শরীফ আহমেদ এর ছোটগল্প | মিহিন্দা


খুন



রাস্তার পাশে নিজের বাসার সামনে চেয়ারে বসে ছিলো আজগর আলী। বিকেলের রোদ এসে পড়ছিলো তার গায়ে। হঠাৎ একটি ট্রেনের ছায়া এসে পড়লো। খুলনা রেলওয়ে স্টেশনের সামনে রাস্তার উল্টাপাশে আজগরের নিজের বাসা। এক বিঘা জমির উপর এখন দুইটি টিনশেড বিল্ডিং। এখন মানে প্রথম থেকেই এগুলোই ছিলো। আজগরের বাবা আনসার আলী আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে এই জায়গাটা কিনেছিলো। আনসার আলী তখন মংলাপোর্টে চাকরি করতো।
এই জায়গাটার মালিক পেয়ারউদ্দিন মংলাপোর্টে এ·পোর্ট ইমপোর্টের ব্যবসা করতো। একটা সময় ব্যবসার সম্ভবনা কমে গেলে পেয়ারউদ্দিন আসন্ন লস এড়াতে মূলধন গুটিয়ে ঢাকায় চলে যায়। তখন ঢাকায় নতুন ব্যবসা শুরু করার জন্য তার বাড়তি টাকার দরকার ছিলো তাই পেয়ারউদ্দিন তার এই জায়গাটা বিক্রি করে দিয়েছিলো। যশোরের গ্রামের সব জমি বিক্রি করে আনসার আলী পঞ্চাশ হাজার টাকা জোগাড় করেছিলো আর ব্যাংক থেকে দেড় লাখ টাকা লোন নিয়ে এই জায়গাটা কিনেছিলো।
তখন আজগরের বয়স বিশ বছর। তার দশ বছর পর আনসার আলী চাকরি থেকে অবসর গ্রহন করে পাওয়া দশ লাখ টাকা থেকে ছয় লাখ টাকা খরচ করে জায়গাটার উপর টিনশেড বিল্ডিং করে। আজগরের বড় বোনকে তার বাবা এই জমির অংশ বাবদ দুই লাখ টাকা দিয়ে যশোরে আরেকটি জায়গা কিনে দেওয়ার পর আজগর খুলনা রেলস্টেশনের সামনের এই জায়গাটার একমাত্র উত্তরাধিকারী হয়। মারা যাওয়ার আগেইতারবাবা আজগরকে জায়গাটি রেজিস্ট্রি করে দিয়েছিলো।
আজগরের বাবা মারা গেছে তিন বছর হলো। তারপর নিজের ¯^ল্প আয় দিয়েআজগরের পক্ষে এই জায়গাটির উপর নতুন কোনো বিল্ডিং করা সম্ভব নয়। আর টিনশেড থেকে যে ভাড়া আসে তা দিয়ে এখন আর সংসারের খরচ চালানোও সম্ভব হচ্ছে না। তাই জায়গাটা বিক্রি করে একটা ব্যবসা করার মূলধন জোগাড় করবে বলে আজগর জায়গাটা বিক্রি করে দেবার চিন্তা করে।
সম্ভাব্য অনেক ক্রেতার সাথে কথাবর্তা বলার পর ‘নাবিল গ্রুপ’ আগ্রহী ক্রেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম দিয়ে জায়গাটি কিনতে চায়। আর তারা জমির দামের পুরো টাকাটাও একসাথে আজগরের দুইটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সাত দিনের মধ্যে ট্রান্সফার করে দিতে চায়। অন্য ক্রেতারা সবাই দুই-তিন কিস্তিতে টাকা দেবার জন্য বলে। একসাথে টাকা না দিলে জমি রেজিস্ট্রি নিয়ে দ্বিধাদ্ব›েদ্ব থাকতে হয়ে আর রেজিস্ট্রি দিতে অমত করাটাও অশোভন দেখায়।

সেদিন বিকেলের শেষে নাবিল গ্রুপের সাথে জমি বিক্রির ব্যাপারে মিটিং ছিলো আজগরের। খুলনা মেডিকেল কলেজের পেছনে নাবিল গ্রুপের এমডি ও ডাইরেক্টরের সাথে মিটিং করে তাদের বাসা থেকে বের হচ্ছিলো আজগর আলী। কিন্তু বের হবার মুখে দেখলো তার বাসার ভাড়াটে শফিক সাহেব রিকসায় ওঠছে সেখান থেকে। তার সাথে একটা ছেলে। ছেলেটার বয়স চব্বিশ বা পঁচিশ হবে। আজগর শফিক সাহেবকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইলো যে, শফিক সাহেব এখানে কোথায় কী কাজে এসেছিলো। কিন্তু জিজ্ঞেস করতে গিয়েও সে পারলো না কারণ তার আগেইতাড়াহুড়া করে শফিক সাহেব রিকসায় ওঠে গেলো।
আজগর সেখান থেকে বাসায় চলে এসেছিলো। কিন্তু শফিক যে তখন বাসায় আসেনি সেটা আজগর বুঝতে পেরেছিলো যখন রাত সাড়ে বারোটায় শফিক সাহেব বাসায় ফিরলো। শফিক সাহেব আজগরের বাসায় ভাড়া থাকে প্রায় তিন বছর হলো। তিনি ব্যবসায়ী। খুলনা নিউমার্কেটে তার জুতার দোকান আছে। তবে লোকটা জাত ব্যবসায়ী বা সৎ ব্যবসায়ী বলতে যা বোঝায় তা নয়। এই দোকান ছাড়াও তার আরো অনেক রকম ধান্দা আছে যা আজগরের পক্ষে আজ অবধি স্পষ্ট করে জানা সম্ভব হয়নি। শফিক সাহেব মাঝে মধ্যে জমি বিক্রির দালালিও করে বলে আজগরের ধারণা। শফিক সাহেব এখন পর্যন্ত দুইবার আজগরের এই জায়গাটা বিক্রির ব্যাপারে খদ্দের নিয়ে এসেছিলো। কিন্তু আজগর তাকে পাত্তা দেয়নি কারণ আজগরের ধারণা ধান্দাবাজ শফিক সাহেব জমির দামের অর্ধেক দালালি বাবদ আত্মসাৎ করবে।

নাবিল গ্রুপের সাথে জায়গা বিক্রির ব্যাপারে সব কথাবর্তা শেষ করে ফেলেছে আসগর আলী। সারাজীবন কিছুটা অভাব অনটন ও কিছু কষ্টের মধ্যে কাটিয়ে এখন এই জায়গা বিক্রির দুই কোটি টাকা দিয়ে সে, তার স্ত্রী ও তার দুই সন্তানের বাকি জীবন অভাবমুক্ত ও প্রাচুর্যময় কাটবে এটা ভেবে সে অনেকটাই আপ্লুত হয়। জীবনটা তার অর্ধেকের বেশি কেটে গেছে। এই পৈতৃক জায়গাটাতে সে এতোদিন পরিবার নিয়ে বসবাস করেছে। টাকা পয়সার অভাবে চারটা টিনশেড ঘর ছাড়া অন্যকিছু করতে পারেনি এই জায়গাটাতে। এই জায়গাটুক ুকেনার পর তার বাবার অবস্থাও পড়ে যায় তাই জায়গাটাতে তেমন কিছু করতে পারেননি তিনিও। টিনশেডগুলো থেকে মাসে পনেরো হাজার টাকা ভাড়া আসে আর তার নিজেকেও বাসা ভাড়া দিতে হয় না। আজগর আলী ‘ত্রিস্টার’ নামে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে সেলস ম্যানেজারের চাকরি করে। মাসে বেতন পায় বিশ হাজার টাকা। তার এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলেটা বড়। দশম শ্রেণীতে পড়ে সরকারি স্কুলে। মেয়েটা ছোট। পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে মাসে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে তার চলনশীল মধ্যবিত্ত পরিবারটা কিছুটা অভাব অনটন ও টানাটানির মধ্য দিয়েই চলছিলো।
অফিস থেকে বের হবার ঠিক আগে আজগরের মোবাইলে একটা ফোন এলো। আজগর ফোন রিসিভ করলো, হ্যালো।
কেমন আছেন আজগর সাহেব?
জ্বি ভালো আছি। আপনি কে বলছেন?
আমি রাশেদ আনোয়ার। সোনাডাঙ্গায় থাকি। আপনার সাথে একটু দেখা করতে চাচ্ছিলাম।
ও আচ্ছা। কী জন্য দেখা করতে চাচ্ছেন?
আমি ত্রিস্টার এসি পারচেজ করতে চাই।
ও। আমার নাম্বার পেলেন কোথা থেকে?
খালিশপুরে আমার বন্ধুর একটা ইলেক্ট্রনি·ের দোকান আছে সেখান থেকে নাম্বারটা পেয়েছি।
ইলেক্ট্রনি·ের দোকান থেকে নাম্বার নিয়েছেন? কিন্তু ডিলার হতে হলে অফিসে আসুন। আমার সাথে দেখা করে কী হবে?
আজগর ভাই। আসলে আমি ডিলার হতে চাচ্ছি না। আমি একটা পার্সোনাল পারচেজ করতে চাই তাই আপনার হেলপ প্রয়োজন।
পার্সোনাল পারচেজ?
হ্যাঁ। পার্সোনাল পারচেজ।
কিরকম কুয়ান্টিটি পারচেজ করবেন?
খুব বেশি না। তবে বিশটা এসির উপরে হবে।
ঠিক আছে। কখন কোথায় দেখা করতে চান?
সোনাডাঙ্গায় আমার বাসায় যদি আসতেন।
আচ্ছা আপনার বাসায় লোকেশানটা মোবাইলে টে·ট করে দিন আমাকে। আমি আগামীকাল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে আটটার মধ্যে আসবো।
ওকে থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ।
ওকে কালকে দেখা হবে।
পরের দিন রাত আটটায় আজগর খুলনা শহরের সোনাডাঙ্গায় রাশেদ আনোয়ারের বাসায় গেলো। লোকটা খুব স্মার্ট আর ভদ্র। বাসাটাও অত্যন্ত সাজানো গুছানো। আজগর আশ্বস্ত হলো এটা ভেবে যে এরকম ভদ্র মানুষদের সাথে প্রোডাক্ট সেল করা ঝামেলামুক্ত হবে।
মিটিং শুরুর আগে কয়েক রকম নাস্তা এলো। নাস্তা খেতে খেতে রাশেদ অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বললো, আসলে আমি বিষয়টা পুরোপুরি অফিসিয়ালি করতে পারতাম। কিন্তু আপনার মাধ্যমে পারচেজ করলে এ·ট্রা সার্ভিস বা এ·ট্রা কেয়ার পাবো তাই আপনাকে কষ্ট করে আসতে বললাম।
ওকে। ইট’স ওকে। আমি আপনার যেরকম সার্ভিস বা কেয়ার লাগবে সেরকমই করবো।
ওকে। তাহলে কাজের কথায় আসি। আমরা একটা কোম্পানি অফিস চালু করবো ‘কেডিএ’র পাশে। সেখানে বেশ কিছু এসি লাগবে।
কয়টা রুম হবে অফিসে আর কতো স্কয়ারফুট করে রুমগুলো? রুমগুলোর মাঝে জয়েন্ট স্পেস কতো স্কয়ারফুট?
রুম হবে পাঁচটা। মাঝখানে স্টাফ ডেস্ক এড়িয়া এবং ফ্রন্টডেস্ক এরিয়া থাকবে বিশ ফুট বাই বাইশ ফুট। আর এরকম তিনটা ফ্লোর হবে।
রুমগুলো কতো স্কয়ারফুট করে?
দশ ফুট বাই দশ ফুট, দশ ফুট বাই নয় ফুট বা দশ ফুট বাই এগারো ফুট এরকম।
আজগর মোবাইলের ক্যালকুলেটরে হিসাব করে বললো, প্রতি ফ্লোরে পাঁচটা এক টন আর দুইটা দেড় টন করে এসি লাগবে।
তার মানে টোটাল এক টন পনেরোটা আর দেড় টন ছয়টা?
এ·াক্টলি তাই।
তারপর সেদিনের মতো সব কথা শেষ করে আজগর সেখান থেকে বের হলো। পরের দিন রাত আটটায় রাশেদ আনোয়ারের সাথে আজগরের খুলনা ডেভেলপমেন্ট অথরিটি বা কেডিএ পাশে সাইট দেখতে যাওয়ার প্রোগ্রাম ঠিক হলো।

সেদিন রাতে বাসায় ফেরার সময় একটি ছেলেকে তার বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো আজগর। আর তার মনে হলো এই ছেলেটাকেই সে শফিক সাহেবের সাথে সেদিন নাবিল গ্রুপের সাথে তার মিটিং শেষে রিকসায় ওঠতে দেখেছিলো খুলনা মেডিকেল কলেজের পেছনে। বিষয়টা কেমন যেন সন্দেহজনক মনে হলো আজগরের। কিন্তু ক্লান্তি ও তাড়ার মধ্যে তার বিষয়টা আর খতিয়ে দেখা হয় না।
পরদিন সকালে নাবিল গ্রুপের সাথে সব চূক্তিপত্র ফাইনাল করে দুপুর বারোটার সময় আজগর অফিসে ঢুকলো। ঠিক হলো তিনদিনের মধ্যে একটা দিন নির্ধারন করে চূক্তি সই করে জায়গাটা সে নাবিল গ্রুপের মালিকদের নামে রেজিস্ট্রি করে দিবে।
আগের দিনের সোনাডাঙার মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অফিস শেষ করে আজগর রিকসা নিয়ে কেডিএর দিকে যায়। ঠিকানা মিলিয়ে সাইটের কাছাকাছি পৌঁছালে রাশেদ সাহেব ফোন করে, আজগর ভাই কতদূর এলেন?
আমি তো প্রায় সাইটের কাছাকাছি।
তাহলে আপনি একটু দাঁড়ান। আসলে সাইটে যাওয়ার আগে আমার একজন পার্টনারের সাথে বসতে হবে। তিনি বলেছিলেন সাইটেই থাকবেন কিন্তু আসতে পারছেন না। দেখুন তো আপনাকে এখন আবার সেখানে যেতে হবে কষ্ট করে।
ওকে। নো প্রবলেম। ঠিকানা দিন আমি চলে যাই।
না না। আপনাকে ঠিকানা বের করতে হবে না। আমি বাসা থেকে গাড়িতে করে সাইটের দিকে আসছি। আপনি কোথাও একটু দাঁড়ান আমি গাড়িতে তোলে নিচ্ছি আপনাকে।
আচ্ছা আমি এখানে হেমকো গ্রুপের একটা ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টার আছে ওটা পার হয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছি।
ওকে। দুই মিনিট দাঁড়ান। আমিও কাছাকাছি চলে এসেছি। কালো রঙের একটা হায়েস মাইক্রোবাস খেয়াল রাখুন।
আচ্ছা আসুন।
তারপর আজগরকে ভালো বা মন্দ কিছু ভাবার সময় না দিয়ে তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যে কালো রঙের মাইক্রোবাসটা তার সামনে এসে দাঁড়ালো। রাশেদ সাহেব আরেক জনকে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে এসে তাকে গাড়িতে ওঠিয়ে নিলেন। যথারীতি তাদের আচরণে বিনয়ের বাড়াবাড়ি। যেন একুশটা এসি নয় বরং কোটি টাকার কোনো লেনদেন হচ্ছে তাদের আজগরের সাথে। রাশেদ সাহেব সামনের সিটে বসলেন আর আজগর পেছনে ওঠলো। আজগরের পাশে আরেকজন ওঠে বসলো।
গাড়ি চলতে শুরু করলো। রাশেদ সাহেব আজগরের দুই পাশে বসা দুজনকে পরিচয় করিয়ে দিলেন কোম্পানির বড় কর্মকর্তা হিসেবে। পরিচয় পর্বে ব্যস্ত থাকায় আজগর ঠিক খেয়াল করতে পারলোনা গাড়িটা কোনদিকে যাচ্ছে। আর তার ঠিক পরপরই কোম্পানির বড় কর্মকর্তা বলে পরিচিত লোক দুটো দুইদিক থেকে হাত দিয়ে আজগরের দুই হাত আর পা দিয়ে তার দুই পা চেপে ধরে নাকে ক্লোরোফরম মাখা রুমাল চেপে ধরলো। আজগর লোক দুটোকে বাধা দেওয়ার চেষ্ঠা করলো। কিন্তু নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার প্রাণপণ চেষ্ঠা করতে করতে মুহূর্তের মধ্যে নিস্তেজ হয়ে পড়লো সে।
তারপর জ্ঞান ফিরলে আজগর নিজেকে দেখতে পায় একটি অন্ধকার ঘরে। ঘরটাতে সে একটা চেয়ারে বসে আছে। চেয়ারের সাথে তার হাত পা বাঁধা রয়েছে। সামনে একটি টেবিল। একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে টেবিলের পাশে। সব কিছু মিলিয়ে ঘরটাকে কেমন আতঙ্কমাখা আর থমথমে লাগছে।
লোকটা তাকে বললো, আজগর সাহেব কেমন আছেন?
আজগর বললো, আমার শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। আপনি কে? আমাকে বেঁধে রেখেছেন কেন?
মৃত্যুর আগে আপনাকে এভাবে বেঁধে রাখার কথাই আমাকে বলা হয়েছে।
মৃত্যুর আগে মানে? কার মৃত্যুর কথা বলছেন?
আপনার মৃত্যুর কথা বলছি আজগর সাহেব। আমাকে বলা হয়েছে আপনাকে মেরে ফেলার জন্য।
কে বলেছে আপনাকে আমাকে মারতে?
যাকে আপনি আপনার রেলস্টেশনের সামনের জায়গাটা আজ থেকে পনেরো দিন আগে রেজিস্ট্রি করে দিয়েছেন।
মানে? কী বলছেন? আমি কাউকে জায়গা রেজিস্ট্রি করে দেইনি তো?
অবশ্যই দিয়েছেন কিন্তু আপনার শরীর খারাপ তাই মনে করতে পারছেন না।
না আমি কাউকে জায়গা রেজিস্ট্রি করে দেইনি তো।
তাহলে এই কাগজপত্রগুলো দেখুন। এখানে বায়নাপত্র, চূক্তিপত্র আর রেজিস্ট্রি দলিল সব রয়েছে।
লোকটা আজগরকে একটা রেকর্ড ফাইলে রাখা সব কাগজপত্র উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখালো। আজগর দেখলো সে নিজে আহমেদ শফিক হায়দার বা তার ভাড়াটে শফিক হায়দারকে জায়গাটা রেজিস্ট্রি করে দিয়েছে। এ সম্পর্কিত যে সব কাগজপত্র থাকার কথা সবই আছে এই ফাইলটাতে। আজগর বুঝতে পারে যে,এই সবই করা হয়েছে তাকে না জানিয়ে আর তার নকল সিগনেচার ব্যবহার করে। লোকটা কাগজপত্রগুলো আজগরের সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে বললো, দেখলেন তো আজগর সাহেব যা বললাম সব ঠিক নয় কি?
হ্যাঁ সবই ঠিক। কিন্তু আমি তো কোনো কাগজে সিগনেচার করিনি।
তা হয়তো করেননি কিন্তু সিগনেচারগুলো তো হুবুহু আপনার সিগনেচারের মতো।
হ্যাঁ। তা ঠিক কিন্তু কোর্ট তদন্ত করলে তো সব প্রমাণ হয়ে যাবে। প্রমাণ হবে যে, এগুলো নকল সিগনেচার।
কিন্তু কে করবে তদন্ত? আপনি তো এখন মরে যাবেন। আর শুধু আপনি নন। আপনার স্ত্রী, দুই সন্তান, আপনার বড় বোন, বড় বোনের ¯^ামী ও সন্তান সবাই তো মরে যাবে আপনার সাথে। এদের সবাইকে ঠিক আপনারই মতো বেঁধে রাখা হয়েছে। এখানেই আছে তারা দেখবেন? দেখেন দেখেন।
তারপর রুমের আলো জ্বালানো হলো। আজগর দেখলো রুমটা অনেক বড় আর রুমের শেষ প্রান্তে সবাইকে হাত, পা, চোখ ও মুখ বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে। প্রচণ্ড ভয়ে আজগরের মাথাটা অসার হয়ে যেতে লাগলো।
লোকটা পিস্তল হাতে নিয়ে বললো, শফিক সাহেবকে জায়গার দখল বুঝিয়ে দিয়ে আজ সন্ধ্যায় আপনারা বাসা ছেড়ে চলে গেছেন। আর কালকে সকালে শফিক সাহেব নাবিল গ্রুপের কাছে জায়গা বিক্রির প্রস্তাব নিয়ে যাবেন।
আজগর খুব কষ্টে শক্তি সঞ্চয় করে বললো, কিন্তু আমরা তো জায়গার দখল ছাড়িনি।
হুম এখনো ছাড়েননি। কিন্তু আপনারা সবাই এখন পৃথিবী ছেড়ে আকাশে চলে যাবেন আর তখন তো এমনিতেই জায়গা ও বাসা দখলমুক্ত হবে। আপনাদের মৃত্যুর কথা কেউ জানবে না আর সময় মতো মামলা করে তদন্ত করারও কেউ থাকবে না। এখন আপনারা সবাই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হোন।
আজগর দেখতে পেলো লোকটার কথা শেষ হবার সাথে সাথে লোকটা তার মাথায় পিস্তল ঠেকালো গুলি করার জন্য।
আরও তিনজন লোক পিস্তল নিয়ে রুমে প্রবেশ করলো আর রুমের অন্য প্রান্তে হাত পা বেঁধে ফেলে রাখা আজগরের স্ত্রী আর দুই সন্তানের মাথায় পিস্তল ঠেকালো গুলি করার জন্য।
লোকটা বললো, ওকে শুভ কাজে দেরি করতে নেই। এসো ওনাদের সবাইকে আমরা বেহেশতে পাঠিয়ে দেই।
আজগর মৃত্যুভয়ে অস্থির হয়ে বললো, আপনার নকল সিগনেচারগুলো যদি আমি আসল করে দেই তবে নিশ্চয়ই আমাদেরকে শফিক সাহেবের খুন করতে হবে না?
লোকটা প্রচণ্ড শব্দে হা হা করে হেসে ওঠলো, বাহ্। বাহ্। আজগর সাহেব। আপনি খুবই বুদ্ধিমান। আমাদের প্রয়োজনটা নিজে থেকেই বুঝে গেলেন। ঠিক আছে নিজেদের বাঁচার প্রয়োজন যেহেতু আপনি বুঝেছেন তাহলে সে প্রয়োজনটা শফিক সাহেব মিটিয়ে দিবেন আর আপনারা যাতে সুন্দরভাবে বাঁচতে পারেন সেজন্য জায়গা বিক্রির টাকা থেকে আপনাদের তিনি দশ লাখ টাকাও দিবেন।
ওকে। দশ লাখ টাকা হলে সংসার চালানোর মতো একটা ব্যবস্থা আমি করে নেবো।
অন্য একটা ফাইলে আগের ফাইলের মতোই সব রকম কাগজপত্রের আরেকটা সেট রাখা ছিলো। তবে এগুলোতে কোনো সিগনেচার নেই আর তারিখগুলোও আগের ফাইলের চেয়ে ভিন্ন। আজগরের হাতের বাঁধ খোলে দেওয়া হলো। সে সবগুলো কাগজপত্রে সিগনেচার করে দিলো।
মুহূর্তের মধ্যে বাবা আনসার আলীর কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া আজগর আলীর একমাত্র জায়গাটা আহমেদ শফিক হায়দার বা তার ভাড়াটে শফিক সাহেবের হয়ে গেলো। তার বাবার সারা জীবনের উপার্জনের এই দুই কোটি টাকা শফিক সাহেব চিনতাই করলো। তারপর ওদের সবাইকে সাতদিন সেখানে আটকে রেখে শফিক সাহেব নাবিল গ্রুপের সাথে জায়গা বিক্রির সব লেনদেন শেষ করলো।
আজগর কোথায় যেন শুনেছিলো একজন মানুষের জীবনের মূল্য এক কোটি টাকা। তাহলে এখানে তার দুই কোটি টাকা লুট হলো। মানে দুইটি জীবন কেড়ে নেওয়া বা দুইজন মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার সমান হলো। মানে দুইটি খুন হলো।
খুন হবার পরও বেঁচে থাকার জন্য আজগর আলী তার পরিবার নিয়ে খুলনা শহর ছেড়ে যশোর চলে গেলো কারণ কখনো খুলনা শহরে ঢুকলে তাদেরকে খুন করবে শফিক সাহেবের লোকেরা।
আজগরকে দশ লাখ টাকা দেবার কথা ছিলো শফিক সাহেবের। কিন্তু সে দিলো সাড়ে সাত লাখ টাকা। আর তাও দিলো ছয় মাস পরে। আর এক সাথে নয় তিন ভাগে এক মাস অন্তর অন্তর। কারণ এক সাথে সাড়েসাত লাখ টাকা পেলে আজগর আলী তার কাছ থেকে জোড়পূর্বক জায়গা দখলের জন্য আইনগত লড়াইয়ে যেতে পারে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন