দুর্জয় খান - এর প্রবন্ধ | মিহিন্দা



আত্মহত্যা ফুল


(১)

বায়রন বলেছিলেনঃ 

" sorrow is knowledge:they who khow the most

Must mourn the deepest o'er the fatal truth. 

The tree of knowledge is not that of life. 


শেলী বলেনঃ 

Our sweetest songs are those 

That tell saddest thought. 


মাইকেল মধুসূদন দত্ত বলেনঃ

আশার ছলনে ভুলি কি ফল লভিনু হায়!


বিহারীলাল বলেনঃ 

সর্বদাই হুহু করে মন

বিশ্ব যেনো মরুর মতন


যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত বলেনঃ 

চেরাপুঞ্জি থেকে 

একখানি মেঘ ধার দিতে পারো 

গোবি সাহারার বুকে?


কাজী নজরুল ইসলাম বলেনঃ

নিশ্চল নিশ্চুপ 

আপনে পুড়িব একাকী গন্ধবিধুর ধুপ।


রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ বলেনঃ

আমি একা এই ভ্রহ্মাণ্ডের ভেতর একটি বিন্দুর মতো আমি একা



মার্ক টোয়েন বলেনঃ 

সবচেয়ে খারাপ একাকীত্ব হলো নিজেকে ভালো না লাগা


এই যে এসব উক্তি বেরিয়ে আসে অন্তরঙ্গ দীর্ঘশ্বাস রূপে এই কবিদের মর্মমূল থেকে। আমরা যদি আরেকটু পিছনে যায় তাহলে দেখতে পাবো জীবনানন্দের নৈরাশ্যবাদকে। জীবনানন্দ বাংলা সাহিত্যের যে ধারায় অবস্থান করেছেন তাতে বোদলেয়ার,র‌্যাঁবো, কাফকা, ক্যামু, মূলত দুঃখ, নৈরাশ্যবাদ,যন্ত্রণা ও মনস্তাপ, উদ্বেগ উৎকন্ঠা, বিকার বিকৃতি, নৈঃসঙ্গপ্রবণতা ও স্বার্থপরতা, পরাজিত মানসিকতা যেনো এঁনাদের জীবনে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ছিলো। মূলত এইসব বিষয়গুলো প্রত্যেক মানুষের ভেতর বিদ্যমান। যার ফলে " আত্মহত্যা " শব্দটি চলে আসে। অর্থাৎ ব্যক্তিজীবনকে যখন নৈরাশ্য ঘিরে ফেলে তখন জীবন হয়ে যায় অর্থহীন। 


নৈরাশ্যবাদীদের আত্মপ্রতিকৃতি উদঘাটন করা যাক প্রথমে। 


জীবনানন্দ ও মুনিরার নৈারশ্যঃ


মৃত্যু হলো চিরন্তন সত্য।  আপনি যতই সুরক্ষা প্রাপ্ত হোন না কেনো, মৃত্যু থেকে পালিয়ে বাঁচবার কোনো উপায় নেই। ধর্মীয় শাস্ত্রগুলোতে উল্লেখ আছে যে, " যে ব্যক্তি বেশি বেশি মৃত্যুকে স্মরণ করে তার আত্মা পরিশুদ্ধ হয়ে যায়'। এতোকিছুর পরেও এই ক্ষণকাল জীবনে ক'জন মানুষ মৃত্যু চিন্তা করে! সেটাই ভাববার বিষয়। ভারত উপমহাদেশের অন্যতম মহাসাধক " সদগুরু" যথার্থ বলেছেন, " মৃত্যু, আমাদের সকলের জীবনে এক অবধারিত পরিণাম"। 


মৃত্যু,  মনে হয় জীবনানন্দের দুশ্চিন্তার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিলো যা তাঁর " মৃত্যুর আগে" কবিতায় স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। শুধু এই কবিতায় নয়। জীবনানন্দের প্রায়ই কবিতায় মৃত্যু তথা পরজন্মের এক অনন্য নিদর্শন পাওয়া যায়। জীবনানন্দের ব্যাপারে ধরে নেয়া যায় জীবন- জগতের প্রতি গভীর ভালোবাসাই এই রকম মৃত্যু চিন্তার কারণ। আপনি যদি জীবন ও জগতকে উপলব্ধি না করেন তবে মৃত্যুচিন্তা মনে আনতে ব্যর্থ হবেন। এক্ষেত্রে তলস্তয় ও রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচিন্তার কিছু আলোকপাত করা যাক। লিয়েফ তলস্তয়ের মৃত্যু চিন্তা অনেক বেশি ছিলো। জীবন জগত বিমুখ স্থুল অনুভূতির লোকেরা এভাবে মৃত্যু নিয়ে চিন্তা করেন না। উদ্বিগ্নও হোন না। ১৯১০ সালে যখন লিয়েফ তলস্তয় মারা যান তখন মৃত্যুর আগে তিনি গৃহত্যাগী হয়েছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি তার স্ত্রীকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন,  " যে প্রাচুর্যের মধ্যে আমি জীবনযাপন করেছি তার মধ্যে আমার আর থাকা সম্ভব হচ্ছে না। জীবনের শেষ কটা দিন আমি নির্জনে, শান্তিতে কাটানোর জন্য গৃহস্থাশ্রম ত্যাগ করছি। আমার বয়সে একজন বৃদ্ধ সচরাচর যা করে থাকেন আমি তাই করছি। " এই চিঠিই ছিলো লিয়েফ তলস্তয়ের শেষ জবানবন্দি।  তার কিছুদিন পরেই লিয়েফ তলস্তয় মৃত্যুবরণ করেন। অপরপক্ষে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর " মৃত্যুর পরে, সিন্ধুপারে, দুঃসময় " এরকম অসংখ্য কবিতায় তিনি মৃত্যুচিন্তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন। অর্থাৎ মৃত্যু অনুষঙ্গেও লিয়েফ তলস্তয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় পুনর্জীবনের কথা এসেছে। অর্থাৎ আমাদের ঐতিহ্যে পুনর্জন্মবাদ ইতিহাস, চেতনা, ও সময়বোধকে এক বিশেষ খাতে প্রবাহিত করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় ডায়াস্পোরা কবিদের অত্যুজ্জ্বল প্রতিনিধি কবি মুনিরা চৌধুরীর কবিতায় ও বাস্তবিক জীবনে অনাদ্যন্ত মহাকাল ও নিরবধি মহাশূণ্যের চেতনায় এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছেন। কবি মুনিরা চৌধুরী মৃত্যুর আগে লিখেছেন,  ' কে ডাকছে আমায়, তুমি না স্বয়ং ঈশ্বর! " কবি জীবনানন্দ দাশকে যেমন মহাকালের বোধ টেনে নিয়ে গেছে, তাড়িত করেছে বারবার নক্ষত্রের দিকে ঠিক তেমনি কবি মুনিরা চৌধুরীকে মৃত্যু চিন্তা নিয়ে গেছে উত্তাল সমুদ্র অব্দিই।  মুনিরা চৌধুরীর বড্ড ইচ্ছে ছিলো কোনো এক কুয়াশাভোরে মৃত্যুবরণ করবেন। ঠিক তাই তিনি কুয়াশাভোরেই মিলিয়ে গেছেন।  এখানে একটি কথা চলে আসতে পারে, এরকম মৃত্যু চিন্তা আত্মহত্যার কারণ হয়। আপনাকে যদি প্রশ্ন করি, জীবনানন্দ কি আত্মহত্যা করেছিলেন? মুনিরা চৌধুরী কি আত্মহত্যা করেছিলেন? ওদিকে জীবনানন্দ প্রকাশ করেছেন কুয়াশাভোরে মিলিয়ে যাবার, অপরপক্ষে কবি মুনিরা চৌধুরীও।  দুজনের মৃত্যু স্বাভাবিক ছিলোনা। এক্ষেত্রে প্রশ্নটি যথাযথ। অনেকে মনে করেন ঔদাসিন্যের কারণে কিংবা অসুস্থতার কারণে কবি জীবনানন্দ দাশ ট্রামের সাথে ধাক্কা খেয়ে মারা যান।  তবে ব্যাপারটি আজও রহস্যময়।  অপরদিকে কবি মুনিরা চৌধুরী একাকীত্বকে সংবরণ করতে না পেরে অসচেতনতায় রোড এক্সিডেন্টে মারা যান। এ ব্যাপারটিও আজ রহস্যময়।  এখানে একটা জিনিস লক্ষ্যনীয় যে, নৈরাশ্যবাদীরাও বাঁচতে চাই আবার মৃত্যুকে ভয় পাই। অন্যদিকে সুখ চাই দুঃখ কষ্ট থেকে দুরে থাকতে চাই। এখানে অটোমেটিক চলে আসে আত্মহত্যার রহস্য বিবেচনার বিষয়। আশাভঙ্গ, পরাজয়ের গ্লানি, অভিমান, কাউকে আপনরূপে না পাওয়ার ফলে জীবনকে সম্পূর্ণ অর্থহীন বোধ করা। প্রতিশোধস্পৃহা চরিতার্থতায় ব্যর্থতা ইত্যাদি নানাকিছু মানুষকে আত্মহত্যায় নিয়ে যায়। 


" নয় দরজার বাতাস " কাব্যগ্রন্থে কবি মুনিরা চৌধুরী লিখেছেন 


" চক্ষু খুলে দেখি - কোথাও চক্ষু নেই, ছায়া নেই প্রতিবিম্ব নেই

শূণ্য কুঠরীতে পড়ে আছে 

মৃত সব মুনিরামায়া আমার অগ্নিমায়া"


অপরদিকে কবি জীবনানন্দ দাশ " হাওয়ার রাত" কবিতায়  লিখেছেন


" আড়ষ্ট ___ অভিভূত হয়ে গেছি আমি

কাল রাতের প্রবল নীল অত্যাচারে আমাকে ছিঁড়ে ফেলছে যেনো ; ""


দুজনের কবিতায় সিম্বলিজম ও আত্মিক শিল্পজাতের অসম্ভব রকম মিল। চিন্তা চেতনার দিক দিয়ে জীবনের বিকার বিকৃতির ও অবক্ষয়ের অদ্বিতীয় শৈল্পিক রূপকার বটে। নির্দ্বিধায় বলা যায় বোদলেয়ার থেকে জীবনানন্দ, জীবনানন্দ থেকে মুনিরা চৌধুরী। যদিও ক্ষণকাল জীবনে কবি মুনিরা চৌধুরীর রচনাবলি ও বিষয়বৈচিত্র তাঁদের তুলনায় কম। তবে আত্ম-প্রতিকৃতির অসম্ভব রকম মিল রয়েছে।  


(২)


মানুষের দুঃখের কারণ একই সঙ্গে তার স্বভাবের মধ্যে এবং পরিস্থিতি ও পরিবেশের মধ্যে নিহিত থাকে। সাংখ্যদর্শন ও বৌদ্ধধর্ম দুঃখের কারণ ও দুঃখনিবৃত্তির উপায় সন্ধান করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত জীবনের সম্পূর্ণ বিলুপ্তিই তো কামনা করেছেন! জীবন থাকলে দুঃখও থাকে। দুঃখ দূর হতে পারে জীবন বিলুপ্ত হলেই। কামনা বাসনার বিলুপ্তি তো জীবনেরই বিলুপ্তি। যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক,  নির্বাণ জীবনের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ছাড়া আর কি!! দুঃখ যখন মানুষকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলে তখন জীবন হয়ে উঠে নিরর্থক মানুষের কাছে। নির্জনতম কবি জীবনানন্দ দাশের কথায় ধরুন,  জীবনানন্দের মৃত্যুর পরে " কবি জীবনানন্দ দাশের জীবনদর্শন " শীর্ষক প্রবন্ধে বিমলচন্দ্র ঘোষ লিখেছিলেন........ " জীবনানন্দের জীবনচেতনায় শান্তি ছিলো না,আনন্দও ছিলো না। সর্বদা তিনি মরা নক্ষত্রের বরফঢাকা শীতলতার মধ্যে ডুবে থাকতেই ভালোবাসতেন "।  অর্থাৎ নৈরাশ্য যেনো কবির অস্থিমজ্জার সঙ্গে মিশে ছিলো। মানব সভ্যতার এই গৌরবময় যন্ত্রযুগে জন্মগ্রহণ করলেও কবি জীবনানন্দ দাশ ক্রমাগত মৃত্যু কামনা করে গেছেন তাঁর অগণিত বিষণ্নমন্থর কবিতার  মাধ্যমে। বলা যায় এটা এক অদ্ভুদ মানসিক ব্যধি। " মরা নক্ষত্র " যেনো তার সাথে নাড়ীর যোগ ছিলো। অগ্রহায়ণ মাসের হৈমন্তী কুয়াশা যেনো জীবনানন্দের কবি মনের আকাশে সর্বদা শিশির ঝরাতো। বস্তুত লক্ষ্য করলে দেখা যায়,  প্রকৃতপক্ষে আমরা মৃত্যুর কাছাকাছি বসবাস করছি, মৃত্যুই আমাদের সময়ে সময়ে জীবনের প্রতি বেশি মনোযোগী করে তুলছে।  ধূসর পান্ডুলিপিতে যার যাত্রা শুরু সেই " মৃত্যুধর্মী ধূসর আত্মকেন্দ্রিকতার হাত থেকে কবি জীবনানন্দ দাশ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আর মুক্তি পাননি।জীবনানন্দ কেনো আত্মহত্যা করলো? কবি মুনিরা চৌধুরী কেনো আত্মহত্যা করলো?  তাদের আত্মহত্যার কোনো কারণ তো আমি দেখছি না। এই আত্মহত্যার প্রতি জীবনানন্দ ও মুনিরার মনোভাব কি একইরকম ছিলো!! এটাই পাঠকদের ঔৎসুক্যের কেন্দ্রবিন্দু। লণ্ডন প্রবাসী কবি মুনিরা চৌধুরী ১৮ নভেম্বর সকালে সমুদ্রের উপকূলে গিয়ে আত্মহত্যা করেন। আদৌ কি সেটা আত্মহত্যা ছিলো কি না কিংবা ১৪ ই অক্টোবর দুই থোকা ডাব হাতে রাস্তা পার হওয়ার সময় ট্রামের ধাক্কায় কবি জীবনানন্দ দাশ আহত হন এবং শম্ভুনাথ হাসপাতালে দীর্ঘ সাতদিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করে অবশেষে হার মানেন ২২ শে অক্টোবর। এইসব প্রশ্ন পাঠকদের রীতিমতো এখনো ভাবিয়ে তোলে যে, জীবনের অথহীনতার বোধ, অর্থহীন জীবনযাপনের ক্লান্তি, তাদের আত্মহত্যার একমাত্র কারণ নয় কি!!

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন