সপ্তর্ষি নাথ এর ছোটগল্প | মিহিন্দা



স্বপ্নভঙ্গ

হঠাৎ আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি আসল। ব্যাস্ত চৌরাস্তার চারপাশে মানুষের সাগরে যেন সুনামি উঠল। বেশিরভাগের লক্ষ্য সামনের বাস/ রিকশাগুলো। যাদের কোথাও যাওয়ার কথা নেই তারা ফুটপাতের শামিয়ানা টাঙ্গানো দোকানগুলোতে বা খাওয়ার দোকান গুলোতে ছুটছে। কেউ কেউ নিরুপায় হয়ে রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে।

শাহেদ পড়িমড়ি করে ঢুকলো এরকম এক চায়ের দোকানে। মুখ দিয়ে বিরক্তিসুচক শব্দ করে মাথা ঝাকা দিয়ে মাথায় জমে থাকা পানিগুলো ফেললো। আশে পাশে অনেকেই আছে জবুথবু হয়ে, ফুটন্ত কেটলির পানির আঁচে গরম হয়ে নিতে।

শাহেদ ভেজা জিন্সের পেছনের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল। গোপন পকেটে পঞ্চাশ টাকা আছে কিনা আড়চোখে দেখে নিয়ে সামনের পকেট থেকে একটা দশ টাকা বের করলো। নোট টা সামনে বাড়িয়ে চা বিক্রেতাকে বলল," মামা একটা গোল্ডলিফ।" দোকানদার সুনিপুন হাতে সামনে রাখা দশ বারোটা প্যাকেট থেকে একটা সোনালি প্যাকেট খুলে দুই আঙ্গুলে একটা শলাকা বের করে শাহেদকে দিল। শাহেদ তাড়াহুড়ো করে নিতে যেয়ে প্রায় ফেলেই দিচ্ছিল, কিন্তু কোনোমতে রক্ষা করলো সিগারেটটাকে।

মুখে রাজ্যের হাসি নিয়ে সিগারেটটাকে দুই হাতের তালুতে ধরলো শাহেদ। ওপরে প্রায় দুই- তৃতীয়াংশ ভিজে গিয়েছে। বামহাতে শলাকাটা মুখে গুজে অপর হাতে ম্যাচ নিল শাহেদ।এক পলকে অভস্ত্য হাতে ম্যাচ জ্বালিয়ে খুব সাবধানে হাত দিয়ে ঢেকে ভেজা সিগারেটটা ধরাল শাহেদ। ভেজা সামনের অংশটি জ্বলতে থাকা বারুদের তাপে শুকিয়ে নিলো শাহেদ। আনন্দে পরপর দুটো সুখটান দিয়ে আশেপাশে তাকাল শাহেদ। তিলোত্তমা নগরী। তাকালেই কতশত গল্প। প্রতিদিনকার মত দেখতে থাকে শাহেদ গল্পগুলো, নিকোটিন পোড়াতে পোড়াতে।

হঠাৎ বাসের হর্নের তীব্র শব্দে ঘোর ভাঙ্গে শাহেদের। এই বাসে উঠতেই হবে। আধ খাওয়া সিগারেট ট্রলির কাঠের পাশে নিভিয়ে সিগারেটের বাকি অংশটুকি পকেটে অতি সন্তর্পনে ঢুকিয়ে রাখে শাহেদ। বাসায় যেতে হবে। শাহেদের মতন অগোছালো উদাসীন পাগল টাইপের ব্যাচেলরদের বাসায় যাওয়ার একতাই কারন হতে পারে...পেটে খিদে ডাক দিয়েছে। গরম ভাতের লোভ শাহেদ এখনো সামলাতে পারে না, কিন্তু যদি গিয়ে দেখে আজ ভাত রান্না হয়নি? তাহলে?

দোটানা করতে করতে শাহেদ বাসে উঠে পড়লো। পেছনের দিকে একটা সিটে বসে গা এলিয়ে দিল। পুরো খালি বাস মিনিট দুই লাগলো ভর্তি হতে। তারপরেও ড্রাইভার আরও মিনিট পনেরো লাগালো যাত্রীদের গালি খেয়ে নিশিন্ত মনে বাস টইটম্বুর করে ছাড়তে। শাহেদের গন্তব্য আগারগাঁও। একটা আরামসে ঘুম দিয়ে দিতে পারবে ধানমন্ডী পার হবার আগেই।

চোখ বন্ধ করার পাচ মিনিটের মধ্যে শাহেদ বুঝতে পারে ঘুম আসবে নাকি আসবে না। আজ এমন আবহাওয়াতেও আসবে না।



সামনের দিক থেকে ভেসে আসা গালির তোড়ে চোখ খুলতে
হলো শাহেদের। "শাউয়ার পোলারা ঠেলাগাড়ী চালাস? বাসা থেইক্যা যাত্রী লইয়া আয় চুদানির পোলারা।" শাহেদ দেখলো তার বয়েসী এক যুবক সিট থেকে দাঁড়িয়ে আছে উত্তেজিত হয়ে। সাধারনত এই সব ব্যাপারে নিউট্রাল থাকে শাহেদ। আজ একটু হাসিও আসছে। কন্ট্রাকটররা গালি না খেলে সরে না। যতো সুমধুর গালি, ততো জোরে চালায় বাস।

বামের সিটে তাকাল শাহেদ। একটা মেয়ে বসে আছে। কানে হেডফোন। মেয়েটাকে দেখে মিলির কথা মনে পড়লো শাহেদের। মিলিও দেখতে এমনই ছিলো। একটু বেটে, একটু ফোলা গাল, এমনই কোকড়ানো চুল। দুনিয়ার কেউ তা দেখুক বা নাই দেখুক, শাহেদের হার্টবিট বেড়ে গিয়েছিল মিলি কে প্রথম দেখার পর। কাউকে এতো সুন্দর করে হাসতে দেখেনি শাহেদ। মিলি এতো মোলায়েম করে কথা বলছিল যে শাহেদ বুঝতে পারছিল না ওর কথা। সে কথা মনে পড়লে শাহেদের মুখে এখনো রাজ্যের রক্ত এসে জমা হয়। এক দিকে ভালই হয়েছে যে মিলি তাকে কখনো আপন করেনি। সে মিলির যোগ্য ছিল না কখনোই।

এসব ভাবতে ভাবতে পাশের মেয়েটার দিকে তাকাল শাহেদ, হুট করে রক্ত উঠলো ওর মাথায়, তবে সম্পূর্ন অন্য কারনে। মেয়েটির পেছনে বসা মধ্য বয়েসি লোকটির হাত অশালীন ভাবে মাঝেমধ্যে উঠে আসছে সামনের দিকে। মেয়েটির চোখে আগুন দেখতে পেল এবার শাহেদ। পরবর্তি তিন মিনিট মেয়েটির শব্দবোমা গুলো লোকটিকে টিএনটির মতো আঘাত করলো। লোকটির টকটকে লাল মুখের দিকে একবার তাকিয়ে অসম্ভব শান্তি অনুভব করলো শাহেদ। যাক, এবার ঘুম আসছে।

"তালতলা...তালতলা।"

কন্টাকটারের কথায় ঘুম ভাঙ্গল শাহেদের। স্টপেজ পার হয়ে যাচ্ছে। আধো ঘুমে লাফ দিয়ে উঠল শাহেদ। কোনমতে রানিং বাস থেকে নামলো শাহেদ। নেমেই হাটা দিল...এক মিনিট, কি যেন ফেলে
এসেছে। পেছনে ফেরে তন্দ্রাগ্রস্থ অবস্থায় উলটো দিকে হাটতে যাবে, হঠাৎ একটা উজ্জল আলো তীরের মতো ছুটে এলো ওর দিকে। শহেদ অনুভব করলো সে মাটির ওপরে ভাসছে, বুক পকেটর আধ খাওয়া সিগারেট খেকে কয়েক গুড়ো তামাক ছড়িয়ে পড়লো কংক্রীটে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন