শরীফ আহমেদ এর প্রবন্ধ | মিহিন্দা



ব্যাক্তি একা এক সংকট নয়। ব্যাক্তি হচ্ছে সমষ্টির সংকট।




প্রাত্যহিক যেসব ঘটনা থেকে আমরা বিমুখ হই তাকে আমরা বিস্মৃত করে দিতে চাই। এই বিস্মৃত দশা থেকে মানুষের মুক্তি নেই।যেমন মুক্তি নেই মৃত্যু থেকে। মানুষ সহজাতভাবেই চায় নিজের তৃপ্তি। আর এমন তৃপ্তি আপনা- আপনি অর্জিত হবার নয়। যেহেতু সকলেই নার্সিসিস্ট নয়। তাই তাকে অন্যের দিকে ধাবিত হতে হয়। "জগত" বলতে আমরা যা বুঝি তা তো কেবল" ব্যাক্তি" একা নয়। তার সকল সুখ-দুঃখের যেসব যোগান পরিপার্শ্ব থেকে আসে সেসবই তার জগত। অথচ আমরা প্রত্যেকেই নিজেকে সুক্ষ্ম কৌশলে উপস্থাপন করতে দ্বিধা করি না যে "আমিই একমাত্র আমার জগত"। ফলে এখানে একটি বৈপরীত্য ঘটনা ঘটতেই থাকে। একজন সুস্থ সবল মানুষ কখন সুস্থ স্বাভাবিক এবং কখন অসুস্থ এবং অস্বাভাবিক তা নির্ণয় করে তার সাথে সুদৃঢ়ভাবে যুক্ত থাকা অপর মানুষ নামক জগত। যেখান থেকে সামান্য একটু ওজনে হেরফের হয়ে গেলে মন নামক নিক্তির এক দিকটা হেলে পড়ে। অবশ্য সবকিছু যে মানসিক ব্যাপার জনিত অবস্থা থেকে আগত তা ই নয়। বর্তমান ইন্টারনেট দুনিয়ায় জীবিকার ধরণও গেছে আমূল বদলে। ফলে কর্পোরেট ঘেঁষা নাগরিক জীবনে এসেছে দুর্বার পরিবর্তন। একদিকে পুঁজির আগ্রাসনে একদল লোকের যেমন স্থূল চিন্তার বিদ্যা বেড়েছে অপরদিকে প্রান্তিক বা গ্রামের একদল লোকের মধ্যে ক্রমশ পুঁজির সাথে প্রতিযোগীতায় পেরে না উঠায় তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে অন্য এক শংকা। ফলে শিক্ষা থেকে ওরা দিনকে দিন দূরে সরে যাচ্ছে। ছুটছে ভিনদেশে ঝুঁকিমুক্ত পুঁজি বিনিয়োগ করে শ্রম দিতে। আর এদের মধ্যে যারা দেশের প্রতি প্রবল আস্থা রেখে বিদ্যার্জনের মাধ্যমে দেশেই থিতু হতে চান
সমস্যাটা এদেরকেই আঁকড়ে ধরে সবচেয়ে বেশি। একদিকে তার যেমন শুরু হয় শিকড় হারানোর ভয় অন্যদিকে আশংকা থাকে মিথ্যে সভ্যতার ছাঁচে নিজেকে গড়ে নেয়ার।এই যে ব্যাক্তির পট পরিবর্তন এক স্থানিক থেকে অন্য স্থানিকতায়। তা থেকেই এক ধরনের মানসিক অবনতি ঘটে প্রায়শই।

ব্যাক্তি একা এক সংকট নয়। ব্যাক্তি হচ্ছে সমষ্টির সংকট। ব্যাক্তি যখন একা নিজের স্বকীয়তা চেয়ে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় সর্বজনের প্রতি তখন আমাদেরকে বুঝে নিতে হবে যে,, প্রচলিত অর্থে যা চলছে রাষ্ট্র বা সংস্কৃতির পরম্পরায় তা থেকে কিয়দংশ নয় অনেক দূরে আমাদের অবস্থান নচেৎ রাষ্ট্র বা সংস্কৃতিই দূরে সরে গেছে।

লেখাটি যে উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়ে নেয়া তা হলো "আত্মহত্যা"।

আমরা অনেকেই জানি বিশ্ববরেণ্য অনেক কবি সাহিত্যিক এ পথ অবলম্বন করেছেন।
তেমনি আমাদের জীবনানন্দ দাশও কী? যদিও জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে আমরা কেউ ই স্পষ্ট করে বলতে পারি না। এটি আত্মহত্যা না নিছক দূর্ঘটনা। যাই হোক আত্মহত্যা হিশেবে চালিয়ে দেয়ার মত একটি প্রয়াস আমরা পেতে পারি বা পেতে চাই তার "আট বছর আগের একদিন " কবিতায়। বিদগ্ধজন মাত্রই কবিতাটি সম্পর্কে জ্ঞাত আছেন।যদিও কবিতায় আত্মহত্যার প্রতি দার্শনিক বয়ান খুব শক্তিশালী। তথাপি তাকে আত্মহত্যা বলা যেতে পারে আবার নাও বলা যেতে পারে। 

কবিকে শ্রদ্ধা জানানো কিংবা কবির প্রতি সুগভীর মূল্যায়ন আমার পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়। যেহেতু আমি একাডেমিক কেউ নই বা তাকে পাঠোদ্ধার করবার মত সেই মেধাও আমার নেই। শুধু লব্ধজাত সামাজিকীকরণ পর্যায়ে আমাদের মণীষা যেখানে মিইয়ে গেছে তা সম্পর্কে উষ্মা প্রকাশ করতে পারি।
এবং একথা বলতে জানি এতটা বিদ্যার্জনের দরকার নেই। সাধারণ এবং অসাধারণ হিশেবে দুটো গোত্রকে যদি দেখি তাহলে প্রথমটিকে ধরা যেতে পারে যারা লেখালেখি করেন না তাদেরকে। দ্বিতীয়ত যারা লেখেন। শুধু লেখেন বললে ভুল হবে। তারা লিখেন এবং যাপন করেন একটি লিখনীয় জীবন।
তো আরও ভালোভাবে তাকালে দেখা যাবে প্রথমটি গড় মাফিক। অবাস্তব বা আবেগের বশীভূত হয়ে যারা কোন কাজ করেন না। এবং একথাও যারা প্রায়ই বলে থাকেন যে "ওরা পাগল,ওরা উন্মাদ"। ওরা" সুখ থেকে বঞ্চিত, ওরা সুবিধা থেকে বঞ্চিত"।

আর এ দ্বিতীয়জনেরাই প্রথমজনদেরকে তাদের কাব্যে সাহিত্যে আক্ষরিক অর্থে তোলে ধরেন তাদের চিন্তা দিয়ে।
কবি জীবনানন্দ দাশ আমাদের উপর তার মৃত্যুকে চাপিয়ে দেননি। যদিও অস্তিত্ব সংকটের কথা তার কবিতায় প্রবলভাবে আলোড়িত। 
দুই হাতে দুই ডাব নিয়ে যিনি চলন্ত ট্রামের সামনে থিতু হলেন তার অভ্যন্তর নিয়ে ঘাটাঘাটি না করে আমি বরং একজন কবির পিড়ীত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে ভাবতে চাই। 
কেন একজন কবিকে বাস্তবিক তার পথচলাতে এতটা হোঁচট পেতে হয়। যদি অনুকূল পরিবেশ তিনি পেতেন তবে কি তিনিই জীবনানন্দ দাশ হতেন না! 
জয় হোক কবির। জয় হোক কবিতার।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন