দুর্জয় খান এর প্রবন্ধ | মিহিন্দা



আধুনিক শিল্পকলায় ইম্প্রেশনিস্টের ইতিকথা



শিল্পকলার ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। ধরা হয়, মানুষের জন্মের ইতিহাস যতোবড় ঠিক ততোবড়োই হলো শিল্পকলার ইতিহাস। আমরা সবাই জানি যে, মানুষ যখন কথা বলতে শেখেনি,তখন বিভিন্ন চিত্র তথা ছবি এঁকে এঁকে একে অপরের মনের ভাব প্রকাশ করতেন। সে সময় মানুষ গুহার ভেতর বসবাস করতেন। পশু শিকারই তাদের একমাত্র জীবিকানির্বাহ ছিলো। ক্রমেই মানুষ যখন সভ্যতার উত্থান ঘটালো শিল্পকলাও সমৃদ্ধ হলো আর শিল্পকলায় আসলো আমূল পরিবর্তন। মানব সভ্যতার ইতিহাসে মানুষ ছবি এঁকেছে বিভিন্ন যুগে। যুগে যুগে শিল্পকলা তার আপন বৈশিষ্ট্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে মানুষ ও সভ্যতার মুখোমুখি হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় জন্ম নিয়েছিলো ইম্প্রেশনিষ্ট আন্দোলন। এটি একটি শিল্পরীতি যা মানব সভ্যতায় উনিশ দশকে এক সমৃদ্ধ ভাবনার নাম ছিলো। তাহলে আসুন আজ ইম্প্রেশনিস্ট আন্দোলন সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।

 শিল্প মনের ( monet) এর আঁকা " সূর্যোদয়ের ধারণা " ছবিটি প্রথম ইম্প্রেশনিজমের সৃষ্টি করে যার ফলে সে সময় থেকেই ইম্প্রেশনিজম আন্দোলনের ধারার সূত্রপাঠ ঘটে।


(ক) ইম্প্রেশনিস্ট আন্দোলনঃ
__________________________

বিশিষ্ট শিল্পগবেষক ডা. মোঃ রফিকুল ইসলাম ইম্প্রেশনিস্ট আন্দোলনের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে

" Impressionist art is a style in which the artist captures the image of an object as someone would see it if they just caught a glimpse of it. They paint the with a lot of color and most of Their picture are outdoor scenes. Their are very bright and vibrant. The artists like to capture their image without detail but with bold colors. Same of the greatest imopressnist artist were edouard manet,camiile pissaro, edgar degas,alfred sisley, clade manet, berthe morisot and pierre auguste reneoir."

মূলত " ইম্প্রেশনিজম " শব্দটি উনিশ শতকের শুরুতে প্রথম ব্যবহৃত হয়। শিল্প মনের ( monet) এর আঁকা " সূর্যোদয়ের ধারণা " ছবিটি প্রথম ইম্প্রেশনিজমের সৃষ্টি করে যার ফলে সে সময় থেকেই ইম্প্রেশনিজম আন্দোলনের ধারার সূত্রপাঠ ঘটে। একটি কথা বলে রাখা ভালো যে, উনিশ শতকের শুরুতে ইম্প্রেশনিজমের শুরু হলেও মনে( monet) এর " সূর্যোদয়ের ধারণা " ( ১৮৭৪ সালে) এবং " দেজনে " ছবিটি এঁকে ইম্প্রেশনিজমকে আবিস্কার করেন। " দেজনে" ছবিতে স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায় যে, ফরাসিদের লাঞ্চ বা ব্রেকফাস্টের চিত্র দৃশ্যমান। এক্ষেত্রে ধরা যায় ক্লদ মনে, তার পাশাপাশি পিসারো, এদগার দেগা, অগাস্ট রেনোয়া, এইসমস্ত শিল্পীগণ ইম্প্রেশনিজম আন্দোলনকে প্রসারিত করেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন " মনে ও পিসারো" যারা ঘরের বাইরে গিয়ে ছবি আঁকতেন কারণ তাদের ধারণা ছিলো পৃথিবীর রেখা সমান নয়,তার রঙও পরিবর্তন হয়। এই চিন্তাধারা থেকে ক্লদ মনে " সূর্যোদয়ের ধারণা " ছবিটি এঁকে সাড়া ফেলে দেন৷ ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখবেন ছবিটি যেনো মোটা মোটা আঁচড়ে স্কেচি টাইপের একটি তৈলরঙা ছবি। অর্থাৎ এখানে কি দাঁড়ালো? শিল্পীরা সবসময়ই সমকালীন মানুষের ভাবনা চিন্তা থেকে অগ্রগামী হয়ে থাকেন। বলে রাখা ভালো, এই ইম্প্রেশনিজম আন্দোলনের সূত্রপাত প্যারিস নগরীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে। ধারনা করা হয়, এই আন্দোলনের পিছনে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক আবিস্কারে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলো। কোনো সভ্যতা যেমন একদিনে গড়ে ওঠেনি ঠিক তেমনি ইম্প্রেশনিস্ট আন্দোলন একদিনে গড়ে ওঠেনি। কোনো সমাজ বা জাতির চেতনা যখন উদ্বেলিত হয় তখনই সৃষ্টি হয় ইতিহাসের। সৃষ্টি হয় নতুন শিল্পকর্ম। পূর্বেই বলেছি ছবি আঁকার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করার আগেই শিল্পীগণ রঙ ও আলোর প্রতি গুরুত্ব দেন। এই আলো তথা সূর্যের আলোর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ, রাসায়নিক রঙের ( chemically producd colour) আবিষ্কারও এই আন্দোলনের মূখ্য ভূমিকা। উনিশ শতকের শুরুতে ইম্প্রেশনিস্ট আন্দোলনের আর্ট প্রদর্শন করা হয়। যখন ইম্প্রেশনিস্ট আন্দোলনের চিত্র প্রদর্শিত হয় তখন জনগণের মনে এক বিভ্রান্ত শুরু হয়। ইম্প্রেশনিস্ট আন্দোলনের শিল্পীদের অনেকটা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়। মূলত সেসব জনগণ রেনেসাঁসের মহান শিল্পী লিওনার্দ্যো দ্যা ভিঞ্চিসহ পূর্ববর্তী শিল্পী রুবেন্স,কন্সটেবল, টারনার এবং দেলাক্রোয়েরের শিল্পধারাই মনোযোগী ছিলেন বেশী। পাশ্চাত্য সভ্যতায় যে নতুন শিল্পকর্মের উদ্ভব ঘটতে চলেছিলো উনিশ শতকের শুরুতে তা কেউই ধারনা করতে পারেনি। পার্থক্য শুধু এই যে, ইম্প্রেশনিস্ট আন্দোলনের শিল্পীগণ বোঝাতে চাইছিলেন আর্টের ক্ষেত্রে আলোর গুরুত্ব অপরিসীম। প্রকৃতি ও মানুষের চিন্তাজগতে আলো কিভাবে প্রভাব বিস্তার করে তারই রহস্য উদঘাটন করে চলেছিলেন। এজন্যই ক্লদ মনে অর্থাৎ তার সমসাময়িক ইম্প্রেশনিস্ট আন্দোলনের শিল্পীগণ প্রকৃত রঙ ( actual colour) , প্রতিফলিত রঙ ( reflected colour) এদের একটি রঙের পাশে অন্য রঙের উপস্থিতিতে উদ্ভাবিত রঙ নিয়ে তারা গবেষণায় ব্রতী হলেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পরিপূরক রঙ ( complementary colour) বড় পরিসরে পাশাপাশি অবস্থান করলে এটির গুণাগুণ বেড়ে যায়। ইম্প্রেশনিস্টরা আরও লক্ষ্য করলেন যে, প্যালেটে বিভিন্ন রঙ না মিশিয়ে টিউব থেকে সরাসরি নিয়ে তা যদি পাশাপাশি লাগানো যায় তা হলে দূর থেকে দেখলে মিশ্রিত রঙের মতোই দেখাবে। এখানে আলোর গুরুত্ব অপরিসীম। শর্টকাট উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হলুদ ও নীল পাশাপাশি ব্যবহার করলে আলোর প্রতিফলনে এটা সবুজ দেখাবে।

এই ইম্প্রেশনিস্ট আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ। এর কারণে এসময়ের শিল্পীগণ নতুন করে জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁরা জনসাধারণের মাঝে চলে আসে। এখানে এসে খুব কাছ থেকে তাঁরা লক্ষ্য করলেন, খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ ও তাদের জীবন সংগ্রামকে৷ উপলব্ধি করলেন প্রকৃতির নতুন রূপরেখা। যা আগে অতটা গভীর থেকে পর্যবেক্ষণ করা হয়নি। অতি সাধারণ মানুষ যেমন, কৃষক,শ্রমিক, কসাই,নর্তকী,জঙ্গলের নারী, এমনকি বিভিন্ন দেবদেবী ও পতিতারাও তাদের চিত্রকলার মূল বিষয়বস্তু হয়ে উঠে। এটিই হলো শিল্পকলার নবতর অধ্যায়। পরিবর্তিত হলো সনাতন নান্দনিকতায়।


ইম্প্রেশনিস্টরা যখন রঙের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করতে গিয়ে বিষয়ের প্রতি অবহেলা করলেন ঠিক তখনই পোস্ট ইম্প্রেশনিজমের শিল্পীরা বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে একটি নির্দিষ্ট ধারায় চিত্র উপস্থাপন করলেন। 


(খ) পোস্ট - ইম্প্রেশনিজমঃ
___________________________

পোস্ট - ইম্প্রেশনিজম নামকরণটি ১৯১০ সালে ব্রিটিশ শিল্পী ও শিল্প আলোচকগণ করে থাকেন। ক্লদ মনে'র আমল থেকে এটিকে পোস্ট - ইম্প্রেশনিজম নামে আখ্যায়িত করা হয়। একের পর এক চিত্রকলা প্রদর্শিতে নতুন করে নতুন কিছু উঠে আসতে থাকে। যার অধিকাংশই ছিলো তরুণ শিল্পী। এ কারণেই এটার নাম দেয়া হয় ' পোস্ট - ইম্প্রেশনিজম'। ইম্প্রেশনিস্টরা যখন রঙের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করতে গিয়ে বিষয়ের প্রতি অবহেলা করলেন ঠিক তখনই পোস্ট ইম্প্রেশনিজমের শিল্পীরা বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে একটি নির্দিষ্ট ধারায় চিত্র উপস্থাপন করলেন। এখানে আরকটি কথা বলে রাখা ভালো যে, ইম্প্রেশনিস্টরা রঙ ও আলো নিয়ে গবেষণা করতে থাকলে পোস্ট ইম্প্রেশনিজমের শিল্পীরা বিষয়ের উপর ঝুঁকে পড়েন অন্যদিকে জর্জেস সুরা পা বাড়ালেন ' পয়েন্টিলিজম'র দিকে। এই ধারা তখন একেবারে নতুন এবং সে ধারায় একমাত্র সে-ই একক যাত্রী। পোস্ট ইম্প্রেশনিজমের শিল্পীদের এখনো ফলো করে থাকেন আধুনিক বিশ্বের শিল্পীগণ৷ কেননা পোস্ট ইম্প্রেশনিজমের শিল্পীরা মনে করতেন, প্রকৃতিতে এতো জিনিস থাকে যে, তা একজন শিল্পীর পক্ষে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। ঈশ্বরই সবচেয়ে বড়ো স্রষ্টা। মানুষ যত বড়োই স্রষ্টা হোক না কেনো, ঈশ্বরের কাছে সে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র। তাই তারা অনেক কিছু বাদ দিয়ে কেবল বিষয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করলেন। আর সেটাই যৌক্তিক বলে মেনে নিলেন ইম্প্রেশনিস্টরা।

(গ) পয়েন্টিলিজমঃ
______________________

পয়েন্টিলিজম এমন একটি পদ্ধতি যা ছোট ছোট রঙের বিন্দু দিয়ে সন্নিবেশিত চিত্র বিশেষ। এটি ইম্প্রেশনিজমের একটি বিশেষ শাখা। জর্জেস সুরা এই ধারার প্রথম উদ্ভাবন করেন ১৮৮৬ সালে। ' পয়েন্টিলিজম " শব্দটি শিল্প সমালোচকগণ দিয়েছেন আঠারো শতকের শিল্পীদের হাস্যাস্পদ করার জন্য কিন্তু পরবর্তীতে এটিই হয়ে উঠে ইম্প্রেশনিস্ট আন্দোলনের একটি বিশেষ শাখা। জর্জেস সুরা এই ধারাটির নাম দেন ' নিও - ইম্প্রেশনিজম'। নিও ইম্প্রেশনিস্টারা আধুনিক নগরীর জীবন, ল্যান্ডস্কেপ ও সমুদ্র সৈকতের ছবি আঁকতে শুরু করেন। জর্জেস সুরার বিখ্যাত ছবি একটি হলো ' রোববারের বিকেল' যা নিও ইম্প্রেশনিস্টদের অভিভূত করে। ধারণা করা হয়, এই সময়কালটি ছিলো ফ্রান্সের আধুনিক শিল্পকলার সময়। এ নিয়ে ম্যাক্সিমিলিয়েন লুস ' সকাল ' নামে (১৮৯০ সাল) একটি চিত্র প্রদর্শন করে জর্জেস সুরার সাথে সহযাত্রী হিসেবে নাম লেখান। পয়েন্টিলিজমের ধারায় আঁকা সমস্ত ছবি ডিভিশননিজমের সঙ্গে ওতোপ্রোতো ভাবেই জড়িত। এক্ষেত্রে জর্জেস সুরা, সিগনাক এবং হেনরি এডমন্ড এগিয়ে ছিলেন। গতানুগতিক চিত্র থেকে কিছুটা ভিন্ন আকারে রঙের ছোট ছোট বিন্দু দিয়ে অসাধারণ কিছু ছবি আবিষ্কার করেন। পয়েন্টিলিজম রীতির শিল্পীরা তিনটি বিষয়ের উপর ঝুঁকে পড়েন

১) কোনো বস্তুর স্বাভাবিক গড়নের বহিঃরূপ
২) বিষয় সম্পর্কে শিল্পীর অনুভূতি
৩) রঙ, রেখা ও গড়নের নান্দনিক পরিশুদ্ধতার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ।

১৮৯০ সালে মরিস দেনিস সিনথেটিনিজমের সম্পর্কে বলেন, ' চিত্র হচ্ছে কোনো দ্বিমাত্রিক পটে একটি বিশেষ পদ্ধতিতে রঙ লাগানো'।

পয়েন্টিনিজমের মূলধারাটাই হলো, দ্বিমাত্রিক ও ফ্ল্যাট প্যাটার্নসমৃদ্ধ চিত্র, যা ইম্প্রেশনিস্ট আন্দোলনকে অনেকদূর পর্যন্ত প্রবাহিত করেছে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন