মলয় দত্তের ‘দ্যা অ্যাপেল ভেণ্ডর এন্ড মাই জুলিয়েটস’: সময়ের ইশতেহার | মিহিন্দা



শিকদার ওয়ালিউজ্জামান



অধুনা কবিদের কাব্যভাষা, শৈলী, প্রতীক ও চিত্রকল্পের যথার্থযোগ প্রশ্নের উপর প্রশ্ন তুলছে। বিশ শতকের শেষ দশক থেকে বাংলা কবিতায় এক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই অস্থিরতা সমকালীন রাজনীতি, প'ড়ো গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ আর পুঁজিবাদ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে চলচ্চিত্রের খলনায়কের মতো। আকাশ সংস্কৃতি আর প্রযুক্তি মানুষকে উড়ালের পাখা সরবরাহ করলেও নৈতিকতাকে বিপর্যয়ে মুড়ে দিয়েছে। নীতি আর নৈতিকতার পতন রাষ্ট্রমগজকে দুর্গন্ধী মলে পরিনত করেছে।

এহেন অবক্ষয় সাহিত্য-সংস্কৃতি আর কবিতায় ফেলেছে চরম প্রভাব। একবিংশ শতক যতোই এগোচ্ছে সময় ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ছে। এই সময়ের কবি মলয় দত্ত। মলয় দত্ত কবিতাকে ছেড়ে দিয়েছেন সময়ের বহুবর্ণিল শাখায়। তার ‘দ্যা অ্যাপেল ভেণ্ডর এন্ড মাই জুলিয়েটস' কাব্যগ্রন্থটি সময়ের আদর্শিক বিচারে আলোচনায় আনাই যায়।

মলয় দত্তের কবিতায় প্রবেশের আগে ভেবেছিলাম বেশ কঠোর অবস্থান নেব। কিন্তু কবিতার সাথে গল্প করতে করতে কখোন আমি নিজেই মলয় হয়ে গেছি টের পাইনি।


লক্ষ লক্ষ হাত কবিতা লিখছে। কেউ প্যানপানাচ্ছেন, কেউ ঘ্যানঘানাচ্ছেন। মাড়াইকলে ফেলে পিষলেও সে সকল কবিতা থেকে কোনভাবে রস বেরুবে না। তবে কি জীবনানন্দের পরবর্তী সময়ে কোন কবিতা হয়নি? এমন প্রশ্ন আসতেই পারে। হ্যা, কেউ কেউ পেরেছেন, তা কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দের কবিতার স্বাদ আর গন্ধ নিয়েই। কথাটি বেশ কর্কশ মনে হলো। বিষয়টি সত্যিইতো।

তবে কেউ কেউ বেরুনোর চেষ্টা করেছেন। আন্দোলনও করেছেন। তা করতে গিয়ে কবিতার ঘোর ভেঙে বক্তব্যে দাঁড় করিয়েছেন। নব্বইয়ের কবিরা ভিন্ন স্বর দাঁড় করালেন বটে, কিন্তু সেটা ষাট, সত্তর আর আশি থেকে। ত্রিশের ঘোর কিন্তু তারা টপকাতে পারেন নি। নতুন প্রজন্ম অর্থাৎ একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের তরুণরা এরকম প্যানপ্যানানিতে বিরক্ত হয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন। তারা ভাঙনের খেলায় জাল পাতছেন। শৈলি, কাঠামো আর চিত্রকল্পের ভিন্নতা আনার চেষ্টা করছেন। মলয় দত্ত তাদেরই একজন। তরুণদের এমন প্রয়াস অগ্রজদের অনেকে আবার হেয়ালীর চোখে দেখছেন। তাতে কী? নতুন জমাটবাঁধা মেঘ থেকেই কিন্তু প্রতীক্ষার বর্ষণ শুরু হয়।

মলয় দত্তের কবিতায় প্রবেশের আগে ভেবেছিলাম বেশ কঠোর অবস্থান নেব। কিন্তু কবিতার সাথে গল্প করতে করতে কখোন আমি নিজেই মলয় হয়ে গেছি টের পাইনি। যাহোক এমন ভূমিকা না রেখেও স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। তাই কিছু কঠিন ভাষা বের হয়েই গেল। এর একটা কারণও বলতে পারেন মলয় দত্তের কবিতা। তার কবিতাকে অনেকে হেসে উড়িয়ে দিতে পারেন। কীসব মানুষ মানুষ খেলা। কবিতায় এত মানুষ কীভাবে আসে? এই রহস্য আসলে চিন্তার বিষয়।

মলয়ের কবিতার বইটির কোন সূচি নেই। কী অবাক করা ব্যাপার! সূচীতে আবার মলয় লিখলেন - ‘কী আশ্চর্য সূচিপত্রের ভিতরে দেখি একটা কুকুরের কান্না ঘুমিয়ে আছে’। এমন উচ্চারণ পাঠকের মস্তিষ্ককে যধহম করে দেয়। নিজের সাথে নিজের দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। আমার কিন্তু এমন অভিনব সূচি বিস্ময়কর মনে হয়েছে। এ এক দারুণ চমক! আমার কাছে মনে হয়েছে ক্ষুধার রাজ্যে সূচিতো আসলেই খাটে না। কবিতাতে চমক আর ঘোর না থাকলে তা কোন কবিতাই না। মলয় দত্ত পুরোদস্তুর ধ্যানী কবি স্বীকার করতেই হয়। মলয় নিজেই বলেছেন- ‘একটা পাণ্ডুলিপি কি একটা কুকুরের কান্নাঘুমের ওজন বহন করতে পারে?’

এবার বলি উৎসর্গবিষয়। কাকে তিনি কবিতাগুলো উৎসর্গ করলেন তা কিন্তু সরাসরি বলেন নি। সেই উৎসর্গে একটি গল্প আছে। চিত্রকল্প আছে। যাকে কবি তার সাধনার কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করবেন তাকে নিয়ে গল্প না থাকলে আসলেই পানসে লাগে। তবে পাঠক সত্যিকার মনোবিবেশ করলে ঠিকই উৎসর্গের আধারকে আবিস্কার করবেন। সে উৎসর্গের কেন্দ্রবিন্দুতে বসে আছেন কবির স্নেহময়ী মা। উৎসর্গপৃষ্ঠায় এমন বিচিত্রতা পাঠককে মুগ্ধ না করে পারে না।

কবিতায় কি যৌনতা খাটে? কবিতায় যৌনতার শব্দ দেখলেই বলে উঠবেন রাম রাম রাম! একি কথা! কবিতা হলো শিল্প, শব্দের অনন্য নান্দনিকতা। যৌনতা কি কবিতায় মানায়?

সাহসী উচ্চারণের জন্য সাহস, সততা আর তাগিদ তিনই থাকতে হয়। মলয় দত্ত একজন তরুণ সাহসী কবি। তার সাহসী উচ্চারণ তার এই কাব্যগ্রন্থের বিভিন্ন স্তরেই দেখা যায়। এই সাহস যুগায় অদৃশ্য কেউ। সেই অদৃশ্য আর রহস্যময় চরিত্র আপেলওয়ালা। আপেলওয়ালা চরিত্রের মাধ্যমেই কবি অদৃশ্যবাদের পথে পা ফেলেছেন মেপে মেপে। চরম হতাশা যখন ঘিরে ধরে কবির চারধার তখন তিনি এই অদৃশ্য শক্তিতেই আশ্রয় গ্রহন করেন। মলয় দত্তের সমর্পন আমরা এভাবে দেখতে পাই-

“ আপেলওয়ালা, আমাকে টেনে টেনে নিয়ে যায় ভয়ের ওপারে। দু’হাটুতে মুখ গুজে আছি মাগো,
আমার শ্বাস ফুরিয়ে আসে
ধানশীষে কেউ ওঠায় নাসরিন সুলতানা।“


আগেই বলেছি কবির যাপনকাল বেশ কণ্টকময়। এ সময়ের প্রজন্মে শূন্যতা। এই শূন্যতা মেধা, জীবিকা, সমাজকে মানিয়ে নেওয়ার দিনযাপনে অগনিত চাপ বহন করতে হয় তাদেরকে যারা কিছু বোধের চাষ করেন। এসব বোধে ধরা দেয়- লাঞ্ছনা, অপমান, ক্রোধ, ঘৃণা, হতাশা, ক্লান্তি, ভালোবাস, সাধ, স্বপ্ন, বিশ্বাস। এই হেতু মলয় লিখতেই চান। কিন্তু তিনি ঘোরে কাঁটাতে চান সময়। কবির ভেতরকার মলয় অন্তহীন দায় অনুভব করেন। এই দায় থেকেই সুন্দর আর কুৎসীত উভয়কেই লিখে যাওয়ার উপাত্ত হিসবে চান। কোনরকম ভণিতা ছাড়াই সমাজের দুঃসহ ক্লান্তিকে আঘাত করতে চান। তাই ঘোরে থেকে যা তিনি লিখবেন তাই হবে মলয়ের বাণী। যে কথাটি পাঠককে মলয়মুখী করবেই তা হলো-

“ এই নাও আমি তোমার জন্য নিয়ে এসেছি দুই বোতল জ্যাক ড্যানিয়েল। তুমি একটু একটু করে খেও, মনে রেখো আমাকে আর লিখো সেই লেখাগুলা যা লিখতে না পারার কষ্টে ঠেকরে ঠোকরে সামিহার স্তনে জমা রেখেছিল পাথরের নদী। আমি চললাম, বলে চলে যায় পৃথিবী।“


কবিতায় কি যৌনতা খাটে? কবিতায় যৌনতার শব্দ দেখলেই বলে উঠবেন রাম রাম রাম! একি কথা! কবিতা হলো শিল্প, শব্দের অনন্য নান্দনিকতা। যৌনতা কি কবিতায় মানায়? যৌনতার বিষয়ে যারা নাক সিটকান, দেখবেন কালো অন্ধকারে তারাই বেশি যৌনসুখ কামনা করে! কবি তো লিখেই খালাস। যৌনতার চেয়ে বেশি কোন শিল্প পৃথিবীতে মেলে? আদম-হাওয়া যৌনতার গন্ধম না খেলে যৌনতার তর্ক কীভাবে করতে বাপু? মলয় দত্ত এমনই শিল্প সাজিয়েছেন আপেলওয়ালাকে প্রতীকী রেখে-

“দোকান জুড়ে বাজুক তবে তাল নবমীর সুর। আপেলওয়ালা তাকাও তুমি রাস্তার প্রতিটি মেয়ের দিকে আলাদা আলাদা ভালোবাসায়- চোখের কষে মিশে যাক নিয়ম মেনে ফুরিয়ে যাওয়া প্রহর।
তবুও,
স্নায়ুজুড়ে কে বাজায় ঝুনঝুনি!
আজ বুঝি, আপেলওয়ালার বরাত মন্দ, সব সুন্দরী দরদাম ছাড়াই আপেল কিনছে!”


মলয়ের কবিতায় চমক এক দারুণ বিষয়। পাঠক ধাঁধাঁয় পড়ে যায়। চমক না থাকলে কবিতা জমেও না। চমক আর ঘোরই তো কবিতার যত মাহাত্ম। 


ঘুমকে কবিগণ বিভিন্ন উপমায় উপমায়িত করে থাকেন, রূপকাশ্রয়ি করেন, কখনো কখনো ঘুমকে জীবন্ত করেন বা ঘুমের মাধ্যমেই বিদ্রুপের গল্প সাজান। আপেলওয়ালা ঘুমোয় না, মানুষ ঘুমোয়। মলয় ঘুমকে ভিন্ন সুরে গেয়েছেন। কেউ ঘুমোবে, আর কেউ নির্ঘুম থাকবে তাই কি হয়? এমন বৈষম্যই তো সারা দুনিয়ায়। মলয়ের আর্তি- আপেলওয়ালা ঘুমকে সার্বজনীন সমান অধিকারে রূপদান করুক। এই ঘুমের গল্পে কিন্তু আনিসা, আনিফা, আনতারা মালিহা, নাওশীন আনজুম, মাহফুজা প্রভৃতি চরিত্র কখনো মানুষরূপী, কখনো অদৃশ্যের ঘুড়ি ঘুড়ি খেলা-

“আপেলের গভীরে যে বিক্রি করে- আদিম ঘুম আর আত্মহত্যাবিষয়ক গান।“

মলয় অদৃশ্যবাদের খেলায় যেভাবে সাজিয়েছেন তাতে মহাবিশ্বই ধরা দেয়। ঝুড়িভর্তি আপেল মানুষের আকাঙ্খার ফল। এই ফলেই মানুষের উড়াল আজান সুরের মতো। আপেল রাজ্যেই মানুষের মুখ আর খোদার ইরতিজা। এত আপেলের ভিড়ে আপেলওয়ালার কণ্ঠ সুদূর। কবির আরাধনা সেই সুদূরের।

মৃত্যুকে মলয় বিভিন্ন রূপে রূপায়িত করেছেন। মৃত্যু এক ভয়। কিন্তু মলয়ের কাছে মৃত্যু এক কামনার নাম। মৃত্যুর সাথে আপেলওয়ালার সংযোগ দেখি তার কবিতায়-

“আপেলওয়ালা- তুমিই বলো মৃত্যুর চেয়ে রোমান্টিক প্রেমের গান কি ছিল কখনো?”

মলয়ের মৃত্যু তৃপ্তির অপর পিঠ। এর পর কী আছে তা মানুষের কল্পনা, বাস্তবতার কিছু নয় হয়তো। তাই মৃত্যুই জীবনযন্ত্রণা থেকে মুক্তির উপায়, রোমান্টিক প্রেমের গান। আবার মলয় মৃত্যুকে নেতিবাচক অর্থেও প্রয়োগ করেছেন-

“মৃত্যুর মতন ফাঁকা মনে হয় আজ বেবাক রাস্তাঘাট “

সময়, ছায়া আর আপেলওয়ালা একই আধার। একই পথ, সমান্তরাল। এই সময় কখনো সবুজ কখনো হলুদ পাতা, কখনো অচেনা দূরের দেশ। এই সময়েই মানুষের বাস। যাপিত জীবন আর পরিপাটি চোখের অন্ধকার। এই সময়ই মানুষের প্রেম আর স্মৃতির দিনবদল। মলয়ের গ্রামে সবুজের ভেতর ব্যাথার সুর এ যেন কবির নিজেরই জীবনলিপি। তার পৃথিবীতে জনাতার ঢল কিন্তু সেখানেও জনতার উন্মাদনা। 

কবিমাত্রই কৌতুহলী। জিজ্ঞাসা তার আত্মার ক্ষুধা। মলয়ের জিজ্ঞাসা অনেক। কিন্তু তার সকল জিজ্ঞাসাই নিরুত্তর। তার জিজ্ঞাসা দক্ষ বাজিকর। অদৃষ্টের চিররুদ্ধ দ্বার, প্রেম ও চিত্রকর। পরিশেষে আপেলওয়ালার মুখোশ খুলে যায়। তাইতো তার উচ্চারণ-

১। এমনি সব জিজ্ঞাসা লই যে অনিচ্ছায় আত্মাবলি আমার- আশ্বিনের সায়হ্নে আজ আাঁধার আকাশ।
তবুও, সব জিজ্ঞাসা আজ আপেলের গাছ হয়ে থেমে আছে কাতর অন্তরে!

২। আপেল ও আপেলওয়ালার মধ্যে-
    আপেলওয়ালা ও ক্রেতার মধ্যে-
    বিরলতম হাওয়ার বনে-
    দাঁড়িয়ে আছি মাঝি। 
    আমার অপর নাম অপার কৌতুহল। 


মলয়ের কবিতায় চমক এক দারুণ বিষয়। পাঠক ধাঁধাঁয় পড়ে যায়। চমক না থাকলে কবিতা জমেও না। চমক আর ঘোরই তো কবিতার যত মাহাত্ম। মলয়ের কবিতায় চমক দেখতে পারি এভাবে-
১। সাতারু বতাসে ভেসে ভেসে- নিজেকে শাস্তি দিতে এমন ঝড়ের দৃশ্য দেখে মাস্টারবেট করে যে যুবক-
সবুজ আপেল, তোমার সেলাই খুলে উন্মুক্ত করে দাও জলেদের ঝামেলা আর আপেলওয়ালার ব্রোথেল ভ্রমন!

২। সঙ্গম দৃশ্যে বেজে উঠুক
    উড়–ক্কু মানুষের সমরসংগীত!


নিঃসঙ্গতাকে মলয় দত্ত জাদুকরের মতো ব্যবহার করেছেন। সে যাদু যেমন চোখের ভেতরেও থাকে, তেমনি চোখের বাইরেও। তার নিঃসঙ্গতার বিচলিত প্রকাশ এভাবে-
হাসপাতালের মতন নিঃসঙ্গ যে বোন আমার- তার চোখ দুটি চুরি করে পালিয়ে গেছে রোদের নুপুর। 


মলয়ের কবিতায় বেশ যৌনতার খেলা। বেশ রোমাঞ্চকরও বটে। পৃথিবী তো যৌনতার এক রন্ধনশালা।

মলয়ের আপেল পড়তে পড়তে মনে পড়ে যায় Samuel Beckett  এর 'Waiting for Godot' নাটক। Vladimir এবং Estragon  এর Godot এর আগমনী অপেক্ষার কথা। তাদের অফুরাণ অপেক্ষার ফল শূন্য।Godot কখনোই আসেনি। মলয় এমনটাই প্রকাশ করেছেন তার কবিতায়। তার অপেক্ষা যেন ভ্রান্তি এক-

“ আপেলের ঝুড়িতে ঝলমলিয়ে ফুটে উঠছে শয্যাগন্ধ আর মাংসের ফুল!
পুড়ে যায়, পুড়ে যায় আপেল সুবাস!
বাইরে ঘাসের ঘ্রাণ ছড়িয়েছে ঝুলে থাকা ছায়া-
আর চিড়িয়াখানা সেজে বসে থাকা আমি আমি আপেলওয়ালার সাক্ষাৎকারের অপেক্ষায়।“


মলয়ের কবিতায় বেশ যৌনতার খেলা। বেশ রোমাঞ্চকরও বটে। পৃথিবী তো যৌনতার এক রন্ধনশালা। যে যতো সুমিষ্ট করে রান্না করবে ততটাই মিষ্টতার গন্ধ ছড়াবে যৌনতা আর সঙ্গম। সঙ্গমকে মলয় অনেকভাবেই উপমায়িত করেছেন নিপুণ শিল্পীর মতো-

“সারাজীবন যে কাকরঙা অন্ধকারে একা একা সবুজ আপেলের তিতকুটে স্তবগান গেয়েছে- সমুদ্র সঙ্গম পাবে বলে শূন্য বালুচরে।
সঙ্গমের রঙ দুর্দান্ত ঘুর্ণিঝড়!”


মলয়ের দশকের অনেকেই জাদুবাস্তবতার প্রয়োগ করেছেন। মলয়ের জাদুতে কখনো শরীরের খেলা আর কখনো অশরীরি হওয়ার প্রত্যয়। এই কোলাহল, পরক্ষণেই একাকী আাঁধার। তার জাদুকরী সম্মোহন এই কবিতায় দেখি-


“শুয়ে আছি ঝুড়ির ভিতরে
অনেক আপেলের সাথে নৈশ ইঁদুরের মতন একা।
দাম ছুঁয়ে নেমে যাচ্ছি ব্যাগের গভীরে।

আমাকে বিক্রি করে দিল যে-
অনেক আপেলের সাথে

আমাকে কিনে নিয়ে গেল যে-
অনেক আপেলের সাথে

দুজনেরই থ থ সংসার!

আমি কাউকেই চিনি না
ঠিক যেমন
বুঝতে পারছিনা
আর কতক্ষণ এই জাদুকরী ভ্রমণ!”


এখানেও  Samuel Beckett এর সংশয়। কবিতায় ম্যাজিক্যাল ব্যবহার আরও দেখি এই কবিতায়-


“জলাশয়ের সামনে দৃশ্য জমাট
বাঁধবে যখন
   তখন
    এক
        আশ্চর্য ম্যাজিক!”


জাদু বাস্তবতার এক দৃশ্য আপেল। এই আপেলেই বসে থাকেন দত্ত মলয়। এই বসে থাকাও তার কাছে সার্কাস মনে হয়। তার সার্কাসেই যত শীত, পিপাসা, ঘুম, লয়-প্রলয়। মলয়ের পারিপার্শ্বিক বাতাসে নৈরাশ্যের জয়জয়কার। কারো কারো সুর যেন বুকের মধ্যে অচেনা পায়ের শব্দ। মলয় নিজেই যেন আপেলের উত্তরাধিকার। তার বসে থাকাও শিল্পময়। এই বসে থাকা সার্কাসের অনন্য দৃশ্যায়ন। এত কিছুর পরেও কেন কবরের সুর? মলয় তার বসে থাকায় চিরকালীনতার সুর তুলেছেন। এই একটি আপেল মানুষের নিয়তি হয়ে বসে আছে আপেলওয়ালার ইচ্ছামন্ত্রের দোটানায়। মলয়ের বসে থাকা অনন্তকালের, জন্ম-জন্মান্তরের। এই জন্ম জন্ম খেলায় হাজার পায়ের সুর। সে সুরেও মলয়ের আকাশে নামে অন্ধকার। মলয় যে সার্কাস নির্মাণ করেন তার কবিতায় সেখানে এক জোকার থাকে। সেও আপেলবনের পরিব্রাজক। এই জোকাররঙ্গে মৃত মানুষেরাও হাসে। সেই সব মৃত মানুষকে যেন নরকভোগ দিয়ে গেছে সময়-

“একজন জোকার নেড়ে চেড়ে দেখছে একটা আপেল।
আর মৃত মানুষেরা সব একে একে দীর্ঘ করে সুর- গনগনে চুল্লীর ভিতরে!”


কবি মলয় দত্ত’র কবিতায় শৈশবের আরাধনা প্রকট হয়ে ওঠে। মলয় তার সময়ের প্রতিনিধি। পুঁজিবাদি বিশ্বে এক কোণায় তার বাস। এই বসতভিটায় দুর্বোধ্য আঁধার। এখানে শুধুই পতনের সুর। এই পতনকাব্যে তার শৈশব চুরি হয়ে যায়। সে যেন শৈশব হারানো নৃত্যকার।Irony এর যথার্থ ব্যববহার পাই তার কবিতায় এভাবে-

“ আন্নি শোনো, আমি ভুলে যাচ্ছি, সেই আপেলওয়ালার কথা,
সে কি আসলেই আপেলওয়ালা নাকি এক নৃত্যরত আনন্দ সংসার মাত্র?”


এভাবেও দেখি তার কবিতায়-

“অ্যাংলো ইন্ডিয়ানের বাড়িতে ফাই ফরমাশ খেটে মায়ের হাতে টাকা তুলে দিতে গিয়ে টের পাই আমি মলয় ও আরতির শেশব চুরি হয়ে যায় একইভাবে সবার চোখের সামনে। মুকুটভার ও সহজ ঘোষণায় ঘনিত হয়ে ওঠে রহস্য, কে পারে ফিরাতে পথের কঠিন ভেঙে সুগভীর শৈশব?
পারে না কেউ!”


মলয়ের ভেতরে পাই দ্বিধা। এই আলো, পরক্ষণেই অন্ধকার। রোদ-ছায়া- বিষণ্ণতা নিয়েই তার দ্বিধার সংসার-

“ রোদ। সমস্ত বিষণ্ণতা নিয়ে সবুজ ঘাসে ঘাসে আজ। রোদ। আপেলওয়ালার ছায়া বেদনায় মুচড়ে উঠে অজস্র মানুষের গভীরে হারিয়ে যায়। রোদ বরফের মাঠ। ভীষণ রোদ।“ 


মেকী, কৃত্রিম আর ছদ্মবেশী সমাজে মলয়ের বাস। তার ভেতর ক্ষোভ দানা বাঁধে। তার সামনে শুধু জড়ো হয় ভাবনার চৌচির আকাশ। তারই প্রকাশ পাই এই কবিতায়। এমন কবিতাচরণ T.S Elliot  এর The Waste Land এর জরাজীর্ণ সমাজকেই মনে করায়-

“আপেলওয়ালার ঘরে লোহাকাঠের খুটি, দরজার খিল, দুর্দান্ত সঙ্গম সবকিছু বিপন্নতায় ভাসে আর উতরে যায় রাতের পরীক্ষায়। আমি তুলে নেই ছড়িয়ে রাখা চোখ। মন খারাপ হয় আমার, ভীষণ। আপেলওয়ালার সঙ্গম হতে উঠে আসা নিঃশ্বাস মনে করিয়ে দেয় আমার ছদ্মবেশের পোশাকগুলোর কথা।“


সকল ঝড় শেষেই স্থিরতা নেমে আসে। মানুষ ঘুমায়। আপেলওয়ালা কখনো মানুষ, কখনো ঘুম, কখনো মলয়ের কবিতার অদৃশ্য ঈশ্বর।


এলিয়টের প’ড়ো জমির মতোই মলয়ের জমিন। তার সময়। সেখানে আছে আধুনিক পোশাকী সমাজের নোংরা কাহিনী-কথা। রাত-সঙ্গম-তরুণী-মুগ্ধতা সবই আছে। আছে প্রতি অঙ্গের বেধড়ক নাচ। ডানাওয়ালা তরুণীর উড়াল হলেই আপেলওয়ালার ঘুম ভাঙে। এখানে মলয়ের প্রকাশভঙ্গি অনেকটা এলিয়টের মতোই- ডান্সবার, মদ, নারী, অন্যপুরুষ, ষড়যন্ত্র, কান্না সবই আছে-

“ডানাওয়ালা তরুণীর এই উড়ে যাওয়া নিয়ে আমাদের কথা বলা, বসে থাকার উপর কে যেন কুলো উপুড় করে ঢেলে দেয় রোদ। সে রোদ আমার একার বুকের নিরাল কোণে চালান হয়ে যায়। এমন সময়ে আপেলওয়ালার ঘুম ভাঙে। সচকিত হয় আশপাশ। সে আমাদের বলে, ভোর রাতে এক খানকি তার স্বপ্নের ভিতরে রেখে গ্যাছে শিকারি কুত্তার দল! “


আপেলওয়ালার সাক্ষাৎকার পর্বটি বেশ রহস্যের। আপেলওয়ালার ভ্রমন সর্বত্র। রবীন্দ্রনাথ, বখতিয়ার খিলজী, মীর নেসার আলী, তিতুমীর সবাই আপেলওয়ালার এক একটি রূপ। তার বাড়ি-ঘর-বাস অজানায়। হেমন্তের হলুদ শস্য স্বর্গের প্রতিরূপ। বংশ পরম্পরায় আপেলওয়ালা প্রবাল কুমার বসুর কবিতার তিনটি জিরাফ। আপেলওয়ালাই জীবনানন্দ, সেই বনলতা সেন। আপেলওয়ালাই বোবা বন্দুক। আপেলওয়ালা হাজার পৃথিবী সমান। আপেলওয়ালাই প্রবাহমান সময়, ইঁদুরের ধানক্ষেত। 


সকল ঝড় শেষেই স্থিরতা নেমে আসে। মানুষ ঘুমায়। আপেলওয়ালা কখনো মানুষ, কখনো ঘুম, কখনো মলয়ের কবিতার অদৃশ্য ঈশ্বর। আপেল ঈশ্বরের হাতে খেলা আর মানুষের গোলক ধাঁ ধাঁ...  

Post a Comment

أحدث أقدم