বনী ইসরাইল এর কবিতা | মিহিন্দা




রেইনকোট


আমার কোন রেইনকোট নাই এ যাবৎ,
যতই ভিজেছি ততই বেড়ে উঠেছি
হাত বড় হয়েছে, পা বেড়েছে
চুল বড় হয়েছে, চোখ, নাক এমনকি কপাল
দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে গেছে

অথচ দিনকে দিন মন ছোট হতেই চলেছিল
যা দেখি সমস্ত কিছুই পাপ ও অন্ধকার
যা কিছু স্পর্শ করি সমস্তটাই অসুখের চিহ্ন
আমার হৃদপিণ্ডটা অনেকাংশে অবশ হয়ে গ্যাছে
এখন ঠিক মানুষের মত চেহারা নেই
এখন ঠিক মানুষের মতন করে কথাও বলতে পারি না

আমার রেইনকোট নেই বলে কখনো বিলাপ করিনি
আমার রেইনকোট নেই বলে কাউকে খুন করিনি
আমার রেইনকোট নেই বলে কাউকে ধর্ষনও করিনি

ঘরহীন একটা দিগন্তে অন্যরকম একটা গান গাইতে
গাইতে আমি একজন বৃক্ষের মতন অহংকার নিয়ে
দাঁড়িয়ে আছি মানুষের চেহারার অনেক বাইরে, একা।



পিতার অপমৃত্যু


জোয়ালটা কাঁধে নিয়ে বাবাকে অনেকদিন শহরের রাস্তায় রাস্তায় ক্ষয়ে যেতে দেখেছি। আর একদিন দেখলাম তিনি মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন তার অফিসের সামনে। সুদূর এয়ার কন্ডিশন রূম থেকে তাকে দেখতে এসেছেন কয়েকটি চৌকস মাছি। ভনভন করে উড়ে ফিরে গেলেন।

মা সেই জোয়ালটা একদিন আমাকেও দিলেন। তার হাত থিরথির করে কাঁপছিল। তাকে আশ্বস্ত করলাম।

একদিন ফেলে দিলাম জোয়ালটা। ছবি আঁকতে বসলাম। মা সেদিনও থিরথির করে কেঁপেছিলেন। আর কোনদিনই আশ্বস্ত করতে পারি নি তাকে। এখন শহরটা আমার দখলে। মাছিগুলো রোজ বাসার সামনে ভনভন করে। মা কাঁপেন। এখন আমি অন্য একটি বাসায় থাকি। আসলে অনেককিছু বলবার থাকলেও চুপ করে থাকতেই পছন্দ করি। একদিন বাবার ছবি আঁকতে বসলাম।

একটি জোয়াল ইরেজারের কবলে। পেন্সিল ভেঙে যায়। মাছি উড়ে। মা কাঁপেন। দেশলাই কাঠি জ্বেলে কাগজের নিচে ধরে থাকি অনেক প্রহর।



প্রভুর অন্ধত্ব


তাকে দেখেছি বেশ্যালয়ে
চকমকে খদ্দেরের পিছু পিছু ছায়াতে

তাকে দেখেছি গির্জাতে
সাদা পোশাকের নিচে ওত পেতে আছে

তাকে দেখেছি মন্দিরে
তামাটে ঘন্টার সাথে সে সাপের মতো পেঁচিয়ে

তাকে দেখেছি মসজিদে
জায়নামাজের সামনে হাস্যরত মুখে

এমনকি বুদ্ধের আসনের সামনে একটি
বৃক্ষের তলায় ছায়াঘন বিশ্রাম নিতে

মৃত্যুকে সর্বত্র দেখেছি
তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম
সেদিন তুমিও দেখেছিলে তাকে আমার চোখের
গভীরে।



যেহেতু আমি আর্টিষ্ট


যেহেতু আমি আর্টিস্ট
সেহেতু তোমাকে হত্যা করা
খুবই আনন্দদায়ক হবে বলিয়া
বিশিষ্টজনেরা মতামত দিয়েছেন
ধরো পেন্সিল গলার ভেতরে ঢুকিয়ে দিতে পারি
শাপনার্র দিয়ে হাতের নরোম উঞ্চতম রগ
তাহাদের লোক ভাববেন না আবার আমাকে
যেহেতু শুধুমাত্র হাতের রগ কাটতেছি
পায়ের দুটো নয়
আবার রংতুলি দিয়ে চোখ উপড়ে দেওয়া সম্ভব
কিংবা ইরেজার দিয়ে পুরো তোমাকেই
বুক থেকে মুছে ফেলা
এমনতো হতে পারে আর্ট পেপার দিয়ে
পুড়িয়ে ফেললাম
তোমাকে আসলে শিল্প সম্মতভাবেই হত্যা করতে চাই
সেটা নান্দনিক না হলে বাজারে মুখ দেখাতে
পারবো না
যেহেতু ওরা আর্টিস্ট বলে চেনে আমাকে
তাদের মতো করেই হত্যা করতে হবে শিল্পকে
এর জন্য একাডেমি পুরস্কার
আর রাষ্ট্রের স্বর্নমুদ্রা, শহরের বাইরে গেষ্টহাউজ
অনেক কিছুই পেতে পারি
তার জন্য আমাকে হত্যা করতে হবে, শিল্প তোমাকে!

তোমাকে ভালোবাসতাম বলে তাচ্ছিল্য কম হয়নি আমার
পিতার জমানো শষ্য ভান্ডারে এখন ইঁদুর দৌড়াই
মা- থাক তার কথা বলতে গেলে নিজেকেই লজ্জা
পেতে হয়
আসলে কি জানেন ওই সব ক্ষ্যাত মার্কা পিতা-মাতার
পরিচয় দিলে ভীষণ অপদস্ত হতে হয় নামজাদা গ্যালারীতে
টেনেটুনে এম এ পাশ করেছি টিউশনির আর বাপের
ঘাম রোদে বারুদের মতো উড়িয়ে
তোমাদের জন্য আমার লজ্জা হয় বাপজান
আমারে ক্যান ওই অন্ধকার আতুড়ঘরে ডেকেছিলে
ক্যান গাড়িতে বসে শেখাও নি বাপ বয়সী ড্রাইভার
লোকটারে তুই বলে ডাকতে
ক্যান আমারে ইংলিশ ইস্কুলে দাও নাই পড়তে
আমার জাত-পাত নিয়ে ক্যান তামাশা করে ওই
মান্দির পুতেরা এখন সকলের সামনে?

যেহেতু আমি একজন উঠতি আর্টিস্ট
সেহেতু তাদের মতামত শুনতেই হবে আমাকে

একদিন কাসার গ্লাসে জল খেতাম
এখন দামী কাঁচের পাত্রে লাল মদ টানি
বাপজান-আম্মা এখন মেলা সুখ লাগে
টাকার তলে শ্যাওলার শরীর ঢেকে গ্যাছে
শহরের কোটিপতি মাগীদের সাথে প্রায় রাতে
শুয়ে থাকি আর বুড়ো বেটাদের লগে শিল্প নিয়ে
আলোচনা করি।

যেহেতু আমি আর্টিস্ট...




আমার কবিতার ভেতরে তোমরা


কবিতাই রাষ্ট্র
কবিতার চেয়ে সংবিধান বড় নয়
প্লেটো, আপনি ফের বলুন
কবিতাই হলো গনতন্ত্র
গনতন্ত্রের কন্ঠই দীর্ঘ কবিতা
যেখানে সব মানুষের রং এক
এড়িয়ে গেলেন কিভাবে আপনি
দেদীপ্যমান সক্রেটিস মৃত্যুবরণ করলেন যেখানে
কবিতার জন্য স্বেচ্ছায়

তিনি মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা মা গাছটির উৎকন্ঠা
বয়ান করলেন, কিভাবে মাটির নিচে ছটফটিয়ে
বেড়ে উঠছে সন্তান বীজগুলো, তিনি সেই সম্ভবনার
কথা বললেন, নতুন বৃক্ষের আগমনের কথা বললেন
সেগুলো কি কবিতার মত নই?

কবিতাই ধর্ম
কবিতার চেয়ে বড় ঈশ্বর নেই
সব ধর্মগ্রন্থই তো কবিতা
কবিদের মত তারা মানুষের কাছে
আলোর গল্প শোনালেন
ভালোবাসতে বললেন
কোরআন, বাইবেল, মহাভারত সব সব কবিতার বই
যেখানে নেই উইপোকাদের কোন আশ্রয় ও খাদ্য

মাকে আমি কবিতার মতই ভালোবাসি
তিনিও বলেন, দেখ আমিই কবিতা
কবিতা ভালোবাসলে মাকে ভালোবাসা যায়
কবিতা ভালোবাসলে বাবাকে ভালোবাসা যায়
কবিতা ভালোবাসলে মরুর কঠিন বালুরাশিতে
উদভ্রান্তের মত হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়া যায়
আমাকে শুনতে দাও আফ্রিকার কোন গাঁয়ের
কালো পোড়া মানুষের কবিতা যারা পশু শিকার
করছে আর অরণ্যের ভেতর পাতাদের জন্য গান গাইছে
আমাকে শুনতে দাও সোমালিয়ার কোন পণ্য কুঠির
হইতে ক্ষুধার্ত মায়ের গান যা ভুলিয়ে দিচ্ছে আদন্ডিত
শিশুদের ক্ষুধা অন্য কোন সুন্দর দেশের কথা বলে
আসলে ক্ষুধাই কবিতা যা বিত্তবানদের জন্য আফসোস
শপিংমলে কবিতা লেখা হয় না, হাজার তলা অফিসে
কবিতা লেখা যায় না, রাজকীয় সিংহাসনে বসে কবিতা
লেখা যায় না, কারখানায় কারখানায় তো কবিতা হয় না
অঢেল আলোয় চকচকে জুতোর দোকানে কবিতা লেখা
হয় না
এখানে আসুন
তাদের মুখের ভেতর তাকানোর চেষ্টা করুন
ওদের পেটের ভেতর কবিতার জলোচ্ছ্বাস বইছে।




1 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন