চৌধুরী ফাহাদ এর কবিতা | মিহিন্দা

 

কহল


আরণ্যকের মত হাওয়াদোলক উল্লাসে পাতাদের সিম্ফনি হও যদি,
বৃক্ষের মত আমিও ভুলে যাবো কথাদের বাতুলতা।
চুপচাপ ঝরে পড়ে ছুঁয়ে যাবো ঝরাপাতার শিরা- উপশিরা,
শান্ত জলের কাঁপনের মত কোথাও কোন অস্থিরতা নেই।
আলোর বিপরীত ডালে শুয়ে থাকা নিটোল ছায়ার মূর্ছনা হও যদি,
রাত্রির মত এক অবিনশ্বর ঘোর নিয়ে চোখে অনন্ত রাতের দিকে
স্থির এক মুগ্ধ উড়ানে মুখে তুলে নেবো মৌন সুরের আরাধনা।
এরপর আরও অনেক শীত, আরও আরও শীতকাল পেরিয়ে যাবে
পৃথিবীর কোথাও আর কথা গজাবে না, ভাষা ফাটবে না,
নীরব নীরবতায় হেসে উঠবে গভীরতর সুষমার এক প্রাণোদ্যান।
এরপর আরও অনেক রাত, আরও আরও আঁধার পেরিয়ে রাতে
শিখর থেকে শিকড়ে নেমে ফুটবে এক নরম বৃক্ষের চোখ,
আরণ্যক হৃদয় স্ফুরিত পাতাদের সিম্ফনি ছড়িয়ে পড়বে পৃথিবীতে...




কর্কশ


যা কিছু দেনা, সব মৃত্যুর কাছে গচ্ছিত রাখি।
অসুখ বলতে চিনেছি হৃদয়-
ঘোর শীতকাল তার, মুড়িয়ে আছে সংশয়!
বিবিধ ব্যথার কার্ণিশ গলে কিছু রোদ এলেও নেমে
ওমের পাকড়ে তাদের সাথে হয়না পরিচয়...
অরূপা,
হৈম শাপে জমে যাওয়া দেখো না কেবল-
ব্যথার দেনায় গলে যাওয়াও রেখো বধির চোখ,
পক্ষাঘাতই অপমৃত্যুর একমাত্র কারণ নয়!




রুহ


অনুভূতির দরজা খুলে দিলে এক একা নদী আকাশে উঠে যায়। নৌকার গায়ে ডানা। মেঘ কেটে ভেসে যাবো বলে দাঁড় টানতেই বিষণ্ণ চাঁদ তপ্ত কড়াইয়ের মত মুখ তুলে বাঁধ হয়ে দাঁড়ায় সামনে। স্থবির এক নদী সামনে দাঁড়িয়ে টেম্পারেচারহীন কাঁপুনি নিয়ে জ্বর চোখে ঘরে ফিরবো না ভাবতেই শুনি রান্না হয়নি আজ। নিঃস্ব হয়ে গেলে জামায় সাঁটা একমাত্র পকেট পৃথিবীতে ক্ষুধার পরিমাণ বেড়ে যায় হয়তো! দারুণ এক অস্থিরতা নিয়ে রাতের দিকে মুখ করে থাকা এক নির্জন ল্যাম্পপোস্টের দিকে হেঁটে যেতে যেতে হাওয়ায় দোলে উঠলে আলো, ভুলে যাই ঘরের ঠিকানা। এইসব বিপন্নতা ভুলে অনুভূতির দরজা খুলে দিলে একটা আকাশ নদী হয়ে উঠে। প্রতি রাতে রাত নামলেই ভাবি কবিতার নিলামে একদিন কিনে নেবো সমস্ত আকাশ...





ব্যর্থ জাদুকর


বিষাদগুচ্ছের উপর দাঁড়িয়ে যে ধোঁয়া মেঘ হয়ে উঠেছিল
তার নিচে আঁকা রাতে বসে কালো রঙের অংক কষছে ঘোড়া এক-
ঘূর্ণনের উল্টোগতি ধরে যেতে হবে বহুদুর...

তৈলচিত্র থেকে চুয়ে নামছে লোনা জল
ভেঙে পড়ছে আবছায়া মহল
ওখানে ফুঁসে উঠছে সুনির্মিত বিয়োগ
একটা ঘোড়া- ঢুকে পড়ছে আলখেল্লার ভেতর!

ঘূর্ণনের উল্টোগতি ধরে যে সমস্ত মেঘ ঢুকে পড়েছিল ফাঁকে
আঁধারে তার ফাঁপা অপেরা,
শূন্য চেয়ারে বসে হাসছে ষ্টেজ
ওখানে গলে গলে পড়ছে অতীতের মুখ
একটা ঘোড়া- গিলে ফেলছে নিজের শহর!

শহরের ভেতরে আরেক শহর, চোখ তার অন্য আঁধার
তৈলচিত্রের মুখ-নিশ্চুপ, পরাপর লিখে দিয়েও ফাটছে না অধর...

ম্যাজিক ফুরিয়ে যাচ্ছে দেখে জাদুকর আত্মহত্যা করে বসছে ম্যাজিকের ভেতর!




বর্গ


বিউগলে বেজে উঠলে দেশ
বছরে বছরে জমাট ধুলো ঝেড়ে দাঁড়িয়ে উঠে ঘুমন্ত বৃক্ষের কেশাগ্র,
বিমূর্ত ছায়ার লুণ্ঠিত প্রেম,
আমাদের মানচিত্রের মেঘ গলে আকাশ হয়ে উঠে লাল
অন্ধ প্রহরীর চির বিষণ্ণ বাঁশিতে ভর করে রাগ ভৈরবী!

বিউগলে বেজে উঠলে দেশ
অখণ্ড দিগন্ত জুড়ে একটাই ধ্বনি
আমাদের মহল্লার বৃদ্ধ কুকুরটা এখনও লেজ নাড়িয়ে দাঁড়িয়ে উঠে-
মানুষের ঘরে ভ্রম!
পূর্বের গতি নেই- এখনও সুর্যটা পশ্চিমে অস্ত যায়!
বেঁচে উঠতে গিয়ে কতবার মরেছি আমরা;
স্বাধীনতা জানে!

মাটি জানে হৃদয় জাগানোর বিদ্যা অগাধ!
মৃত মৃত্যুর ঘাতে বিলুপ্ত নিঃশ্বাসের অতলান্তে নেমে
এক অনির্ণীত জাদুমন্ত্রে তুলে আনে ভালোবাসার সনির্বন্ধ আকাশ...




অনির্ণীত কবিতা


আমার মৃত্যুর পর দীর্ঘশ্বাসের মত পুড়িয়ে ফেলো অবশিষ্ট দৃশ্যাবলী,
হৃদয়ের বাতুলতা
পুড়িয়ে ফেলো যেটুকু বর্তমান মাছের কাটার মত বিষ পুষে রাখে
কেননা,
মানুষের জন্য যেখানে শোকের আয়ুষ্কাল সীমিত
সেখানে মনুষ্যবিবৃতির প্রাণের জন্য ব্যথার উৎসারণ স্থান রাখে না হৃদয়
আমার মৃত্যুর পর ছিঁড়ে ফেলো সেইসব বাহাসঘন সারগম
ভালোবাসা নির্মিত সমস্ত স্বরলিপি
অবোধ স্পন্দনে তোমাকে বাজিয়ে যেত সারাবেলা
মুছে ফেলো আমাদের না আঁকা চুম্বন সমগ্র
আমার মৃত্যুর পর পর্দা উঠে গেলে ছিন্নমূল ইথারে
অন্য অনেক রাতের মতোন একক করে নেবো নীরবতারর ঝুলন্ত ব্রিজ..
জানোই তো,
জীবন এক অগুন্তি মৃত্যুর অনির্ণীত কবিতা!


Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন