রাহুল বিশ্বাস এর অণুগল্প | মিহিন্দা




সহাবস্থান

দুর্গন্ধে খামারির দম বন্ধ হয়ে আসছিল। কাপড় দিয়ে পুরো নাকটা আটকিয়ে মুখে শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজটা চালিয়ে শেষমেশ খামার থেকে মরা মুরগীটাকে ভাগাড়ে ফেলে দেওয়া হল। ক্ষুধার্ত মানুষটা সেটার কাছে পৌঁছানোর আগেই একটা কুকুর এসে মুরগীটাকে টেনে নিয়ে গেল। কুকুরটার দাঁতের এক হ্যাঁচকা টানে আধপঁচা মুরগীটা পুরোপুরি দু'ভাগ হয়ে গেল। ওমনিই তার একটা ভাগ নিয়ে ক্ষুধার্ত মানুষটা ছুটে পালালো।


বইবিক্রি

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকীতে তার লেখা দুটি বই ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদেরকে উপহার দেওয়া হলো। বলা হলো, তাঁর আদর্শে গড়ে উঠবার জন্য বই দুইটি উপহার স্বরুপ সকলকে দেওয়া হচ্ছে।
পড়ুয়া অসচ্ছল কিছু লোকের তাতে করে লাভ হল বৈকি। অর্ধেক টাকা দরে বই দুইটি তারা কিনতে পারলো।



আক্রোশ

টিপ টিপ করে বৃষ্টি ঝরছে। পুরো বাসটা এখন যাত্রীশূন্য। ড্রাইভার কাশেম আলী ও হেলপার শামীম মিয়া তীব্র ভলিউমে হিন্দি গান শুনতে শুনতে বাসটা নিয়ে তাদের গন্তব্যে এগিয়ে চলছিলো। হঠাৎ এক ভাবোদয়ে ড্রাইভার সুইচটা টিপে গান বন্ধ করে দিল কিছুদূরে হেঁটে চলা স্কুলড্রেস পরিহিত একটা ছেলেকে দেখে। এই শালা শুয়োরের বাচ্চারা ক’দিন আগে ড্রাইভারদের নিয়ে ভ্যাগাইছিল কম না। রাস্তায় রাস্তায় অবরোধে নেমেছিল। শালাটাকে একটু ভয় দেখানো দরকার।
বশির, এই শালা শুয়োরের বাচ্চারা আমাদের শাস্তি চেয়েছিল না?’
‘হ বস। মালগুলোর মেদ একটু বেশি বেড়েছে। উচিত শিক্ষা একবার দিলে টের পাবে।’ কাশেমের মাথায় এবার নতুন রোগ চাপে। সে ভাবে শালা মালটাকে চাপা দিলে কেমন হয়? পুরো রাস্তাটা খালি। কেউ জানবেইনা কিছু।
‘দিবো চাকার মধ্যে সান্দায়ে হালাটারে?’
‘কি কন বস। ভরদুপুরে এ কাজ করন ঠিক হইবো? ফেঁসে যাইতে পারি।’
‘আরে মিয়া রাস্তা দ্যাহ খালি। দ্যাহ রাস্তায় লোকজন আছে?’
‘নাই বস। তাইলে দিলে ক্ষতিতো নাই।’
‘সান্দাইয়া দেলাম তাইলে।’
ছেলেটা বাসের চাকার তলে পড়ে পিষ্ট হয়। পুরো শরীর তার দোলা পাকিয়ে যায়। হেলপার ছেলেটার রক্তের ফিনকি দেখে অচেনা এক হাসিতে ফেটে পড়ে। মুখে বলে ‘শালারা বিচার চায় আমাগো।’ বাসটা দ্রুত গতিতে পাকশীর মেইনরোড থেকে ভিন্ন পথে ছুটে চলে।
ঘণ্টা তিনেক পরে কাশেমের কাছে একটা ফোনকল আসে। সে জানতে পারে পাকশীতে তার ছেলে বাসচাপায় মারা গেছে। কই তার ছেলেতো ঐ রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরে না কখনো।


করুণা

রাতের অন্ধকারে দশ-বারোটা বাড়িতে আগুন দিয়ে কে বা কারা পালিয়ে গেল। যে পরিবারগুলোর সকলেই ছিল ধর্মের ভিত্তিতে অভিন্ন। আগুনের ফুলকির প্রচণ্ডতা যত শুরু হলো ঘরের মানুষগুলোর চিৎকারও ততো ভারী হয়ে উঠলো। ঘরের ভেতর থেকে মানুষগুলো যখন বাইরে বেরিয়ে পড়ল, কিছু মুখোশধারী ব্যক্তির লুটপাটও তখন শুরু হয়ে গেল।
পরদিন সকালে চেয়ারম্যান মকবুল সাহেব ক্ষতিগ্রস্ত সকল ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে এক দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত তিনটি পরিবারের দেখভাল করার দায়িত্ব তিনি নিজের কাছে রাখলেন। এভাবে গ্রামে যারা কতিপয় সম্ভ্রান্ত তাদের উপর বাকি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দায়িত্ব বর্তালো।
ধীরেনের জায়গা হলো মকবুল সাহেবের বাড়িতে। দুপুরে তার পরিবার এ বাড়িতে ভরপুর খেতে পারলো। কথায় কথায় তখন মকবুল অজ্ঞাতনামা, দুর্বৃত্ত সে লোকদের উদ্দেশ্য করে গালমন্দ করতে থাকে। ধীরেন তার কথা শুনে বেশ খুশি হয়। ভাবে এমন ভালো মানুষ আছে বলেইতো আজও এদেশে থাকা যায়।
হঠাৎ করে মকবুল সাহেবের মেঝো ছেলের ঘর থেকে তীব্র এক চিৎকার শোনা গেল। সাপ! সাপ! সকলে ছুটে যায় সেখানে। দেখা গেল এক কেউটে সাপ তার ফণা উঁচিয়ে ফোঁস ফোঁস করছে। কিছুক্ষণ পর সাপটি পালিয়ে গেল। সকলে মিলে যেন এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। ধীরেনের সে নিঃশ্বাসটা বের হবার আগেই চোখ পড়ল ঘরটার ভেতর চৌকাঠের পাশে। ভুল দেখছে নাতো সে? না, না তার বিভ্রম ঘটেনি। সে দেখতে পেল সেখানে তার ঘরের ট্র্যাঙ্ক, কাঠের বা· দিব্যি পরিপাটি সে ঘরটার অংশ হয়ে আছে। সুলতার চোখটাও সেটাকে হয়তো ফাঁকি দিতে পারিনি। সে ধীরেনকে কিছু বলতে যাচ্ছিল। ধীরেন তাকে থামিয়ে দিল।
রাতের বেলা ধীরেনের পরিবারের সকলেই মকবুলের বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলো। বারো বছরের মেয়েটার হাত ধরে তারা দু’জন অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। আদৌ তা কাঠের বা· বা ট্র্যাঙ্ক চুরি হয়েছে সেজন্য কিনা। 
 

অচলায়তন

‘স্যার গতকালের ঐ ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা আগামীকাল মানববন্ধনে যেতে চায়। আমরাও কি ওদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করবো?’ 
‘উপর থেকে এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্ত আসেনি।’ 



 সাফল্য 

ভাইস-চ্যান্সেলর বললেন, ‘তিনশত একুশ জন শিক্ষার্থী  এবছর আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিসিএসে চান্স পেয়েছে, এর থেকে বড় সাফল্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর কি হতে পারে।’   
  


শিরদাঁড়া

‘স্যার, যারা আন্দোলনে লিড দিয়েছিলো তাদের নামে মামলা ঠুকে দেই?’   
‘না, ওদের শিরদাঁড়া অনেক শক্ত। যেকোন সময় যেকোন অঘটন ঘটাতে পারে।’  
‘তাহলে স্যার?’ 
‘নড়বড়ে কিংবা আদৌ যাদের শিরদাঁড়া নেই। মানে যারা শেষ সারিতে ছিল কিংবা সেখানে ছিলই না তাদের নামে মামলা ঠুকুন। পাঁচজনে আর আন্দোলন হয়না। বুঝলেন? বাকি সবাই ভয় পাক, ভীত হোক।’  



নিরাপদ 

এই ক্যান্টনমেন্টের ভেতরটাই তাহলে সবথেকে সেফ জায়গা। শালা এক সপ্তাহ ধরে মালটাকে ইচ্ছেমতো খেলবো। তারপর যখন সাধ মিটে যাবে মাগীটারে গুম করে দেবো।  



মানুষ

‘উন্নয়ন, আমাদের সবকিছু উন্নয়নের জন্য।’  
‘কাদের জন্য উন্নয়ন?’ 
‘কেনো? মানুষের জন্য।’  
‘কিন্তু স্যার প্লান্টটা গড়লে সেটা মানুষের জীবনের জন্য হুমকি হবে। এমনকি তার আশেপাশে বিকলঙ্গ শিশুর জন্ম হবে। অন্যসব কথা নাইবা বললাম।’  
‘সবাইকে মানুষ ভাবতে নেই। ওয়াসি সাহেব। বিলো দ্য লাইন অফ দ্যা হিল অল উইল বি ডিসমিডস অর ডিসঅ্যাপিয়ার্ড। দ্যাটস আর ক্যাপিটালিজম।’   



ধামাচাপা


‘ছেলেটা আগামীকাল অনশনে বসছে। মিডিয়ার চোখ এখন ওদিকেই।’  
‘কেন?’   
‘ওইসব দাবিগুলো মেনে নিতে হবে। বলে বন বাঁচাও, নদী বাঁচাও, ফসলের জমি বাঁচাও; মানুষ বাঁচবে।’ 
‘বুঝলাম।’    
‘যাইহোক ম্যাম আগামিকালের শিডিউলের কথায় আসি। আমাদের গন্তব্যে আমরা সকাল কয়টায় রওনা হচ্ছি? দশটায় নাকি সাড়ে দশটায়?’  
‘সাতটায়। রিক্সায়।’   
‘মানে ম্যাম!’ কিছুক্ষণ থেমে তারপর বলে, ‘ও আচ্ছা, ঐতিহাসিক ব্যাপার বটে।’  



শাঁখারি বিক্রেতা


একজন শাঁখারি বিক্রেতা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। সে গাঁও-গেরামের মানুষ কিনা? তার কথাবার্তায় কিছুটা তোতলামি আছে কিনা? জোর গলায় যিনি বলতে বলতে যাচ্ছিলেন, ‘ভোঠচুড়ি, ভোঠচুড়ি, ভোঠচুড়ি।’       
একজন ইচ্ছুক ক্রেতা তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘সে আবার কেমন চুড়িরে ভাই?’ 
প্রত্যুত্তরে শাঁখারি বিক্রেতা বলল, ‘দারুণ, দারুণ ফকফকা। ঢুকাবেন রাতে ফলাফল দিনে।’         


Post a Comment

أحدث أقدم