শাকিল রহমান - এর কবিতা | মিহিন্দা

 




বৃক্ষের দুর্ভিক্ষ




বুলেটের চেয়ে তীব্র গন্ধ দূর্ভিক্ষ
হতাশার চিত্র ফুল হয়ে ফোটে পেটে - পিঠে।
আমি অভাবগ্রস্হ মানুষ –
সক্রেটিস-এর বিষের পেয়ালা মুখে তুলে মানুষকে শোনাই আত্মহত্যার জয়গান।
চুয়াত্তরের দূর্ভিক্ষের দেয়াল ভেদ কোরে নেমে আসি,
কানে কান রেখে শুনছি আগামীর মহামারীর গান
এত এত ক্ষুধা-অভাব-জরা-দুঃখগ্রস্হের ভেতর
            জন্ম নিয়ে দ্যাখলাম – উত্তপ্ত জল পাতিল টপকে নেমে আসে প্যালেষ্টাইন শিশু'ফুলের বুকে।

পৃথিবীর আয়নায় চোখ রাখি, কোনো ফল নেই–ক্ষুধায় ভেসে ভেসে আসে নরকের ফুলদানি।




ডালিম গাছ




গাছটি ডালিম ফল দিত, ছোট - ছোট, লাল - লাল।
বাবার ডালিম পছন্দ নাহ্। আমার খুব পছন্দের। ক্ষুধাতুর পেট নিয়ে গাছ থেকে ছিঁড়ে খেতাম ডালিম ফল। লাল - লাল দানা, কয়েকটি শাদা শাদা দুঃখ-বেদনা লুকোনো।


ছোটবেলায় পড়ছি –"গাছের প্ৰাণ আছে" (জগদীশ)-
বিশ্বাস করিনি, তাই পরীক্ষায় নৈর্ব্যক্তিকে 'না' ভরাট কোরে বাড়ি ফিরে আসি। ডালিম গাছটি বয়সের ভারে নুঁয়ে পড়ে, ফুল দেয় নাহ্, ফল দেয় নাহ্।
যেহেতু বাবা ডালিম পছন্দ করেন নাহ্ সেহেতু গাছটি কেটে তারপাশে রুইয়ে দিলেন সবুজ পেয়ারার গাছ।

কাটা ডালিম গাছের শিকড় থেকে বেরিয়ে আসে নতুন চারা – ডালিমের পাশে বেড়ে ওঠে সবুজ পেয়ারা।




দেয়াল




দেয়াল ধরে বেড়ে ওঠে শ্যাওলা
অন্ধকার অন্ধের বুক ছিঁড়ে নেমে আসে,
কেউ কেউ এখানে আশ্রয় নেয় পথিকের বেশভূষায়।
শরতবনে নেমে আসে শরৎ – শরতফুলের গা ঘেঁষে চলে গ্যাছে মৃত নদী, নদীর পাড় ধরে হেঁটে যায় শেয়াল। শতবছর এখানে বৃষ্টি নেই সুতরাঙ শেয়ালের গা ঢাকা দ্যাওয়ার মত দেয়াল প্ৰয়োজন পড়ে না।
আমি ঈশ্বর প্রদত্ত অন্ধ – অতএব আমি দিকহারা হোয়ে পিঠ পেতে দেই দেয়ালের কাছে।


অথচ দেয়াল ভাঙতে গ্যালে আমি শ্রমিক কিম্বা সৈনিক  হয়ে উঠি, গড়তে গ্যালে খরচা করি শ্রম এবঙ ঘাম।




এবঙ কয়েকটি অভাব




মানুষ – মানুষকে ভাড়া দেয়
পানশালায় অভাবগ্রস্হ নারীর মত বিক্রি করে মানুষের কাছে। ভাঙাড়ে ভাড়াটে জরাজীর্ণ জীবন
            হাতের হাতুড়ি ভাঙে হাড় ;
আমারে ১ আনায় ভাড়া দিয়ে কিনে আনি চাল,ডাল,তেল
কসাইয়ের বাজারে দাম নেমে গ্যাছে মাংশের
মূল্য বেড়ে গ্যাছে ছোট এলাচ দানার।

এলাচ দানার ভেতরে ঢুকে দ্যাখি জেগে আছে কয়েকটি মুমূর্ষ অভাব।




শোক ও ঈর্ষা




মাতালের মত গালাগাল কোরে ঘুমিয়ে পড়ি
মধ্যরাতে ডাকাতের পদশব্দে সজাগ হয়ে যায় তোমার বাড়ির কুকুর – তোমার উরুদ্বয়ে পড়ে থাকে একটি নিঃস্ব পাখির সুখ এবঙ শোক।
অপরের কবিতার মত তোমারে ঈর্ষা হয় ;
ঈর্ষার ক্রোশে পোড়ে কবিতার বাসর
মক্তবের কিশোরের মত হাসো – আলিফ-লাম-মীম তেলাওয়াত করো উচ্চস্বরে
ভ্রমরের কৌশলে ডানা মেলে উড়ে যাও ফসলে, ফুলে।
বিধবার শোক ঢুকে পড়ে দরজার ফাঁকে
দেয়ালের আস্তরণে উঠে আসে আশ্বিনে গত হওয়া বৃদ্ধ জীবনের কঙ্কাল।

তুমুল শোকের সবুজ মসনদে বোসে সেলাই করি অনাগত প্রেমিকার যাবতীয় দুঃখের সায়া!




ঘরঘোর




সন্ধ্যা, রাত টুপটাপ ঝরে পড়ে বুকের উপর –
সমতল ভূমে আদমের কোনো জানালা নেই, নেই
  ঘর
        দুয়োর
                 ছাউনি
                             পাটি
                                  বালিশ
                                                 আশ্রয়কেন্দ্র।

কার ঘরে রাখি মাথা –
কার ঘোরে রাখি পা!
একজন দর্জি, অনবরত সেঁলাই করছে মানুষের দেহ।
  - কবরখোদক, মানুষের জন্য বানাচ্ছে ঘরঘোর।
কে হে তুমি মশাই?
তপ্ত রোদে কোদাল ধরে ভুড়ি বের কোরে কাঁদছ বিধবা মালির মত!




ফেরার কৌশল




ভেজা শীত-শীত, জোস্নায় কুয়াশা, ট্রাম লাইন, মুমূর্ষ গার্মেন্টস, বিষাদ'বার কাঁধে, বুকে জল-দুঃখ নিয়ে উড়ে উড়ে যায় ফড়িং –
পিঁপড়ের কৌশলে পথ চলে মাতাল
মাতাক্রান্ত রাত নিভে যায় স্টেশনে শুয়ে থাকা বুড়ির শীতের শীৎকারে।
একটি জরা, দুঃখগ্রস্হ আপেল পড়ে আছে কুমারীর পায়াবিহীন খাটে – কাঠ নিঃশব্দে খায় মাতাল কয়েকদল ঘূনোপোকা।
বাসের হাতল ধরে আপেলের হাড় নিয়ে বাড়ির দিকে ছুটে যাচ্ছে গার্মেন্টস কর্মী রাবেয়া।





নরকদানি




অভিশাপ দিয়ো – নাগরিক যানযটে দ্যাখা হলে ফিরিয়ে নিয়ো সহস্র বছরের চেনা পরিচিত চোখ।
জেনে রাখ –
আমাদের পথ ওতটা দীৰ্ঘ নয় স্বর্গের সিঁড়ি ছোঁবে,
গতবারের মত বিষাদবারে আমরা ঠিক'ই নেমে যাব নরকের ফুলদানিতে।


Post a Comment

أحدث أقدم