কালীকৃষ্ণ গুহ এর কবিতা নিয়ে সায়ন এর আলোচনা | মিহিন্দা



অস্তমিত জীবনের সংলাপ
গোটা পৃথিবীটাকে একটা পাখির চোখ দিয়ে দেখলে মনে হয় - যেন কতদিন পৃথিবী তার আপন জীবনের রূপ দেখে নি। হাড়কঙ্কর ভাইরাসাতংকের ভয়ে মানবজাতি যখন প্রবেশ করেছে আত্মগোপন গৃহে, মানুষের সঙ্গে মানুষের মধ্যে এসেছে দূরত্ব , তখন বার বার মনে হয় - নির্জন ভাষার অর্থ কি? আমি কালীকৃষ্ণ গুহ- র কবিতার  'বিরোধাভাস' নিয়ে হৃদয়ের পথকাটি জীবনপথে - " অন্তমিলের মধ্যে আসন পাতা/ কে তাকে ভাঙে কে তাকে গড়ে ফের/ এই প্রশ্ন নিয়ে তরুণ কবি/ নিজেকে ভাবে যাত্রী দিগন্তের ।"

আমিও একজন তরুণ ভাষাজীবী। মন, মস্তিষ্ক, প্রাণ ও কলমের মধ্যেই আমার বহুকৌণিক দেখার রহস্য। মাঝে মাঝে জীবনকেই মনে হয় না পড়া কোনো মহাকবিতা, আবার কখনও ছন্দের সান্দ্রমন্ত্র থেকে উঠে আসা নিগূঢ় সত্য আমাকে নগ্ন করে দেয় আপন আয়নার কাছে। পাতা উল্টে দেখি - " কিছু কি রয়েছে যা / সত্য না মিথ্যে না? / কিছুই কি নেই যা/ সত্য- মিথ্যা- পার?" ( রক্তজবা)

ভন্ডভাষায় অভ্যস্ত অধিকাংশ পাঠকের কাছে কালীকৃষ্ণ গুহর 'অস্তমিত পানাহার' একটা বোবার কোলাহল মাত্র। একবারও তো ভেবে দেখি নি - বাংলা কবিতায় এই কাব্য পরিক্রমা বিশ্বব্যাপী অন্তর্গত চিৎকারের বিরুদ্ধে 'না-কথা'র মধ্যে স্নিগ্ধ মনোরঙের প্রলেপ তৈরি করতে পারে। আমরা তো ভাবতে ভুলেই যাচ্ছি - এখন শুধুই চর্ম চোখে দেখা, ভোগ করা আর ভুগতে থাকা । এখন শুধুই " পুরাণের বিস্তৃতি/ তাই নিয়ে তিথিডোর/ ঘুম থেকে জেগে দেখা/ অচেনা পৃথিবী,ভোর।" ( ধর্মহীন) 

তার কাব্যস্নায়বিকতা মনে করিয়ে দেয় শঙ্খ ঘোষের 'ধ্বনি - প্রতিধ্বনি'র স্বরায়ন " অনেক সময়ে সামনে এসে পৌঁছনো কোনও সংশয় বা গ্লানি থেকে উত্তীর্ণ হয়ে ওঠার চেষ্টাটাই হয়ে ওঠে তার রচনা।" 
ঘরের এক কোণে বসে ভাবছি - সাহিত্য সমাজের দহরম মহরম থেকে নিজেকে সরিয়ে আপন ঘরের মধ্যে বসে সঙ্গীত ও চিত্রকলায় ঘেরা নিজের একাকী আশ্রমযাপন - তার আসল কবিতাজীবন। সব কবিতাকেই যে ভাষায় রূপ দিতে হবে - এমন তো কোনো কথা নেই! নিজের দেশ-কাল-পাত্র কে দেখতে দেখতে একটা আপন মহাভারত কখন মহাবিশ্ব হয়ে ওঠে - যে বিশ্ব শুধু তার নয়, তার কবিতার নয়- আমাদের জন্য দুহাত খুলে অপেক্ষা করতে থাকা ফোঁটা ফোঁটা শব্দ শিশির - " তিনি শুনছেন মহাভারতের মধ্যে থেকে উঠে আসা/ চিৎকার/ অট্টহাসি/কান্না/ সবকিছু নিয়ে সমবেত মহা- আবর্তন।" ( আবারও মহাভারতের কথা)
এই মহামারি, এই ভয়, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ - একি শুধুই এক একটা ঘটনা মাত্র । তা হয়তো নয়, বরং মানুষের হিংস্র জীবন চাহিদার বিপ্রতীপে একটি অধিবাস্তব উত্তর কোথাও লুকিয়ে থাকে। প্রতিটা দিন ভয়ের সঙ্গে খবরের কাগজ খুলতে হয়,মৃত্যুর সংখ্যাতত্ত্ব ও মানুষের শ্রেণিগত লালসা, হাঁটতে হাঁটতে মিশে যাওয়া শ্রমিকদের দেহ, রক্তাক্ত ট্রেনের চাকা, পদ্মা ও গঙ্গা র জলে মিশে যাওয়া মানুষের শেষ চিতাভস্ম , যাকে আপনজনেরা শেষবারটুকুও দেখতে পেল না, দেখতে দিল না এই মারণ ভাইরাস - একে প্রকৃতির প্রতিশোধ ছাড়া কিইবা বলা যায় আর!  
কখনও গাছের সঙ্গে, পাখির সঙ্গে, পাহাড়ের সঙ্গে, নদী কিংবা সমুদ্রের সঙ্গে একাত্ম ভাষায় কথা বলতে পেরেছি কি আমরা? 'পথিকজন্ম'এর কবি কালীকৃষ্ণর ভ্রমণ আজ খুব প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে যখন দেখি পাশে কেউ নেই,কিন্তু একদিন  ," বন্ধু ছিল প্রেমিক ছিল যারা/ কোথায় মিশল শেষে?"

প্রাচীন গ্রন্থের মহাকালীন চিন্তাবীক্ষা
জাগ্রত করে মানববোধ। কবিতার চিন্তাভাষ্যকার
আরিস্ততলের শ্বাশতবাণী " The object the imitator represents are actions, with agents who are necessarily either good men or bad - the diversity of human character being nearly always derivative from this primary distinction , since the line between virtue and vice is one dividing the whole of mankind." ( 'On the Art of Poetry'). 

মনে হয় বৈচিত্র্য আসলে মানবের নাকি জ্ঞানের , নাকি চিন্তা ও কর্মের - এই সুন্দরের পাশে কুৎসিতের ও প্রয়োজন হয়, তাহলেই হয়তো সুন্দরের কাছে আরও বেশি আত্মসমর্পণ করা যায় - " স্বর্গে নাকি মর্ত্যপৃথিবীতে মানুষের উৎস আর শেষ অবস্থান/ এই নিয়ে/ পরস্পরের সঙ্গে তর্করত গুরুশিষ্য/ পুঁথি-হাতে যুগ পার হয়ে চলেছেন। ....... আরও কত কোলাহলময় যুগ পার হলো...." ( ভাটিকানে রাফাযে়লের একটি দেয়ালচিত্র)
" সবই শুধু/ পথচলার / কথকতা/ ফিরে ফিরে/ ঘিরে আসে/ নীরবতায়" ( শ্রোতা) একটি করে শব্দ দিয়ে এত বিপুল বাক্যের পথ কত মসৃণ করে দিচ্ছে। কোলাহলের অতিকথনে আমরা যখন অতিষ্ঠ হয়ে উঠতে থাকি , কবিতায় পাখির নরম বুকের মতো ভেসে থাকা ভাষা ,যেন দিকশূণ্যপুরের ঠিকানা দেয়, শান্তির প্রদীপ জ্বলে," পার হয় কলধ্বনি শব্দের কুহক/সেইমতো সেই বার্তাবহনের পাশে/ আমরা রয়েছি যেন বিগতজীবনে - / যেন হিমে ভিজে যায় সকল সান্ত্বনা "( চতুর্দশপদী ২০১১)।


Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন