঞান যুক্ত করেছেন। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে শোষিতের মুক্তি চাওয়ার বিষয়টি আজ কবিতায় জনপ্রিয়তা পাওয়ার সস্তা মাধ্যম ও ফাঁদ হয়ে উঠেছে।   
 
আবার পুঁজিবাদের করাল গ্রাসে আত্মসংস্কৃতি ভেঙ্গে যাবার দৃশ্যও কবির চোখ এড়ায়নি। কবি সচেতন দৃষ্টিতে গভীর পর্যবেক্ষণ করেছেন এই পরিবর্তনের। " টাওয়ার ও মৌচাকের গল্প" কবিতার কয়েকটি লাইন এ বিষয়ে উদ্ধৃত হতে পারে-
ধুলো উড়ছে বালির শহরে
ফানুস উড়ছে বহুজাতরঙা পুঁজির ছাদে,
টাওয়ার চূড়ায় গলাচিপা কান্নার আওয়াজ
ভাঙা শাঁখ পাদদেশে।

কবি স্বপ্ন দেখেন কাঁটাতারবিহীন অখণ্ড পৃথিবীর। এই স্বপ্ন যেমন তার অন্তরজগতে বৃক্ষের জন্ম দিয়েছে, তেমনি সেখানে স্বপ্নভঙ্গের কাঠঠোকরা তৈরি করেছে যন্ত্রণার অসংখ্য গর্ত। "মধ্যপথের বংশীবাদক" কবিতায় আমরা সেই যন্ত্রণার আভাস পাই। 

দেশভাগ, নদীভাগ, সাম্প্রদায়িকতার বিভীষিকার কথাও কবির স্পর্শকাতর হৃদয় কাব্যিকতায় তুলে ধরেছেন ব্যর্থতার রাজহাঁস এবার থামো কাব্যগ্রন্থে। তবে কবিতার ভাষাশরীরে সময়ের চিহ্ন দেখার বদ অভ্যেস কাটাতে পারেননি। এঙ্গেলস এর একটি বাক্য এসব ক্ষেত্রে মনে রাখা যেতে পারে- একজন লেখকের নিজস্ব মতামত যত বেশী লুকানো থাকে, শিল্পকর্মের জন্যে তা ততই কল্যাণকর।
   
সংস্কৃতি বিষয়ে কবির প্রেম কোথাও কোথাও মনে হয় স্মৃতির বিন্দুতে স্থির, অগ্রগামী নয়। বিগত সময়ের মায়াছন্নতায় চলমান সময়ের পা প্রপিতামহের জুতোয় গলাতে গিয়ে যে অসামঞ্জস্যতা তৈরি হচ্ছে তাতেই কবির অধিক পীড়ার আবির্ভাব। হয় তিনি সচেতনভাবে এটি করছেন অথবা চেষ্টা করছেন নতুন সময়ে তাল মেলাতে- কিন্তু পারছেন না। কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে দীর্ঘশ্বাস। "ব্যর্থতার রাজহাঁস এবার থামো" কাব্যগ্রন্থের কয়েকটি কবিতার লাইন পড়লে হয়তো বিষয়টি স্পষ্ট হবে-

... কলের লাঙ্গল বাবলা বনের দীর্ঘশ্বাস... আহা! কৃষকের গান জয়াল-লাঙ্গল যেন হারানো পদাবলি। 
                                                       "শরণার্থী চোখে"

একদা মানুষের সারি ছিল, আযান আর কীর্তনের
সে গায়ে এখন অ মানুষের ভীর।
                    "নবগঙ্গার পদাবলি- আট"
অথবা

চলেই তো যাচ্ছে সমূহ দিন, কথারা হয়েছে অতীত
পিঁপড়ের ঢিবির মতো হারিয়ে যাচ্ছে সময়
সময়ের না'য়ে শুধু ফিরবেনা ঐ পথ, গিয়েছে যেদিক।
                        "পরিত্যক্ত সময়ের কাছে"

একইভাবে সময়ের নির্লজ্জতা নিয়ে দারুণ উপস্থাপন করেছেন "টিকটিকির" সংলাপ কবিতায়। সেখানে চলমান আবহ তুলে ধরে তিনি লিখছেন-
যখন পাতাগুলো ঝরে পড়লো মুক্ত হতে
টিকটিকি বললো না কিছুই
শুধু লেজ ছাড়লো... লাজ খোয়ালো। 

আর উৎকণ্ঠা কবিতাতে সময়ের দারুণ স্যাটায়ারের ব্যাবহার পাঠককে আলোড়িত করার এক দারুণ মসলা। 
                             ৩

শিকদার ওয়ালিউজ্জামানের কবিতায় অনুভব করি স্পর্শে নিগূঢ়তম চৈতন্যকে শব্দে উপস্থাপন করার এক আপ্রাণ প্রচেষ্টা। উপমার এ প্রয়োগকৃত বিশিষ্টতা কবির বক্তব্যকে করছে প্রাণবন্ত ও গতিময়। এজরা পাউনডের ভাষায় -language changed with meaning to the utmost degree.  


ধনুকের তীর কিংবা অর্জুনী বাণ কোনো কিছুই নেই আমার
অধিকারেও নেই দ্রৌপদীর বিশ্বস্ত আঁচল... 

এভাবেই স্মৃতি নিয়ে স্পর্শ গন্ধ এবং স্বাদের চৈতন্য কবির কাছে যেন উন্মোচিত হয়েছে। এই চৈতন্য বিশ্লেষণ সাধ্য না হলেও অনুভব সাধ্য। যদিও শিকদার ওয়ালিউজ্জামান কখনও কখনও স্ববিরোধী দুটি বক্তব্যকে একত্রিত করেছেন যার ফলে বিশ্বাস এবং অবিশ্বাস একই নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হয়েছে। তার কবিতায় ইচ্ছাপূরণের অভাবে যন্ত্রণার দায়ভাগ যেন প্রকট। সমাজ ও রাজনৈতিক চিন্তার পরিপ্রেক্ষিত এবং প্রতিদিনের আচরণের যান্ত্রিকতা ব্যাক্তিত্তকে প্রকাশ না করে অনেকগুলো অভিজ্ঞতা এবং ধারনার আলঙ্কারিক প্রকাশ করে। এই বিষয়টিকে expressionism বা একটি পদ্ধতি বলতে পারি যা একটি সজীবতাকে প্রকাশিত করে  অনুপম সুক্ষ কৌশলে। রুশোর ছবিতে যেমন মানুষ, লতা, গাছ, নদী, হাঁস, সাপ এবং পাখি একটি সম্মিলিত প্রাণ চেতনায় একাকার হয়েছে।  

শিকদার ওয়ালিউজ্জামানের অনেক কবিতায় উত্তরাধুনিকতার পদছাপ স্পষ্ট কিন্তু কোথাও কোথাও সনাতনী মায়ার কাছে আত্মসমর্পণও করেছেন। যা তারই সৃষ্ট এক নবতর আবহের সুরে বিপর্যয় তৈরি করেছে। কোথাও কোথাও কবিতাকে মহিমময় আনন্দলোকে উপস্থিত করতে পূর্বতন রীতির মধ্যে মহৎ করার প্রয়াশ দেখিয়েছেন। এজরা পাউনড hugh selwayn mauberley কবিতায় বলছেন এইভাবে কবিতাকে কখনও মহৎ করা যায়না। এই প্রচেষ্টা প্রথম থেকেই ভুল- in the old sense wrong from the start. 
এই কথার স্বপক্ষে "ব্যর্থতার রাজহাঁস এবার থামো" কাব্যগ্রন্থে অসংখ্য শব্দ ও পঙক্তির ব্যবহার আমাদের দৃষ্টিকটু হয়। যেমন- "মাগো, তুমি কেঁদো না আর!", "আহা নবগঙ্গার জল" । এসব লাইনের প্রেক্ষিতে বলা যায় মর্যাদাসম্পন্ন শিল্পপদ্ধতি সবসময় অগ্রগামী, পশ্চাৎমুখী নয়।
 
তবে শিকদার ওয়ালিউজ্জামানের কবিতায় ঝমঝমানো, দাপাতে, বিরহকুটুম, ভিটে এরকম অসংখ্য আঞ্চলিক শব্দের সার্থক ব্যবহার তার ভাষা সচেতনতার প্রতিই নির্দেশ করে। প্রমিত ধারার যে গড্ডালিকা প্রবাহ সেখানে আঞ্চলিক শব্দের এমন ব্যবহার আলাদা সাক্ষর বহন করে একথা সুনিশ্চিত ভাবে বলা যায়। 

                                 ৪
কবিতা আবেগের হাত ধরে হাঁটে। প্রেমমদ্মতা নিয়েও ভালো কবিতা হতে পারে। "ব্যর্থতার রাজহাঁস এবার থামো" কাব্যগ্রন্থে অন্যতম শক্তিশালী দিক এর রোমান্টিক কবিতাগুলো। যেখানে প্রেমিক মনের সাবলীল সরলতা এমন ভাবে প্রকাশিত যা চির তারুণ্য ও অমরত্বের দাবি করার যোগ্যতা রাখে। রোমান্টিক কবিতা পড়তে পড়তে শেখ ফরিদুদ্দিন আত্তারের দুটি লাইন মনে আসে-

প্রেমিকের হৃদয়ে যখন প্রেম আগুন ধরিয়ে দেয়, তখন তা তার হৃদয়ে অধিষ্ঠিত প্রেমাস্পদ ছাড়া আর যত কিছু আছে, সবকিছু পোড়ায়ে ফেলে। ( কুল্লিয়াতে আত্তার) 
 
শিকদার ওয়ালিউজ্জামানও যেন সেরকম দগ্ধ হৃদয় নিয়ে প্রেমিকার উদ্দ্যেশে বুনে গেছেন নিবিড় প্রেমের পংক্তি। 
তোমার চোখ থেকে চোখ সরালেই জানি একা হয়ে যায় ,
অথবা
প্রিয় সূচনা, তোমার প্রতিটি অবহেলা 
মাথা উঁচু করে আমাকে হাঁটতে শেখায়
কিংবা 
আমার প্রতিরাতের মৃত্যু তোমার স্নানঘর পাহারা দেয়। 
এরকম প্রেমের পত্র পুষ্প শিকদার ওয়ালিউজ্জামানের কবিতার শোভা বহুগুণে বৃদ্ধি করেছেন। 

শিকদার ওয়ালিউজ্জামান কবিতায় নিজের অভিজ্ঞতাকে অধিক সমাদর করেছেন এবং কখনও কখনও কবিত্বকে সরিয়ে দার্শনিকের ভুমিকা গ্রহন করেছেন। কিন্তু তার কবিতায় সরলতা একটি প্রধান বৈশিষ্ট। সাহিত্যে সারল্যতা ও প্রাঞ্জলতা চিরদিনই মূল্যবান। নিভৃতে প্রকৃতির সাথে তিনি যে সম্পর্ক স্থাপন করেছেন তা পাঠকের জন্য প্রস্তুত করেছে কেবলই পবিত্রতর আবহ। 
বলেছেন- সাদা বক, তুমি মিলিওনা হাত অন্ধ হাতে। হেঁটোনা বোবাদের পৃথিবীতে... 

বইটির প্রকাশক "অনুভব প্রকাশনী", প্রচ্ছদ করেছেন "নির্ঝর নৈশব্দ", মূল্য " ১৭০ টাকা" এবং প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ।      

1 تعليقات

  1. খুব ভালোলাগলো। এমন বিস্তারিত আলোচনা সচরাচর দেখা যায় না। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণে গ্রন্থটাকে উপস্থাপনের জন্য আলোচককে ধন্যবাদ।

    ردحذف

إرسال تعليق

أحدث أقدم