সঙ্গমরত জোড়া লাশ : সৌর শাইন | ছোটগল্প | মিহিন্দা

 




মানুষের মগজ ভুনা ও বাটি ভর্তি পান্তা ভাতের সংমিশ্রণ দু’চোখের ভেতর সাঁতার কাটতে কাটতে যখন রাজপ্রাসাদের সদর দরোজায় এসে দাঁড়ায়, তখন সন্ধ্যার গলা টিপে ধরে একখণ্ড অন্ধকার। পাতা খসখস শব্দে চমকায় দেবদারুদের শরীর, ঐ আসে কেউ হত্যার ঘুণকাব্য বগলে জড়িয়ে খুনের স্বদিচ্ছা নিয়ে, গলা টিপে নিশ্বাস রোধ করা ছোবল।


এখানে বাধার ঢেউ, বিপত্তির বিষদাঁত ও শৃঙ্খলের চাবিকাঠি। কে ওরা? সমাজ নৃপতির চেলারা মদ গিলে। ধর্মরক্ষকগণ কেতাবের আফিমে ডুবে লিঙ্গ নাচায় লেবাসের তলে। মাদ্রাসার আমির মাওলানা নূরানী সাহেব নাদুস-নুদুস বালকের সমতল বুকে দিয়েছে হাত, শরীরে বসিয়েছে কামড়! আরেক ক্বারি সাহেব কোরআন শেখানোর উসিলায় নাবালিকাকে করেছে সম্ভোগ! রক্ত ও ক্ষত! ক্ষুধা বিকৃতির জাহান্নাম ভোঁ ভোঁ শব্দে কান স্তব্ধ করে দেয়। এখানে দাঁড়িয়ে থাকা কষ্টকর! দূষিত বীর্যের দাগ মাটিকে চিরদুখী করে তোলে। আবার শোনা যায় গির্জার সেই চিরকুমার ফাদারের সংবাদ, যাকে সবাই দেবতা জ্ঞান করত, আশির্বাদের ডালা মেলে ধরতো প্রতিদিন যিশু ভাস্কর্যের সামনে পেছনে সবখানে, তার হাতেও বলাৎকারের দাগ।

এই সবকিছু কচু পাতার পানির মতো একসময় ঝরে পড়ে যায়, বোঝাই যায় না কখনো এখানে পাপের জলছাপ ছিলো। সমাজধর্মের চোখে পাপের কারিশমা লেপ্টে আছে কেবল ওদের পারস্পরিক প্রেম স্বদিচ্ছায়, একজোড়া মনের মিলন মোহনায়। ককর্শ কণ্ঠে ভেসে আসে,‘ওরা তো পাপি, পাপিনী! ওরা ব্যভিচারে মগ্ন, জেনাকারি, ওদের ধরো, ওদের কতল করো। ওদের বিনাশ করো।’


ওরা পরস্পরকে কাছে টেনেছিল ভালোবাসায়। বিনিময় ও মনোমিলনের সেতু গড়ে স্বর্গীয় সুধা ডেকে এনেছিল পৃথিবীর বুকে। ওরা চুমুতে চেয়েছিল মুক্তি! ওরা সমুদ্র ঝড় পাড়ি দিতে চেয়েছিল পরস্পরকে জড়িয়ে। ওরা পাল্টে দিতে চেয়েছিল শৃঙ্খলের চিত্র! ওরা নোংরাদের স্বীকৃতি চায়নি, ওরা তোয়াক্কা করেনি নিবন্ধিত হবার সার্কাসকে! পুঁজির পুঞ্জে থুথু ছুঁড়ে বলেছিল, পৃথিবী মুক্ত! সঙ্গমে আনন্দ, প্রেমের স্রোতে জগত মুগ্ধ! আদি সত্যে পূজোর অঞ্জলি!


সৌরাংশুর দেহ মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে! শ্বাসরোধের দণ্ড দাগ নক্ষত্রপুঞ্জের মতো ছড়ানো। অদ্রিতার চোখ খুঁজে আশ্রয়, পায় না। জ্বলতে থাকে কর্নিয়া! আজ জলশূন্য চারদিক, মরুদিগন্ত ছড়ানো গোটা চোখ। মৃত্যু কামনা রোধ করে গতি!



বিষাদের মঞ্চে একমুঠো ক্ষুধা এসে চেপে বসে নিশ্বাসের অগ্রভাগে, নিশ্বাস ও ক্ষুধার খেলা চলে শত শত বছর ধরে। নিয়তির শরীর খুবলে আঁকা আলপনা পায়ের তলায় জর্জরিত হয়ে চিৎকার করে আকাশ ফাটায়। সেই ফাটল ধরে নেমে আসে ভেজা রাতের ঝড়।

তখনো সৌরাংশু ঘুমে বিভোর! অদ্রিতা বুঝতে পারে না এ কেমন ঘুম! মখমলের মতো নরোম, তৃপ্তিময় সতেজ! দু‘চোখ সূর্যালোকের ছোঁয়ায় পানপাতার মতো উজ্জ্বল হয়ে তাকায়, অথচ অন্ধকারের খোলসে ঘেরা এই মৃৎশিল্প। এঁটেল মাটির মতো নির্মাণে নন্দিত বুকের খাঁচা, খর-কুটোর পাঁজর। যে ঘর পুড়ে গেছে, ছড়িয়ে আছে কেবলি চৌকাঠ, শুকনো ডাল-পালা।


চোখ এত সুন্দর হতে পারে? কে আঁকে এই চোখ? মৃত্যু? অদ্রিতার কণ্ঠে উত্তেজনার ঢেউ।


সৌরাংশু সজাগ হতে পারে না, চির ঘুম ওকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখে। ও পড়ে থাকে পাথরের মতো, বরফের মতো নির্বাক নিশ্চল হয়ে। অদ্রিতা আকাশের দিকে তাকায়, অসহায়ত্ব এসে টোকা দেয় কপালের রেখাগুলোর পিঠে। ওর ভাবনা সাপের মতো এঁকে বেঁকে একসময় কুণ্ডুলি পাকিয়ে বসে।

ওর অপলক চোখ সৌরাংশুকে ঘিরে ধরে নিশুতি রাতের বিশ্বস্ত পাহারাদারের মতো। রাজপ্রাসাদ আজ শূন্যতার হাহাকারে স্নান সেড়ে নিয়েছে। বাগানের ফুলেরা পরেছে নুঁয়ে পড়া বরণ। প্রতিশোধ রূপরেখা আজ ক্ষুধায় রূপান্তরিত। যারা ঘৃণা বুঝে না, ওদের ঘৃণা করা না করা সমান। বরং অবহেলা উচিত সাজা। গোটা পৃথিবীকে অবজ্ঞার নেশা হয় প্রস্তুত।

চারপাশ সজাগ করে অদ্রিতার কণ্ঠ সচল হয়, বন্দি মানবের মুখশ্রী এতো সুন্দর কেন?


প্রশ্নোত্তর দেবার মতো কেউ নেই। নিস্তব্ধতায় খাক হয়ে আছে গোটা মাঠ। আজ দূর্বাদলের চোখে ঘুম নেই, আজ শিশিরের চোখে দুঃখের ফোয়ারা। সৌরাংশু ঘুমাচ্ছে, নিভিড় ঘুম, গভীর ঘুম। কার সাধ্য আছে ভাঙতে পারে এই ঘুম?


রাজসৈনিকরা নিরুপায় হয়ে ফিরে গেছে কালের গর্তে। রানির কেনা সাংবাদিকরা কেঁদে হয়েছে মমি পাথর! অস্তিত্বের দাবানল আজ অপরাহ্নের কোষগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে দূর দিগন্তে ছড়িয়ে দিচ্ছে।


অদ্রিতা মাটি খামচে ধরে রোষানলের তীব্র স্রোতে। চোখের ভেতর ঝড়! শরীরে দোলা দিয়ে যায় মৃত্যুর সৌন্দর্য। কামনার শিখা বনান্তের ঐশ্বর্য পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। অদ্রিতার চোখ জ্বলে, ঠোঁট পুড়ে মগ্নতার আতিশয্যে।


ঘুমন্ত চোখে জাদুর খেলা উপচে পড়ে। অদ্রিতার ঠোঁটের পাশে ছোট্ট তিলটি দীর্ঘশ্বাস ছড়ায়, ঝাউবনে রুদ্ধশ্বাসের ছিপ এসে টোপ ফেলে।


কাঁচের ঘর থেকে বৃষ্টির জলফোঁটা মুছে দেয় টিস্যু পেপারের সংঘবদ্ধ শক্তি। পাল্টে যায় চ্যানেলের নিউজ, সবই রিমোট বাটনের দম্ভ!


পাণ্ডুলিপির বুকে সেই রাজপ্রাসাদ দণ্ডায়মান ইতিহাসের অভিশাপ গায়ে মেখে, পা থেকে মাথা অবধি সাজে কাদাময় নোনা রঙে। পৃথিবী অন্ধকার হয়, দুধেল কুয়াশারা আজ গাঢ়! বিষ বিষ আচ্ছন্ন ভীষণ!


অদ্রিতা লুটিয়ে পড়ে মাটির শুকতারা হয়ে। নিশ্চল সৌরাংশ জেগে উঠে না অদ্রিতার স্পর্শ পেয়েও। পৃথিবী কাঁপে! দূরের মাঠে করুণ শিবরঞ্জনী বাজে! অদ্রিতার কম্পমান ঠোঁট সৌরাংশুকে চুমুতে ডুবিয়ে দেয়, ঠোঁটে ঠোঁটের সঙ্গম তেষ্টা জ্বলে উঠে আগ্নেয়গিরির লাভার মতো। সঙ্গমরত গিরি গলে বিলীন হবার তপস্যায় নগ্ন সুধায় প্রমোদ গুনে। মেঘ ডাকে! গর্জনে জাগে রাতের মৃত্যু পাণ্ডুলিপি। আচমকা বিজলিতে দেখা যায় সাঁকো খেলার পারাপার।


ভেঙে পড়ে সুন্দর, অসুন্দরে লালিত হয় জীবন ও রাজশক্তির লেজ। জবরদস্তির জয় জয়কার ধ্বনি!


গড়ের মাঠে জোড়া লাশ লানত দেখে বর্ষণ করে থুথু ফেলে কেতাবিমহল। দুধেল কুয়াশা ভেঙে নিভে যায় অস্তিত্বের মঙ্গল!


Post a Comment

أحدث أقدم