উ ত্ত রা ধু নি ক তা : উত্তপ্ত যৌবনের অন্তর্গত যোগ বিয়োগ | প্রবন্ধ

সারওয়ার চৌধুরী



ক.

উত্তরাধুনিকতা কি আসলেই খুব জটিল কিছু? না, অতো জটিল কিছু না, যতোটা জটিল দেখানো হয়েছে কিছু ইংরেজী আলোচনায়, যে-সব আলোচনায় মুলত 'রাজকীয়' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, অপেক্ষাকৃত সহজ শব্দ প্রয়োগ করা হ'লে সৃষ্টিশীল পাঠকের কাছে উত্তরাধুনিক ধারনাসমষ্টি আরো সহজবোধ্য হতো বলে মনে হয়।
সেই কথা ঠিক যে, একাডেমীর চত্তরেই উত্তরাধুনিকতা জন্ম লাভ করেছে এবং লালিত হয়েছে কিছুকাল। বলা হয়েছে আধুনিকতার এক অবাধ্য/বিদ্রোহী সন্তান উত্তরাধুনিকতা। প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা আপাত প্রতিষ্ঠান বিরোধী এক নব্য বিগ ব্যাঙ, যার ভেতর থেকে ক্রমাগত তত্ত্ব বেরিয়ে আসছে এবং প্রসারিত হচ্ছে।
মানবজাতি এখন উত্তরাধুনিক সময়ের চৌহদ্দিতে জীবন ও স্বপ্নের খেলায় মেতে আছে। আধুনিকতা বেচারা কানা বোবা মিসকিন! খুব করুন দশা আধুনিকতার! কেন? কে দায়ী? এর সদুত্তর বের করা মুশকিল। কেননা, যদি এমন হয়ে থাকে, সময়ের বিশাল ক্যানভাসে চিত্রায়িত দৃশ্যই স্বয়ংক্রিয় আসছে ধারাবাহিক, তাইলে কাউকে দায়ী করা যায় না। কিন্তু উত্তরাধুনিকতার কিছু ধারনা আধুনিকতার কিছু কীর্তিকলাপকে দায়ী করছে। তা তর্কসাপেক্ষ বটে।
এক বান্ডিল দর্শনের বাক্স এই উত্তরাধুনকতা ১৯৮০ কিংবা মতান্তরে ১৯৭০ এর দশক থে'কে পরিচিতি পেতে শুরু করেছে- এই তথ্য পন্ডিতগণ দিয়েছেন। আবার এও জানানো হয়েছে, ১৯৫১ সালে এক চিঠিতে আমেরিকার কবি চার্লস ওলসান 'উত্তরাধুনিক মানুষ' উল্লেখ করেছিলেন। আধুনিকতা ঠিক কখন শুরু হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। বিগত শতকের প্রথম/দ্বিতীয়/তৃতীয় দশককে আধুনিকতার যৌবনকাল ধরা হয়। আর শুরুটা ধরা হয়, ইউরোপীয় এ্যানলাইটেনমেন্টের সময় আঠারো শতকের মাঝামাঝি। উত্তরাধুনিকতাকে বুঝার জন্য আধুনিকতার লেবেলগুলো দিকে নজর দেয়া দরকার। কারণ, আধুনিকতা প্রায় সকল দরজায় লেবেল লাগিয়েছে একেবারে মজবুত ক'রে সুপারগুলু দিয়ে! আধুনিকতার যৌবনকালের রূপ একেবারে 'মায়াবনবিহারীনি হরিণী'! সকল প্রকার মতবাদ/বিশ্বমত আধুনিকতার রূপে পাগল হয়েছে, প্রেমে পড়েছে। আধুনিকতাও তার অনিন্দ্য আদরে সবাইকে সন্তুষ্ট করেছে। আহ্ এই আধুনিকতার সেই যৌবনের ঝলক আর এখন নেই! বলে রাখা দরকার, হাই মর্ডানিজম সময়ে মানবজাতি কিছু অসাধরণ মানুষ পেয়েছে। তারা হলেন, এলিয়ট, কাফকা, ওলফ, মালার্মে পাউন্ড প্রমুখ।
উত্তরাধুনিকতাও কারো কাছে রূপবান কন্যা, রহিম বাদশারাই প্রেমে পড়েছে, অনেকে এখনো নাবালক, তাই রূপবানের পেছনে ঘুরঘুর করতে আরো কিছু দশক পার হতে হবে।
তাহলে উত্তরাধুনিকতাকে সহজে কেমনে বুঝা যায়? সংজ্ঞা নাই। তার একটা অংশ সংজ্ঞা ও বিরোধী। চট ক'রে ধরে ফেলা যাবে না। ওই পথে হাঁটতে হবে, দেখতে হবে- কি কয়, কেন কয়, কারে ডাকে, কেন ডাকে? জায়েজ ভালোবাসা নাকি না-জায়েজ ভালোবাসা! পরিচয় পেলে হয়তো আপনিও বলবেন-'আমারো পরাণ যাহা চায়, তুমি তাই গো'।

কিছু সারকথা এরকম, যা উত্তরাধুনিকতাকে তুলে ধরে-
> বিষয়ের অর্থে অনিশ্চয়তা থাকবে এবং সিদ্ধান্তমুলক ব্যাখ্যা পরিহার (গ্রাউন্ডলেস)
> আধুনিকতার অবাধ্য সন্তান
> এক অংশে- অলৌকিকতা পূর্নাঙ্গতা এবং পবিত্রতার বিরোধিতা (আইকনোক্লাজম)
> সকল প্রকার বিশ্বমত ক্ষমতার নিমিত্তে, সত্য পাওয়ার জন্য না, এমন মনে করেন উত্তরাধুনিকতাবাদীরা।
> পশ্চিমা আধুনিকতাকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, মশকারী মূখ্য কিংবা রংবাজি
> নিপীড়িত জনতার পক্ষে, বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে
> নিষ্ঠুর প্রতিক্রিয়া, পুনর্জাগরনের পক্ষে (সকল প্রকার পুনর্জাগরন, ধর্মীয় পুনর্জাগরনসহ)
> যা করা দরকার করো, দ্বিতীয় চিন্তার প্রশ্রয় দেয়া যাবে না।
ইত্যাদি।

উল্লেখ করা আবশ্যক যে, উত্তরাধুনিকতার গুরু পুরুষেরা হলেন মিশেল ফুকো, জ্যাক দেরিদা এবং রোর্টি। আর চমৎকার হলো, উত্তরাধুনিকতাও বাইনারী অপজিশনের আওতাভূক্ত। না-বোধক এবং হাঁ-বোধক প্রপঞ্চ এর ভেতরে আছে।


খ.

বাইনারী অপজিশন- না-হ্যাঁ, বা ইতি নেতি, ডান বাম, দিন রাত. আলো অন্ধকার, উপর নীচ অর্ডার ডিজঅর্ডার ইত্যাদি প্রাণহীন ও প্রাণসমেত অগণন প্রপঞ্চ। নারী পুরুষও বাইনারি অপজিশন গন্য। কিন্তু এই ক্ষেত্রে প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়,নারী পুরুষ আসলেই কি একে অপরের বিপরীত সত্ত্বা? ক্রোমোজম এক্সএক্স এক্সওয়াই পার্থক্য সূচকে কি দেখা যায়? অর্থাৎ এক্স ক্রোমোজম দুইয়ের মধ্যে আছে। দুইটা আলাদা লৈঙ্গিক সত্ত্বা হয়েও ইন্দ্রিয়জ অনুভূতিগুলো একই রকম নয় কি? মানুষ, হ্যাঁ মানুষ, নারী হোক কিংবা পুরুষ, মানুষ সত্ত্বাটার মধ্যে পুরুষ মন নারী মন উভয়ের আংশিক উপস্থিতি দেখা যায় কি? সভ্যতার ইতিহাসে নারী ও পুরুষের লৈঙ্গিক রাজনীতির একটা বিরাট ভূমিকা (অধিকাংশই নেতিবাচক) প্রণিধানযোগ্য। এর পেছনে কিছু বিশ্বমতের (গ্রান্ড নেরেটিভস) অপব্যবহার/চালবাজি চোখে পড়ার মতো। অধিকার বঞ্চনার ধারাবাহিকতা নারীবাদ এর জন্ম দিয়েছে। ক্ষোভ, বেদনা ভারাক্রান্ত অবস্থা আর্ত-চিৎকারসমৃদ্ধ শিল্পেরও জন্ম দিয়েছে। ঈসা নবী মৃত লেজারাসকে কবর থেকে জিন্দা করা নবীয়ানা কুদরতি। কিন্তু সিলভিয়া প্লাথ এর 'লেডি লেজারাস' অন্তরজ্বালা থে'কে বেরিয়ে আসা কান্না হিসাবে গণ্য।
নারীবাদের ধারণাগুলোও আপডেটেড হচ্ছে। নারীবাদ উত্তরাধুনিকতাকে খুব পছন্দ করে। কিন্তু যখন দেখা যায়, ক্লাস্টার বোমা ফেলে যারা অগণন মা শিশু হত্যা করে নির্বিচারে, তারাই আবার এসপিওনাজ কারিশমা দেখিয়ে গ্লোবাল পলিটিক্স নিয়ন্ত্রন করার জন্যে নারীবাদী কারো কারো পেছনে 'মহান' পৃষ্টপোষকের ভূমিকা রাখে,তখন ব্যাপারটা হাস্যকর ড্রামা হয় কি না ভেবে দেখার অবকাশ আছে। রাজনীতির ভেতরে বিস্তর রংবাজি খালি চোখে দেখা যায়। বিশেষ চশমা লাগালে দেখা যায় অন্য কিছু! উত্তরাধুনিকতা বলে- 'খালি চোখে দেখো, অনেক তামাশা দেখবা'। রাজনীতির 'সত্য' হলো- 'তুমি আমার হইলে তোমার সাত খুন মাফ। তুমি কয়লা হইলেও তোমাকে সোনা বইলা চড়া দামে বাজারে বেইচা দিমু।' রাজনীতির এই 'সত্য' নারীকে যথাযথ সম্মান দেয় না এবং পুরুষকেও পুরুষ থাকতে দেয় না- এমন মত প্রকাশ করার সুযোগ থাকে।
আধুনিকতা যেমন সকল দরজায় তার লেবেল লাগাতে সক্ষম হয়েছে, তেমনি উত্তরাধুনিকতাও সকল বন্ধ দরজার কড়া নাড়ছে! উত্তরাধুনিকতাকে দেখলে আধুনিকতার চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে যায়, রক্তশূন্যতায় ভোগে! কিন্তু আধুনিকতার 'রোমান্টিসিজম' ঘাঁটি বড়ই মজবুত কেউ কেউ বলেন। উত্তরাধুনিকতার জন্যে 'রোমান্টিসিজম' এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। পুতুপুতু প্রেমের বন্যায় ভাসছে বিশ্বসমাজ। এ্যান্ডু কোহেন বেচারা বলে দিয়েছেন, 'ওই মাইয়ার জন্যে ভালোবাসা আর নতুন গাড়ি কেনার প্রবণতা একই রকম।' তবে কথা আছে, নারী আর গাড়ি এক নয়।

গ.

আধুনিকতার বিস্তারিত সময় ব্যাপে রোমান্টিসিজম পাকাপোক্ত হয়েছে বলা হয়। প্রেম প্রেম এবং প্রেমের মধ্যেই মুক্তি যুক্তি- এইমতের কথা আছে।। রোমান্টিসিজম এই মর্মে অভিযুক্ত যে, 'আবেগ দিয়া বুদ্ধি বা যুক্তিকে চাপা দেয় অথবা ঢাইকা রাখে'। আর এই ইজমের পক্ষে যারা, তারা বলেন, যুক্তি কান্ধে নিয়া দৌঁড়াইয়া সাতরাইয়া কূল-কিনারা পাওন যাইব না। যুক্তির বাত্তি দিয়া আইজ দেখবা এক রূপ, কাইল দেখবা আরেক রূপ। আইনস্টাইন মিয়াও ভাবে মজিয়া বেহালা বাজাইসে, প্রেম করছে শালীর লগে।'
রোমান্টিসিজমকে ভাব দরিয়া বলা হয়। দেহ প্রেমের সিঁড়ি বেয়ে অধরার প্রেমের দিকে উঠতে থাকে। সভ্যতার তাফালিংয়ের চাইতে প্রকৃতির দিকে মনোযোগ দেয় বেশি। কথার উপরে কথা নাচে। শুধু ভাবে মজে থাকলেও তো চলে না। দুনিয়াদারীর পক্ষে যুক্তির ভূমিকাও অনুজ্জ্বল নয়। অঙ্ক করতে হয়। সমিকরণের সমাধান বের করতে হয়। অংকের দৌলতে 'যাও পাখি বলো তারে সে যেনো ভূলে না মোরে' এর দিনকাল এখন নাই। এখন আলোর গতিকে পেছনে ফেলে 'এসএমএস' এর শব্দগুলো মুহুর্তেই পৌছে দেয় প্রেম! আবার প্রেমিক/প্রেমিকা এসে বলবেন- 'বিজ্ঞানের আবিস্কারের মধ্যেও অধরার প্রেম ক্রিয়াশীল। তাই আইনস্টাইন নিজেও দেখাতে পারেন নি কেমতে বের হয়েছিলো ই = এমসি স্কয়ার!' নিমগ্ন সুরকার হঠাৎ পেয়ে যান অসাধারণ সুর। কবি কখন লিখে ফেলেছেন অনিন্দ্য পংক্তিটি টের পান নি, নিজের পংক্তি নিজেই দেখে বিস্মিত! সকল প্রকার শিল্পের কারিগরদের বেলায় এমন হয়।
উত্তরাধুনিকতার না-বোধক প্লাটফরমের কিছু ব্যাপার নারীবাদীগণ খুব পছন্দ করেন। কারণ 'the postmodern avowal of fragmentation and multiplicity tends to attract liberals and radicals. This is why, in part, feminist theorists have found postmodernism so attractive'. একজন নারীবাদী বলেছিলেন, 'রোমান্টিক প্রেম পুরুষকে খবরদারী করার সুযোগ দেয়'। বিষয়টা নিয়ে বিস্তর তর্ক আছে। ভালোবাসা সমান্তরালে থাকলে আধিপত্যের প্রশ্নটা আসে না। আর যেই অরগ্যানের যেই দায়িত্ব, সেই অরগ্যান সেইটা ঠিক মতো পালন করলো কি না দেখার বিষয়।
উত্তরাধুনিকতার ওই যে মাল্টিপ্লিসিটি, তার কোনো সীমা নেই, অনেক ব্যাপারকে আওতায় আনতে পারে। মুক্ত বিহঙ্গের অসীম আকাশে উড়ে বেড়ানোর মতো।
যাক, এ পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, উত্তরাধুনিক পন্ডিতগণ রোমান্টিসিজমকে যে-ভাবে চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখছেন, হতে পারে অদূর ভবিষ্যতে রোমান্টিসিজমকে একটা স্থান দিতে হতে পারে। কেননা মন ও দেহের ক্যারিজম্যাটিক কীর্তিকলাপ দূরেও রাখে, কাছেও ডাকে, আড়ালেও রাখে।

ঘ.

কোলরিজ এবং ওয়ার্ডসওয়ার্থ, ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট এর সমান্তরালে, রোমান্টিসিজমকে মহিমামন্ডিত করেছেন এই দুই কবি। প্রেম ও প্রকৃতির কাব্যিক ব্যাখ্যা তাদের অসাধারণ ও মরমস্পর্শী যা চাউর হয়েছে বিশ্বময়! রোমান্টিসিজমের ব্যাপারে কোলরিজ চমৎকার প্যারাডক্সিক্যাল ফ্রেজ(অক্সিমরোনও বলা যেতে পারে) ব্যবহার করেছেন, বলেছেন, ইন্টেলেকচুয়াল ইনটুইশান।
একটি মানুষের চেহারা কত রূপ ধারণ করে? হাসি দিলে এক রকম, কাঁদলে আরেক রকম, ঠাট্টা করলে আরেক রকম, মেঘাচ্ছন্ন হলে আরেক রকম, ভালোবাসা ছুঁয়ে দিলে অন্তরের বিমুগ্ধ ঢেউ মুখমন্ডলে ঝিলিক মারে, চোখ কথা বলে, কপোল কথা বলে; আবার বঞ্চনার তীব্রতার কারণে সমগ্র চেহারায় অগ্নিশিখা চিত্রায়িত; কখনো সুন্দর মুখটিতে এমন একটা ভাব ফুটে উঠে যা রহস্যাবৃত কিন্তু অনিন্দ্য, যথাযথভাবে ধরা না-গেলেও ভালো লাগে; আবার অধরা বিমর্ষতাও ফুটে, দরদ জাগায়, মায়া লাগায়, ভাবায়,ভাসায়, কাছে ডাকে, দূরেও ঠেলে দেয়। । ওদিকে কূটচাল যখন মস্তিষ্কে খেলা করে, মুখমন্ডল হয়ে যায় 'রাষ্ট্রদূত'! - এইসব মুখপঠনে ধরা পড়ে বলে জানা যায়। পন্ডিতগণ মুখপাঠ করতে পারেন, অপন্ডিতগণও পাঠ করেন। লেখক পাঠ করেন, অলেখকও পাঠ করতে পারেন। কেউ বেশি কেউ কম।
মানুষের মনের আয়না চেহারায় কখনো অগণন জীব জানোয়ার পাখি-টাখি, ফুল-টুল দেখা যায়। ক্ষেপা শিম্পাঞ্জি, আফ্রোডিজায়িক জেব্রা,ধাবমান সারমেয়, 'মহান' গাধা, কূটনৈতিক বানর ইত্যাদির ছায়া মানুষের মুখে জলছাপের আদলে পরিলক্ষিত-এমন তথ্য কেউ কেউ জানাতে কুন্ঠাবোধ করেন না।
উত্তরাধুনিক শিক্ষকেররা বলেন, একই মুখের, একই অন্তরের এতো রূপ থাকতে পারলে, মানুষের মুখের ভাষার কিংবা অন্তরের ভাষার প্রতিটি শব্দ কেন বহু অর্থ বহন করতে পারবে না? পারবে। উত্তরাধুনিক কবিতার প্রতিটি শব্দ অজস্র অর্থ দিতে পারে। (যদিও অর্থ মূখ্য নয়।) কবি নিজেও জানেন না তার কবিতা কতো প্রকারের অর্থ দিতে পারে। উত্তরাধুনিকতা এতো রূপের বাহারকে কদর দেয়ার কথা বলে। পংক্তিটিকে, শব্দটিকে, স্বাধীনভাবে উল্টেপাল্টে ব্যাখ্যা করার কথা বলে। উত্তরাধুনিক আলোচনার ধরনটাই আলাদা। ক্রমসম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের মতো বিস্তার হতে থাকে।

ঙ.

উত্তরাধুনিক চোখ শব্দের অঙ্গে বহুরূপ দেখে। শব্দের বাহির দেখে, ভেতর দেখে। শব্দটি বেরিয়ে আসার কারণ খুঁজে। পটভূমিতে কি আছে দেখে। শব্দকারিগরের মনস্তত্ব যে-দিকে ধাবিত হলো তার ইতি নেতি ব্যাখ্যা করে। কবি'র কাব্যিক শব্দ বিন্দু থেকে সিন্ধুতে ঝাঁপ দ্যায় কেমনে দেখায়।
উত্তরাধুনিক চোখে দ্রোহের আগুন আধুনিকতার বিরুদ্ধে! কারণ আধুনিকতা 'উন্নয়ন' এর দোহাই দিয়ে শব্দ ও ভাষার এবং বিবেকসম্মত সব ধরনের স্বাধীনতার টুটি চেপে ধরেছে। আধুনিকতা স্বাধীনতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। 'স্বাধীনতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ' এটি মুলত স্ববিরোধ। পরিস্কার অক্সিমরোন! উন্নয়ন তো একটা মিথ। উন্নয়নের ভেতরেও অসভ্যতা আছে। বলা হয়েছে, ঈশ্বর ছাড়া, যুক্তি ছাড়া, বিশ্বমত ছাড়া কেমনে বাঁচা যায়? উত্তরাধুনিক জবাব- জীবনকে তার নিজের রাস্তা খুঁজে বের করতে দাও, জীবন যাপন করো, জীবন নিয়ে যাবে জীবনের পথে।
(The prophets of postmodernity and their cohort have little to offer. Foucault says power is god. Derrida says dance to the sound as human civilization is deconstructed -- god by god and idea by idea. Rorty says let life be guided by success, it does not matter if there is no intrinsic good in life or success.) প্রফেট মুলত এখানে ফোরকাস্টার বা প্যারাসাইকোলজিস্ট অর্থ বহন করে বলে মনে হয়।
উত্তরাধুনিক চোখে আগুন কেন? কারণ আধুনিকতা দেশে দেশে স্বাধীনতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে বাণিজ্যপ্রবণ ক'রে তুলেছে। স্বাধীনতা বিক্রি করে প্রতিষ্ঠান! স্বার্থের লড়াইয়ে নেমে এক প্রতিষ্ঠান আরেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। স্বাধীনতা কখনো এই খোয়াড়ে কখনো ওই খোয়াড়ে! কবি, লেখকের শব্দগুলোকে খোয়াড়বন্দী করেছে! তাই মানুষেরই চেতনার এক অত্যুজ্জ্বল দ্রোহ আকারে উত্তরাধুনিকতা এসেছে। , (the human spirit is rebelling in the form of postmodern moments of insanity.)
আগেই বলা হয়েছে, উত্তরাধুনিকতা এক বান্ডিল দর্শনের বাক্স। বান্ডিল আবার বাক্স? হ্যাঁ, বাক্সের নাম উত্তরাধুনিক, আর এর ভেতরে ধারণাসমষ্টির বান্ডিল। একটা উজ্জ্বল দিক হলো দ্রোহ এবং দ্রোহ। এই দ্রোহ কোনো প্রকার জাতীয়তাবাদকেও প্রশ্রয় দেয় না। এমনকি ধমীয় পুনরুজ্জীবনের আন্দোলনকেও উত্তরাধুনিকতা বাহবা দেয়। 'the contemporary resurgence of religion is a postmodern phenomenon. Both postmodern philosophy and Religious theology reject the modernist claim in the infallibility of reason.)
এখানে বলে রাখা ভালো হতে পারে, আধুনিকতা যেই সব শর্তে মানব সভ্যতার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলো, বিগত শতকে সেইসব শর্ত ভঙ্গ করেছে এবং অপমান করেছে সভ্যতাকে। দার্শনিক ক্যান্ট বেচারা ব্যাপক অর্থের 'স্বাধীনতা'কে ভালো কাজে ব্যবহার করার জন্য বুঝিয়েছিলেন। আধুনিকতা দিলো লাগামছাড়া যা খুশি করার আশকারা। আর উত্তরাধুনিক চিন্তা লেখকদের জন্য বলছে- স্ট্রিম অব কনশাসনেস রাইটিং।

চ.

আদিম মধ্য আধুনিক উত্তরাধুনিক- এইসব নামকরণ সময়ের, যে-সময়ে আমরা বাস করে আসছি হাজার হাজার বছর ধরে. এর পর্যায় বিভাজন বা লেবেল লাগানোর মধ্যে সার্থকতা অসার্থকতা দুই-ই আছে মর্মে বিস্তর কথা বলা যেতে পারে। একটা ব্যাপারে এক ফোটা আলোকপাত যেমন- জ্ঞানতত্ব (epistemology) আলোচনার নিমিত্তে যদি ধরা হয় আমাদের পূর্বজ পন্ডিতগণ 'আধুনিক' লেবেলটা লাগিয়েছেন। এই আধুনিক সময়টা জুড়ে আদিম ও মধ্যযুগীয় সংস্কার/সংস্কৃতি বিশ্ব সমাজে কি অনুপস্থিত? উত্তর পাওয়া যাবে, কিয়দংশে হ্যাঁ, কিয়দংশে না। যে কোনো প্রকারের 'এনলাইটেনম্যান্ট' বেচারা সূর্যের মতো সমগ্র ভূপৃষ্ঠে একসাথে আলো দিতে অক্ষম!
মানুষের সভ্যতার প্রতিটি পর্যায়ে আমরা দেখে আসছি সংস্কৃতি কিংবা দর্শন বনাম দর্শনের লড়াই। সরাসরি এবং ঠান্ডা লড়াই! সেই চেঙ্গিস খানের 'শয়তানী' আর এই জর্জ ডব্লিউ বুশের 'শয়তানী'র মধ্যে পার্থক্য কী? আবার এই সময়েরই, পাকিস্তানের ওয়াজিরিস্তানের ওই 'অশিক্ষিত' টিপিক্যাল পাঠান, যে-তার ফুলের মতো বোনটাকে 'প্রেম' করার অপরাধে 'প্রেমিক প্রেমিকা' দুজনকেই নৃশংসভাবে গুলি করে মারে; ওই পাঠানের গুষ্ঠিদম্ভ কিংবা সংস্কার চেতনা যার সাথে অর্থনীতিরও রিশতা আছে; ওই পাঠানের চেতনাপ্রসূত বর্বরতা আর 'শিক্ষিত-এনলাইটেন্ড' জর্জ ডব্লিউ বুশের চেতনাপ্রসূত বর্বরতার মধ্যে মুলত পার্থক্য কী?
আমরা বিস্ময়কর এক জগতে বাস করছি! একদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অসাধারণ সফলতা, জেনোম প্রজেক্ট সম্পন্ন হয়েছে, মানুষ ক্লোনিংয়ের প্রয়াস চলছে এবং উত্তরাধুনিক প্রপঞ্চ কৃত্রিম বুদ্ধির খেলা; আর অন্যদিকে পূর্বে তালেবানরা, হিন্দুত্ববাদীরা এবং পশ্চিমে জেরি স্প্রিংগারেরা এবং জেরি ফালওয়েলরা দিব্যি দিলখোশ মিলিয়ন মিলিয়ন শিষ্যের সমর্থন পেয়ে!
আর উত্তরাধুনিক ধারনাসমষ্টি সকলের ঘরে ধর্ণা দিচ্ছে! সুবিচার কিংবা সিদ্ধান্ত দেয়া কঠিন! কবি খলিল জিবরান জানালেন- ‘'What judgement pronounce you upon him who though honest in the flesh yet is a thief in spirit?' & 'And how prosecute you him who in action is a deceiver and an oppressor, yet who also is aggrieved and outraged?'’
কিন্তু আসলেই কি কঠিন? সুবিধা অসুবিধা অথবা ইতি নেতিসহ অবস্থাভেদে, স্থান কাল পাত্র দেখে, একটা জুডিশিয়েল সিদ্ধান্ত দেয়াটাও কি জরুরি নয়? অন্তত যেসব ইজম এর নেতিবাচক প্রভাব বেশি, যা অধিক অকল্যান নিয়ে আসে তুলনামুলক, তার বিরুদ্ধে 'এ্যাকশন' নেয়া সমূহের জন্য দরকার নয় কি? দুনিয়াদারী এক অর্থে 'অর্থহীন' হলেও সময় সাপেক্ষে 'অর্থহীন' নয়। প্রয়োজনের প্রেক্ষিত ধাপে ধাপে পরিলক্ষিত।
পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদ এর ভেতরে মধ্যযুগ ঝিলিক মারে! রেইসিজমকে লাটিপেটা করার প্রয়োজন আছে বলে অনেকেই মনে করেন। আমিরি বারাকা'র 'সামবডি ব্লিউ আপ আমেরিকা' এর ভেতরে আন্তরিক শব্দের ঝংকার এবং সুমধুর ক্ষোভ হোয়াইট হাউসের রক্তিম মুখমন্ডলকে ফ্যাকাসে করে দিতে সক্ষম হয়েছে। ৯/১১ কারা ঘটিয়েছে আমিরি'র কবিতায় পরিস্কার; কে লাদেন, কারা জেনোসাইডের দৌলতে 'ধনী' হয়; কারা তেল চোর, কাদের আরো তেল দরকার; আমিরি জানিয়ে দিয়েছেন। ওই কবিতাটিকে একটি উত্তরাধুনিক কবিতা বলা যায়। কারণ, বাচনভঙ্গির বহুমাত্রিকতা এবং বিক্ষুব্ধ উচ্চারণ যেনো ক্লাস্টার বোমাকেও অকার্যকর করে দেয়! বারবার 'হু' এসেছে কে বা কারা হয়ে। এর ভেতরে অনেক ইজমকে আনা যেতে পারে।
আমেরিকা বহুদেশকে সাহায্য করে, লাখো নারী শিশুকে দুবেলা খাবার দ্যায়; এই তথ্য সত্য বটে কিন্তু শাটল ডিপ্লোমেসি- একদিকে বিনাশ – লাশ-লুট চুরি করে অন্যদিকে দরদি হওয়ার এই আধুনিক ফাইজলামি কেন? দশ বিলিয়ন লুট করে এক মিলিয়ন দান খয়রাত করার বিটলামী বুঝার জন্য কাউকে অক্সফোর্ড থেকে ডিগ্রি নেয়া আবশ্যক নয়! আমেরিকার ফরেন পলিসি বিশ্বের মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করছে! নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার কি আর কোনো উপায় নেই? উত্তরাধুনিক চিন্তা আরো উত্তম উপায় বের করার তাগিদ দ্যায় কি?
বিড়ালের মতো চোখ বুজে দুধ খেয়ে ফেলার সুযোগ দ্যায় কি না উত্তরাধুনিকতা দেখতে হবে। খেতে চাইলে চোখ খোলা রেখে খাও বলবে কি? নিজেকে ধোঁকা দিও না অথবা দিও বলবে? বিলাই চোখ বন্ধ করে খায় আর ভাবে কেউ দেখে না!

ছ.

মিশেল ফুকো'র সব ধরণের বিশ্লেষণের সাথে একমত না-হওয়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের 'সাইকোএনালিসিস'কে ফুকো কর্তৃক ঝুলিয়ে দেয়ার ব্যাপারটা মজাদার। ফ্রয়েড দেখিয়েছিলেন, আকাঙ্খা/তৃষ্ণা আসে অভাববোধ থে'কে। ফুকো দেখালেন, না, অভাববোধের কারণেই তৃষ্ণা/আকাঙ্খা আসে না। তিনি দেখালেন- Desire is a productive, real force. এই ডিজায়ার এর ভেতরেও বাইনারি অপোজিশান আছে। ইতি নেতি (dichotomy/duality) আছে। নেতিবাচক ডিজায়ার ও প্রডাক্টিভ বটে। তবে এই ডিজায়ারকে লাগামহীন ছেড়ে দেয়া যাবে কি? যদি ছেড়ে দেয়া হয়,যদি রাষ্ট্র ছাড়পত্র দ্যায় এই মর্মে যে, সকলেই যার যার তৃষ্ণা নিবারণ করো যখন খুশি তখন। তাইলে তো পাবলিক নুইসেন্স এ্যাক্ট এর সাথে সংঘর্ষ বাঁধবে কি? কোনো সুন্দর নারী বা হ্যান্ডসাম পুরুষ যদি রাস্তা-ঘাটে যখন তখন যৌন তৃষ্ণার প্রডাক্টিভিটি দেখাতে শুরু করে, তখন সমাজের অবস্থা কেমন হবে?
ফ্রয়েড পরিবারের বিরুদ্ধে ছিলেন না। পরিবারের পক্ষে ওকালতি করেছিলেন। ফুকো পরিবারকেই চিহ্নিত করেছেন The family therefore constitutes the first cell of the fascist society. দেশে দেশে পরিবারের ভেতরে কুসংস্কার, অন্যায় খবরদারি, ইত্যাদি কিছু নেতিবাচক দিক পাওয়া যাবেই। কিন্তু তাই বলে পরিবার প্রথা উঠিয়ে দিলে সমাজের সর্ব নিম্ন ইউনিট কি হবে? সব সিস্টেমের ভেতরেই কিছু অসুবিধা যেহেতু আছেই সেইহেতু অসুবিধাগুলোর কারণেই কি পুরো সিস্টেম ভেঙ্গে ফেলতে হয়? বিকল্প চমৎকার সিস্টেমটা কি? সেই সিস্টেমেও কি বাইনারি অপোজিশান থাকবে না? ডিজায়ারের ভেতরে চমৎকার 'তুমি' 'আমি' এর খেলা দেখা যায়! বাইনারি অপোজিশন। 'তুমি' ছাড়া 'আমি' এর অর্থ পাওয়া যায় না। আবার 'আমি'টা অর্থবহ করে 'তুমি'কে। ''According to Ferdinand de Saussure, the binary opposition is the “means by which the units of language have value or meaning; each unit is defined against what it is not”. এবং ডিজায়ারের ভেতরকার 'অর্ডার' 'ডিজঅর্ডার' নিত্য সহচর। যেখানে 'অর্ডার' সেখানেই 'ডিজঅর্ডার'। ছায়াসঙ্গি!
ফুকোর 'এ্যান্টি ঈডিপাস' বইটি ভালো বাজার পেয়েছে। জগতের সমাজগুলোতে বহু লোক এমন আছে যে নিজে নেংটা হতে চায় না কিন্তু অন্য নারী পুরুষকে নেংটা করানো হচ্ছে জেনে পুলকিত হয়! দেখতে চায়! ফুকো ফ্যাসিজম'র জড় তালাশ করতে করতে পরিবারের ভেতরে গিয়ে পেয়েছেন। যে-সব কার্যকলাপকে, পরিবারের ভেতরকার, ফুকো ফ্যসিজম আখ্যা দিয়েছেন, তার উপর তর্ক চলে আসছে দুনিয়া জুড়ে। তিনি বলেছেন-
'And not only historical fascism, the fascism of Hitler and Mussolini [...] but also the fascism in us all, in our heads and in our everyday behavior, the fascism that causes us to love power, to desire the very thing that dominates and exploit us.'
পূর্বে উল্লেখ আছে, উত্তরাধুনিক চিন্তার দাবীদার অনেক পন্ডিত পরিবারপ্রথা ও সমাজ বিরোধী। কিন্তু মজার প্যারাডক্স, তারাই আবার 'পোস্টমডার্ন সোসাইটি'র কথা বলেছেন। সেই সোসাইটিতে কি থাকবে কি থাকবে না তাও বাতলিয়েছেন যা এখনো স্পষ্ট নয়।

জ.

এ পর্যায়ে দেরিদা তাঁর বিনির্মান তত্ব ব্যবহার করে কিভাবে দেখেছেন বাইনারি অপোজিশানকে, উত্তরাধুনিক চিন্তার ক্ষেত্রে এর আলোচনা হতে পারে। দেরিদা কেমনে দেখলেন দেখা যাক-
Derrida states that all of Western thought forms pairs of binary opposites in which one component of the pair is privileged, arresting the play of the system and marginalizing the other component. With the application of deconstruction, Derrida employs a tactic of decentering; destabilizing the primary term so that the secondary term temporarily overthrows the hierarchy.
এখানে দেরিদার চিন্তার কেন্দ্রে হায়ার্কি বা চেইন অব কমান্ড বা শ্রেণী কাঠামো বা আদেশ নিষেধের কাঠামো এর ব্যাপারটি মুলত মূখ্য। পশ্চিমের সাংস্কৃতিক পটভূমি সামনে এনে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। নারী-পুরুষ, সাদা-কালো, উপস্থিত-অনুপস্থিত, ইত্যাকার দ্বৈত বিরোধগুলোতে প্রতি দ্বৈত ইউনিটে একটি আরেকটির উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বিধৃত। নারীর উপর পুরুষের, কালোর উপর সাদার, অনুপস্থিতের উপর উপস্থিতের খবরদারীর ব্যাপারটি উঠে এসেছে।
উত্তরাধুনিকতার প্রচন্ড রাগ আধুনিকতার উপর এইজন্যে যে, আধুনিকতা মুলত 'অর্ডার'কেই সমীহ করে এবং ডিজঅর্ডারকে দাবাতে চায়, পিটাইতে চায়, থাপ্পর মারতে চায়, বন্দী করতে চায়, ঠেঙ্গাতে চায়, কনুই মারতে চায় এবং চরমপন্থা অবলম্বন করে খুন করতে চায়। উত্তরাধুনিকতা চ্যালেঞ্জ করে- 'ভালোত্ব' আর 'খারাপত্ব'র কি নিরংকুশ অবস্থান আছে? স্থান কাল পাত্র ভেদে যা ভালো তা-ই মন্দ আবার যা মন্দ তা-ই ভালো নয় কি? সাংস্কৃতিক প্রভেদ কিংবা বিভেদ দেশে দেশে 'ভালো' 'মন্দ' ফেরী করছে কি? ক এর কাছে যা ভালো খ এর কাছে তা মন্দ আবার ক এর কাছে যা মন্দ খ এর কাছে তা ভালো এ রকম বাস্তবতা সবখানে আছে। আধুনিকতা 'ইতি'র সুপেরিয়রিটি চায়, কারণ 'নেতি' ডিস্টার্বিং এলিমেন্ট; শুধু বাধা-বিপত্তি সৃষ্টি করে।
এ পর্যায়ে আবারো স্মরণ করা যাক পূর্বোল্লেখিত, উত্তরাধুনিকতা কোনো ধারণাকেই বাতিল করে না। ইতি নেতি সব দরকারী। অতএব ইতি এর খবরদারীকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। খবরদারী ছাড়া সহাবস্থান থাকার ওকালতি করে উত্তরাধুনিকতা। আবার দেখা গেছে, উত্তরাধুনিক চিন্তাওলা বুদ্ধিজীবির মধ্যে স্ববিরোধ আছে। উত্তরাধুনিকতা জাতীয়তাবাদ কিংবা ধর্মবিশ্বাসমেত 'গ্রান্ড ন্যারেটিভস' এর কঠোর সমালোচনা করে। ওই বুদ্ধিজীবি তা মানেন কিন্তু নিজ দেশের স্বার্থ সংশ্লিস্ট অবস্থানে দাঁড়িয়ে নিজ দেশের কিংবা অন্য দেশের বিপরীত মেরুতে থাকা চেতনার বিরোধিতা করেন বা পাত্তা দেন না কিংবা 'রুখো' আন্দোলনে সহযোগিতা করেন। এই প্যারাডক্স থেকে উত্তরাধুনিকতা কিভাবে বের হবে?
'Postmodernism, in rejecting grand narratives, favors "mini-narratives," stories that explain small practices, local events, rather than large-scale universal or global concepts. Postmodern "mini-narratives" are always situational, provisional, contingent, and temporary, making no claim to universality, truth, reason, or stability.'
এই 'মিনি ন্যারেটিভস' এর পক্ষে অথবা 'লোকাল ইভেন্টস' এর পক্ষে দাঁড়াতে গেলেই উত্তরাধুনিক ধারনার বান্ডিলের ভেতরকার অন্য ধারনার বিপক্ষে দাঁড়াতে হয়! 'for postmodern societies, there are only surfaces, without depth; only signifiers, with no signifieds.' কিন্তু কই? উত্তরাধুনিকতা 'নো ম্যানস ল্যান্ড' অবস্থানে দাঁড়াতে পারছে কি? ব্যাপারটা কি এমন হচ্ছে যে, নিজের মেয়ের জন্যে 'ভালো জামাই'র সংগা এক আর অন্যের মেয়ের জন্যে আরেক প্রকারের সংগা?

ঝ.

[নারী পুরুষের সম্পর্কে আধিপত্য বিষয়ে আমি একজন উত্তরাধুনিক নারী কবির সাথে বিস্তর কথা বিনিময় করেছিলাম। তিনি নারীবাদী। নারীবাদ কিভাবে আপডেটেড হচ্ছে, এর তথ্যও তিনি আমাকে দেন। তিনি আল্লাহ-খোদায় বিশ্বাস রাখেন না এও জানিয়েছিলেন। আমি তাকে আল্লাহ কোথায় এবং কিভাবে এ্যাকশন নেন এবং অনেক ক্ষেত্রে কেন নেন না, একেকটা নৃশংস ঘটনার সাথে আগে পরের অনেক বিষয়ের সম্পর্ক থাকে। তার উপর অনেক কথা বলার পর তিনি লিখেছিলেন, 'আপনার চিন্তা সমৃদ্ধ এবং বিপক্ষে দাঁড়াতে পারছি না।' আমি তাকে বলেছিলাম, 'নারী পুরুষের সম্পর্কের মধ্যে রিসাইপ্রোকাল এ্যাট্রাকশান বা পারস্পিরিক আকর্ষন ক্রিয়াশীল যা প্রকৃতির সাধারন নিয়মের সাথে মিল খায়। আধুনিক সমাজের যে-সব পুরুষ নারীর প্রতি অবিচার করে তারা অপরাধী নিঃসন্দেহে। কিন্তু সব পুরুষ তো অবিচার করে না। মধুর সম্পর্কও তো আছে। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ইওর ওয়ার্ডস আ্যার সাবসটেনশিয়েল বাট আই থিংক সামথিং ডিফরেন্ট। তিনি ক্ষুব্ধ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কারণে। আমি এও বলেছিলাম, ব্যক্তিগত প্রাপ্তি না-প্রাপ্তির আলোকে তো ইউনিভার্সেল ধারনা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। তিনি অন্য প্রসঙ্গে জাম্প দেন। তিনি আবার 'সতিত্ব এবং সাধুতা ধরে রাখার পক্ষপাতি, জীবন যৌবনের যাচ্ছেতাই ব্যবহারের বিরোধী]
পূর্ব কিংবা পশ্চিম, পৃথিবীর সবখানেই জেন্ডার বৈষম্য আছে। ভিন্ন ভিন্ন সাংস্কৃতিক বলয়ে পুরুষের উপর আধিপত্যের অভিযোগ। অর্থাৎ নারীর উপর খবরদারী করে। একটা বাস্তবতা এরকম যে, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, অল্পশিক্ষিত, ধর্মব্যবসায়ীরা নারীর যথাযথ অধিকার দিয়ে আসছে না। তাই বলে ঢালাওভাবে 'গ্রান্ড নেরেটিভস'কে দায়ী করা সুবিচার হয় কি? কিছু লোকের আচরণ দিয়ে কি সমগ্রকে অভিযুক্ত করা যৌক্তিক? বাংলাদেশের অজপাড়া গাঁর একজন কাটমোল্লার ধর্মচিন্তা আর মিসরের আল আজহার ইউনি কিংবা মদীনা ইউনি থেকে বেরিয়ে আসা ইসলামিক স্কলারের ধর্মচিন্তা কি এক? অথবা যারা তুলনামুলক ধর্মতত্ব নিয়ে উচ্চ ডিগ্রী নেন, তাদের ধর্মচিন্তা উপমহাদেশের অনেক মাদ্রাসা পাশ বিখ্যাত আলেমের ধর্মচিন্তার চাইতে উজ্জ্বল এমনও দেখা যায়। যে-সব 'ধার্মিক' এর ভেতর থেকে কাম ক্রোধ লোভ ঘৃণা বের হয় বিষাক্ত ফণা তোলা সাপের মতো, তারা কি আসলেই 'ধার্মিক'? অপরদিকে যারা আল্লাহ খোদা মানেন না, মানবতাবাদী দাবী করেন, অথচ তাদের ভেতর থেকে ক্ষ্যাপা শিম্পাঞ্জির মতো হিংস্রতা বের হয় 'ধার্মিক'দের উদ্দেশে, তারা কি আসলেই মানবতাবাদী?
উত্তরাধুনিক পন্ডিতদের কারো কারো দৃষ্টিতে ইসলামও একটি 'গ্রান্ড নেরেটিভ'। তারা এই 'নেরেটিভ' এর ইতি নেতি বের করার জন্য চিরুনী অভিযান চালানোর পক্ষপাতি। কারো দৃষ্টিতে সালমান রুশদী'র 'স্যাটানিক ভার্সেস' উত্তরাধুনিক প্রয়াস। আবার কারো মতে, না, ওটা উত্তরাধুনিক চিন্তা সমৃদ্ধ বই নয়। কেউ কেউ ইসলামী পুনরুজ্জীবন আন্দোলনকেও উত্তরাধুনিক ফেনোমেনন মনে করেন। পুঁজিবাদের বিপক্ষে যুদ্ধের ময়দানে উত্তরাধুনিক চিন্তা পুঁজিবাদের সব ধরণের শত্রুর সাথে হাত মিলাতে চায়। কারণ আধুনিকতার বিশাল ক্যানভাসে, ইউরোপীয় এ্যানলাইটমেন্টের ভেতরে, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নামক 'মারাত্মক রোগ' এর বিরুদ্ধে ইসলাম তিন শ বছর লড়াই করেছে, যা অন্য কোনো 'গ্রান্ড নেরেটিভ' করে নি। এখানেও ধারণাগত প্যারাডক্স আছে। কেননা উত্তরাধুনিক পন্ডিতদের একাংশ রোমান্টিসিজম ও ফান্ডামেন্টালিজমকে মস্ত চ্যালেঞ্জ মনে করেন।
উত্তরাধুনিক চিন্তা জেন্ডার বৈষম্যকে গলা ধাক্কা দিয়ে পৃথিবীর উপরিভাগ থেকে মহাশুন্যে ফেলে দিতে চায়। তাই ফেমিনিজম বলে- 'আসো বন্ধু গলাগলি করি প্রাণভরে'। কারণ আগেই উল্লেখিত রোমান্টিক ভালোবাসা নাকি পুরুষের খবরদারীকে সুযোগ দ্যায়। কিন্তু মানুষের মেধাজাত বিস্তর ধারণা ভালোভাবে প্যাঁচ বন্ধনে যুক্ত অর্থাৎ তত্বের সাথে তত্বের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট যোগ একেবারে গার্ডিয়ান নট বা মরা গিট্টু এর মতো লেগে আছে। পশ্চিমের বাইনারি অপোজিশানের ব্যাখ্যা নারী পুরুষের বেলায় দুই প্রকার। কেউ দেখছেন নারীলিঙ্গ ইতিবাচক আর কেউ দেখছেন নারী লিঙ্গ নেতিবাচক। কেউ বলছে পুরুষলিঙ্গ বাইরে আছে অবস্থায় প্রকাশিত,তাই ইতি; আর নারীলিঙ্গটি বাইরে নাই বিধায় নেতি। নারীলিঙ্গকে যারা ইতিবাচক বলছেন, তাদের যুক্তি- নারীলিঙ্গ আধার- ধারন করে, গ্রহন করে। পুরুষলিঙ্গ আধার নয়, গ্রহন করে না। এই দ্বন্দ ফেমিনিজমকে ভালো একটা সমস্যায় ফেলেছে।
'বঞ্চনা' র উপর চোখ রাখলে, দেখা যাবে, দেশে দেশে বহু সংখ্যক নারী যেমন বঞ্চিত, তেমনি বহু সংখ্যক পুরুষও বঞ্চিত। সারভাইভাল অব দি ফিটেস্ট এর খেলায় জেন্ডার কি আসলেই মূখ্য? নারীও নারীকে ধাক্কা মেরে ফেলে আগে যেতে চায়, পুরুষও পুরুষকে মারে, নারী পুরুষকে মারে, পুরুষও নারীকে মারে ধাক্কা! এই ধাক্কা মারামারি দৃশ্যে তত্ব নিরব দর্শক। সভ্যতার বিশাল ক্যানভাসে প্রখর মেধাবী নারী আছে,পুরুষও আছে। ব্যক্তির সাফল্যের আলো দিয়ে সমষ্টির ষোল আনা সাফল্য আসে না, সেই দৃশ্যও আছে কালান্তরের দৃশ্যপটে।
(আগে উল্লেখ করেছিলাম প্রফেট জেসাস'র কথা, আবার করি) প্রফেট জেসাস কবর থেকে জিন্দা তুলেছিলেন ল্যাজারাসকে। সেটা ছিলো তার নবীয়ানা কারিশমা। আর সিলভিয়া প্লাথ'র 'লেডি ল্যাজারাস' কবিতার শেষ পংক্তি 'আর পুরুষ খাই বাতাসের মতো'। খুব কষ্ট ছিলো তাঁর মনে। দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩১ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেছিলেন। তাঁর 'লেডি ল্যাজারাস' সম্পর্কে আলোচকদের মত- 'বেদনার্ত কান্না-চিৎকার মুলত এই কবিতাটি'। সিলভিয়া গোস্বায় পুরুষ খেয়েছেন তার কবিতায়। সব নারী কি বাতাসের মতো পুরুষ খায়? খায় না। সব দেশে প্রতি দিন জনম নেয় রোমিও জুলিয়েট, লায়লী মজনু। প্রতি জনপদেই জুলেখার অনুসারী আসে, রাধার অনুসারী আসে।
উত্তরাধুনিকতা যদি শুধু ভালোবাসাহীন মেশিন মানুষ বানাতে চায়, তার সফলতার তৃষ্ণা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা থাকেই। নারী পুরুষের প্রেমাবেগের জন্য দায়ী হরমোন। এই হরমোনকে অকেজো করে ফেলা হয় যদি প্রেম করা বন্ধ। স্টপ লাভ!

ঞ.

কবিতা শিল্প ও ভাষার বহুবিধ কারিশমা প্রসঙ্গে আরো কিছু কথা এখন বলা যায়।
অন্তত উত্তরাধুনিক কবিতার রূপটা কেমন, এই রূপ মায়া লাগায় কি না, কিংবা মায়া ব্যাপারটা কতটুকু আছে এখানে, এইটুক বুঝার জন্য কিছু সংগা রকমের কথা পাওয়া গেছে। উত্তরাধুনিক পন্ডিতেরা টের পেয়েছেন, তত্বের একটা সংগা না-থাকাটা খুব অসুবিধায় ফেলে। একটা বাউন্ডারী না-থাকলে নিরাপত্তা হুমকীর মুখে থাকে। অন্য তত্ব এসে ব্ল্যাকমেইল করতে পারে। তবু গতানুগতিক সংগার মতো নয়। উত্তরাধুনিক চিন্তায় closed definition are rejected in favour of investigation and free play.

কিছু ইংগিত এরকম-
> মনের জটিল দ্বান্দ্বিক ব্যাপারগুলো থাকতে পারে
> বিক্ষিপ্ত, খন্ডিত, বাস্তবতার চিত্রায়ন
> চর্চাটাই মূখ্য, কবিতা ফসল নয়, চর্চা চলমান জীবনের মতো
> নীতিকথা, উপদেশ সরাসরি থাকবে না
> সমসাময়িক, দৈনন্দিন জীবনের ক্ষোভ সুখের বিষয়াবলী থাকবে
> 'আমি' 'তুমি' 'সে' ছাড়া নৈর্ব্যক্তিক বুনন হতে পারে, যেখানে শব্দগুলোই হবে বোধদাতা, ফলে পাঠক পাবে অনেক প্রকার 'আমি'র সাক্ষাৎ
> নির্দিষ্ট বিষয়কে ধারন করে পুরো কবিতা না হতে পারে, অনেক বিষয়ের সমাবেশ একটি কবিতায়
> ব্যাকরণের রীতি ভাঙ্গা থাকতে পারে কখনো, বোধের ব্যাঞ্জনে সততার পরিস্ফুটন
> অবচেতন ততোটা গুরুত্বপূর্ন নয়, চেতনের যৌক্তিক বিশ্লেষণ
> কবিতাটির একাধিক অর্থ পাবে পাঠক, একেক পাঠক একেক অর্থ দেখবে, প্রত্যেকের জীবন ও বাস্তবতার আলোকে
> আবেগের পক্ষে বিপক্ষে ওকালতি থাকবে না
> উত্তরাধুনিক কবিতায় তত্বের ঝিলিক থাকবে যা আধুনিক কবিতার ক্ষেত্রে অনেকটা মানা ছিলো
> পশ্চিমা আধুনিকতাকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, মশকারী মূখ্য কিংবা রংবাজি
ইত্যাদি ইত্যাদি। সত্য যে, উত্তরাধুনিক কবিতার ধারনাও ক্রমাগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাবে। বিভিন্ন আকার ধারণ করার স্বাধীনতা থাকবে যেই কারণে we must call it a practice and not a product. আর হ্যাঁ, উত্তরাধুনিকতা যেহেতু কোনো ধারনাকেই বাতিল করে না সেইহেতু সকল প্রকার ধারনা/বোধ/তত্ব এই শিল্প মাধ্যমে অপ্রত্যক্ষভাবে পাওয়া যাবে। মধ্যযুগীয় ও আধুনিক কবিতার সিংহভাগ প্রডাক্ট হিসাবেই বিবেচিত হয়েছে। প্রডাক্ট মানে একটা সিদ্ধান্ত সরাসরি বেরিয়ে আসা। একটা 'কিছু' বলা হয়েছে কবিতায় এই প্রকারের বিচার। উত্তরাধুনিক কবিতা একটা 'কিছু' বের করে না। অনেক 'কিছু'র উপলক্ষকে প্রকাশ করে সরাসরি সিদ্ধান্ত না-দিয়ে। পাঠক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। Roland Barthes বলেন- each text possesses a plurality of meanings. প্রকাশিত প্রপঞ্চ ডিকৌড করবে পাঠক। আর শিল্পটা চিন্তাটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়। নতুন শিল্প, নতুন চিন্তার পেছনে পূর্বের অনেক চিন্তা ও শিল্পের ভূমিকা থাকে।
T. S. Eliot এর কথা স্মরণ করা যায়, বলেছিলেন- No poet, no artist of any art, has his complete meaning alone. His significance, his appriciation is the appriciation of his relation to the dead poets and artists. (Traditioin and the Individual talent) বুর্জোয়া আদর্শের চোখে টেক্সট এর একক অর্থ বের করা যা লেখক বলতে চেয়েছেন হিসাবে ধরা হয়, এইমতের দেখাকে Roland Barthes বাজে পাপ বা worst sin বলেছেন। জ্যাক দেরিদার 'বিনির্মান'ও দেখিয়েছে- 'any text has more than one interpretation'. ব্যক্তির 'আমি' গৌণ, সমষ্টির ভূমিকা মূখ্য। শিল্প কারিগরদের কাজ-কাম কপিয়ার মেশিনের মতো। চমৎকার একটা মিল পাওয়া গেলো ইসলামী জীবনবোধের সাথে! ইসলাম এর উচ্চমার্গীয় দর্শনে 'আমিত্ব' এর গুরুত্ব নেই। 'আমি'র অহংকে জ্বালিয়ে আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার কথা বলা আছে। মধ্যযুগের 'আমি'গুলো, আধুনিক এর 'আমি'গুলো জগতের যথেষ্ট অকল্যান করেছে। ব্যক্তিক 'আমি' ও সামষ্টিক 'আমি'কে কেন্দ্র করে প্রাতিষ্ঠানিক ফাইজলামী, নারী পুরুষের সম্পর্কে বেদনাবিধুর পরিণতি, জাতিতে জাতিতে যুদ্ধ, উগ্রতা, সাম্প্রদায়িকতা, ইত্যাদি অনিষ্টকর কাজ হয়ে আসছে। উত্তরাধুনিকতার একাংশে, বলা যায় নেতি প্রধান অংশে আল্লাহ গড ঈশ্বর নিয়ে মাথা ঘামানী নেই।
উল্লেখ করা ভালো যে, আজ যা নতুন কাল তা ঐতিহ্য হয়ে যায়। প্রতিটি সমাজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য শুরুতে 'নতুন কিছু' আকারেই প্রকাশ পেয়েছিলো। মানুষের পছন্দ ধীরে ধীরে তাকে ঐতিহ্য হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। 'নতুন কিছু'কে ঘিরে তৈরী হয় পছন্দ ও না-পছন্দের ধারাবাহিকতা। উত্তরাধুনিক চিন্তা ও শিল্প সাঁতার কাটে ঘোলা জলে কিংবা পরিবর্তনের উলট-পালট স্রোতের মধ্যে। আনন্দের ঢেউয়ে উতলা হয়। Postmodernism swims, even wallows, in the fragmentary and the chaotic currents of change as if that is all there is- Harvey এর মতে। উত্তরাধুনিক চিন্তা ও শিল্প স্থায়িত্ব বা জীবনের 'চিরন্তন সত্য'কে গুরুত্ব দিতে চায় না। কারণ স্থায়ী থাকছে কই ব্যাপারগুলো? কারণে অকারণে পরিবর্তনশীলতাই বাস্তব আকারে স্ফুট। সব'কিছু' যেনো সমুদ্র সৈকতে। সময়ের ব্যবধানে সাগরের অথৈ জলে মিশে যায়।
Roland Barthes কিছু শব্দের মাধ্যমে দেখিয়েছেন ভাষার ভেতরে যা থাকে বা ঘটে- সিগনিফায়ার (বোধদাতা/বর্ননাকারী) সিগনিফায়েড( অর্থ/তাৎপর্য) সাইন (সংকেত/প্রতীক/অর্থবোধক কিছু) কনোটেটিভ (যা প্রকাশিত তার অধিক ইংগিতবহ কিছু) ডিনোটেটিভ (প্রকাশিত প্রাথমিক অর্থ)এবং Denotative system: A signifier, signified, and sign that together form a meaning.

ট.

('উত্তরাধুনিকতা বনাম বিজ্ঞান' শীর্ষক একটা এ্যাটমিক ইংরেজী গদ্য পড়ে আমার মাথার ভেতরে যেনো কিছুটা আউলা-ঝাউলা বোধ এসে ধাক্কা দিলো! অথবা কনফ্লিক্টিং স্রোতের মাঝখানে পড়লে যা হয় আর কি! কয়েক বছর আগে আমি একটা গল্পে বলেছিলাম- অতীত বর্তমান ভবিষ্যত আবার অতীত এই রকম একটা চক্র ঘূর্ণনের ব্যাপার-স্যাপার আছে কি না আমাদের সময়ে, যে-সময়ে আমরা বাস করছি! ইতোমধ্যে বুদ্ধিঅলাদের অনেকে বলেছেন, উত্তরাধুনিকতা মানে আধুনিকতার আগের জমানায়, মধ্যযুগেরও আগের কালে ফিরে যাওয়া অথবা আধুনিকতাকে কনুই মারতে মারতে এক সময় উত্তরাধুনিকতা নিজেই আত্মহত্যা করবে! এক পশ্চিমা পন্ডিত মিয়াসাহেব তাঁর দীর্ঘ প্রবন্ধে উত্তরাধুনিকতার পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি প্রকাশ করে বারবার বুঝাইতে চাইলেন, শত প্রকারের শৃংখলা নির্মাণ করেও মানুষ মুলত জঙ্গলের মতো আউলা-ঝাউলা জীবন যাপন করে আর জঙ্গলীপনাকে গোপন করে সাধু সাধু ভাব দেখায়। আমি সামগ্রিকভাবে উত্তরাধুনিকতার পক্ষে বা বিপক্ষে না-দাঁড়িয়ে চিন্তাগুলোকে প্রকাশ করছি মাত্র এবং প্রাসঙ্গিক প্রশ্নও উত্থাপনও করছি। আগে এই দর্শনের বান্ডিলের ভেতরকার কিছু চিন্তার চমৎকারিত্বও প্রকাশ করেছি।)

জীবনের সমস্যা ও সমাধান নিয়ে আলোচনা করার সময় মানুষ বাস্তবতা বা রিয়েলিটি এর প্রসঙ্গ আনে। যেমন, 'এই হলো বাস্তবতা. এর আলোকে সমাধান বের করা দরকার।' বাস্তবতা আসলেই কি স্থায়ী কিছু? বাস্তবতা কি ক্রমপরিবর্তনশীল নয়? কারো সাধ্য আছে কি দেশ কালের পটভূমিকে এক জাগায় ধরে রাখার? বলা হয়েছে, মানুষ প্রতি ন্যানোসেকেন্ডে ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা তৈরী করে চলেছে।
আশা আকাঙ্খা স্বপ্ন ইচ্ছা মনের মধ্যে যেমন খুশি, যতো খুশি লালন করতে পারে কেউ। এইগুলান লালন করতে টেক্স দেয়া লাগে না। মানুষ নিরংকুশ স্বাধীনতা কীভাবে উপভোগ করবে? তার মন খাঁচায় বন্দী। সাথে আছে বিবেক প্রহরী। বিবেককে তোয়াক্কা না-করে যেই মানুষ নিরংকুশ স্বাধীনতার আনন্দ পেতে চেয়েছে, সেই মানুষ নিজেই নিজের বিপদ ডেকে এনেছে, এমন নজির খুব আছে। ইচ্ছা করলেই কি বাইনারী অপোজিশানগুলোর নাম-নিশানা মুছে ফেলা যাবে? আহ বেচারা কার্ল মার্কস! কতো অর্থকষ্টে জীবন কাটিয়ে গেলেন! শক্তিমান মার্কসবাদীরাই মার্কসবাদকে নেংটা করে, বেইজ্জত করে একেবারে বরবাদ করে দিয়েছে!
উত্তরাধুনিকতা সম্পর্কে কথা বলতে গেলেই দুনিয়ার সবাই ফরাসী বুদ্ধিঅলা Lyotard এর কথাটা, "incredulity towards metanarratives." সকলেই স্মরণ করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসাবে Walter Truett Anderson এর অনেক নাম। উনি 'উত্তরাধুনিক রাজনীতি'র পক্ষে কথা বলেন। তিনি Alan এর প্রশ্নের জবাবে ইউনিভার্সেল বিশ্বমত নাই সে-প্রসঙ্গে কথা তোলেন। অর্থাৎ মার্কসবাদ খৃষ্টবাদ ইসলাম, প্রত্যেকে ইউনিভার্সেলিটি দাবী করলেও ইউনিভার্সেল হয় নি বা হতে পারে নি, সেই কথা বলছেন। আর এও বলছেন, ওই গ্রান্ড নেরেটিভগুলো সাম্রাজ্যবাদকে লালন করেছে। এই কথা সর্বাংশে সত্য নয়, তা বলার সুযোগ আছে। তিনি প্লুরেলিজম বা বহুমতের সহাবস্থানের পক্ষে কথা বলছেন।
কিন্তু এ্যালান যখন প্রশ্ন করলেন- বহুমতকে গুরুত্ব দিলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা মূল্যায়ন করন কেমনে? তখন এ্যান্ডারসানকে দেখা গেলো একটু চেতে গেলেন, যেনো সদুত্তর না-পাওয়া অবস্থার উত্তেজনায় জ্বলে ওঠা! তিনি নিজের কাছে ফিরে এসে বললেন- I just mobilize the best facts and values I can in the language of our times, and I have to live with the outcomes of my actions. এ্যালান আরেকটু টোকা দিলেন- 'তাহলে তো আপনার কথায় রেডিক্যাল ইনডিভিডুয়েলিজম এর গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে?' এ্যান্ডারসান জবাব দিলেন- 'কইতে পারো তুমি তা, আর এও কইতে পারো যে আমি রেডিক্যাল কনটেক্সচুয়েলিজম-এ আছি।' অতঃপর এ্যান্ডারসান জানালেন, 'উত্তরাধুনিক রাজনীতি' হলো Postmodern politics is just whatever is happening at the moment. পূর্বোল্লেখিত কথাটা আবারো স্মরণ করা যায় এখানে- উত্তরাধুনিক রাজনৈতিক চিন্তায় জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ মানবজাতির শরীরে একটা 'মারাত্মক রোগ'। এ্যান্ডারসান আরো যা বললেন তার সারকথা হলো, জাতীয়তাবাদী ও দেশীয়ঐতিহ্য চেতনা খুব ঠুনকো। রাশিয়ানরা লিথুনিয়ায় থাকছে, এশীয়রা কানাডায়, আমেরিকায় বহুদেশী থাকছে, ইত্যাদি ইত্যাদি একটা plain old human mobility বিদ্যমান।
ওই সাক্ষাতকারের সর্বশেষ অংশ ছিলো-
Alan: In this turbulent sea, how do you set your political rudder? You advocate taking strong positions - but how do you sort through the complexities and competing values systems to know where to stand?
Walt: First off, you make some choices. Certain issues, for whatever reasons, have a lot of energy for me. Lately I find myself less involved with mainstream environmentalism but very involved in biotechnology issues, which are getting neglected in a lot of ways. So I put my energy where it feels like some difference can be made.
I think the scare talk about biotechnology has prevented people from understanding what a tremendous revolution is going on in the life sciences, and how important this will become in the very near future. I'm especially interested in exploring ways biotechnology can be applied to sustainable development projects in Third World countries.
এ্যালানের প্রশ্নের পরিস্কার উত্তর বেরিয়ে এলো কি এখানে?
'উত্তরাধুনিকতা বনাম বিজ্ঞান' আলোচনায় কেন ওরা বলেন সকল প্রকার বিজ্ঞান লৈঙ্গিক যুদ্ধ? কেনো বলা হলো উত্তরাধুনিকতা মানে - outright irrationalism and rejection of science per se. কোনো কিছুই ঠিক না, কোনো কিছুই ভুল না, কোনো কিছুই সত্য না, কোনো কিছুই অসত্য না, বিরোধী কেউ না, সবকিছু কুয়াশাচ্ছন্ন, অস্পষ্ট। ভবিষ্যতের (?) উত্তরাধুনিক বিশ্ব সম্পর্কে এমন চিন্তা আপনাকে কোথায় নিয়ে যাবে?


[লেখাটি পুনঃপ্রকাশিত হলো। প্রথম  প্রকাশ  - অলস দুপুর ওয়েবজিন। ]

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন