কবির হোসেন এর কবিতা | মিহিন্দা




কূয়োর সাপ


কূয়োর ব্যাঙ নিয়ে কত লম্ফঝম্প হয়, কিন্তু ব্যাঙের লোভে যে সাপটি কূয়োয় লাফ দিয়েছিল, আর আটকে গিয়েছিল ব্যাঙের জেলখানাতে, এ-ব্যাপারে কোনো বীণ বাজে না। কেনইবা বাজবে, ব্যাঙ খেয়ে সাপই যেখানে ঘ্যাঙরঘ্যাঙ ডাকে, মেঘ দেখলেই চিৎকার করে ওঠে আর বৃষ্টি ঝরাতে মায়াকান্না করে কূয়ো ভরাট করতে জলে! আশ্চর্য হই, সারাজীবন ব্যাঙ খেয়ে লাফের চর্চা করতে চেয়েছিল যে সাপ, আজতক তার পা-ই গজালো না! পা ছাড়াই সাপের এই ভুল লাফের সংবাদ রাষ্ট্র হয়ে গেছে হয়তো—ব্যাঙের পুকুরে দেখি সাপ বড়শি পেতে রাখে!




কালো বক


কলসের পানি যতোটা কম হলে একটি কাককে বক হয়ে যেতে হয়, তারচেয়েও কম পানি রেখে একটি কলস পেতে রাখি উঠোনে। কণ্ঠে তীব্র তৃষ্ণা নিয়ে একটি কাক উড়ে এসে ধরা পড়ে, কলসে গলা বাড়িয়ে পানি খেতে গিয়ে বক হয়ে যায়; তারপর তৃষ্ণার কথা ভুলে হঠাৎ ক্ষুধার্ত হয়ে উঠলে—মাছ ধরতে নেমে পড়ে কলসে। আমরা কলসের ঢাকনা ফেলে বকটি ধরে ফেলি, একটানে খুলে ফেলি তার উকিলের পোশাক।

বকের মাংশ খেয়ে বাবা রায় দেন—বিভিন্ন মাছের স্বাদ পাওয়া যায়।




দাড়িপাল্লা


দাড়িপাল্লায় বাঁ পা ওজন করে মাপি তার পথটা। ডান পা ওজন করে মাপি তার পথ। দুই পায়ের মাপে দেখি গড়মিল—বাঁ পায়ের চেয়ে এককদম এগিয়ে আছে ডান পা। অর্থাৎ বাঁ পা পেছনে রেখে ডান পা এককদম এগিয়ে, হাঁটার ভঙ্গিতে, একদিন এভাবেই থমকে দাঁড়াতে হবে, চিরতরে। এখানেই তাদের দু'জনের পথ শেষ। অথচ দু'জনের ওজনে থাকার কথা সমান পথ। তবে বাঁ পায়ের ঘাটতিটা খরচ হলো কোথায়?
মনে পড়ে, হোঁচটে আহত ডানের শুশ্রুষায়, বাঁ হেঁটেছিলো বেশি।





উচ্চতর কৃষিবিজ্ঞান


ফসলি এক জমিতে ধানের গোছার মতো কতোগুলো বিল্ডিং রোপণ করা হয়েছিলো। আশ্চর্য, মাটি এতোটাই উর্বর যে এক মৌসুমে সবক'টা বিল্ডিংই তরতাজা হয়ে উঠলো। আবার বিল্ডিংগুলোতে ফলনও ফলেছে দারুণ—একেকটা বিল্ডিংয়ে ফলেছে পঞ্চাশ কিংবা ষাট সত্তর তলা। ফসল কাটার দিনে আরেক আশ্চর্য দেখতে পেলাম। ফসল না কেটে চাষী ক্ষেতে রেখেই ফসল বিক্রি করে দিতে লাগলো, আর লোকজন ফসল কিনে ফসলের ভেতর ঢুকে পড়তে লাগলো পরিবারসহ।

আশ্চর্য, নবান্নের উৎসব করে ফসলগুলো মানুষ খেতে লাগলো!





শিকার ও শিকারী


নদীতে ছিপ ফেলে বহু বছর ধরে বসে আছি যে-মাছটির জন্য, তার ছেলে, একদিন বন্ধুদের নিয়ে এসে আমাকে দেখিয়ে বলে—ঐ দেখো, বাপের শিকার। ছিপটার ঠিক নিচেই একটি সাপ, ফণা তুলতে জানে না, ছিপের ভয়ে সেই যে মাথা পেতে রেখেছে উঁচিয়ে, আর যেতে পারেনি। কতো ঢেউ এলো গেলো, ধাক্কালো, জলের ওপর ছিপের ছায়াটিকে নিয়ে যেতে চাইলো, ছায়াটি আর গেলো না। নড়চড় নেই দেখে যে-ফড়িংটি আমার ওপর বাসা বেঁধেছিলো, তার ছেলে আমাকে পৈত্রিক ভিটা দাবি করেছে। এসব নিয়ে ভাবছি না অবশ্য; ভাবছি—তাকিয়ে আছি যে-উড়ন্ত প্রজাপতিটির দিকে, সে কেনো যেতে পারেনি!




বুলেট ট্রেন


মা, ট্রেন এখন আর কণ্ঠে তেল পান করে না, গানের সুরও গেছে পাল্টে। কোথা থেকে যেনো শুনেছে অর্থেরও আছে তরলের স্বভাব, সেই তরলে কণ্ঠ ভেজাচ্ছে জ্যৈষ্ঠ মধুতে। আর গানের সুরে সুরে বের হয়ে আসছে সাদা মেঘের ধূসর অন্ধকার। গুটিগুটি পায়ে যে গান গাইতো পুরনো, তা ভুলে, নতুন গানে দৌড়াচ্ছে এক বুলেট—কার যেনো বুক ফেড়ে। মা, অর্থে কী এমন তারল্য আছে—যা পান করলে অনর্থক ট্রেনও অর্থ পেয়ে যায় চলার। দেখো, নতুন ট্রেনের পেছনে চলছে পুরনো একটি বগি—যেনো অনর্থক বসে আছে শেষে।
শেষ বগির বাসিন্দা আমি, ট্রেন প্লাটফর্মে পৌঁছে গেলেও আমি পৌঁছাই দেরিতে।




বেলুনফল


আশ্চর্য এ হাওয়াগাছ, বেলুন ফলে আছে ডালে ডালে। ফুল হয়নি কোনো, গাছে, কাঁটা জন্মে যাবে বলে। ফুলের শ্বাসনালীতে বেলুন ফলে আছে। শ্বাস পান করে বেলুন ফুলে ওঠে ক্রমে, ফুলের ঘ্রাণ নিয়ে। শ্বাসনালী পায়নি বলে পাতা জন্মায়নি গাছে। পাতার জীবন বেলুন যাপন করে, বাতাসে দুলে দুলে। বাতাসকে বলে দেওয়া হয়েছে, সূর্য আর ধুলোবালিকেও—দৃষ্টি তির্যক দেওয়া যাবে না, বেলুনের বুক ব্যথা করে। সুঁই অথবা কাঁটার গল্প—ঘষে ঘষে তুলে ফেলা হয়েছে।

তবুও খবর চলে আসে, বেলুনগাছতলায় বেলগাছের চারা দেখা গেছে।





কানের উৎপাত


কর্ণের মতো মাইক খাড়া করে পেতে রাখা হয়েছে, একে একে ধরা দিচ্ছে কথা গোচরে। ব্যক্ত যতো কথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, ব্ল্যাকহোলে জমা হচ্ছে আকর্ষণে। যে-কথা হয়নি বলা এখনো, মুখে লেগে আছে স্বাদের মতো, তাও দৌড়াচ্ছে শ্রুতের দিকে। গোপনাক্রান্ত কথা কিছু—জ্বরের প্রকোপ নিয়ে কাঁথামুড়িতে লুকিয়ে আছে গোপনে, তাও চলে আসছে ছুটে মাইকের ফাঁদে। এতো বড় কানের উৎপাতে কথা কি আর গোপন থাকে? কেউ কেউ তো জানে না, জবা ফুলের মতো এই লোলুপ কানে যা হচ্ছে শ্রুত, তা হবে তার কথা। এতোটা নিগূঢ় টেনে আনে মাইক, কথা উৎপন্নের মেশিনকে ক্লান্ত করে। আর সে-সব কথা তার বেয়ে পৌঁছে যাচ্ছে মাইক্রোফোনে।

মাইক্রোফোন হাতে এক বোবা ও কালা, কুন আইস্ক্রিমের মতো চেটে খাচ্ছে কথা আয়েশে।



ব্যর্থ কমলা


বয়স যেখানে এলে কমলা পাকে, দেহে রঙের প্রলেপ নিয়ে গন্তব্যের স্বাদে মিষ্টি হয়ে ওঠে, একটি সবুজ কমলা সেখানে এসে দেখে—দোকান বন্ধ করে রঙমিস্ত্রি হারিয়ে গেছে। রঙের তৃষ্ণা নিয়ে দোকানের বাইরে সবুজ কমলাটি কণ্ঠ পেতে বসে থাকে, দোকানদারের অপেক্ষাতে। বসে থাকতে থাকতে বাড়তে থাকে তার মাংশপেশি ও স্থুলতা, বাড়তে থাকে ক্যালেন্ডারের বয়স। বড় হতে হতে কমলাটি ক্রমশ জাম্বুরা হয়ে ওঠে। তারপর কারো ডিশে লবণ মরিচের মাখামাখিতে ছটফট করতে থাকে আর জাম্বুরাকে ভাবতে থাকে ব্যর্থ কমলা।

লেবুকে ভাবতে থাকে অকাল প্রয়াত কমলা, যে কমলা হওয়ার ঝুঁকি নেয় না।




পৃথিবীর গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা


পৃথিবীর পেট খারাপ হলে, আগ্নেয়গিরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। উগড়ে দেয় যাবতীয় বদহজম। আগ্নেয়গিরির এই উগড়ানো রোগে পৃথিবীর পানিশূন্যতা ব্যাধি হয়—শুকিয়ে যায় সমস্ত জলাশয়। সাগর নদী খাল বিলের তুমুল তৃষ্ণায় আকাশে মেঘ ওড়ে না—দূরবীণ দিয়ে শুষে নেয় উত্তপ্ত কড়াই। পৃথিবীর যাবতীয় আঙুরগাছে কিসমিস ফলে, জলপাইগাছে পাই ফলে কেবল জল নিভে যায় তৃষ্ণাতে। গোপন জলাশয়ের তুমুল তৃষ্ণাতে পৃথিবী শুকিয়ে যায় পানিশূন্যতায়।

পৃথিবীকে ওরস্যালাইন খাওয়াতে হবে—জলে ভরে উঠবে যাবতীয় জলাশয়।




মার্বেল বিপ্লব


পৃথিবীর সমস্ত মার্বেল মুক্ত হয়ে গেছে, যে যার মতো ছুটে পালাচ্ছে দিগ্বিদিক। ঢালুপথ ধরে মার্বেল দৌড়াচ্ছে গড়িয়ে, সাপের গোপন পায়ে। নদীর সাথে যেনো গোপন সম্পর্ক আছে—যেদিকেই যাচ্ছে মিশে যাচ্ছে নদীতে; অথবা প্রাচীন জল থেকে তৈরী এই মার্বেল, ফিরে যাচ্ছে মায়ের বুকে। মার্বেল ফিরে পাওয়ার আনন্দে দেখো নদীগুলো খলবল করছে। বরফের টুকরো ভেবে গলানোর চেষ্টা করছে চুমুতে চুমুতে। আর সমস্ত নীরব মার্বেল, নদী বেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে নিম্নাঞ্চলের দিকে। কোনো এক নিম্নাঞ্চলে মার্বেলের বন্যা হয়ে জানান দেবে নিজেদের তারল্য স্বভাব।

একদিন মার্বেল দখলে নেবে যাবতীয় ঝর্ণা। তারও তো আছে জলের ধর্ম—গড়িয়ে চলার।



দূরদর্শন


আমার টেলিভিশনটা আশ্চর্য এক দূরবীণ, বৈদ্যুতিক সংযোগ দিতেই দূর-দূরান্ত চলে আসে নিকটে, ভেসে ওঠে পর্দায়। অনেকটা সিসিটিভি, কোথাও ক্যামেরা নেই কোনো, তবুও সিন-সিনারি টেনে নিয়ে আসে। জুম যতো বাড়াই ততো দূর-দূরান্ত চলে আসে নিকটে, টিভির পর্দায়, জীবন্ত দৃশ্যগুলো সরাসরি সম্প্রচার হতে থাকে; এমনকি সীমানার বাইরে যে-গোপন লুকিয়ে থাকে আড়ালে, বাড়াতে জানলে সে-সবও চলে আসে পর্দাতে। কমালে দেখি অতিনিকট দৌড়ে চলে যায় অতিদূরে। ঐতো, আমার ঘরের দরোজা জানালা চলে গেছে কতো দূরে, সামনের গ্রামে, তারচেয়ে আরো দূরে কুকুরটা।

কুকুরটা ঘরের বাইরেই ছিলো, আমার কাছে আসতে লেগে যাচ্ছে তার সারাটাদিন সময়।





কাগজের নৌকা


কাগজের নৌকাটি জলে ভাসাতে গেলেই দেখি বারবার ডুবে যায়। যেনো মালপত্র অতিরিক্ত হয়ে গেছে, লোড নিতে পারছে না। অথচ দুই পৃষ্ঠার কাগজের নৌকায় যতোগুলো কথা দেওয়া যায় ততোটাই দিয়েছি। তবুও চলে না নৌকা, ভাসাতে গেলে সাথে সাথে ডুবে যায়, কব্জি সমান গভীর এই নদীতে। আমি কি লাইন দিয়ে ফেলেছি বেশি তবে? এমনও না যে কলমের নিভ মোটা ছিলো, কালি গাঢ় ছিলো। দুই পৃষ্ঠার একটা কাগজের নৌকা কতো শব্দের ভার বইতে পারে?
কাগজের নৌকা থেকে দশটি শব্দ কেটে দিয়ে দেখি—নৌকাটি জলে ভাসে দিব্যি।




একজন সিনেমাপ্রেমি অন্ধ


দাঁত ব্রাশের সাথে প্রতিদিন সকালে নিয়মিত কান পরিষ্কার করে যে অন্ধ লোকটি, তাকে সকলেই চিনে একজন তুখোর সিনেমাপ্রেমি হিসেবে। কান পরিষ্কার করেই টেপ রেকর্ডার নিয়ে বসে পড়ে সে, তারপর ক্যাসেট চালু করে রেকর্ডার কানে লাগিয়ে শুনতে থাকে অডিও সিনেমা। তার সিনেমা শোনার এই নেশার সাথে কোনো মাতালই পেরে ওঠে না, যেনো গোগ্রাসে গিলছে সব। নিয়মিত হলেও যায়, নতুন নতুন সিনেমা শুনে আসে। নতুন পুরনো সব সিনেমা শোনা হয়ে গেছে তার, এখন কান পরিষ্কার করে বসে আছে মুক্তিপ্রাপ্য সিনেমার অপেক্ষাতে।

এই ফাঁকে তার মনে পড়ে নির্বাক চলচ্চিত্রের কথা, যার অস্তিত্ব প্রমাণিত নয় তার কাছে।




বৈদ্যুতিক শালবন


এই-যে দেখছেন শালগাছের বৈদ্যুটিক খুঁটি, রোপন করা আছে রাস্তা/ঘরের পাশেই, এর গোঁড়ায় নিয়মিত পানি অথবা রাসায়নিক সার দিলে বিদ্যুতের ফলন পাবেন ভালো। আলোর জন্য বাল্বে বাল্বে পৌঁছে যাবে বৈদ্যুতিক জ্বালানি। এবং ফ্যানের নিঃশ্বাস থেকে উৎপন্ন হবে অক্সিজেন। শহরজুড়ে অসংখ্য শালগাছ নিয়ে যে শালবন, ঘরে বসেই পাওয়া যাবে তার সুবিধা। এবং ডাইনিং-রুমে বসেই সারা যাবে বনভোজন। কল ছেড়ে তালের রস পাবেন অবশ্যই, যদি ব্যক্তিগত উদ্যোগে ঘরের পাশের খুঁটিটি তালগাছের দিতে পারেন।
আমি দিয়েছি ধানগাছের—কুকার সংযোগ দিতেই ভরে ওঠে ভাতে।



Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন