সজীব মেহেদী এর কবিতা | মিহিন্দা




আয়না ভাঙা কাঁচ


একটি সেলুন, ভাঙা আয়না।
সচরাচর, এই মেঠো পথ ধরে কেউ যায় না।
অথচ উড়ে যাচ্ছে আয়না ভর্তি অন্ধকারাচ্ছন্ন মেঘ।
দূরে যে ব্রিজ, উড়ে যাওয়া গাঙচিল, তার ওপরে থমথমে আকাশটি
আয়নার বিপরীত।
ময়লা চিরুনি হাতে জবুথবু বসে থাকা নাপিত,
আয়নায় চোখ রেখে থ হয়ে ভাবে, জলই পৃথিবীর প্রাচীনতম আয়না।

দেখে আয়নায়, ঝরে পড়ছে আকাশ থেকে অজস্র কোটি আয়না।
আয়না ভাঙা শব্দ, মূক-বধির নাপিতটি শুনতে পায় না।

বাহিরের এই হীমশীতল আর বুনো ভ্যাঁপসা কাদামাটিতে পা ফেলে
ফাঁস দেয়া শাড়ীর আঁচল হাতে নিয়ে নাপিত চলে যাচ্ছে,
শ্মশানে,
সেলুনে তালা ঝুলিয়ে।

এই নাপিত, ধ্বজভঙ্গ হরিতকি, বয়েস উনপঞ্চাশ, 
আয়না ভাঙা কাঁচের ওপর যার পা, 
শরীর জুড়ে গেঁথে আছে যার বেদনার ভাঙা কাঁচ।

ক্যালেন্ডারে আজ, সেই বিষণ্ণ ১৪ই মার্চ।





জাতিস্মর


প্রথমবার মরে গেছিলাম বাসের নিচে চাপা পড়ে, সাইবেরীয় অঞ্চলে। তখন ছিলাম একটি কুচকুচে কালো বিড়াল। বাসটি দাঁড়ায়নি, নির্লিপ্ত ভাঙ্গিতে চলে গেলো।

দ্বিতীয়বার এক গোছা শিমুল তুলা, উড়তে উড়তে একটা জলাশয়ে মৃত্যু হয় আমার। সেটি দার্জিলিঙে, গভীর রাত এবং চারপাশে নেশাগ্রস্থ চৈত্রপূর্ণিমা। এমন মৃত্যু সুখের।

তৃতীয়বারের মৃত্যু মনে পড়লে মন খারাপ হয়, সেবার ছিলাম একটি পাথর। আমাকে ভেঙে প্যারিসে একটি শৈল্পিক দালান হয়। জানতাম, পাথরের অবদান আড়াল করে শিল্পী নিয়ে হইচই হয়।

বৃষ্টির একটি ফোঁটা হয়ে জন্মেছিলাম চতুর্থবার। সেটি ক্ষণস্থায়ী স্থায়িত্ব ছিলো আমার। ঝরে পড়া জীবন নিয়ে এসে জানলাম, প্রকৃতি এক অদ্ভুত বিষণ্ণতায় ভোগে প্রতিটা মুহূর্ত।

পঞ্চমবারের মৃত্যু সুখের ছিলো। গোলাপ হয়ে জন্মেছিলাম। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে থাকা এক ক্যান্সার রোগিকে তার প্রেমিক দেখতে গিয়েছিলো, সাথে আমাকে নিয়ে। দীর্ঘক্ষণ সেই প্রেমিকা আমাকে দেখলো। আমি তখন পড়তে পারছিলাম সেই প্রেমিকার ক্ষত।

ব্রাজিলে এক বাদাম গাছের সাথে সখ্যতা হয় ষষ্ঠবার। বাদুর হয়ে জন্মেছিলাম। বৈদ্যুতিক তারে ঝুলে পড়ে মৃত্যু হয় সেবার। ঝলসে গিয়েও মাটি ছুঁতে পারিনি, অপেক্ষা করতে হয়েছে পরবর্তী বর্ষার জন্যে।

এরপর একটি মেহগনি পাতা হয়ে জন্মেছিলাম মেদিনীপুরে। মৃদু বাতাসে নেচে উঠতাম। একদিন সন্ধ্যায় ঝরে পড়ে মৃত্যু হয় আমার। চারপাশে পিনপতন নীরবতা। ঝড়ে পড়তে পড়তে শীত ঋতুকে ঘৃণা করলাম।

অষ্টমবারের অভিশপ্ত জন্ম আমার। মানুষ হয়ে জন্মে জেনেছি, মূলত একই ঘরে সকলেই পৃথক এখানে। জন্মাবার পরে এখানে নিয়ম করে হিংসে গিলানো হয়।  প্রেম আর মদ ছাড়া মনুষ্য জন্ম তেঁতো খুব। এবং জানি একদিন মৃত্যু হবে,
হয়তো ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক কোন দাঙ্গায়। হয়তো মরে যাওয়ার সময়, ভ্রু কুঁচকে বিরক্ত হয়ে উঠবো এত দেরীতে মৃত্যু হওয়ার কারণে।

এরপর যদি কলম হয়ে জন্মাতে পারি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হবে। আমাকে দিয়ে আত্মহত্যার পূর্বে এক তরুণী তার জীবনে শেষ তিনটি শব্দ লিখবে। লিখবে 'এটাই শেষ নয়।' কিংবা কোন তরুণ সুইসাইড নোট লিখতে বসে আমাকে আর খুঁজে পাবে না। কেউ জানবে না তার অকথ্য ব্যথা।

যেমন আমার ব্যথা কেউ জানে না।





ঈশ্বর এবং ঈর্ষা


ঈশ্বরের ওপর নানা কারণেই চটে থাকি,
যেহেতু আমার পা জোড়া জন্ম থেকে খোঁড়া এবং আমি ভিক্ষুক।
মানুষের মুখের চাইতে পা আমাকে মুগ্ধ করে
এ কথা শুনে শ্যামলেন্দু হো হো করে হেসে উঠলো।
অবাক হলো,
যখন জানলো মানুষ ছাড়াও জোড়া পায়ে হেঁটে যাওয়া হাঁসেদের প্রতিও আমার ফুসফুস ভর্তি হিংসে।

অন্ধ শ্যামলেন্দু আমার বন্ধু, গান গেয়ে ভিক্ষা করে।
অন্ধ হলে যুতসই মেজাজে ভিক্ষে করা যায়।
যেমন ধরুন,
ভিক্ষুক দেখলে, মানুষের কুঁচকে থাকা ভ্রু সমেত চোখ জোড়া সে দেখতে পায় না।
দেখতে পায় না, জ্বলসে যাওয়া চামড়া নিয়ে একটি খোঁড়া কুকুরও কিভাবে  ভিক্ষুকদের দিকে তাকিয়ে লালা ঝরায়!

সন্ধ্যায় গাঁজা টানতে বসি, মালিবাগ বস্তির পাশে
তখন যদি থাকে বৃষ্টি খুব,
শ্যামলেন্দু গল্প শুরু করে।
আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি তার মায়ের গল্প।
মায়ের সাথে যখন সে চাঁদের আলোয় হাটে, মা'কে সে স্পষ্ট দেখতে পায়।
শুনে
আশ্চর্য হই।

এমন অনেক গল্প সে বলে,
এইতো সেদিন মুখ ফসকে বলে ফেলেছে যে, সে ঈশ্বরকে দেখেছে।
তার সাথে নিয়মিত গপ্পো করে ঈশ্বর, রাত্তির যদি হয়ে থাকে তখন পৌনে তিনটে।

সেসব শুনে মাঝেমধ্যে মন খারাপ হয় আমার,
অন্ধ হয়ে জন্মাইনি বলে ক্ষেপে গিয়ে গাঁজায় টান মারি।
দম যখন ছাড়ি, তখন ভেতরে ভেতরে শ্যামলেন্দুর প্রতি আজন্ম ঈর্ষা
দীর্ঘশ্বাসের সুগন্ধি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
শ্যামলেন্দুর নাকে সেই সুগন্ধি পৌঁছায় কিনা জানা হয় না কিংবা শ্যামলেন্দুর ঈশ্বরের নাকে।




হারিকেন



হারিকেন ছিলো আমাদের দোচালা ঘরে, আধাপাকা ঘর তখনো হয়নি আমাদের।
যখন হলো,
ঘরে এলো চার্জ লাইট।
দেয়ালের একটি পেরেকে সেই হারিকেন ঝুলতো,
ঝুলতে ঝুলতে একদিন মাকড়শাজালে ঢেকে গেলো তার শরীর।
যেমন, আমার শরীর ঢেকে আছে শ্যাওলায়।
প্রমাণ হলো, পরিত্যক্ত শরীর এভাবেই ঢেকে যায়, বেখেয়ালে।
এরপর একদিন,
হারিকেনটি পাচার হলো ভাঙারির ভ্যানে,
বিনিময়ে মা নিয়ে এলেন আলু।
সে আলু রান্না হলো দুপুরে,
খেতে বসে আমার গলা দিয়ে নামছিলো না খাবার।
মনে পড়লো, হারিকেনের কথা, চিমনীর কথা।
চিমনীতে কালি জমলে মুছে পুঁতে দিতাম ফের, কেরোসিন ঢেলে দিতাম তলানিতে।
নভ ঘুরিয়ে রশি বাড়াতাম কমাতাম, আলো বাড়তো কমতো।
চিমনীর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে পড়তাম,
আলু ইংরেজি পট্যাটু, আলু একটি সুষম ও পুষ্টিকর খাবার।





আর্টিস্ট

  

তিনি আর্টিস্ট, হিংস্র কুকুরের ছবি আঁকেন।
ঊনত্রিশ বছরে প্রায় পৌনে দুশো ছবি এঁকে,
ঘুমিয়ে গেলেন।

প্রদর্শনী ফেরত পৃথিবী দেখলো,
নিজের ছবি এতো সুন্দর করে কখনওই কেউ আঁকতে পারে নি।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন