ট্রামের চাকার নীচে মৃত্যুহীন এক দেহ : সায়ন | গদ্য | মিহিন্দা




"বাড়ি ফেরার আগে চশমার ফাঁক দিয়ে খুব সাবধানে তোমায় একবার দেখে নিই
আপাতত আমার আত্মহত্যাপ্রবণতা স্লিপিং পিল খেয়ে বেঘোরে ঘুমোচ্ছে,
       আমাদের বেঁচে থাকাগুলো আসলে আমাদেরই হাতে
অতীত বলে কিছু হয়না, যা হবার, তা আগেই হয়ে গেছে..

        মাইরি বলছি আমি দিব্বি আছি
ব্যস্ত শহরে আজ কবুল করছি
ভালবাসার মত সুন্দর কিছু নেই আর!"

এ কবিতা এক নারীর, যার বয়স আমার চেয়ে ঢের কম - সৃজনী দত্ত। এই লেখা খাতায় ছড়িয়ে গেছে তার হঠাৎ খুলে যাওয়া পা ছোঁয়া চুলের খোঁপা থেকে। ২২শে অক্টোবর একটা স্তব্ধ তারিখ, তোমার কথা মনে হয়। অক্টোবরে আর কোনও তারিখ নেই! একটা রক্তচিহ্ন একটা জোড়া ট্রামলাইন একটা ট্রাম আর সময় মুখোমুখি এসে দাড়িয়ে যাবে অনন্ত কালের " নক্ষত্রের আলো জ্বেলে পরিষ্কার আকাশের 'পর"। 

- জীবনানন্দ দাশকে চেনেন?
- একটা আচমকা ধাক্কায় আমরা লাইনের নিচে গডিযে় গেলাম। আর কিছু মনে নেই ... 

বারবার ৩৬৫ দিন অন্তর ক্যালেন্ডার ছিঁড়ে ফেলে দিলে তবুও অক্টোবর ফিরে আসে, আর আমি " আমার দেহের গন্ধে পাই তার শরীরের ঘ্রাণ, -/
সিন্ধুর ফেনার গন্ধ আমার শরীরে আছে লেগে।" ট্রাম লাইনের নিচে কি চাপা আছে সিন্ধুর বিরাট
পলিমাটির চরাচর! ওখানে চলে যাবো পাঠক এক অমিমাংসীত কবির হাত ধরে..... জীবনানন্দ কে চিনতে পারছেন? 

সমস্ত সারসের বিপন্ন বিস্ময় আর বন্দুকের গুলি থেকে বার হওয়া বুলেটের পর যে ধোঁয়া, তার কথা লিখেছিলেন কোনও এক আজন্ম চলমান মানব, তিনি জানতেন " শরীর রয়েছে, তবু মরে গেছে আমাদের মন!" 
- ওই দেখুন কেমন আমাদের দেখে সবাই চিৎকার করছে!
ভাবলো মাথা দেওয়ার জন্য ট্রাম লাইন বেছে নিলাম। স্বার্থপর মধ্যবিত্ত.. বিপ্লবহীন বিপন্ন জীবনের পরগাছা। 
যখন বেঁচেছিলাম কটা লোক আর একপাতা উল্টে দেখেছে, তবুও বলে গেছি - " মুখে রক্ত ওঠে - তবু কমে কই বুকের সাহস! / যেতে হবে , - কে এসে চুলের ঝুঁটি টেনে লয় জোরে! / শরীরের আগে কবে ঝ'রে যায় হৃদয়ের রস! -" তারপরও "মৃত্যুর ঠোঁটের" উপর আমি গাঢ় ভাবে টেনেছি ঠোঁট ভরা ভাষালিপি। 
- আপনি ট্রামের নিচে কেন এলেন? 
বিপন্ন বন্দর থেকে যে জাহাজ , তেলের ভান্ডারের খোঁজ না নিয়েই সমুদ্র সংগমের জন্য মেতে ওঠে তার কোনও লোহার চাকার উপরে বা নিচে - কোনও কিছুতেই বিস্ময় বা বিশ্বাস নেই আর " অশান্ত হাওয়ার বুকে তবু আমি বনের মতন/ জীবনেরে ছেড়ে দিছি! - "। 

- ওই তো এসে গেছে উনি,এসো আলাপ করাই ।
ওনার নাম - মৃত্যু। 
আমি ওকে জীবন বলে ডাকি।
- এখন শুধু আমাদের কবিতা গল্প আর উপন্যাস নিয়ে কথা বলা। একটা ট্রাঙ্ক আছে ভরা আমার খাতায় । 

আমরা জীবনপাঠ করতে চাই। সবটাই শুনে যাই গ্রানাইট পাথরের মতো অজর নির্বাক শব্দের নিচে জেগে থাকা হৃদয়ধ্বনি থেকে। ওরা বেঁচে আছে কারণ " মৃত্যুরেও তবে তারা হয়তো ফেলিবে বেসে ভালো! / সব সাধ জেনেছে যে সে-ও চায় এই নিশ্চয়তা!" 
সমস্ত উদ্ধৃত বাক্যবন্ধ - কবিতাই বলো কিংবা নেশা, লেখা থাকবে 'জীবন' কবিতাগুচ্ছের পাতায়, ট্রামলাইনের গা'যে় তারপর ওরা আস্তে আস্তে জেগে উঠবে, হাঁটবে, বিপন্ন রাতের তরুণের ডাবলাব হৃৎপিণ্ডের দংশনের ভিতর ,চলে যাবে অক্টোবরের প্রতিটা মুহূর্তে যেখানে " নির্জন রাত্রির মত শিশিরের গুহার ভিতরে, -/
পৃথিবীর ভিতরের গহ্বরের মতন নিঃসাড়/ রব আমি;"।

জেগে উঠি, দেখি,আত্মহত্যারলিপি নয়, বনলতা থেকে ব্যবিলন ব্যপ্ত জীবনভাষার চাদরে ঢাকা আছে জীবননান্দের ঠান্ডা দেহ।


Post a Comment

أحدث أقدم