অ্যালেন সাইফুল এর কবিতা | মিহিন্দা




প্রতারিত পাখি



প্রতিশ্রুতি আমাকেও দিয়েছিলেন
কম নয়
বরং ঢের বেশি।

সবকিছু এত দ্রুত ভুলে যেতে নেই
জানেন তো,
কবুতর এবং শকুন
একজন আরেকজনের শূন্যস্থান পূরণ করার ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়নি
অথচ, দুজনেই পাখি।




সংসার


মা’র রাইখা যাওয়া নাকফুলডা পরায়া দিয়া নীরুবালারে কইলাম,
আমার তো একখান ডিঙানৌকা বাদে আর কিচ্ছু নাই
বিয়া কইরা তোমারে কই রাখমু?
নীরুবালা একগাল হাসি দিয়া কইলো,
নৌকার মইধ্যে কি ঘর বান্ধন যায়না— মাঝি?

বুনোফুল, এক আসমান তারাবাত্তি আর চান্দের আলোয় আমরা বাসর সাজাইলাম
একজন আরেকজনের হাত ধইরা গাঙের উপরে ভাসতে ভাসতে
পুরা রাইত কাটাইয়া দিলাম কতা কইয়া— কত কতা!

নীরুবালা কইতাছিলো, হুনো মাঝি, আমার মনে চায়
শীতের এক বেয়ানবেলা তুমি আর আমি হাত ধইরা ঘাসের উপরে হাঁটতাম
শিশির আর আমার পাওয়ের নুপুরের যুদ্ধে শরম ভাইঙ্গা যাইবো ঘাসেগো।
আমি কইলাম, হেরপর যহন হাঁটা শ্যাষ অইবো
তুমি তোমার ভেজা পাও দুইহান আমার কোলে উডাইয়া দিবা
আমি আমার কান্ধের গামছাখান দিয়া খুব যতন কইরা তোমার পাও দুইডা মুইছা দিয়াম।
নীরুবালা হাইসা উঠলো
তার হাসির শব্দের কাছে হাইরা গ্যালো গাঙ্গের ঢেউ।

নীরুবালার কতা সত্য অইলো
নৌকার মইধ্যে পাতা আমাগো সংসারে সুখের জোয়ার উঠলো
যেই জোয়ারের ফরে আর কোনো ভাটা নাই বইলা ভাবলাম আমি।

একদিন হাইঞ্জারকালে কই থাইক্কা জানি একটা চড়ুই পাখি আইন্না নীরুবালা আমারে কইলো,
এইডা জালে প্যাচাইয়া আছিলো গো মাঝি
নিয়া আইলাম। আইজ থাইকা ও আমাগো লগে থাকবো
তয় চিন্তা করছি, নতুন মেহমান আওনের ফরে ওরে ছাইড়া দিমু।

আমার চোহেমুহে তহন রাজ্যের ব্যাবাক খুশি
নীরুবালারে কইলাম, যেমন কইরাই হউক
এইবার আমার একখান ঘর বান্ধনই লাগবো।

বাইচ্চা অওনের কালে নীরুবালা মইরা গ্যালো আইজ সাত বছর
আমার এহন ঘর আছে
ডাঙায় সংসার পাতনের মতন পয়সা আছে
বেয়ানবেলার ঘাসের উপরে জ্বলজ্বল করা শিশিরকণা আছে
কিন্তু হাত ধইরা হাটনের মতন হেই হাত দুইহান আর কোলের মইধ্যে লইয়া শিশির মুইছা দেওয়ার মতন হেই পাও দুইহান নাই।

শ্যাষ অবাধি নীরুবালারে আমি কিছুই দিতাম পারলাম না
যার দুক্কে মাঝেমইধ্যে রাইতের কালে বুকের মইধ্যে তুফান উডে
সবকিছু ভাইঙ্গা যাইতে চায়— ভাইসা যাইতে চায়
আমারে নিয়া যাইতে চায় নীরুবালার কাছে

কিন্তু নীরুবালা নিজের জান দিয়া আমারে যেই মায়াহরিণীর বাইচ্চা দিয়া গ্যালো
হ্যারে রাইখা কোন হানে যাইতে পারিনা
রঙিন ফিতায় চুলের দুই বেনী আর ইস্কুলের পিরানে পরী সাইজ্জা বেয়ানবেলায় মাইয়া আমার অহন ইস্কুলে যায়
আলতারাঙা দুইহান পাওয়ে নুপুর পইরা ফড়িঙয়ের মতন হারা বিহাল উড়তে থাকে ঘাসের মইধ্যে
বন-বাদাড়ে ঘুইরা পাখির বাইচ্চা ধইরা আইনা পুষে খুব আদরে

আমি দেহি,
নীরুবালা না থাহনেও আরেকখান নীরুবালা বাইড়া উঠতাছে আমার চোক্ষের সামনে।




ধরো


ধরো জীবনানন্দ আত্মহত্যা করে নাই
আত্মহত্যা করে নাই সিলভিয়া প্লাথ
ধরো মানুষের লোভের বলি হইয়া রানা প্লাজা ধ্বংস হয় নাই
ধর্মের দোহাই নিয়া ধ্বংস হয় নাই কোনোদিন ফিলিস্তিন
ধরো বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র
মানুষের কোনো দিন পড়তে হয় নাই অস্ত্রের মুখে

আর ধরো তোমারে আমি কোনো দিন ভালবাসি নাই
কিংবা ভালোবাসো নাই তুমি আমারে




আশ্চর্য ফুল


মা একটা রান্নাঘরের ছবি এঁকে শাড়ির আঁচল ঠেলে দেন চুলায়
আগুন জ্বলে ওঠে
টগবগ করে পাতিলে ছুটে চলে পিতার শ্রম

ক্ষুধার্ত প্যানথার টের পায়, মোহময় ঘ্রাণ
বুঝি তিন দিন পর
বাড়িতে ফুটেছে আশ্চর্য সেই ফুল— সাদা ভাত




কবি


দুপুরবেলা পাতিলে হাত দিয়ে দেখি
কবিতা না লিখে সাদা খাতা ফেলে রেখেছেন

মা— একজন ব্যর্থ কবি।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন