আখতার জামান এর কবিতা : যখন জগতের কেউ শীলের ক্ষুরকে অশ্লীল ভাবে না | মিহিন্দা



শরিফ আহমেদ
"বৃষ্টিমাখা চা" আখতার জামান' র দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। প্রকাশিত হয়েছে "চন্দ্রবিন্দু" প্রকাশনী থেকে। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ " "নাতিষীতোষ্ণ এ অঞ্চলে অনেককিছুই ঘটে"
"প্লাটফর্ম "থেকে প্রকাশিত। প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের দিকে তাকালে বেশ কিছুটা দূরত্ব উপলদ্ধি করা যায়। যেখানে দ্রোহ, ক্ষোভ এবং মুক্তচিন্তার দুর্বার প্রতিফলন ছিলো কবিকণ্ঠে। কে জানে স্বতন্ত্রতার সাক্ষর রাখতে না কি কবি চিত্তের প্রকৃত বাকবদল ঘটাতেই এই পরিবর্তন হয়েছে। আমি কবির এই পরিবর্তনকে আমাদের অঞ্চলভিত্তিক নানা বিপর্যয় বা সাম্প্রদায়িকতার নানা ঘাত প্রতিঘাতের ফলে যে ব্যাক্তিক পরিবর্তন মনের অজান্তেই ঘটে যায় তাও বলতে পারছি না। অথচ এরকম হয়ে থাকলেও তা দোষের কিছু নয়। কবি যেহেতু এমন কোনো দায় নিয়ে হেঁটে বেড়ান না।সেহেতু যেখানে তার দৃষ্টি থাকে বাধা, সেখানেই নিহিত কবির চিরন্তন রাধা। তো প্রথমেই বইয়ের নামকরণ নিয়ে দুটি কথা না বললেই নয়। ভ্রমণপিপাসু এই কবির রয়েছে চা পানের প্রতি বিরাট এক নেশা। অজপাড়াগায় চায়ের আড্ডায় সেদিন আমিও ছিলাম।মুষলধারায় বৃষ্টি নেমেছিল সেদিন। দোকানের পুরাতন ছাউনির ছিদ্র এবং জানলার মত জাপ দিয়ে সত্যিই বড়রকমের বৃষ্টি ঝাপটা আসছিল এবং কবি সহ আমরা প্রত্যেকেই ভিজে যাচ্ছিলাম। বৃষ্টির প্রতিটি ফোটা যেন কাপের উপর পডছিল। সেই সে চা। যা থেকেই এ নামের উদ্ভব।
" পৃথিবী যেহেতু গোল
আর পানি নিচের দিকে গড়ায়
নদী ধরে স্রোতের বিপরীতে হাঁটো
উপরে যেতে যেতে আকাশের সন্ধান পাবে।
আর তা যদি না পারো
জীবনবাবুর সোনালি চিলকে ডাকো
সে পৌঁছে দিবে বার্তা -
একদিনের জন্যে কিংবা এক মূহুর্তের জন্যে
আকাশ নিচে নেমে আসুক।
সেটাও যদি না পারো
ধানসিঁড়ির তীরে গিয়ে বসে থাকো
মেঘের পিঠে ভর করে বৃষ্টি হয়ে নেমে আসবে
আদতে বৃষ্টির অপর নামই তো আকাশ।".

" বৃষ্টির অপর নাম আকাশ" পুরো কবিতাটি নেয়া হলো এখানে। বৃষ্টি নিমগ্ন প্রকৃতি আর আকাশ নদীর বৃত্তে কবিতাটি ঘুরপাক খাচ্ছে।আর এখানে যে আহবান শোনা যাছে তা বরং অন্যকে না ডেকে কবি নিজেকেই সজাগ করতে চাইছেন কবিতার স্বরূপে।
অনেকটা বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তার পরিসরে কবি হাঁটতে চেয়েছেন কবিতাটিতে। গোলাকার পৃথিবী। পানি গড়ায় নিচের দিকে। তাই কবি স্রোতের বিপরীতে হেঁটেই ছুঁতে চেয়েছেন আকাশকে। কাব্যে এভাবে যে বিজ্ঞানমনষ্ক চিন্তা দিয়েও প্রকৃতির আবহ তৈরি করা যায় এই কবিতাটি সে কথাই বলে।

"প্রমাণসিদ্ধ কবিতার প্রতিটি শব্দই অধরামৃত।........
.......

দৃশ্যরা মলাটবন্দি,শব্দেরা ঘুমায় বাঙলা অভিধানে। নদীর শৃঙ্গারে বাজে আভিধানিক রাত।
"নদীর শৃঙ্গারে বাজে আভিধানিক রাত" কবিতায়
কবি হয়তো গণিতের মতো নিয়ম জেনে কবিতাকেও গড়ে তুলতে চেয়েছেন প্রামাণিকভাবে। নয়তো প্রমাণসিদ্ধ কবিতার প্রতি এভাবে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতেন না। যেখানে বলতে পারছেন "দৃশ্যরা মলাটবন্দি, শব্দেরা ঘুমায় বাংলা অভিধানে। এখানে এসে বোধ হয় সেই ইঙ্গিতটি পাওয়া যাচ্ছে প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের স্বকীয়তা।
পরবর্তী এক কবিতায় লেখা হচ্ছে
" সাপটা
বসন্তের রঙ ছড়াচ্ছে সামনে তার বিয়ে, মহাধুমে"
"লালশাড়ি" নামক কবিতায় বলেছেন
" খুন হওয়া
তরমুজের দিকে তাকালে শেখা যায়
মৃত্যুর পরেও হাসা সহজ।"
কবির জীবনের প্রতি যে সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি তা উপরোক্ত পংক্তিগুলো পড়লেই বুঝা যায়।
পূর্বে যদিও কবি বিজ্ঞানমনষ্ক হওয়ার প্রত্যয়ে মত্ত ছিলেন "ছোবল ও মৃত্যু" কবিতায় দেখা যায় তার উল্টো চিত্র। যেন উত্তরাধুনিক কবিতাই লিখে যাচ্ছেন কবি অবচেতনে। যখন ধারনাগত চিন্তা থেকে নির্জনতম দূরে শানিত আবেগের প্রস্ফুটন ঘটে তাই তো আধুনিকতার বিপরীতে উত্তরাধুনিক।
"তোমাকে হারানোর পরে একবার
সাপ আমাকে ছোবল দিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলো!"
কী এক বিস্ময়কর পংক্তির সমারোহ এখানে। পাঠককে এখানে না ভাবিয়েই কবি ছেড়ে দেন না।
"হাপিত্যেশ" কবিতায় কবি বলেছেন "আসক্ত সংসারে মা আমার কী নিদারুণ খেটেছেন আজন্মকাল
"বাপ-মা- মরা ভাইয়ের সংসারে কিংবা স্বামীর!

আমার শৈশব - আমার মায়ের কড়াশাসন
আমার শৈশব -কাঁধে বাবার আদুরে হাত।"
ষাট -সত্তর দশকের ধারাবাহিকতার আদলে
চারটি লাইন সাজানো হলেও পারিবারিক পারম্পর্যের মায়ায় অন্য কবিদের প্রভাব নিমিষেই ম্লান হয়ে যায়।
মেঘে আঁকা বর্ণলতা কবিতায় কবি নিজেই যেন হয়ে উঠেছেন এক মূখ্য চিত্রকর।
যেমন -
"চারুবিদ্যা-
কলাকৌশলে আঁকলে ঠোঁট
নিজের চোখ দুটো হেঁচকাটানে তুলে
পাপড়িসহ লাগিয়ে দিলে,মায়ায়।

তোমার চোখ পৃথিবী দেখে
তুমি,অন্ধকার।"
এই কবিতায় যদি সামান্য খেয়াল করি তাহলে দেখতে পাই এখানেও কবি ব্যবচ্ছেদ করেছেন ব্যক্তির সামগ্রিক কাঠামো থেকে ইন্দ্রিয় ক্রিয়াকলাপকে। নচেৎ বলতে পারতেন না, "তোমার চোখ পৃথিবী দেখে
তুমি,অন্ধকার।

কবিকে বাগে পায় কে? একান্ত যে প্রেম সেখানেও কী কবি স্থির থাকতে পারেন।
পারেন না। আর পারেন না বলেই বোহেমিয়ান ছুটে চলেন কাব্যিক পরিমণ্ডলে।
বৈচিত্রতা এনে দেন তার কাব্য সম্ভারে।
পাঠক প্রাণিত হন চিত্তে- মননে।
"এক'পা - দু'পা করে হেঁটে আসে বাতাস
হামাগুড়ি দিয়ে চলে যায় নদী, ধীরে
আকাশ ছোয়ার প্রত্যয় নিয়ে
ছুটতে থাকে পাহাড়
নীলিমার বুকে মুখ লুকায় প্রেমিক পুরুষ মেঘ
.......
......
প্রিয়তম ব্যাঙ কখনো ছাতার দুঃখ বুঝলোই না!
......
.....
চাঁদ একটি জোনাকপোকা, জ্বলে - নিভে
অমাবস্যা - পূর্ণিমা তার প্রমাণ।"
"চাঁদ একটি জোনাকপোকা " কবিতা থেকে উদ্ধৃতিটুকু নেয়া হলো।
অপর এক কবিতার উদ্ধৃতিটুকু নিচে তুলে ধরা হলো- " পৃথিবীতে যার জামা নেই, সে'ই শুদ্ধ।আমি শুদ্ধ হতে চেয়ে মানুষ হয়ে গেলাম।দিনদিন কেমন জামার ভেতর সেঁটে গেলাম!"
কবির কাছে মানুষ হয়ে যাওয়া মানেই যেন জামায় সেঁটে যাওয়া।আর জামায় সেঁটে না যাওয়া মানেই যেন মানুষ হয়ে যাওয়া। বড় দ্বিধায় ফেলে দিতে সামর্থ্য দেখাচ্ছে উপরোক্ত পংক্তিগুলো।আধুনিক মানুষকে কবি এক ধরণের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পেরেছেন এ কবিতায়। আর যা ভাবাতে পারে তাই তো চিরন্তন কবিতা।
আরেক কবিতা " ভাদ্র মাস কৃষ্ণচতুর্থী"
একটি জায়গায় লিখেছেন
"আমার ঢেঁড়স -ভেঁপু নাক
ঘ্রানজ্বরে বন্ধ আছে"
একটু পরেই লিখেছেন
"লম্বা-বেঁটে আঙুল
স্পর্শে অমলদুর্বল ঘাস
আমার পঞ্চইন্দ্রিয়
কৃষ্ণচতুর্থীর ভাদ্রমাস।"
কবিতাটিতে নিত্যনতুন বিশেষণের আয়োজন চোখে পড়ার মত।
তারপর কবি এখানেই থেমে থাকেন না, প্রকৃতি, জীবন পাঠের পাশাপাশি তিনি মেতে উঠেন কসমোপলিটান প্রেম নিয়ে।
"অপহরণ "নামক কবিতায় তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়।যেখানে মৃত্যুও বাদ যায়নি কবির চোখে দেখা এ বহির্জগত থেকে।যেখানে কবি নিজেই গুম হয়ে আছেন পৃথিবীঘরে। কবিতাটি নিচে দেয়া হলো-

"আমাকে একটি ঘর দেখিয়ে বাহির চেনানো হলো
তারা জানে না -
পৃথিবী যার ঘর, তার আবার বাহির কীসের!
নম্র স্বরে উন্নত মস্তকে বললাম-
বাহিরে যাওয়ার সামর্থ্য নেই ;
বাহির মানে তো মঙ্গল গ্রহ কিংবা চন্দ্রপৃষ্ঠ!
মৃত্যুপুরীও হতে পারে বহির্জগৎ
যেখানে থাকে কবরভর্তি কোলাহল।
আমাকে হরণ করবে কী
আমি নিজেই গুম হয়ে আছি পৃথিবীঘরে!"

যুগে যুগে কালে কালেই কবিতায় গভীরতর দর্শনকেও টেনে এনেছেন অনেক কবি। এবং কবিতাকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। তেমনিভাবে কবি আখতার জামানও নিত্যনৈমিত্তিক কিছু বিষয় থেকেই তুলে এনেছেন তার অধিকাংশ কবিতার উপাদান। এমনই এক কবিতার নাম " চরিত্র"
কবিতাটির শেষ লাইনে কবি বলেছেন -
" সম্ভবত জগতের কেউ শীলের ক্ষুরকে অশ্লীল ভাবে না। মূলত শীলের আভিধানিক অর্থ চরিত্র।"

আমার দৃষ্টিতে কবি অসাধারণ এক দর্শনকে এখানে কুক্ষিগত করেছেন।পুনরাবৃত্তি না করেই উপরের লাইনটি পাঠক মাত্রই পাঠান্তে বুঝতে পারবেন কবির মনস্তাত্ত্বিক দর্পণে কিভাবে সাম্যবোধের চিন্তা ঢেউ খেলে চলেছে।  সম্ভবত উপরোক্ত দুটি পংক্তি দিয়ে 
কবি যা বুঝাতে চেয়েছেন তা তার সম্পূর্ণ কাব্যগ্রন্থের অন্যান্য কবিতায় পাওয়া বড় দুর্লভ।
একেই বলা যেতে পারে প্রকৃত কবিত্ব। বইটি পড়ে সকলেই ঋদ্ধ হবেন বলে প্রত্যাশা করি।


Post a Comment

أحدث أقدم